এক সাথে অনেক কাজ যেভাবে করবেন

হাসান শরীফ

বিজ্ঞানবিষয়ক ওয়েবসাইটSharpBrains-এর সিইও ও প্রতিষ্ঠাতা অ্যালভারো ফারনান্ডোসের মতে, ‘অত্যাধুনিক স্ক্যানারে দেখা যাচ্ছে, আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। মস্তিষ্কের কোষ মারা যায়, তবে সব সময়ই নতুন নতুন কোষ সৃষ্টি হতে থাকে। আর আপনার মস্তিষ্ক যে কাজ করছে, তার আলোকেই নতুন কোষগুলো প্রস্তুত হয়ে থাকে।’ অর্থাৎ আপনি মস্তিষ্ককে যে কাজটি দিচ্ছেন, তারই আলোকে সে বদলে যেতে থাকে।

গত বছর এর চেয়েও নাটকীয় আবিষ্কার হয়েছে। দেখা গেছে, আপনি যদি ঠিক সফটওয়্যারটি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, তবে কম্পিউটার র‌্যামের সামনে আপনার কাজ করার ক্ষমতা, স্মরণশক্তি (ওয়ার্কিং মেমোরি) বাড়বে। মনে মনে কোনো হিসাব কষা কিংবা কাউকে কোথায় যেন দেখেছি, এমন কিছু স্মরণ করার সময় আমরা জট পাকানো তথ্য বিশ্লেষণে এই ক্ষমতাই ব্যবহার করি। আর এসবের মাধ্যমে আপনি আপনার আইকিউ দুর্দান্ত ১০ পয়েন্টে বাড়িয়ে নিতে পারেন।

আপনার মস্তিষ্কের বিশেষ কোনো দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে চমৎকার উদাহরণ হতে পারে লন্ডনের ব্ল্যাক ক্যাবের ড্রাইভাররা। মস্তিষ্কের স্ক্যানে দেখা গেছে, এসব ড্রাইভারের হিপ্পোক্যাম্পাস (মস্তিষ্কের যে অংশটি স্মৃতি ও পথ চলার কাজটি করে) স্বাভাবিকের চেয়ে বড়। লন্ডনের হাজার হাজার রাস্তা মুখস্থ রাখতে রাখতে তাদের দেহের এই অংশটি বিকশিত হয়েছে।

একসাথে অনেক কাজে লাভ?

একসাথে অনেক কাজ করা উচিত কি না তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রবল মতবিরোধ রয়েছে। সাংবাদিক ও লেখক ম্যাগি জ্যাকসন মনে করেন, শব্দ, টুইটার আর ২৪/৭ ডিজিটাল তথ্যের কাছে আত্মসমর্পণ আমাদের নতুন অন্ধকার যুগে নিয়ে যাচ্ছে। একসাথে অনেক কাজ আমাদের চূড়ান্ত দক্ষতার দিকে ঠেলে দিলেও সত্যিকার অর্থে তা আমাদের অদক্ষতাই প্রকাশ করছে। আমরা কাজগুলোর মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকি, কোনোটার দিকেই পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারি না। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো, এতে করে আমাদের সৃষ্টিশীলতার সুযোগ থাকে খুব কম।

আমাদের মনোযোগ কি কমে যাচ্ছে?
‘মোটেই না’ জানালেন স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের ডেভেলপমেন্টাল কগনিটিভ নিওরোসায়েন্স ল্যাবের প্রধান ড. টরকেল কিংবার্গ। যেসব বিজ্ঞানী মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ে বলে প্রমাণ করেছেন, তিনি তাদের অন্যতম। তিনি বিশ্বাস করেন, নিজস্ব সমস্যা সমাধানের জন্য মস্তিষ্ক প্রয়োজন মতো নিজের সামর্থ্য বাড়িয়ে নেয়। তার মতে, তথ্য গ্রহণের চাপ গ্রহণ করার মধ্যে কোনো তি নেই এবং এতে করে আমাদের মতা বরং বাড়ে।

আর এ কারণেই কিটি যেভাবে হোমওয়ার্ক করছে, সেটা সত্যিকার অর্থে মস্তিষ্কের মতা বাড়ানোর দুর্দান্ত এক ব্যায়াম। অবশ্য ঠিক এখন কেউই জানে না, সম্ভাব্য কিংবা দীর্ঘমেয়াদে এর প্রতিক্রিয়া কী হবে। কিন্তু তাই বলে মস্তিষ্কের মতা বাড়ানোর সুযোগকে হাতছাড়া করা উচিত নয়। ব্রিটেনে এখন কম্পিউটার গেমের জন্য ‘ব্রেইন এইজ’, ‘ব্রেইন ট্রেনিং’ প্রোগ্রাম বিক্রি হচ্ছে। এই বিক্রি ভালোই হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ১৫ মিলিয়ন ইউনিট বিক্রি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের কাজ শুরু হয়েছে, তবে ভিন্নভাবে। সেখানে ব্রেন জিম আছে, আছে অনলাইন সাইট। কয়েক বছরে এসব বাজারের বিক্রি হয়েছে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের।

ব্রেন ট্রেনিং সত্যিই ফলপ্রসূ?

নিউরোসায়েন্টিস্ট ও সাইকোলজিস্টদের মধ্যে এখনো এ নিয়ে দ্বিধা রয়েছে। মার্কিন স্বাস্থ্য সংগঠন লাইফস্প্যান (তারা আলঝেইমার’স ও ডেমেনশিয়া জার্নাল প্রকাশ করে থাকে) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানিয়েছে, ব্রেন ট্রেনিং গেমগুলো এমনভাবে তৈরি, যার ফলে মস্তিষ্কে আলঝেইমার রোগ বাসা বাঁধতে পারে না বলে যে কথা বলা হয়, তা সত্য নয়। ভোক্তা ম্যাগাজিন হুইচও চলতি বছরের প্রথম দিকে একই ধরনের কথা বলেছে। ব্রেন ট্রেনিং যন্ত্রগুলোর কার্যমতা নিয়ে যেসব গালভরা কথা বলা হয়েছে, সে সম্পর্কে বাস্তব প্রমাণ তেমন পাওয়া যায়নি। আরো প্রমাণ সংগ্রহের লক্ষে গত সেপ্টেম্বরে বিবিসি ব্রেন টেস্ট ব্রিটেন পরিচালনা করে। তারা ওয়েবসাইটে ছয় সপ্তাহব্যাপী ১০ মিনিটের ব্রেন ট্রেনিং প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য আগ্রহী সবাইকে আমন্ত্রণ জানায়। চলতি বছরে এর ফলাফল প্রকাশ করা হবে।

তবে স্টারলিং ইউনিভার্সিটির সাইকোলজিস্ট ড. ট্রাসি অ্যালোওয়ের মতে, ব্রেন ট্রেনিং কাজ করে কি না তা প্রমাণের জন্য এ ধরনের বিশাল পরীা-নিরীার মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তার মতে, যাচাইয়ের নামে অনেক নেতিবাচক সমীা হচ্ছে। তিনি আপনার মেধা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন কি না এবং সে জন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করছেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনি কোনো জিমে গিয়ে প্রতিদিন ২০ মিনিট ওঠা-বসা করে ম্যারাথনে আপনার উন্নতি হলো কি না সে প্রশ্ন করতে পারেন না। আপনি যে কারণে যে ব্যায়ামটি করছেন, সে দিকে আপনার উন্নতিই বিবেচ্য বিষয়।

কোন ট্রেনিংটি ফলপ্রসূ?
ড. ট্রাসি অ্যালোওয়ে ও আরো কয়েকজন প্রমাণ করেছেন, ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে ওয়ার্কিং মেমরি বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ ধরনের ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে বুদ্ধিমত্তা ও মনোযোগ মতা বাড়ানো যায়। অ্যালোওয়ে জানান, ‘আমার গবেষণায় দেখা গেছে দুর্বল ওয়ার্কিং মেমরি, যা ১০ শতাংশ শিশুদের মধ্যে দেখা যায়, পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’

গত সেপ্টেম্বরে অ্যালোওয়ে ‘জঙ্গলব্রেন’ নামের একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাপ্ত গবেষণাতথ্য উপস্থাপন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, এই প্রোগ্রামটি আট সপ্তাহ ব্যবহার করে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী ছেলেদের আইকিউ প্রায় ১০ পয়েন্ট বেড়েছে। তাদের সারতা ও হিসাব করার মতাও বেড়েছে। এই গবেষণায় সবচেয়ে মজার বিষয়টি ছিল, যে ছাত্র ছিল সবচেয়ে খারাপ, সে-ই সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেছে।

জঙ্গলব্রেন প্রোগ্রামটি আসলে ‘এন-ব্যাক’ প্রোগ্রামেরই চটকদার সংস্করণ। ব্রেন ট্রেনিংয়ের জন্য পরিচিত এই প্রোগ্রামটি অনেক দিন থেকেই কম্পিউটারে ভর করে আছে। ওয়ার্কিং মেমোরি বাড়ানো যে সম্ভব, তা প্রমাণ করার জন্য ২০০৮ সালে বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল সুইডিশ গবেষক প্রোগ্রামটি ব্যবহার করেন। এর আগ পর্যন্ত বলা হতো, মানুষের ওয়ার্কিং মেমোরি বাড়ানো-কমানো সম্ভব নয়।

তাদের গবেষণার ফলে আপনি এখন আপনার ওয়ার্কিং মেমোরি নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারছেন। আপনি যখন একই সাথে অনেকগুলো কাজ করেন, তখন মস্তিষ্কের এই অংশটিই সক্রিয় হয়। কিটি যখন কম্পিউটারে একের পর এক উইন্ডো খোলে, স্পেনিশ কোনো শব্দের অর্থ খোঁজে, কোনো লেখা পড়ে, তখন সে তার ওয়ার্কিং মেমোরিই ব্যবহার করে।

ড. অ্যালোওয়ে জানান, একসাথে একাধিক কাজ করলে আপনি বরং আরো যোগ্য হবেন, আরো দ হবেন।
তবে ‘এন-ব্যাক’ সমীায় শুধু এটাই দেখানো হয়নি যে, অতীতে যে সবকিছুকে অপরিবর্তনীয় বলে বিবেচনা করা হয়েছিল, কম্পিউটারের এই প্রোগ্রামটি ব্যবহার করে তার সব কিছুই এখন বদলানো সম্ভব। বরং সেই সাথে এটাকে একটি ট্রেনিং যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটা আইকিউয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ (ফুয়েড ইন্টেলিজেন্স) তরল বুদ্ধিমত্তা নামে পরিচিত মস্তিষ্কের কাজের জন্য উপযোগী।

ফুয়েড বুদ্ধিমত্তা?
‘আমরা সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ফুয়েড বা তরল বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করি’, জানালেন আলভারো ফারনান্ডোস। এটা উদ্ভূত পরিস্থিতি উপলব্ধি করে সমস্যার সমাধান করে। এটা (ক্রিস্টালাইন ইন্টেলিজেন্স) স্ফটিকতুল্য বুদ্ধিমত্তার বিপরীত, যা দীর্ঘমেয়াদি মেমোরির ওপর নির্ভরশীল। তরল বুদ্ধিমত্তা ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয়। অন্য দিকে ক্রিস্টালাইন বুদ্ধিমত্তা ৬০ বছরের আগে হ্রাস পায় না। তবে এই বুদ্ধিমত্তা ফুটবল ম্যাচের গোল কিংবা নৌকা বানানোর কৌশল সব কিছুই মনে রাখতে সাহায্য করে থাকে।

বদলে ফেলার সময় কি এটা নয়?
অবশ্যই। ইন্টারনেটের যুগে আমরা ক্রিস্টালাইন বুদ্ধিমত্তাকে পাশে সরিয়ে রাখতে পারি। কবে কোন রাজা সিংহাসনে আসীন ছিলেন, ডাইনোসর স্তন্যপায়ী প্রাণী ছিল কি না, সেসব তথ্য মস্তিষ্কে ধারণ করে রাখার প্রয়োজন এখন অনেকটাই ফুরিয়েছে। এ জাতীয় হাজার হাজার তথ্য আমরা এখন অতি সহজেই পেতে পারি, আগের মতো অনেক বই ঘাঁটার দরকার নেই। কিটি লিখতে লিখতে ইন্টারনেটে সেসব তথ্যই টুকে নিচ্ছে। তাৎণিকভাবে যা কাজে লাগে, সেটাই এখন সবচেয়ে বেশি উপযোগী হয়ে উঠেছে।

আর ঠিক এ কারণেই ড. কিংবার্গ মনে করেন, অনেক কাজ একসাথে করলেই আমাদের সম্ভাবনা বাড়ে। তার মতে, আমরা আইকিউ টেস্ট ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখতে পারি, আইকিউয়ের সাধারণ মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। এখানে সেটাই প্রয়োগ করা যেতে পারে। আপনি যখন অনেক কাজ একসাথে করেন, তখন ক্রমবর্ধমান তথ্য আপনার ওয়ার্কিং মেমোরি বাড়িয়ে দেয়। সেটাই ফুয়েড বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধি করে। আধুনিক যুগ আমাদের অনেক বেশি এগিয়ে দিচ্ছে।

তবে এই জায়গাতেই অনেক কাজ একসাথে করার আসল বিপদ নিহিত। ম্যাগি জ্যাকসনের মতে, এর ফলে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ মতা হ্রাস পেতে পারে। তিনি বলেন, ডিজিটাল যুগে আমদের একসাথে অনেক কাজ করতে হতে পারে, কিন্তু সেটাই যদি আমাদের কাজ করার প্রধান পদ্ধতি হয়, তবে তা হবে বিপর্যয়। সফলভাবে কাজ করতে চাইলে, আপনাকে অবশ্যই পূর্ণ মনোযোগী হতে হবে।

সমস্যার মূলে রয়েছে, আমাদের পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে আমরাও বদলে যাচ্ছি, যেভাবে আমরা প্রতিটি ই-মেইলে সাড়া দিচ্ছি। এতে করে আমরা খেলার পুতুলে পরিণত হচ্ছি, ছোটাছুটিতেই মত্ত থেকে যাচ্ছি। জ্যাকসনের মতে, এই সমস্যা সমাধানে ব্রেন ট্রেনিং কাজ করবে ভাবলে ভুল হবে। তিনি বলেন, আমাদের সর্বোত্তম ধারণাগত সামর্থ্য ফুয়েড বুদ্ধিমত্তা, সৃষ্টিশীল অন্তর্দৃষ্টি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ সব কিছুরই একত্রে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। আপনি যদি ই-মেইল চেক, কম্পিউটারে লেখা কিংবা গান শোনার কাজ একসাথে করতে থাকেন, তবে কোনোটিই যথাযথভাবে করতে পারবেন না।

সমাধান কোন পথে?
গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিন। আপনি কিভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন, সেদিকে মনোযোগ দিন। আপনি যে কাজটি করছেন, সেদিকে মনোযোগী হওয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করুন। আপনি যাতে সৃষ্টিশীলতা প্রদর্শন করতে পারেন ও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নতুন নতুন সমাধান বের করতে পারেন সে জন্য অনেক কোম্পানি ‘হোয়াইট স্পেস’ সময় বের করে দিচ্ছে, যাতে কোনো ই-মেইল বা ফোন আপনার মনোযোগ কেড়ে নিতে না পারে। একবার যদি আপনি পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারেন, তবে ব্রেন ট্রেনিং আপনাকে এগিয়ে দেবে।

এই মুহূর্তে আমি শুধু কিটিকে নিয়েই ভাবছি। আমি ক্রিস্টালাইন বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বসে আছি, আর সে ফুয়েড বুদ্ধিমত্তায় এগিয়ে আছে। হয়তো ‘এন-ব্যাক’ প্রোগ্রামের দিকে অনেক সময় ব্যয় করার সময় এখনই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *