আলোকিত মানুষের জন্যই প্রকৃত ভালোবাসা

আনিসুর রহমান এরশাদ

আপন আলোতে নিজের সমাজ এবং সমাজের মানুষকে উদ্ভাসিত করেন আলোকিত মানুষরাই। সততা, সাহস ও উদ্যোগ নিয়ে দৃষ্টান্ত হয়ে ছড়িয়ে থাকা আলোকিত মানুষরাই সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যান, টেকসই উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি মানব সম্পদ তৈরি করেন।আলোকিত মানুষ নিজেই শুধু আলোকিত নন, নিজে শুদ্ধ-পবিত্র-বড় হওয়ার পাশাপাশি এমন কিছু মানুষ তৈরি করে যান যারা আলো ছড়ায় চারপাশে।

সত্যিকারের আলোকিত মানুষ মানেই নিবেদিত মানুষ, একজন নিঃস্বার্থ মানুষ। আলোকিত মানুষরাই সমাজকে আলোকিত করেন এবং ভবিষ্যতে সমাজে আলো ছড়ানোর মানুষ তৈরি করে যেতে পারেন, আগামী প্রজন্মকেও সঠিক পথে পরিচালিত করার পথ রচনা করতে পারেন, সৎ চিন্তার বিকাশ ঘটানোর কাজ করতে পারেন, মানুষকে মুল্যবোধ শিখান ও অবচেতন মনকে চেতনা যোগান। যার মন আলোকিত নয় তার কথা অন্য মানুষকে আলোকিত করে করে না, ইতিবাচক কাজে অনুপ্রাণিত করে না, মানুষকে সৎ ও পরিশ্রমী হবার সাহস যোগায় না। আলোকিত মানুষরাই নিজ কর্মগুণে সবার মনে স্থান করে নেন, গণ-মানুষের উপকারে আত্মনিয়োগ করে মানসিক প্রশান্তি লাভ করেন।

অনুকরণ ও অনুসরণ যোগ্য একজন আলোকিত মানুষ জানেন- একজনের চিন্তাশক্তি, শারীরিক-মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব অন্য কারো নয়। ফলে কত বড় ডিগ্রি আছে, কত বেশি ক্ষমতা আছে, কত বেশি জনসমর্থন আছে এসব না ভেবেও তারা নিরবে কাজ করে যেতে পারেন। সাধারণত প্রত্যেকের কাছেই নিজের, পরিবারের, আত্মীয়-স্বজনের, সমাজের, দেশের, মানবতার কিছু অধিকার রয়েছে। ব্যক্তিগত অসচেতনতার কারণে এসব অধিকার পূরণে সাধ্যানুসারে কাজ না করলে ব্যক্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যের অধিকারও পূরণ হয় না। যে কোনো পর্যায়ের সম্ভাবনাই সঠিকভাবে বিকশিত না হলে নানা সমস্যার উদ্ভব ঘটে, সংকট সৃষ্টি হয়ে বড় ধরনের ক্ষতি হয়। তাই নিজের জন্য না হোক বৃহত্তর স্বার্থে তথা পরের জন্যে হলেও স্বাস্থ্যের প্রতি, সময়ের সদ্ব্যবহারের প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত। আলোকিত মানুষের জন্যই প্রকৃত ভালোবাসা রয়েছে। কারণ মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন আলোকিত মানুষরাই সমৃদ্ধ জাতি গঠনে সঠিক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন।

বৃহৎ দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়াটা সহজ হয়। সংকীর্ণ চিন্তা ও আবেগ নির্ভর সিদ্ধান্ত সব সময় বাস্তবিক পক্ষে সুফল বয়ে আনে না। পৃথিবীতে মানুষের পরিচয় নির্মিত হয় অনেক বিষয়কে কেন্দ্র করে। যেমন-ধর্ম, ভৌগোলিক অবস্থান,রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, জাতিসত্তা, ভাষা সহ আরো অনেক কিছুই। তবে শুধুমাত্র এসব পরিচয় দিয়েই ব্যক্তির অবস্থান ও ব্যক্তিত্ব নির্ণিত হয় না। ব্যক্তির মধ্যকার আভ্যন্তরীণ গুণাবলীই তার স্বকীয়তা বিনির্মাণ করে। ব্যক্তির চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গি, রুচিবোধ ব্যক্তির পরিচয় সুস্পষ্ট করে। একই ভাষার, একই দেশের, একই এলাকার অন্তর্ভুক্ত সব মানুষের মূল্যায়নও একই রকম হয় না। এর মধ্যেও ভিন্নতা তৈরি হয়। নানান পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা বা জ্ঞানগত কারণে ব্যক্তিভেদে পার্থক্য দেখা দেয়। একজন ব্যক্তির বড় পরিচয় সে ব্যক্তিই তৈরি করে। ব্যক্তির কর্ম পরিসর, জীবন-প্রণালী তথা সামগ্রিক কার্যক্রমেই প্রমাণিত হয় ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু, দক্ষতা কতটুকু।

সবাই মানুষ কিন্তু সমান উন্নতি অর্জন হয় না। কেউ এগিয়ে যায়, কেউ পিছিয়ে পড়ে। পিছিয়ে পড়া ব্যর্থ মানুষের আত্মপরিচয় সংকট তার উন্নতির পথে সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দেখা দেয়। আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাহীন ব্যক্তিরা কখনোই বড় ব্যক্তিত্ববানরূপে নিজেকে গড়ে তুলতে পারেন না, দ্বিধা-সংকোচ থাকায় একটি নিজস্ব বলয় সৃষ্টি করতে পারে না। ব্যক্তির এগিয়ে যাওয়া কিংবা পিছিয়ে পড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ব্যক্তির নিজের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তির কার্যক্রমই তার অবস্থান তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সহায়ক। নিজেকে গড়ার যাবতীয় প্রস্তুতি ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখাই নিজের পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট। তবে কেউ যদি নিজে পরিবর্তন চায়, নিজেকে গড়তে চায়, সে জন্য অব্যাহত প্রচেষ্টা চালায় চারপাশের অনেক শক্তিই তার সহায়ক হয়। সেক্ষেত্রে বাস্তবায়নে উদ্যোগী হহতে হয়, ঘটনা শুধু প্রত্যক্ষ না করে ঘটনা সৃষ্টিও করতে হয়।

নানান ধরনের বৈচিত্র্যময় জ্ঞানের অফুরন্ত ভাণ্ডার লাইব্রেরীর নিরিবিলি পরিবেশ তাদের চিন্তাশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক; যারা শুধু ভাবুকজীবন পছন্দ করেন না, স্বপ্নের জগতেই রাজত্ব করেন না বরং বাস্তব জীবন ও জগৎ সম্পর্কে দারুণ কৌতূহলী। শান্তি সুখের নীড় লাইব্রেরীর সংস্পর্শ দেয় বিশালতার সন্ধান, প্রেরণা নেয়ার এ এক সর্বোত্তম ঠিকানা যেখান থেকে চর্মচক্ষুর চেয়ে মনের চক্ষু বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অনুসন্ধিৎসু মন নতুনত্বেরর সন্ধানে সদা উদগ্রীব হয়ে থাকে। জ্ঞানের জগৎটা বিশাল। সার্টিফিকেট সর্বস্ব শিক্ষা নয়; জীবন ও জগৎ থেকে, প্রকৃতি থেকে, বাস্তবতা থেকে শেখার আছে। জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করার জন্য শুধু বই পড়াই যথেষ্ট নয়। এতে জ্ঞান পরিপূর্ণ হয় না, শুধু তত্ত্ব তৈরি হয়; সে তত্ত্বের প্রয়োগের জন্য উপযোগি জ্ঞানের শূন্যতা বিরাজ করে। জ্ঞানের আলো সর্বস্তরে ছড়ায়ে দিতে হলে জ্ঞানাহরণের পদ্ধতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। পৃথিবীতে অনেকেই নিজেকে সীমাবদ্ধ একটা পরিসরে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলতে চায় না, সীমানা বা সীমারেখাকে অতিক্রম করে যায়। মহানায়কদের ঘটনা বিরাট পরিধিতে কার্যক্রম পরিচালনার মানসিক প্রস্তুতি জোগায়, হতাশা ভুলায়ে নতুন আশা-বিশ্বাস-উদ্দীপনা জাগায়, নিজের সীমাবদ্ধতা-দুর্বলতা অনুধাবনের সক্ষমতা বাড়ায়, সম্ভাবনার বিশালতা অনুধাবণে সহায়ক হয়। মহৎ উদ্দেশ্যই ব্যক্তিকে মহৎ করে তুলে।

যার মন যত বড়, মানুষ হিসেবে সে তত বড়। হৃদয়ের বিশালতা দিয়েই ব্যক্তির বিশালতা অনুধাবণ করা সম্ভব। যে জিনিসের যে কাজ, সে জিনিসের দ্বারা যদি সে কাজ না হয় তবে তা মূল্যহীন। কলমের কাজ লেখা। সবকিছুই কলমের ঠিক আছে, শুধু কালি ফুরিয়ে গেছে। অর্থাৎ কালি না থাকায় লেখার কাজে সে ব্যবহৃত হতে অক্ষম। সে মূল্যহীন। তারপরও যদি সেটিকে ‘কলম’ বলে পরিচয় দেয়া হয় তবে তার সাথে ‘খালি’ শব্দটা যোগ হয়ে হয় ‘খালি কলম’। নামে নয় গুণেই পরিচয়। উদ্দেশ্য মহৎ কি-না সে ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব মহৎ হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তিদের পক্ষেই। দুধের সাথে প্রস্রাবের সংমিশ্রণ যেমন যৌক্তিক হতে পারে না, বিশাল চিন্তা ও সংকীর্ণ হৃদয়ের সমন্বয় তেমনি অযৌক্তিক। মহৎ কাজ করার জন্য বিশাল হৃদয়ের প্রয়োজন। মনের চোখ শক্তিশালী হলেই স্বপ্ন, বাস্তবতা ও পরিকল্পনার যৌক্তিক দৃঢ়তা অনুধাবণ করা সম্ভব। রঙ্গীন চশমা দিয়ে কখনোই সত্যিকারের রং প্রত্যক্ষ করা যায় না। বড় মনের মানুষদের যৌথ প্রচেষ্টাতেই যে কোনো মহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হতে পারে।

আমরা অনেক ক্ষেত্রেই একটু বেশি তাড়াহুড়ো করি। ধৈর্য কম থাকায় অনেক ক্ষেত্রে আমাদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিটা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সরল ব্যাপারটাও সঠিকভাবে বোঝার বিবেচনা শক্তিও থাকে না। উদ্যোগ নিতেই হবে পরিবর্তন চাইলে। অনেকে সহজেই স্বার্থের টানে পরের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে তৃপ্তি পায়। নিজের সম্মান, ব্যক্তিত্ব রক্ষা ও বিকাশে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালালেও অপরের আত্মমর্যাদায় আঘাত দিতে পারলে আনন্দ লাভ করে। এরা মানুষ হিসেবে খুব বড় হতে পারে না। যে সত্যিকারের বিজয়ী হয়, সফল; সেই ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি উন্নত থাকে। সে ব্যর্থতা আসলেই ভেঙ্গে পড়ে না, হতাশ হয় না। পরাজয় আসলে সেখান থেকেও শিক্ষা নিয়ে সমৃদ্ধ হয়। সমস্যা চিহ্নিত করে, ত্রুটিগুলো খুঁজে নেয়, সমাধান কৌশল আবিষ্কার করে, অভিজ্ঞতা অর্জন করে। আর জয়ের আনন্দ, কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসলে নতুন করে প্রেরণা পায়, সঞ্জীবনী শক্তি পায়, সজীবতা লাভ করে। শক্তিশালী হয় হৃদয়, হয় দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *