খোসাতে কী গুণ জেনে নিন

এমন কিছু ফল ও সবজি রয়েছে, যেগুলির আসল গুণ লুকিয়ে রয়েছে তার খোসাতেই। কাজেই খোসা কেটে বাদ দিয়ে দিলে, ফেলনা হয়ে যায় নানা প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল। আপনার ফল-সবজি খাওয়ার উদ্দেশ্যটাই জলে যায়। কোন কোন ফল খোসাসমেত খান আপনি? আপেল, শশা, আর কী কী? আর সব্জির মধ্যে? খোসা সমেত খান বা খোসা ছাড়িয়ে, বেশ কিছু ফল ও সব্জির খোসা অত্যন্ত উপকারী। জেনে নিন – এমনই কিছু ফল ও সব্জি যার খোসা ফেলে না দিয়ে অবশ্যই লাগাতে পারেন কাজে।

আপেল: বেশিরভাগ লোকই খোসা সমেত আপেল খেতে পছন্দ করেন। তবে, শুচিবায়ুগ্রস্ত অনেকে আবার আপেল খাওয়ার আগেও সযত্নে সেটির খোসা ছাড়িয়ে নেন। কিন্তু, জানেন কি, গোটা একটা আপেলের থেকে প্রায় ২ থেকে ৩ গুণ বেশি পুষ্টি ও ফাইবার থাকে আপেলের খোসাটিতে। এছাড়াও আপেলের খোসায় রয়েছে এসিই এনজাইম, যা উচ্চ রক্তচাপ কমানোয় বিশেষ সহায়ক। আপেলের শাঁসের তুলনায় খোসায় ৮৭ শতাংশ বেশি ফাইটোকেমিক্যাল রয়েছে। যা ক্যানসার রুখতে সাহায্য করে। আপেলের খোসায় থাকে পেকটিন। যা ফাইবার যা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করে। পাশাপাশি রক্তে সুগার এবং কোলেস্টেরলের মাত্রাও কমায়। আপেলের খোসায় থাকা প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ক্যানসার কোষ নষ্ট করে।

তরমুজ : অনেকে ভাবছেন, তরমুজের এত শক্ত খোসা আবার কি করে খাবেন? না, তরমুজের একেবারের বাইরের সবুজ খোসা নয়, সেটি কাটলে লাল তরমুজের গায়ে সাদা রঙের যে অংশটি থাকে, সেটিকেও অনেকে কেটে বাদ দিয়ে দেন। কিন্তু, তাঁরা জানেন না, তরমুজের ওই সাদা অংশেই থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, বি৬ ও সিট্রুলিন নামে অ্যামিনো অ্যাসিড, যা রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ উপকারী। এমনকি সাদা অংশ মুখে মাখলেও উপকার পাবেন।

লেবু : ঘরে ঘরে লেবু জুস করে খাওয়ার একটা প্রবণতা রয়েছে। কমলা হোক বা মুসম্বির রসই খেতে বেশি পছন্দ করে ছোট-বড় সবাই। কিন্তু জানেন কি, একটা লেবুর জুস খেয়ে যেটুকু পুষ্টি আপনার শরীরে যাচ্ছে, লেবুটির খোসাটিও যদি খেতেন, তবে পেতেন আরও অন্তত ২০ গুণ বেশি পুষ্টি। যেকোনও লেবুর ক্ষেত্রেই একই কথা প্রযোজ্য। লেবুর খোসা হাড় ও দাঁতের স্বাস্থ্য ভাল রাখতে যেমন সাহায্য করে, তেমনই শরীর থেকে টক্সিন দূর করে ওজন কমাতেও সাহায্য করে।

শশা : একটু তিতকুটে স্বাদের কারণে অনেকেই শশার খোসা ফেলে দিয়ে খেতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু শশার খোসায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক সিলিকা, যা ত্বক ও চুলের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী উপাদান। কাজেই তিতকুটে ভাব কাটাতে শশার খোসাটি কেটে বাদ দিয়ে দিলে কিন্তু শশার উপকারিতার ১০০% পাওয়া থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন। শশার খোসা খেতে যেমন উপকারী, তেমনই ত্বকের বিভিন্ন সমস্যায়, রোদে পোড়া দাগ, চোখের কোলের কালি দূর করতেও দারুণ কাজ করে শশার খোসা। শসার খোসায় থাকে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ফাইবার, ভিটামিন কে এবং পটাসিয়াম।

আলু : হোটেল বা রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে যদি দেখেন আলুর খোসা সমেতই রান্না করে দিয়ে দিয়েছে, তাহলে নিশ্চয়ই মেজাজটা গরম হয়ে যায়। কিন্তু, যদি বলি, আপনি বাড়িতেও আলু রান্না করুন খোসা সমেতই। অবাক হচ্ছেন? আসলে আলুর খোসা ছাড়িয়ে রান্না করলে আপনি অনেক পুষ্টির অপচয় করবেন। কারণ আলুর খোসায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, পটাশিয়াম, ভিটামিন কে, কপার ও আয়রন, যা আমাদের শরীরের জন্য বিশেষ উপকারী। রয়েছে ভিটামিন বি, সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও। তাই আলু খোসা না ছাড়িয়ে খাওয়াই ভালো। আলুর শাঁসের থেকেও ১৭ গুণ বেশি আয়রন থাকে আলুর খোসায়।

গাজর : একই কথা প্রযোজ্য গাজরের ক্ষেত্রেও। গাজরও খাওয়া উচিত খোসা সমেতই। গাজরের খোসাতেই লুকিয়ে থাকে অনেক অনেক পুষ্টিকর উপাদান। যা আমাদের চোখ, ত্বক, কোলনের সুরক্ষা করে। তাই গাজরটি খাওয়ার আগে ভালো করে ধুয়ে নিন, কিন্তু খোসা ফেলে দেবেন না। গাজরের খোসাও অনেক উপকারী।

কলা : কলার খোসা বেটে খান অনেকেই। তবে বেশির ভাগই ফেলে দেন। কলার খোসায় থাকে লুটেন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে। ট্রিপটোফ্যান দেহে সেরোটনিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। সেরোটনিন মুড ভাল রাখতে সাহায্য করে। কলার খোসায় ভিটামিন বি৬, বি১২, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম রয়েছে। কলার শাঁসের তুলনায় খোসায় ফাইবারের পরিমাণ বেশি থাকায় হজমেও সাহায্য করে।

কমলা লেবু : গোটা কমলা লেবুতে যে পরিমাণ ফাইবার থাকে তার চেয়ে চার গুণ বেশি ফাইবার থাকে খোসায়। ফ্লাভনয়েড থাকায় ইউ ভি রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করে কমলা লেবুর খোসা। ত্বকের ক্যানসার রুখতেও উপকারী কমলা লেবুর খোসা। কমলালেবুর খোসায় থাকে ভিটামিন সি, ভিটামিন বি৬, রাইবোফ্ল্যাভিন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম। থাকে ফ্ল্যাভনয়েডসও। যা দেহে আয়রন সংরক্ষণ করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি ব্যথা-বেদনার উপশম করে। অ্যান্টি-ক্যানসার উপাদানও থাকে এতে।

আম : অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসেবে দারুণ কাজ করে আমের খোসা। কোলেস্টেরল কমাতে যেমন সাহায্য করে, তেমনই হজমেও সাহায্য করে আমের খোসা। রেসভারেট্রোলের কাজ করে আমের খোসা— যা ক্যালরি কমাতে সাহায্য করে। আমের শাঁসের থেকেও খোসায় বেশি পরিমাণে ক্যারোটিনয়েড, পলিফেনল, ওমেগা ৩, ওমেগা ৬ এবং পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। যা ডায়াবেটিস, হার্টের অসুখও কমাতে সাহায্য করে।

লাউ-কুমড়ো : লিভার পরিষ্কার রাখতে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ও ওজন কমাতে দারুণ উপকারী লাউয়ের খোসা। প্রচুর পরিমাণে জিঙ্ক থাকে লাউ-কুমড়োর খোসায়। যা ত্বককে সতেজ রাখে।

পেঁয়াজ: এক গ্লাস পানিতে কিছু পেঁয়াজের খোসা সারা রাত ভিজিয়ে রাখুন। পরদিন সকালে উঠে পানিটা ছেঁকে নিয়ে পান করুন। এমনটা কয়েকদিন করলেই  পেঁয়াজের খোসা চুলকানি এবং অ্যালার্জি একেবারে ভালো করবে। কারণ পেঁয়াজের খোসায় রয়েছে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান, যা অল্প সময়েই শরীরের যে কোনও জ্বালা বা প্রদাহ কমাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। মশা, মাছি বা পোকামাকড়, তেলাপোকা থাকে কাজেই এগুলো থেকে রেহাই পেতে প্রতিদিন একটি পাত্রে পেঁয়াজের খোসা ভিজিয়ে সেই পানি আপনার জালানা বা দরজার বাইরে রেখে দিন। কারণ পেঁয়াজের গন্ধে পোকা-মাকড়েরা আপনার ঘরে ঢুকতে পারবে না। তবে প্রতিদিন আবার পানিটা পরিস্কার করে ফেলতে হবে।প্রতিদিন গোসলের পরে পেঁয়াজের খোসা ভেজানা পানি দিয়ে ভাল করে চুলটা কয়েকবার ধুয়ে নিন। এতে করে আপনার চুলে আদ্রতা ফিরে আসবে। সেই সাথে মাথার ত্বকে যে সমস্ত ময়লা আটকে থাকে তাও পরিস্কার করতে সহায্য করে। যার ফলে পেঁয়াজের খোসার পানি মাথার চুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। পেঁয়াজের খোসা ব্লেন্ড করে জুস বানিয়ে নিন, পুরোপুরি বেল্ড না হলেও চলবে। মূলত খোসার রসটাই আসল। এবার তার সাথে ১ চা চামচ মধু বা চিনি মিশিয়ে নিন। কারণ শুধু খোসার রসটা খেতে স্বাদ লাগবে না। প্রসঙ্গত, প্রতিদিন নিয়ম করে শরীরচর্চা করার পাশাপাশি যদি এই জুসটি খেতে পারেন, তাহলে শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা একেবারে কমে যায়। ফলে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোক সহ একাধিক মারণ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় থাকে না বললেই চলে। পেঁয়াজের খোসায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-ব্য়াকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি-ফাঙ্গাল প্রপাটিজ, যা পেটের যে কোনও ধরনের সংক্রমণ কমাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। এক্ষেত্রে পেঁয়াজের খোসা ভেজানো পানি প্রতিদিন খেতে হবে। তাহলেই দেখবেন রোগের প্রকোপ একেবারে কমে যাবে। একেবারে ঠিক শুনেছেন! ক্যান্সার রোগের প্রসার আটকাতে পেঁয়াজের খোসার কোনও বিকল্প হয় না বললেই চলে। কারণ এতে রয়েছে বিশেষ এক ধরনের এনজাইম যা শরীরে ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি আটকায়। সেই সঙ্গে এতে উপস্থিত অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট স্বাভাবিক কোষেদের বৃদ্ধি যাতে ঠিক মতো হয়, সেদিকে খেয়াল রাখে। ফলে ক্যান্সার রোগ শরীরে বাসা বাঁধার কোনও সুযোগই পায় না। এক্ষেত্রে প্রতিদিন রাতে ঘুমাতে যাবার অাগে  পেঁয়াজের খোসা দিয়ে বানানো চা-ও খেতে পারেন।

বেগুন: নাসুনিন নামে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে বেগুনের খোসায়। এই অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে রয়েছে অ্যান্টি-এজিং উপাদান। ফলে বেগুনের খোসা ত্বককে সতেজ রাখে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *