ইনবক্সে গোপন প্রেমের সাইকোলজিক্যাল ফাঁদ!

ইনবক্সে ফাঁদ

পর্ব-০১

এক ভদ্র মহিলার কাছে একটা ম্যাসেজ আসল
-আপনি হয়তো বিষন্ন মনে ভাবছেন সবার কাছে আপনি মূল্যহীন, আপনার জীবিনের গতি থেমে গেছে, আপনার কোন ভাল বন্ধু নেই যাকে সব কথা বলা যায়, যখন খুশী তখন পাওয়া যায়, যেভাবে খুশী সেভাবে চাওয়া যায়……। আমি আপনার তেমন একজন বন্ধু…. আমি শুনব, আমি হাসাব, আমি সহজ করে দিব, আমি নাগালেই থাকব….. ”
সোজা কথা এটা ছিল একটি গোপন প্রেমের প্রস্তাব, বা সম্পর্ক গড়ার একটি সাইকোলজিক্যাল ফাঁদ।
ম্যাসেঞ্জারের ফিল্টারে জমে থাকা এই ম্যাসেজ দেখে ভদ্র মহিলা ঘাবড়ে গেলেন – যদি স্বামী এটা দেখে ফেলে। তাই তিনি ভয়ে আতঙ্কে সেটা মুছে ফেললেন।
কিন্তু মন থেকে কি তিনি সেটা মুছে ফেলতে পারলেন? হয়তো পেরেছেন, কিংবা পারেননি। এটা মুছে দেয়া, না দেয়ার পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তি কিন্তু আছে।
যেমন ধরুন,

অধিকাংশ পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী পুরুষটি অর্থের পিছেই দৌড়াচ্ছে। তার কর্মব্যস্ততার বিপরীতে ঘরের স্ত্রীর অবসর কিভাবে কাটে সেটা ব্যস্ত লোকটা জানে না। ক্রমাগত নি:সঙ্গতায় ডুবেডুবে স্ত্রী খুঁজে বেড়াচ্ছে বিস্তর পৃথিবীর অস্তিত্ব। ফেসবুকে ফুটে উঠা অসংখ্য মানুষের স্বপ্নময় জীবনের আনন্দ দেখে তার মনে মোহের জন্ম নিচ্ছে। চাহিদা অনুসারে সে চারিদিক থেকে অর্জন করছে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান। অগণিত সুপুরুষের ব্যক্তিত্বের প্রতি সে হয়ে উঠছে আকৃষ্ট। সে প্রতিদিন হাতের কাছে বেড়ানো কিংবা ঘুরার মত সুন্দর সুন্দর জায়গাগুলোতে সপরিবারে ঘুরতে যাওয়ার স্বপ্ন গড়ছে। এভাবেই ধীরে ধীরে স্ত্রীর মনের মনিকোঠায় জমে উঠছে অসংখ্য স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, চাকচিক্যের প্রতি আকর্ষণ। এসব কিছুই তাকে খুব চঞ্চল করে তুলছে। ফেসবুক প্রোফাইলে তার ‘জুলেখা’ নামটা বদলে সে রাখছে ‘জুলী’। কিন্তু রাতের বেলায় স্বামী কাছে সে সেই জুলেখাই রয়ে যাচ্ছে। কিন্তু, ভিতরের নারীটি যে আর সেই ‘জুলেখা’ নেই সেটার খবর স্বামী রাখেনি। জুলেখা মুক্ত পৃথিবীর সাথে যুক্ত হয়ে স্বামীর বিকল্প হিসেবে একটি জগত তৈরী করে ফেলেছে। সে এখন সেখানেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। একাকী হলেই সে ঢুকে পড়ছে সেই স্বপ্নময় জগতে।

কিন্তু স্মার্ট কিংবা বোকা কিংবা এক নায়ক স্বামী ভিন্ন কোন ‘জুলী’দের দেখে মুগ্ধ হয়। ঘরের ‘জুলী’র খবর রাখার মত সময় কিংবা আগ্রহ কোনটাই তার হয় না। কিন্তু জুলেখার কাছে এটা অধিকার, এটা স্বপ্ন, এটা দাবী। কেননা, স্ত্রী এখনও হয়তো অনেকের কাছে বাপ-দাদাদের স্ত্রীর মতই মুক অথবা শুধুই রাধুনী।
একটু আধুনিক স্বামী জুলেখার সাথে একটা সেল্ফি তুলছে, তার জন্মদিনে একটা কেক কেটছে কিংবা বিবাহ বার্ষিকীতে একটা গিফট দিচ্ছে – শুধু এফবি’তে পোষ্ট দেয়ার জন্য। স্বামী নিজের ইচ্ছায়, নিজের পরিকল্পনায়, নিজের টাকায় কিংবা নিজের সুবিধামত এই আয়োজনগুলো করছে। কিন্তু জুলেখার হয়তো ইচ্ছা ছিল তার এবারের জন্মদিনের কেকটার রং হবে গোলাপী, কিন্তু হয়ে গেছে সাদা। তার হয়তো স্বপ্ন ছিল এবারের বিবাহ বার্ষিকীতে তারা কক্সবাজার বেড়াতে যাবে, কিন্তু স্বামীর আয়োজনে বাঁধা পরে দিনটা কাটিয়ে দিয়েছে রান্না ঘরেই। এভাবেই জুলেখার স্বপ্ন মার খায়।

এগুলো হয়তো সব স্বামী কিংবা স্ত্রীর জন্য প্রযোজ্য নয়। তবে, অনেকের জন্যই প্রযোজ্য। প্রযোজ্য বলেই তো দুষ্ট লোকরা ম্যাসেঞ্জারের ফিল্টারে ‘ নারী শিকারের টোপ’ হিসেবে এরকম গণপ্রেমের পত্র পাঠিয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকে।

নারীর মনের কষ্ট আর চাহিদার উপর ভিত্তি করে ছেলেটা ঐ ম্যাসেজের ভাষা সাজিয়ে গুছিয়ে লিখেছে। হতে পারে এটা কোন সহজ সরল নারীকে ইমোশনালী ব্ল্যাক মেইলিং করার একটি ফাঁদ। কিন্তু ক্ষেত্রটা তো ঘর থেকেই তৈরী হয়ে আছে। ফেসবুক কিংবা ভাইভারের দখল পেয়ে হঠাৎ স্বাধীন হওয়া অনেক নারাই তো সমাজের জটিলতা-কুটিলতা বুঝে উঠতে পারে না। তাই তাদের কাছে সেই ছেলেটির বানানো ম্যাসেজটি একটি ‘প্রোডাক্ট’-এর আদলে খুব কার্যকরী মনে করে জুলেখা। স্বামী হয়তো জেনে গেলে বলবে – এ পথটা ভুল। কিন্তু সহজ সরল জুলেখাদের কাছে তো এটা হেসে-খেলে বেঁচে থাকার ‘পথ’।

ছেলেটার ম্যাসেজের ধরণ দেখে বুঝা গেল অসংখ্য নারীকে সে এই ম্যাসেজটি পাঠিয়েছে। ২/১ জন নারী রাজী হলেই তার চলবে। ম্যাসেঞ্জারে ম্যাসেজ সার্ভিস ফ্রি বলেই হয়তো অনৈতিক প্রেমটাও তার কাছে ফ্রি হয়ে গেছে। কিন্তু মনের অজান্তে জুলেখার স্বামীও এই ফ্রি প্রেমের ক্ষেত্র তৈরীতে কম ভূমিকা রাখেনি।
যাহোক, জুলেখাদেরও বুঝতে হবে দূরের কোন স্বপ্নময় অচেনা পুরুষের কাছ থেকে প্রাপ্ত সুখ কাছের মানুষের দেয়া দু:খের থেকে উত্তম নয়। ক্ষণস্থায়ী সুখের বাটিতে ঢেলে রাখা মধুতে যে বিষ মাখানো থাকে তা বুঝার জন্য দেহের চোখের জ্যোতির চেয়ে মনের চোখের জ্যোতি বেশী দরকার হয়।
সিটি কর্পোরেশনের হিসাবে তালাকের পরিসংখ্যান বেড়ে যাওয়ার পিছনে মনের চোখের অন্ধত্ব অনেকটাই দায়ী।

আবার, জুলেখাদের রেখে আরেক জুলীর কাছে স্বামীরা যাচ্ছে বলেই সমাজের কিছু জুলাখাদের জুলী হয়ে সুখ খুঁজতে হচ্ছে। কিংবা কিছু জুলেখা জুলী হয়ে ভিন্ন পথে সুখ খুঁজে বলেই স্বামী ভিন্ন কোন জুলীর কাছে আশ্রর নিচ্ছে। মাঝখানে সন্তান, পরিবার আর সমাজ হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে উদ্ভব হচ্ছে ইনবক্সের সেই সুবিধাবাদী গ্রুপের যারা হয়তো আর ফিল্টারে আটকে থাকছে না, সোজা ঢুকে পরছে বেডরুমে।
তাই ইনবক্সের যত্ন নিন, আউট বক্সের সময়টা একটু কমিয়ে দিয়ে।

(ডজনখানেক যুগলের দাম্পত্য জীবনের বাস্তব সঙ্কটের বিশ্লেষণ থেকে এই লেখাটি লিখলাম। দয়া করে এটাকে সার্বজনীন ভেবে কেউ কষ্ট নিবেন না। এটা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। আর জুলেখা নামটাও কাল্পনিক)

লেখকঃ বাংলাদেশ পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের এডিসি সানি সানোয়ার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *