ভাজা-পোড়া খাবার কতটা ক্ষতিকর?

ওজন বৃদ্ধি হলে একে একে শরীরে এসে বাসা বাঁধতে শুরু করে কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস,হার্টের রোগ এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো মারণ রোগ। তাই আলুভাজা হোক কি ফ্রেঞ্চফ্রাই, এ সব খাবার থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকাট জরুরি। ভাজা জাতীয় খাবার বেশি মাত্রায় খেলে শরীরের আরও নানা ধরনের ক্ষতি হয়ে থাকে। যেমন…

শরীরে ট্রান্স ফ্যাটের মাত্রা বাড়তে শুরু করে: ভাজা জাতীয় খাবার বেশি মাত্রায় খেলে শরীরে এই বিশেষ ধরনের ফ্যাটের মাত্রা বাড়তে থাকে। আর ট্রান্স ফ্যাটকে ভেঙে যেহেতু এনার্জিতে রূপান্তরিত করা যায় না, তাই তা শরীরের বিভিন্ন জায়গায় জমতে শুরু করে। এক সময় গিয়ে রক্ত বাহিকায় ফ্যাটের পরিমাণ এত মাত্রায় বেড়ে যায় যে শরীরের একাধিক অঙ্গের ক্ষতি হতে শুরু করে। সেই সঙ্গে হার্ট অ্যাটাক, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস এবং ওজন বৃদ্ধির মতো সমস্যাও মাতা চাড়া দিয়ে ওঠে।

শরীরের সচলতা কমে যায়: একবার ভাবুন তো বয়সের কাঁটা ৪০ পেরতে না পেরতেই যদি শরীরে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগ এসে বাসা বাঁধে, তাহলে কী ভয়ঙ্কর কান্ডটাই না ঘটবে। এমনটা হলে পছন্দের সব খাবারকে টাটা বাই-বাই তো বলতেই হবে, সেই সঙ্গে জীবনযাত্রাও এত নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে যে জীবনের সব আনন্দই ফিকে হয়ে যাবে। তাই কম বয়সে যদি ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ বা কোলেস্টেরলের মতো অসুখে আক্রান্ত হতে না চান, তাহলে শুধু আলু ভাজা নয়, প্রায় সব ধরনের ভাজা জাতীয় খাবারকেই ভুলে যেতে হবে। এমনকি আলুর চপ এবং বেগুনিকেও।

শরীরে টক্সিক উপাদানের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে: ভাজা জাতীয় খাবার খেলে শরীরে অ্যাক্রিলেমাইড নামক এক ধরনের টক্সিক উপাদানের মাত্রা বাড়তে শুরু করে, যা ক্য়ান্সার রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ায়। তাই জীবনকে যদি সুন্দর এবং স্বাস্থ্যকর বানাতে চান, তাহলে ভুলেও ভাজা জাতীয় খাবারের দিকে ফিরে তাকাবেন না।

তেল হতে হবে পরিষ্কার: খেয়াল করে দেখবেন রাস্তার দোকানে আলুর চপ বা বেগুনি ভাজার সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পোড়া তেল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এমন ধরনের তেলে কার্বোনের পরিমাণ বেশি থাকে, যা শরীরে প্রবেশ করার পর মারাত্মক ধরনের ক্ষতি সাধন করে থাকে। তাই একান্তই যদি ভাজা খাবার খেতে ইচ্ছা করে, তাহলে বাড়িতে আলুর চপ বা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বানাবেন, ভুলেও রাস্তার দোকান থেকে কিনবেন না যেন!

অস্বাস্থ্যকর তেলেদের সঙ্গ ছাড়তে হবে: যেসব তেল উচ্চ তাপমাত্রায় পৌঁছানোর পর তাতে অ্যাক্রিলেমাইডের জন্ম হতে শুরু করে, তেমন তেল ভুলেও ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ যেমনটা আগও আলোচনা করা হয়েছে যে অ্যাক্রিলেমাইড হল এক ধরনের টক্সিক উপাদান, যা শরীরের পক্ষে একেবারেই ভাল নয়। তাই রান্নার তেল কেনার আগে একবার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে ভুলবেন না যেন!

জীবনের সব কিছুতে ভারসাম্য আনাটা জরুরি: আলু ভাজা খেতে মানা করা হচ্ছে মানে এই নয় যে যতদিন বাঁচবেন কোনও দিন ভাজা খাবারকে ছুঁতে পারবেন না। এমনটা একেবারেই নয়। সপ্তাহে ১-২ দিন চলতেই পারে। কিন্তু রোজের নিয়ম বানালে চটজলদি যে পৃথিবী ছাড়তে হবে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই কিন্তু।

প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করে: বেশি করে ভাজা, সেঁকা খাবারে লুকিয়ে আছে ক্যান্সারের আতঙ্ক। এই সব খাবারে থাকে অ্যাক্রিলামাইড নামে যৌগ। যা প্রাণিদেহের DNA-র পক্ষে ক্ষতিকর। এই রাসায়নিক বহুগুণে বাড়িয়ে দেয় কর্কট রোগের আশঙ্কা। স্নায়ুতন্ত্র ও প্রজনন ক্ষমতা এর ফলে নষ্ট হচ্ছে।

ক্ষতিকর রাসায়নিকে দীর্ঘমেয়াদি অসুখ: খাবারে থাকা জল, শর্করা আর অ্যামিনো অ্যাসিড উচ্চতাপে তৈরি করে এই অ্যাক্রিলামাইড, (শর্করা+অ্যামিনো অ্যাসিড+জল -উচ্চতাপ-অ্যাক্রিলামাইড)। বাদামি করে সেঁকা পাউরুটি, কড়া করে ভাজা আলু, বেক করা চিকেন, কেক, বিস্কিট, চিপসেই এই ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকতে পারে। কফিতেও এই সমস্যা হতে পারে।

আলু ভাজা খাবেন না: আলুর মধ্যে ভাতের তুলনায় প্রোটিন ও শর্করা কম থাকলেও অন্যান্য উপাদান, বিশেষ করে ফাইবার বা তন্তু, খনিজ লবণ (পটাসিয়াম) ও ভিটামিনের পরিমাণ বেশি। তবে ভাজা আলু খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জেনেও বড়রাও অহরহ ভাজা আলুর বিভিন্ন রকম খাবার খেয়ে যাচ্ছেন এবং একই সাথে আমাদের বাচ্চাদেরও খাওয়াচ্ছেন। এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভ্যাসের কারণে হচ্ছে। অন্যদিকে অল্প কিছু মানুষ এর নেতিবাচক ও খারাপ দিকগুলো জেনেও এটিকে তথাকথিত সামাজিক মর্যাদা ও স্মার্টনেসের সাথে গুলিয়ে ফেলছে।  ডায়েটিসিয়ানরাও ভাত ও আলুর মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য দেখেন না। তবে ভাত ও আলু দুটোরই সূচক উঁচু— যার অর্থ হচ্ছে দুটোই খাওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যে রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এজন্য দুটো খাবারের ব্যাপারেই ডায়াবেটিক রোগীদের সতর্ক থাকা দরকার। ভাজা আলু খাওয়া একটি উচ্চ মৃত্যুঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যারা সপ্তাহে ২/৩ বারের বেশি ভাজা আলু খায়, তাদের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি। তবে আশার কথা, না-ভাজা আলু নিরাপদ। এর সঙ্গে হৃদরোগ হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কিত নয়। American Joual of Clinical Nutrition-এ প্রকাশিত গবেষণায় প্রমাণিত যে, ভাজা আলু খাওয়ার সাথে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি, হৃদরোগ, স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের যোগসূত্র আছে। আর মানুষ ইচ্ছে করলেই অথবা খাবারের অভ্যাস পরিবর্তন করে ভাতের বদলে আলু না ভেজে বিভিন্ন রকম সুস্বাদু খাবার তৈরি করে খাওয়ার অভ্যাস করতে পারে। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এটা জুতসই ও উপযোগী হতে পারে, বিশেষ করে যখন চালের দাম বেশি থাকে। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশেই অধিকাংশ মানুষ ভাতের পরিবর্তে বেশি করে আলু খায়, বিশেষ করে আলু-ভর্তা জাতীয় খাবার।

ভাজা-পোড়া না খাওয়াই উচিৎ।  যদি খেতেই হয় তাহলে দরকার বাড়তি সতর্কতা: তেলেভাজা মুখরোচক খাবার গুলো আবার অনেকেরই পছন্দ। কিন্তু তেলেভাজা খাবার খাওয়ার কারণে কোলেস্টোরেল বেড়ে গেলে কার্ডিওভ্যাস্কুলার সমস্যা শুরু হয় যার কারণে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে। ঝুঁকি এড়াতে ১. অলিভ অয়েল দিয়ে ভাজুনঃ তেলে ভাজা খাবারকে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে চাইলে অলিভ অয়েলে ভাজুন। অলিভ অয়েল কোলেস্টোরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে এবং এটি অন্যান্য তেলের তুলনায় স্বাস্থ্যকরও বটে।  ২.পরিস্কার তেল ব্যবহার করুনঃ এক তেল বারবার ব্যবহার করবেন না। একবার তেল ঢেলে তাতে একবারই ভাজার চেষ্টা করুন। অথবা তেলে খাদ্যের অংশ একেবারেই পড়তে দেবেন না। ৩.ময়দার পরিবর্তে ব্যবহার করুন চালের গুঁড়োঃ তেলে ভাজা খাবারের জন্য আমরা কোনো না কোনো ব্যাটার তৈরি করে নিই অথবা পাকোড়া ধরণের খাবার তৈরির সময় ময়দাই বেশি ব্যবহার করি। কিন্তু ময়দাতে থাকে গ্লুটেন যা খুব বেশি তেল শুষে নেয়। তাই এর পরিবর্তে চালের গুঁড়ো ব্যবহার করেও স্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারেন তেলে ভাজা খাবার। ৪. খাবারে বেকিং সোডা ব্যবহার করুনঃ ভাজার জন্য ব্যাটার তৈরি বা পাকোড়ার মিশ্রণে অবশ্যই বেকিং সোডা ব্যবহার করবেন। কারণ বেকিং সোডা ব্যবহারের ফলে ভাজার সময় তা গ্যাস বাবল তৈরি করে, যার ফলে তেল শোষণ কম হয়। ৫. খাবার সঠিক তাপমাত্রার তেলে ভাজুনঃ তেল পুরোপুরি গরম না হওয়া পর্যন্ত খাবার ঢেলে দিবেন না। আবার বেশি তাপমাত্রায় ভাজলেও সহজেই পুড়ে যায়। তাই সঠিক তাপমাত্রায় ভাজার চেষ্টা করুন। ডুবো তেলে ভাজার জন্য ৩২৫-৪০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট যথেষ্ট। তাই একটি কুকিং থার্মোমিটার অবশ্যই রাখবেন সাথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *