বাচ্চাদের শাসনে যেসব কথা কখনোই বলবেন না

শাসন করা তারই সাজে, আদর করে যে। এই বাক্যটি মনে রেখে বাচ্চাদের শাসন করেন মা-বাবা বা পরিবারের গুরুজনরা। কিন্তু এই শাসন করতে গিয়েই তারা এমন সব কথা বা বাক্য ব্যবহার করেন, যা শিশুদের মনে ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। আপাতদৃষ্টিতে বাক্যগুলো সহজ-সরল হলেও আপনার ব্যবহৃত এই বাক্যগুলোই অন্য শিশুদের থেকে পিছিয়ে দিচ্ছে আপনার শিশুকে। চলুন জেনে নিই কোন সাতটি বাক্য শিশুদের বলা উচিত নয়।

১. বড়দের কথা শোনা উচিত

কথাটি শুনে বাচ্চারা কী ভাবে : সব বড়ই নিশ্চয়ই ভালো এবং সৎ। তারা যা বলবে আমাকে তাই করতে হবে। ফলে বাচ্চারা অপরিচিত কাউকে সৎ ভেবে তার কথা শুনতে গিয়ে বিপদে পড়তে পারে।

যা বলা উচিত : এই কথাটি না বলে বরং বলা উচিত ‘মা ও বাবার কথা শুনতে হয়। এই বাক্যটি আপনার সন্তান চিন্তা করতে বাধ্য করবে এবং অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলা উচিত সেটা শেখার তাগিদ দেবে।

২. কান্না বন্ধ করো

কথাটি শুনে বাচ্চারা কী ভাবে : নিজের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করা খুবই খারাপ কাজ। কাঁদলে আমাকে ধমক দেওয়া হবে।ফলে সে এক ধরনের নীরবতার মাঝে বড় হয়ে উঠবে। তবে এখনই হোক বা দেরিতে, লুকিয়ে রাখা এই আবেগগুলোই রাগ অথবা কান্নার মাধ্যমে বের হয়ে আসবে।

যা বলা উচিত : কী তোমাকে বিরক্ত করছে? কেন কাঁদছ তুমি? যদি বাচ্চারা পড়ে গিয়ে ব্যথা পায়, তাহলে বলা উচিত তুমি কি ব্যথা বা ভয় পেয়ে কাঁদছ? এ ধরনের কথা আপনার সন্তানকে আবেগ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দেবে।

৩. দুজনে সব সময় ভাগাভাগি করে খেলবে

কথাটি শুনে বাচ্চারা কী ভাবে : আমাকে সবকিছু শেয়ার করতে হবে। এই পৃথিবীতে আমার ব্যক্তিগত বলে কিছু নেই। এই কথাটি আপনার সন্তানের মধ্যে আত্মত্যাগ করার মানসিকতা তৈরি করলেও সে নিজের মানসম্মান এবং অধিকার নিয়ে কথা বলতে শিখবে না। মানসম্মান এবং অধিকারকে সে নিজের জন্য মূল্যহীন বলে মনে করবে।

যা বলা উচিত : তুমি কী তোমার খেলনাটা দিয়ে এই বাচ্চাটাকে খেলতে দেবে? অথবা ‘কিছুক্ষণের জন্য তুমি ওর খেলনা দিয়ে খেল আর সে তোমার খেলনা দিয়ে খেলুক। এর ফলে আপনার বাচ্চা নিজের জিনিস কীভাবে সামলাতে হয় তা শিখবে। যদি আপনি বলার পরও আপনার বাচ্চা খেলনা শেয়ার করতে না চায়, তাহলে জোর করবেন না।

৪. কার কাছে শিখেছ? (দুষ্টুমির ক্ষেত্রে)

কথাটি শুনে বাচ্চারা কী ভাবে : আমার মা-বাবা তো জানে না আমি এই দুষ্টুমি কেন করেছি। এই কথাটি বলার কারণে আপনার বাচ্চা শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানো শিখবে।

যা বলা উচিত : কেন তুমি এটা করেছ? এই বাক্যটি আপনার বাচ্চাকে বলতে সাহায্য করবে যে দুষ্টুমিটা সে নিজে থেকে করেছে নাকি কারো উৎসাহে করেছে। তাকে তার দোষ স্বীকারের যথেষ্ট সুযোগ দিন।

৫. দেখো তোমার চেয়ে ওই ছেলেটা/মেয়েটা কত ভদ্র

কথাটি শুনে বাচ্চারা কী ভাবে : আমি অন্যদের চেয়ে খারাপ। আমি যাই করি না কেন, এটা অন্যদের মতো ভালো হবে না। অন্য শিশুর সঙ্গে নেতিবাচকভাবে তুলনা করলে এর প্রভাব বাচ্চার আত্মসম্মানবোধের ওপর পড়ে। এর ফলে বাচ্চা ভাবতে থাকে, তাকে দিয়ে বড় কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়।

যা বলা উচিত : আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমিও এই বাচ্চাটির মতো হতে পারবে। কথাগুলো বলার পাশাপাশি আপনার সন্তানের সামর্থ্যগুলো খুঁজে বের করুন এবং তাকে বুঝিয়ে দিন যে তার ওপর আপনার বিশ্বাস আছে। মনে রাখবেন, আপনার শিশুটি তার নিজের প্রতিভায় অন্যদের থেকে আলাদা।

৬. যা বলার বাসায় গিয়ে বলব

কথাটি শুনে বাচ্চারা কী ভাবে : বাসায় গিয়ে মা-বাবা আমার গায়ে হাত তুলতে পারে। তারা আমাকে পছন্দ করে না। আমি বাসায় যেতে চাই না। এই কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গে মা-বাবার প্রতি ভালোবাসাটা হুমকিতে রূপ নেয় এবং বাচ্চারা বাসাটাকে শাস্তির জায়গা হিসেবে মনে করতে থাকে।

যা বলা উচিত : শোন তোমাকে বলি, কেন আমি তোমার ওপর মর্মাহত হয়েছি। এই কথাটি শোনার পর বাচ্চারা আপনার আবেগকে মূল্য দেবে এবং ভবিষ্যতে কোনো দুষ্টুমি করার আগে বিবেচনা করবে।

৭. তুমি এখনো অনেক ছোট। তাই এ বিষয়ে তোমার চিন্তা না করলেও চলবে।

কথাটি শুনে বাচ্চারা কী ভাবে : আমি জানতে চাই, আমি অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করব। যদি আপনার সন্তান আপনাকে অস্বস্তিকর কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে এবং যথাযথ জবাব না পায়, তাহলে অন্য কোনো উৎস থেকে সে তার প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে এবং তার খুঁজে পাওয়া ব্যক্তিটি প্রশ্নটির উপযুক্ত উত্তর না দিয়ে ভুল তথ্যও দিতে পারে।

যা বলা উচিত : আমি এখন তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছি না। আমার কিছুটা সময় লাগবে। আপনার সন্তানকে নিরাশ করবেন না। যদি সে আপনাকে কোনো প্রশ্ন করে, তার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করুন। এই পদ্ধতিতে তার ওপর আপনার কর্তৃত্ব বজায় থাকবে এবং সেও আপনার ওপর বিশ্বাস হারাবে না।

সংগৃহীত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *