প্রবীণের শান্তি-সুখের প্রকৃত নীড় হোক পরিবার

আনিসুর রহমান এরশাদ

প্রবীণবান্ধব পরিবার বয়স্ক ব্যক্তির আর্থিক, সামাজিক ও সামগ্রিক নিরাপত্তা প্রদান করে। জ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা থাকার কারণেই বৃদ্ধ ও বৃদ্ধাদের ব্যক্তিগত সমস্যা নিরসনে নবীন সদস্যরা আন্তরিক ভূমিকা রাখে। প্রবীণদের প্রয়োজন পূরণ ও অধিকার পূরণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ও সচেতন থাকে। প্রবীণকে স্বস্তিদায়ক কর্মমুখর জীবনের দিকে এগিয়ে নিয়ে তাদের জীবনকে অর্থবহ করতে সচেষ্ট থাকে। যেসব প্রবীণের মৌলিক চাহিদা পূরণের সামর্থ্য নেই, তাদের চাহিদা পূরণকে অগ্রাধিকার দেয়। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি বাবা-মাকে ফেলে এককভাবে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আলাদা সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখেন না।

বার্ধক্যে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা, তাদের যাপিত জীবনের বাস্তবতা অনুধাবনের মানসিকতা রাখা, তাদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তায় সচেতন থাকা একটু বেশিই প্রয়োজন। পরিবারের কর্মক্ষম ও উপার্জনক্ষম সদস্যদের ভাবতে হবে; প্রবীণরা পরিবারের জন্য বোঝা নন বরং আশীর্বাদস্বরূপ। অবসরের পরও প্রবীণদের মেধা, প্রজ্ঞা ও সঞ্চিত অভিজ্ঞতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগালে অনেক সুফল পাওয়া যায়। বার্ধক্যে মানুষের সামাজিক বিচরণের ক্ষেত্র ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসে। সন্তান-সন্ততিরা নিজ নিজ পরিবার নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সমবয়সী আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা কমে যায় এবং সর্বোপরি সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে প্রবীণেরা ধীরে ধীরে প্রয়োজনহীন, মূল্যহীন, অকেজো, উপেক্ষিত ও অবহেলিত হয়। এমতাবস্থায় তাদের শারীরিক ও মানসিক সাপোর্ট খুব বেশি দরকার।

অনেক সময় পুত্রবধু কিংবা নাতি-নাতনিদের হাতে স্মার্টফোন থাকা, বাসায় ডিশের লাইন থাকা, কম্পিউটার-ইন্টারনেটে ব্যস্ত থাকা, রাতে বাসায় ফেরা- প্রবীণরা পছন্দ করেন না। প্রবীণদেরও আধুনিক বিষয়গুলো গ্রহণ করতে হবে, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। শুধু ভুল ধরা, রাগারাগি করা থেকে বিরত থেকে সহনশীল ও ক্ষমাশীল মানসিকতা রাখতে হবে। মা-বাবার প্রতি সন্তানদের আগ্রহ থাকলে তা নাতি-নাতনিদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়বে। প্রবীণদের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকতে হবে, প্রবীণদের সঠিক মূল্যায়নে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে হবে। আমার মা-বাবা আমার সঙ্গে থাকেন না বলে, বলতে হবে- আমি আমার মা-বাবার সঙ্গে থাকি। কর্মক্ষম প্রবীণদের উপযুক্ত কাজে লাগিয়ে সম্মানজনক ও সক্রিয় জীবন যাপনে সহায়তা করতে হবে।

প্রবীণ অসুস্থ হলে তাদের চিকিৎসা করাতে হবে, নির্ভেজাল পুষ্টিকর খাবার ও ওষুধ সরবরাহ করতে হবে। তাদের প্রতি অবহেলা, অযত্ন, দুর্ব্যবহার আর নির্যাতনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই ব্যাপারে সর্বস্তরে সচেতনতা ও সতর্কতা বাড়াতে হবে। নবীন-প্রবীণদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, মধ্যম-প্রবীণদের জন্য হালকা কাজকর্ম এবং অতি-প্রবীণদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রবীণদের জন্য খাদ্যের নিরাপত্তা, সেবা দেয়া, সঙ্গ দেয়া, স্বাধীনতা দেয়া ইত্যাদি খুব গুরুত্বপূর্ণ। সংসারে প্রবীণ যেন কষ্ট না পান সেজন্য আচরণে সতর্ক থাকতে হবে, সম্মান দেখাতে হবে, ভালোবাসতে হবে, শ্রদ্ধা করতে হবে। নন-কমিউনিকেবল ডিজিজগুলো প্রিভেনশন করতে ব্যায়াম বা লাইফস্টাইলের পরিবর্তনে সহায়তা করতে হবে। প্রতিবন্ধী, শারীরিকভাবে রুগ্ন-দুর্বল এবং সামর্থ্যহীন প্রবীণদের ব্যাপারে আন্তরিক থাকতে হবে। প্রবীণের নিরাপদ ও মর্যাদাজনক জীবন নিশ্চিত করে অসহায়ত্ব দূরীকরণে নবীনদের এগিয়ে আসতে হবে।

প্রবীণ সমস্যাটির সমাধানে কিছু সিদ্ধান্ত ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। প্রবীণদের দেখতে হবে, বুঝতে হবে, কাছে যেতে হবে, তাঁদের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে, প্রবীণদের কল্যাণে কাজ করতে বা টাকা-পয়সা খরচ করতে আগ্রহী হতে হবে; তাঁদের অধিকার পূরণে সচেতন হতে হবে। প্রবীণদের জন্য বিনোদনমূলক কর্মকা-ের আয়োজন করতে হবে। প্রবীণের প্রজ্ঞা পরিবারের সম্পদ। পরিবারের বিভিন্ন কাজে অভিজ্ঞতার ভান্ডার প্রবীণদের অন্তর্ভুক্ত করলে তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নবীনদের সামনে এগিয়ে যাওয়া দ্রুততর হবে। প্রবীণদের পক্ষে যানবাহনে চড়া, অফিস-আদালত-ব্যাংক-হাসপাতালে যাওয়া-আসা, হাঁটাচলা করা, রাস্তা পার হওয়া, বাজারঘাট ও দৈনন্দিন কাজকর্ম করা অত্যন্ত কষ্টকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ। বয়সের ভারে রোগে-শোকে আক্রান্ত প্রবীণকে কষ্টসাধ্য উপার্জন কাজে নিয়োজিত করা যেমন, সম্পদ ও বাড়িঘর পাহারা দেওয়া, রান্না করা, শিশুদের দেখভাল ও স্কুলে আনা-নেওয়া করা ইত্যাদি সাংসারিক কাজে ইচ্ছার বিরুদ্ধে নির্দয়ভাবে ব্যবহার করা কোনোক্রমেই সমীচীন নয়। প্রবীণদের কষ্টদায়ক কাজে নিয়োজিত করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

প্রবীণদের ইতিবাচক, সৃজনশীল, অর্থবহ হিসেবে চিত্রায়িত করে তুলে ধরে তাদের প্রতি ছোটদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পরিবারের বড়দের ভূমিকা রাখতে হবে। মানবিক সমাজ বিনির্মানে মানবিক পরিবার বিনির্মানের বিকল্প নেই। পরিবারের সব সদস্য প্রবীণবান্ধব মানসিকতার হলে, প্রবীণদের বাস্তবতার কথা মাথায় রাখলে পরিবারও সুখী হবে। প্রতিটি পরিবার যদি পরিবারস্থ বৃদ্ধ মানুষের মানবেতর জীবনযাপন বন্ধ করার দায়িত্ব নেয়, তবে তা’ বৃহত্তর মঙ্গল বয়ে আনতে পারে। এক্ষত্রে বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিদের সকল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যৌথ পরিবারের চর্চা বৃদ্ধি ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় দূর করতে হবে, আমাদের মনমানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে।

প্রবীণদের অনুৎপাদনশীল, অক্ষম, দুর্বল ও ব্যধিগ্রস্ত মনে করা; চিন্তা-চেতনায় সেকেলে, পরিবর্তনবিমুখ মনে করা ঠিক নয়। প্রতিটি পরিবারই এমন হোক যাতে জীবন সায়াহ্নে এসে মানবেতর দিন কাটাতে হবে না কোনো প্রবীণের, ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনির ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হবে না, নিশ্চিত হবে ন্যায্য অধিকার, প্রবীণদের জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হবে না। পরিবারে প্রবীণ ব্যক্তিরা যাতে অবহেলা, বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হবে না, সম্পত্তিভোগের অধিকার পাবে। প্রবীণদের জীবন হবে না নিরাপত্তাহীন, সন্তানের সাথে দেশে বা প্রবাসে অবস্থান করতে পারবে, পরিবার-পরিজনহীন একাকী জীবন কাটাতে হবে না। অন্যের বাড়িতে আশ্রিত হয়ে নতুবা চেনাজানা পরিবেশ ছেড়ে শহরের বিশাল জনস্রোতের সঙ্গে মিশে ভিক্ষাবৃত্তি বা শ্রম বিক্রি করে মানবেতর জীবনযাপন করতে হবে না।

বৃদ্ধরা দয়া চায় না, অধিকার চায়, পূর্ণ অধিকার নিয়ে বাঁচতে চায়, সুখের সাথে মৃত্যু চায়। নিরাপদ বার্ধক্যে স্বস্তিময় জীবনে আনন্দময় থাকতে চায়। তাই প্রবীণ ব্যক্তি উজ্জ্বল রঙের পোশাক পরলে ঠাট্টা করার মানসিকতা দূর করতে হবে। প্রবীণবান্ধব বাড়ি ও সিঁড়ি নির্মাণ করতে হবে। বাবা-মায়ের জন্য আলাদা কক্ষ বরাদ্দ রাখতে হবে। অনুষ্ঠানাদিতে প্রবীণদের উপযোগী খাবার রাখতে হবে। প্রবীণদের প্রতি অন্যায় আচরণ সংঘটিত হতে দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে তার প্রতিবাদ করতে হবে এবং প্রতিবিধানের জোরালো ব্যবস্থা নিতে হবে। যাতে প্রবীণেরা শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, আর্থিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য দ্বারা অবহেলা ও অপব্যবহারের শিকার না হয়। প্রবীণদের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া, প্রয়োজনীয় ওষুধপথ্য, খাদ্য, পোশাক ইত্যাদি সরবরাহ করা এবং কাঙ্ক্ষিত সঙ্গ দেওয়া জরুরি। প্রবীণকেও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণে নিয়ে যেতে হবে। যাতে পরমুখাপেক্ষী-পরনির্ভরশীলতা প্রবীণের মাঝে একাকিত্ব, হতাশা ও বিরক্তির উদ্রেক না করে।

পরিশেষে আমরা চাই- প্রতিটি পরিবারে বার্ধক্য হবে সফল, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ। দয়া-দাক্ষিণ্য বা করুণার দৃষ্টিতে নয়, মানবাধিকারের ভিত্তিতে এবং প্রাপ্য মর্যাদার যুক্তিতে প্রবীণদের চাওয়া-পাওয়ার সমাধান করা হবে। বয়সের ভারে নিস্তেজ হয়ে আসা সময়টুকুতে প্রবীণরা একটু সহানুভুতিতে বেঁচে থাকুক, সুখ-শান্তি এবং মর্যাদার সঙ্গে বাঁচুক। প্রতিটি পরিবারে প্রবীণদের স্বস্তি, স্বাচ্ছন্দ্য, স্বাধীনতা, আত্মতৃপ্তি, সেবাযত্ন ও দেখভালের বিষয়টি গুরুত্ব পাক।  আসুন পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করি, প্রবীণদের ভালোবাসি, প্রবীণবান্ধব পরিবার তৈরি করি, সফল বার্ধক্যের স্বার্থে তাদের অধিকার বাস্তবায়নে উদ্যোগী হই, শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রবীণদের দেখভাল করি, নিজেদের স্বস্তিময় বার্ধক্যের প্রস্তুতি নিই এখন থেকেই। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশের প্রতিটি পরিবার হয়ে উঠবে সব বয়সীর বসবাসের জন্য সমান উপযোগী, সমান সুরক্ষিত এবং উপভোগ্য এমনটাই প্রত্যাশা করছি।

লেখকঃ কো-ফাউন্ডার, সেভ দ্য ফ্যামিলি-বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *