প্রোস্টেট ক্যানসারের কারণ-লক্ষণ-প্রতিরোধে করণীয়

ডা. রকিব উদ্দীন আহম্মেদ
প্রোস্টেট ক্যানসার পুরুষদের একটি রোগ। সাধারণত প্রবীণ বয়সে পুরুষদের প্রোস্টেটগ্রন্থি বড় হতে দেখা যায়। একে আমরা বলি বিনাইন হাইপার ট্রপি অব প্রোস্টেট। প্রোস্টেট বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে এই প্রোস্টেট বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি যেটি হতে পারে সেটি প্রোস্টেট ক্যানসার। অর্থাৎ বয়স্কদের যে সমস্যা দেখা দেয়, সেটি হলো বারবার প্রস্রাব হওয়ার প্রবণতা। প্রস্রাব করতে যখন যাবে, তখন একবারে প্রস্রাব করতে পারবেন না, বন্ধ হয়ে যাবে। প্রস্রাব করতে কষ্ট হচ্ছে বা আটকে যাচ্ছে, যখনই প্রস্রাব করতে চাপ দিচ্ছে, তখনই দেখা যায় যে বন্ধ হয়ে গেল। প্রস্রাব করার পর একটি অনুভূতি কাজ করে যে প্রস্রাব পূর্ণ হলো না। প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া হতে পারে। প্রস্রাব লাল হতে পারে। একে আমরা হেমাচুরিয়া বলি। এগুলো সাধারণত যখন প্রোস্টেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তখন। প্রোস্টেট ক্যানসারের একটি বড় অংশ বিভিন্ন জায়গায় চলে যেতে পারে। অনেক সময় হাড়ে চলে যায়। হাড়ে চলে গেলে শরীরের ব্যথা নিয়ে লোকজন উপস্থিত হতে পারে। পেছনে যে বড় হাড় আছে প্রোস্টেট ক্যানসার সেখানে চলে যায়। ব্যথা নিয়েই উপস্থিত হয়।

প্রোস্টেট ক্যানসার নির্ণয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা রয়েছে। এই সমস্যাগুলো হলে প্রথমে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। এই রকম সমস্যা নিয়ে এলে বিনাইন এনলার্জমেন্টের বাইরেও প্রোস্টেট ক্যানসার নিয়ে ভাবতে পারি। সেই ক্ষেত্রে স্পেসিফিক মার্কার রয়েছে। একে আমরা পিএসএ বলি। আমরা ডিআরই বলি। ডিজিটাল রেক্টাল এক্সামিনেশন। পায়খানার রাস্তা দিয়ে আঙ্গুল দিয়ে আমরা প্রোস্টেট অনুভব করতে পারি। এটি খুব সহজ একটি পরীক্ষা। আমরা চেম্বারে বসেও এটি করতে পারি। ডিআরই করলে প্রোস্টেটের সঙ্গে বিনাইন এনলার্জমেন্টের পার্থক্য ক্লিনিক্যালই বোঝা যাবে। পাশাপাশি আমরা প্রযুক্তির সহযোগিতা তো নিবই, পিএসএ লেভেল যেটি বলি প্রোস্টেট স্পেসিফিক এন্টিজেন, এটি যদি বেশি থাকে, তাহলে আমরা প্রোস্টেট ক্যানসারের কথা ভাবব। আর যখন আমরা ভাবব তখন এর চরিত্র সম্পর্কে জানার চেষ্টা করব। পায়খানার রাস্তা দিয়ে প্রোস্টেটটি বায়োপসি করে সহজে প্রোস্টেট ক্যানসার রোগ নির্ণয় করতে পারি। আর সিস্টোস্কোপি করে প্রোস্টেট থেকে একটু টিস্যু নিয়ে পরীক্ষা করতে পারি। একে বলা হয় টিইউআরপি। এটি করে প্রোস্টেট ক্যানসার নির্ণয় করতে পারি।

যারা ঝুঁকিপ্রবণ তাদের বেলায় স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। এটি একটি নিয়মিত বিষয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তারা স্ক্রিনিং করতে থাকে। স্ক্রিনিং বলতে আমরা কেবল পিএসএ লেভেলটা করতে পারি। এই লেভেল চার থেকে সাত পর্যন্ত আমরা স্বাভাবিক মনে করি। একজন ব্যক্তি যদি পিএসএ লেভেল পরীক্ষা করতে থাকে, তাহলে আমরা সহজে পেয়ে যাব সমস্যাটা। প্রোস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধে প্রবীণ বয়সে এই স্ক্রিনিং করা জরুরি। পিএসএ লেভেল করতে বেসরকারি পর্যায়ে লাগে ৮০০ টাকা, সরকারি পর্যায়ে ৩০০ টাকা খরচ হয়। বাংলাদেশে প্রোস্টেট ক্যানসারের প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। এর দুটো কারণ মনে করি, বাংলাদেশের জনগণের এখন আয়ু একটু বাড়ছে। এটি একটি বিষয়। আর দ্বিতীয়ত, আমরা দিনে দিনে উন্নত হচ্ছি। আমার ধারণা, এসব কারণে প্রোস্টেট ক্যানসারের প্রবণতা দিনে দিনে বাড়ছে।

চিকিৎসকদের মতে রোজকার খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের ধারা পরিবর্তন করলে এই রোগের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে৷ অতিরিক্ত রেড মিট খাওয়ার অভ্যেস অবিলম্বে ত্যাগ করুন৷ প্রোস্টেট ক্যানসার মূলত হরমোনের উপর নির্ভর করে৷ অতিরিক্ত রেড মিট শরীরে হরমোন ক্ষয়কারি রাসায়নিকের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়৷ তাই রেড মিটের থেকে মুরগির মাংস খাওয়া অভ্যেস করুন এবং সপ্তাহে ৩ দিনের বেশি মাংস খাবেন না৷ রেড মিট খেলেও চর্বি বাদ দিয়ে খাবেন, এছাড়া মাছও খাওয়া খেতে পারে৷ দৈনিক শরীরচর্চার অভ্যেস প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকিয়ে প্রায় ৪১ শতাংশ কম করে৷ কারণ নিয়মিত শরীরচর্চটা করলে শরীরের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়৷ যারা এই রোগে আক্রান্ত তাদের ক্ষেত্রেও এক্সারসাইজের পথ্য অতি আবশ্যক৷ যারা নিয়মিত দৌঁড়ানো, সাঁতার কাটা বা বিভিন্ন খেলার সঙ্গে যুক্ত থাকেন তাদের মৃত্যু ঝুঁকি অনেকটাই কম থাকে৷ প্রতিদিন বিভিন্ন ধরণের শাকসবজি ও ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন৷ প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় সোয়া জাতীয় খাবার যেমন সোয়া মিল্ক, তোফু ইত্যাদি রাখা চেষ্টা করুন৷ এই জাতীয় খাবারগুলি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে যা কোষকে ক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচায় ও ক্যানসার প্রতিরোধ করে৷ ব্রোকলি প্রোস্টেট ক্যানসার ও হৃদরোগ রোধ করতে ভীষণ পরিমাণে সক্ষম৷ ব্রোকোলির মধ্যে আইসোথিওসায়ানাইট নামক একপ্রকার উপাদান পাওয়া গেছে যা ক্যানসার উৎপাদনকারী রাসায়নিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংসকারী জিন উৎপাদন করে৷ বাড়ি এবং কর্মক্ষেত্রে স্ট্রেসের পরিমাণ কম করলে আয়ু বাড়ে অনেকটাই৷ এছাড়াও ধুমপান ও মদ্যপানের নেশা অবিলম্বে ত্যাগ করুন৷ মানসিক অবসাদ. রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ইত্যাদি সমস্যা থাকলে ইতিমধ্যে তার চিকিৎসা করুন, প্রোস্টেট ক্যানসারের হাত থেকে বাঁচুন৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *