স্মৃতিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ এমন কিছু অসাধারণ শিক্ষকে সমৃদ্ধ যে- ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় যে যেভাবেই পড়তে আসুক না কেন, পড়াশুনা শুরু করার পরই তার কাছে বেশ উপভোগ্যই হয়! প্রশ্ন করার শক্তি ও উত্তর খোঁজার সাহস তৈরি হয়। নিজেকে জানার, নিজের অতীতকে বোঝার ও জ্ঞান অর্জনের প্রয়াস বাড়ে।

এছাড়া পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া যায় নতুন উৎসাহে। যারা শুধু সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি নির্ভর পড়াশুনায় বিশ্বাসী নয়, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট উত্তরণের সক্ষমতাও দিন দিন বাড়ে। মানুষ ও মানুষের সাথে সম্পৃক্ত অনেক বিষয়ে পড়াশুনার আগ্রহ বাড়তেই থাকে, শেকড়ের সন্ধানে অন্তর্চক্ষুর উন্মেষ ঘটে।

এছাড়া অন্যের আদর্শ ও নীতিকেও সম্মান করার মতো উদারতা তৈরি হয়, উৎসাহিত করে মানুষের মতো মানুষ হতে, বিশ্বনাগরিক হতে। নৃবিজ্ঞান পড়লেই বানরের বংশ হতে মানুষের উৎপত্তি হয়েছে বিশ্বাস করে নাস্তিক হয়ে যায় বা নারীবাদী হয়ে যায়, এমনটি যারা মনে করেন তারা ভুলের মধ্যে আছেন। বরং সামাজিক বৈচিত্র্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, চিন্তার বৈচিত্র্য, ভিন্নমতের সুরক্ষা আর ভিন্নতার প্রতি সহিষ্ণুতা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মানসিকতা তৈরি করে নৃবিজ্ঞান।

বিভাগটির কোনো কোনো শিক্ষকের পণ্ডিত্য এমন যেন নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান, একটি মহীরুহ! যাদের পড়ানোর ধরনই এমন, যা রপ্ত করতে প্রথাগত মুখস্থ বিদ্যার পদ্ধতি অনুসরণের প্রয়োজন হয় না; মুখস্থ বিদ্যা রপ্ত না করে বা পরিহার করেও পরীক্ষার বৈতরণী পার হওয়া যায়। চাকরির মেয়াদ শেষ করে যারা অবসর জীবন কাটাচ্ছেন সেসব শিক্ষকরাসহ সকল শিক্ষকের প্রতি নিবেদন করছি বিনম্র শ্রদ্ধা।

বাংলাদেশে বিদ্যায়তনিক নৃবিজ্ঞান চর্চায় জাবি’র নৃবিজ্ঞান বিভাগটির পথপ্রদর্শন সুবিদিত। এই বিভাগের ২১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী হওেয়াটা ছিল সৌভাগ্যের। ১৯৮৫ সালে এই বিভাগটি চালু করা হয়। বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বপ্রথম নৃবিজ্ঞান বিভাগ এটিই।

মানুষ ও তার সংস্কৃতির সামগ্রিক অধ্যয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে এটি সামাজিক বিজ্ঞানের অন্যতম শক্তিশালী শাখায় পরিণত হয়েছে। ২০০৬ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে আমাদের ক্লাস শুরু হয়েছিল! বিভাগটা একটা ভালোবাসার জায়গা। অনেক অথচ এক প্রাণ যেন! নৃবন্ধনে আর ঐকতানে সম! এখানে বহু আপনহারা প্রাণ!

শিক্ষকদেরকে সর্বোচ্চ সম্মানের আসনতো শিক্ষার্থীর হৃদয়ে। খুবই নিবেদিতপ্রাণ-দক্ষ শিক্ষকের সস্নেহ পরিচর্যা, কাছে টেনে নিয়ে সন্তানের মতো আপন করে নেয়া- প্রশংসাযোগ্য জীবন গড়ায় আশীর্বাদ স্বরুপ বা জীবনের অমূল্য সঞ্চয়। যদিও খুব কম জনের সাথে কদাচিৎ দেখা হয় এখনো, তবে সবার কথাই মনে পড়ে। দেখা-সাক্ষাত না হবার পেছনে ব্যক্তিগতভাবে আমার যোগাযোগ বিমুখতার প্রবণতাও দায়ী!

লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হওয়া মানে যেনতেনভাবে শুধু সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়া নয়, মানুষের মনের গভীরে লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ায় সমাজে কন্ট্রিবিউশন রাখতে পারা, দেশপ্রেমী-মানবপ্রেমী-চরিত্রবান হওয়া। যদি নীতি-আদর্শ না থাকে, পথের নিশানা না থাকে- তাহলে দুর্নীতিবাজ-স্বার্থপর হয়ে আত্মকেন্দ্রিক-পরিবারকেন্দ্রিক চিন্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ফলে যাদের দিকনির্দেশনা চিন্তার কাঠামো বদলে দেয়, যারা দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর প্রেরণা হয়ে ওঠে, যাদের উৎসাহ জীবনের গতিপথ বদলে দেয়- তারা শুধু শিক্ষকই নন, শিক্ষকের চেয়ে আরো বেশি কিছু। যাদের স্মৃতি এখনো এক ঝলক আনন্দের দমকা হাওয়ার মতো!

শিক্ষকদের সার্থকতা এমন শিক্ষার্থী তৈরি করায়- যারা কত বেতন পান তা দিয়ে নিজেদের মূল্য নিরূপণ করেন না, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের সম্মান দেয়া-নেয়া নিয়ে বিচলিত হন না; নীতি-আদর্শ-মূল্যবোধকে জাগ্রত-সমুন্নত রাখেন। শিক্ষার্থীরও সার্থকতা হচ্ছে- জীবনের সকল দিক ও বিভাগে এমন স্বচ্ছতা-উৎকর্ষতা বজায় রাখা যার ফলে গুরুজনদের সৌন্দর্য-শোভা-আভার প্রতিফলন সুন্দরভাবে ঘটে; অর্থাৎ কোনো কাজে-আচরণে যারা পড়িয়েছে বা যেখানে পড়েছে তার বদনাম না হয় বা ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়।

আসলে শিক্ষকদের কাছে শিক্ষার্থীদের যে ঋণ তার কোনো প্রতিদান হয় না, টাকার অংকে সে ঋণের কোনো মূল্যমানও হয় না। কিছু শিক্ষকের মাধ্যমেই শিখেছি- সাহিত্য-প্রীতি, ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করা, যুক্তির জোর দিয়ে মুক্তির ভাবনা ভাবা, বিশ্লেষণ করে কথা বলা, লিখতে শেখা। যাদের সুপরিমিত বাক্যচয়ন, পরিপাটি উপস্থাপন, বিরল সততা-নিষ্ঠা-একাগ্রতা-বিনম্রতার মধ্যে স্মৃতি হাতরে আমি এখনো খুঁজে পাই অনুকরণীয় অনেক কিছু। একেক শিক্ষকের সাথে জড়িয়ে রয়েছে একেক ধরনের স্মৃতি- যা আজীবন মনে থাকবে, কৃতজ্ঞতার কারণ হবে।

আসলে নৃবিজ্ঞান বিভাগে মানুষকে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার মনোভঙ্গি তৈরি হয়। সামগ্রিক অধ্যায়ন মানবিক মানুষ হতে সাহায্য করে, সহিষ্ণু করতে সাহায্য করে। অন্য জাতির লোকের আলাদা আচরণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়। ভুল-অশোভন মনে হওয়া সাংস্কৃতিক রীতিনীতি-কাজকর্মকে বিশেষ পরিবেশগত বা সামাজিক অবস্থার জন্য অভিযোজনের ফসল হিসেবে বিবেচনা করে। বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা জানার আগ্রহ বৃদ্ধি করে। জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ভুমিকা রাখে৷

মানুষের সমাজ ও সংস্কৃতির জটিলতা অনুধাবন এবং বিভিন্ন সমাজের মানুষের জীবনযাপন পাঠের মাধ্যমে বিভিন্ন মানবীয় সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে উৎসাহিত করে। প্রত্যেক সমাজ ও প্রতিটা মানবগোষ্ঠীকেই সমান গুরুত্ব দিতে শেখায়। সমাজে যাদের মূল্যায়ন নেই, সম্মান নেই, মর্যাদাজনক অবস্থান নেই; সেসব পিছিয়ে পড়া মানুষদের অস্তিত্বকেও অর্থময় করে তুলতে শেখায়। এটি শুধু পছন্দের পেশায় দক্ষ হতেই সাহায্য করে না, বিভিন্ন পেশায় ভালো করে সমাজের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে যাবার মতো বহুমুখী যোগ্যতা তৈরি করে।

বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষদের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে অত্যন্ত সচেতন, সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল ও সমানুভূতিশীল অবস্থান তৈরি হয়। অজানার প্রতি কৌতুহল তৈরি হয়। অপরকে ভিন্ন বাস্তবতা দিয়ে বোঝার ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দেয়ার মানসিকতা তৈরি হয়। বাস্তবধর্মী প্রায়োগিক বিষয়ে জানা যায়; তথা তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগ করার মতো ব্যবহারিক জ্ঞানেরও সন্ধান মেলে।

এই যে বৈচিত্র্যময় জীবনের সব কিছু ভালো করে বোঝার চেষ্টা ও জীবন-জগতের সম্পর্কে সবার ভূমিকা-তৎপরতাকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখার চেষ্টা- এই বোঝাপড়া-বোঝাবুঝি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ সেবা। কারণ মানব বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য বোঝতে পারলে সামাজিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেও চিন্তা-গবেষণা করা সহজ হয়; যা জটিল-আধুনিক সমাজেও সামাজিক পরিবর্তনকে ইতিবাচক গতিধারায় নিতে অনুধাবন-উপলব্ধি তৈরি করে।

বিশ্বকে-সমাজকে-দেশকে আনন্দের জায়গা বানাতে হলে ভবিষ্যত গতিপথ বাতলে দিতে সক্ষম এমন অনেক জ্ঞানী নৃবিজ্ঞানীদের প্রয়োজন হবে! পুরো বিশ্বকে দেখার অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী সম্পন্নরা দারুণভাবে সহযোগিতা করতে পারবেন। তাইতো পৃথিবীর বিভিন্ন নামিদামি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান আজ প্রথম সারিতে। চাকরির বাজারে এই বিভাগের পরিধি ব্যাপক। এই বিষয়ের ক্ষেত্রে আছে বহুমুখি পেশা। পেশাগুলো বেশ খানিকটা উপভোগ্য।

তবে এই মজা-স্বাদটা যারা নিতে চান, তাদের শিক্ষাজীবনেই বিশ্বমানের মানবসম্পদ হিসেবে নিজেদেরকে তৈরির প্রস্তুতি নেয়া শুরু করার দরকার রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে নৃবিজ্ঞানের সমন্বিত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নৃবিজ্ঞানের সমকালীন বিকাশের সাথে সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করতে পারলে বিষয়টির উৎকর্ষতা সাধন ও পরিধি বিস্তার হবে আরো আশাজাগানিয়া।

মুক্তবুদ্ধি ও সংস্কৃতি চর্চার চারণভূমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলাম। উল্লাসে-আনন্দে-বিষাদে যুগ থেকে যুগান্তরে ৩৫ অন্তরে থাকবে! মন জুড়ে ৩৫, এক সুরে ৩৫! প্রীতি ও প্রেমের পূণ্য বাঁধনে বেঁধেছে ৩৫! শহীদ সালাম বরকত হলের (এসএসবি হল) ৩৪১ নং রুমে থাকতাম। প্রাণের ক্যাম্পাস! কি যে বর্ণিল ছিল দিনগুলো!

এখনো ভালোবাসায় জাবিয়ান! কৃতজ্ঞতায় জাবিয়ান! উচ্ছ্বাসে জাবিয়ান! বিশ্বাসে জাবিয়ান! অগ্রযাত্রায় জাবিয়ান! সহযোগিতায় জাবিয়ান! ভ্রাতৃত্বে জাবিয়ান! শ্রদ্ধাভাজন বড়ভাই-বড়বোনদের আন্তরিকতা! বন্ধুদের সাথে কত আড্ডা! প্রিয় ছোটভাই-ছোটবোনদের কত শত গল্প! জাবিয়ান বন্ধন চির অটুট থাকুক মুকুটে, মহাকাব্যে অথবা চিরকুটে! জাবিয়ান সম্পর্ক সব সময়ের। জয়তু জাবিয়ান!

About আনিসুর রহমান এরশাদ

শিকড় সন্ধানী লেখক। কৃতজ্ঞচিত্ত। কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী। ভেতরের তাগিদ থেকে লেখেন। রক্ত গরম করতে নয়, মাথা ঠাণ্ডা ও হৃদয় নরম করতে লেখেন। লেখালেখি ও সম্পাদনার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সময়ে পাক্ষিক-মাসিক-ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন, সাময়িকী, সংকলন, আঞ্চলিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ ও জাতীয় দৈনিকের সাথে সম্পর্ক। একযুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। পড়েছেন মিডিয়া ও জার্নালিজমেও। জন্ম টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার হাতীবান্ধা গ্রামে।

View all posts by আনিসুর রহমান এরশাদ →

Leave a Reply

Your email address will not be published.