বিভিন্ন বয়সে সোনামণিদের যা খাওয়াবেন

জন্মের পর বুকের দুধই শিশুর একমাত্র আদর্শ খাবার। বুকের দুধ ছাড়া চিনি, মধু, মিছরির পানি, কিছুই খাওয়ানো ঠিক নয়। বুকের দুধ খাওয়াতে হবে জন্মের প্রথম ঘণ্টার মধ্যেই। বুকের দুধ এমন একটি মিশ্রণ, যাতে ২০০টির বেশি উপাদান রয়েছে। যখন বাচ্চা বুকের দুধ চুষতে আরম্ভ করে মা ও বাচ্চা উভয়ের পরিপাকতন্ত্র থেকে ১৯ ধরনের অতি প্রয়োজনীয় হরমোন নিঃসরিত হয়। বুকের দুধ শিশুর পুষ্টি দানের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, বুকের দুধ খাওয়ানো ৬ মাস বয়স পর্যন্ত অব্যাহতভাবে চালিয়ে যেতে হবে। এটা করা হলে ৫ বছরের নিচের শিশুদের মৃত্যুহার শতকরা ১৩ ভাগ কমানো যায়।

৬ মাস থেকে ১২ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টির অর্ধেক চাহিদা এবং ১২ মাস থেকে ২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টির এক তৃতীয়াংশ চাহিদা পূরণ হয় মায়ের দুধ থেকে। ৬ মাস বয়স পূর্ণ হওয়ার পর শুধু মায়ের দুধ শিশুর পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে পারে না। এ সময় ঘরের তৈরি খাবার শুরু করতে হয়। এ খাবারটি যেন পুষ্টিকর ও সহজে হজমযোগ্য হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। খাবারটি যেন অতিরিক্ত পাতলা না হয় তাও দেখতে হবে। পাতলা খাবারে পুষ্টির ঘাটতি হয়। ৬ থেকে ৮ মাস বয়সের শিশুকে আধা বাটি (২৫০ মিলির বাটি) করে দিনে ২ বার, ৯ থেকে ১১ মাস বয়সের শিশুকে আধা বাটি করে দিনে ৩ বার এবং ১২ থেকে ২৩ মাস বয়সের শিশুকে এক বাটি করে দিনে ৩ বার পুষ্টিকর খাবার খেতে দিতে হবে। এছাড়া সব শিশুকে ১-২ বার পুষ্টিকর নাশতা দিতে হবে। বিস্কুট, পিঠা, সেমাই, পায়েস, ফিরনি, ক্ষীর, পুডিং, হালুয়া, ইত্যাদি নাশতা হিসেবে দেয়া যায়।

খাদ্য তালিকা- শিশুকে প্রতিদিন কমপক্ষে ৪ ধরনের খাবারের প্রতি গ্রুপ থেকে ১টি খাবার খাওয়াতে হবে যেমন : ১. ভাত, রুটি, ২. ডাল, ৩. মাছ, মাংস, ডিম, ৪. শাকসবজি (যেমন মিষ্টিকুমড়া, গাজর, পেঁপে, আলু ইত্যাদি)। পরিমাণমতো তেল ও মশলা মিশিয়ে এসব খাবার দিয়ে খিচুড়ি তৈরি করে শিশুকে খাওয়াতে হবে। খিচুড়ি তৈরির সময় যে পরিমাণ চাল দেয়া হবে তার অর্ধেক পরিমাণ ডাল দিতে হবে। এছাড়া শিশুকে প্রতিদিন দুধ ও ফল খাওয়াতে হবে। সাধারণত যে কারণে শিশু খেতে চায়না তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল জোরপূর্বক খাওয়ানো, শক্ত খাবার, অপছন্দের খাবার এবং একই খাবারের পুনরাবৃত্তি। জোরপূর্বক খাওয়ানো শিশুর জন্য ক্ষতিকর। জোর করে খাওয়ালে খাবারের প্রতি শিশুর অনিহা তৈরি হয় এবং সে খাবার দেখলে ভয় পায় বা বমি করে।

শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে হলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর দিকে দৃষ্টি দিতে হবে-  শিশুর যখন ক্ষুধা লাগবে, তখন খাওয়াতে হবে। জোর করা যাবে না । খাবার খাওয়ানোর সময় তাড়াহুড়া করা যাবে না। বাচ্চার সঙ্গে না রেগে হাসিমুখে খাওয়াতে হবে। মায়ের হাসি ভরা মুখ শিশুর পুষ্টি পূরণে সহায়ক। দুই বছর বয়স হলেই বাচ্চার নিজে নিজে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। অনেক মা-ই বাচ্চাকে খাইয়ে দেন। এটি বাচ্চার খাবারের অনীহার ও পুষ্টিহীনতার একটা বড় কারণ। খাবারের আগে শিশুকে আচার, জুস, চকলেট এমনকি দুধও দেয়া যাবে না। টেলিভিশন দেখিয়ে বা কার্টুন দেখিয়ে শিশুকে খাওয়ানো যাবে না। খাবারের প্রতি শিশুকে মনযোগী করে তুলতে হবে। শিশুকে বিভিন্ন ধরনের খাবার দিতে হবে, একই খাবার বারবার না খাইয়ে খাবারে বৈচিত্র্য আনতে হবে।  খাবার তৈরির প্রক্রিয়ায় যেমন- বাজার করা, সবজি পরিষ্কার ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাচ্চার উপস্থিতি বা অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবার শেষ করা খাবারের জন্য বাচ্চাকে অভিনন্দন জানাতে হবে। প্রয়োজনে পুরস্কৃতও করতে পারেন। উপরের নিয়মগুলো মানলে শিশুর খাবার খাওয়ার প্রতি আগ্রহ বাড়বে। তার সঠিক পুষ্টিও নিশ্চিত করা যাবে।

লেখকঃ ডা. আবু সাঈদ শিমুল, রেজিস্ট্রার (শিশু বিভাগ), ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *