অমৃতফল আমলকি : শ্রেষ্ঠ ফলগুলোর অন্যতম

আমলকির গুণের কথা আমরা অনেকেই জানি। আমলকি ত্বকের বুড়িয়ে যাওয়া রোধ করে, রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করে, স্মৃতিশক্তি বাড়ায়। আমলকিতে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, আমলকিতে পেয়ারা ও কাগজি লেবুর চেয়ে ৩ গুণ ও ১০ গুণ বেশি ভিটামিন সি রয়েছে। আমলকিতে কমলার চেয়ে ১৫ থেকে ২০ গুণ বেশি, আপেলের চেয়ে ১২০ গুণ বেশি, আমের চেয়ে ২৪ গুণ এবং কলার চেয়ে ৬০ গুণ বেশি ভিটামিন সি রয়েছে। নিচে আমলকির কয়েকটি উপকারিতা বা ব্যবহারিক দিক নিয়ে আলোচনা করা হলো :

সাধারণত ভিটামিন সি এর অভাবে স্কার্ভি নামক রোগ আমাদের শরীরে বাসা বাধে। এর ফলে দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ে, মাড়িতে ঘা হয়, শরীর দুর্বল হয়ে যায়, চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণ হয়, চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে যায় এবং হাড়ের মধ্যে পরিবর্তন দেখা দেয়। অথচ প্রতিদিন মাত্র ১-২টি আমলকি খেলে এসব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কারণ এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি। প্রতি ১০০ গ্রাম আমলকিতে আছে: জলীয় অংশও – ৯১.৪, মোট খনিজ – ০.৭, আঁশ – ৩.৪, খাদ্যশক্তি – ১৯, আমিষ – ০.৯, চর্বি – ০.১, শর্করা – ৩.৫, ক্যালসিয়াম – ৩৪মি:, লৌহ – ১.২, ক্যারোটিন – ০, ভিটামিন বি-১ – ০.০২, ভিটামিন – ০.০৮মি:, ভিটামিন সি – ৪৬৩।

নিয়মিত আমলকি খেলে পেটের আলসার দূর হয়। আমলকির রস কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং পাইলস রোগ থেকে মুক্তি দেয়। প্রতিবার খাওয়ার আগে মাখন ও মধুর সঙ্গে আমলকির গুঁড়া মিশিয়ে খেলে ক্ষুধামন্দা দূর হয়। দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে আমলকি।  এছাড়া চোখ লাল হওয়া, চুলকানো ও চোখ দিয়ে পানি পড়া রোধেও এটি বিশেষ ভূমিকা রাখে।

দীর্ঘমেয়াদী কাশি-সর্দির জন্য আমলকির নির্যাস উপকারী। শরীরের অতিরিক্ত মেদ ঝরিয়ে দৈহিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।    এমনকি এটি খেলে হজম শক্তি বেড়ে যায়। ফলে মানুষ মুটিয়ে যায় না। আমলকি চুলের টনিক হিসেবে কাজ করে। চুলের যত্ন নেওয়ার জন্য এটি একটি অপরিহার্য উপাদান। আমলকি খেলে শুধু চুলের গোড়াই শক্ত হয় না, চুল দ্রুত বেড়ে ওঠে। চুলকে খুশকিমুক্ত ও কম বয়সে চুল পাকা রোধে আমলকি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন সকালে মধুর সঙ্গে আমলকির রস মিশিয়ে খেলে চর্মরোগ নিরাময় হয়। তাছাড়া এটি খেলে ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায় এবং মুখের চামড়ায় কোনো দাগ পড়ে না।

আমলকি রিপ্রডাক্টিভ হেল্থ বা প্রজনন ক্ষমতার উন্নতি ঘটায়। আমলকি কামনাকে বাড়িয়ে দেয়। ফলে আপনার সেক্স লাইফের উন্নতি ঘটে। এ ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি আছে যা পুরুষদের স্পার্ম কাউন্ট বাড়িয়ে দেয়। আমলকি যৌন শক্তি ও পুরুষত্ব এরও উন্নতি ঘটায়। এর প্রধান কারণ আমলকিতে আছে আয়রন আর জিঙ্ক। যে নারীরা সাদা স্রাব সমস্যায় ভোগেন‚ আমলকি শুকিয়ে তা গুঁড়ো করে মধু দিয়ে নিয়মিত খেলে উপকার পাবেন। পুরুষরা আমলকির জুস সকালে খালি পেটে বা সন্ধ্যায় খেতে পারেন। সেক্স লাইফ উষ্ণ এবং রঙিন করতে আমলকি গুঁড়ো করে মিশিয়ে দুধ খেতে পারেন।

আমলকি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মানসিক চাপ কমায়। কফ, বমি, অনিদ্রা, ব্যথা-বেদনায় আমলকি অনেক উপকারী। ব্রঙ্কাইটিস ও এ্যাজমার জন্য আমলকির জুস উপকারী। শরীর ঠাণ্ডা রাখে, শরীরের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে, পেশী মজবুত করে। এটি হৃদযন্ত্র, ফুসফুসকে শক্তিশালী করে ও মস্তিষ্কের শক্তিবর্ধন করে। আমলকির আচার বা মোরব্বা মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা দূর করে। শরীরের অপ্রয়োজনীয় ফ্যাট ঝরাতে সাহায্য করে। লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা বাড়িয়ে তুলে দাঁত ও নখ ভাল রাখে। এর এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান ফ্রি র্যাদডিকালস প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। বুড়িয়ে যাওয়া ও সেল ডিজেনারেশনের অন্যতম কারণ এই ফ্রি র্যাওডিকালস। সর্দি-কাশি, পেটের পীড়া ও রক্তশূন্যতা দূরীকরণে বেশ ভালো কাজ করে। ব্লাড সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রেখে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। কোলেস্টেরল লেভেলেও কম রাখাতে যথেষ্ট সাহায্য করে।

রোজ সকালে উঠে যদি একটা গোটা আমলকি খাওয়া যায়, তাহলে শরীরের পক্ষে খুবই ভালো। শুধুই ফলই না, পাতাও ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আমলকির রস রক্তের চিনির মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। লিভারের কর্মক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সাহায্য করতে পারে। ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, প্রদাহ এবং কিডনি রোগ সারাতে আমলকির বিশেষ গুণ রয়েছে। আমলকির ফল, পাতা ও ছাল থেকে তৈরি পরীক্ষামূলক ওষুধে এইসব রোগ নিরাময়ের প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া প্যানক্রিয়াটাইটিস রোগের পরে ক্ষতিগ্রস্ত প্যানক্রিয়াস (অগ্ন্যাশয়)-এর ক্ষত সারাতে আমলকি খুবই কার্যকর।

আমলকিতে সামান্য নুন আর লেবুর রস মাখিয়ে রোদে শুকোতে দিন। শুকনো আমলকি রোজ খান। খাবারের সঙ্গে আমলকির আচারও খেতে পারেন। হজমে দারুন সাহায্য করে।  আমলকি মাঝারি আকারে টুকরো করে ফুটন্ত পানির মধ্যে দিয়ে নরম করতে দিন। পানি ঝরিয়ে টান্ডা করতে দিন। এরপর নুন, আদা কুচি, লেবুর রস মাখিয়ে রোদে শুকোতে দিন। একটি এয়ারটাইট পরিস্কার জারের মধ্যে রেখে দিন। নষ্ট হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *