সাক্ষাৎকারের কলাকৌশল

বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞদের ইন্টারভিউ বা সাক্ষাৎকার নিতে হয়। কোনো কোনো সাংবাদিক সাক্ষাৎকার গ্রহণের দক্ষতাকে শিল্পের পর্যায়ে নিতে পারেন, অনেকে নিতে পারেন না।

যারা নিতে পারেন না তারা মনে করেন, সাক্ষাৎকার কেবলমাত্র প্রশ্ন জিজ্ঞাসা ও জবাব নেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে আকর্ষণীয় ও তথ্যভিত্তিক সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নিজস্ব জ্ঞানভান্ডার থেকে প্রচুর মালমশলাও যোগানের প্রয়োজন হয়।

সংবাদপত্রে প্রথম সাক্ষাৎকার ছাপা হয় মার্কিন সংবাদপত্র নিউইয়র্ক ট্রিবিউন পত্রিকায়। কিছু কিছু সাক্ষাৎকার হয়ে উঠে সময়ের দলিল ও অপ্রকাশিত অন্তরের অকপট প্রকাশ। সাক্ষাৎকারে বিশেষ আলাপের মাধ্যমে কোনো বিষয়ে কারো মতামত জেনে নেয়া হয়।

সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ হয়, সুন্দরভাবে সাক্ষাৎকার দেয়া-নেয়ায় দু’পক্ষের মধ্যে পরিচিয়-সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সাক্ষাৎকার নিতে থাকা দরকার- আর্ট অব প্রেজেন্টেশন বা উপস্থাপনা করার স্টাইল, স্মার্টনেস, ব্যক্তিত্ব, স্পষ্ট উচ্চারণ ও প্রত্যুৎপন্নমতি।

প্রতিবেদনকে তথ্যসমৃদ্ধ করে সংবাদ সাক্ষাৎকার। বিশিষ্ট ব্যক্তির জীবন, দৃষিÍটভঙ্গি, মতাদর্শসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে ব্যক্তিত্ব সাক্ষাৎকার। কোনো বিশেষ ইসুতেও কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের কন্ঠস্বরও তুলে ধরা হয়।

ওরিয়ানা ফালাচি রাজনৈতিক সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী হিসেবে বিখ্যাত। তার ইন্টারভিউ উইথ হিস্ট্রি বইটিতে এমন কিছু সাক্ষাৎকার রয়েছে; যা তাকে সাহসী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। অথচ দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক কর্মীতে রূপান্তরিত হওয়া আনুকূল্য-প্রত্যাশী অনুগত সাংবাদিক ক্ষমতাসীনদের বা দলের নেতাদের উপযুক্ত-যথাযথ প্রশ্ন করতেই পারেন না।

সাক্ষাৎকারদাতা সম্পর্কে মৌলিক তথ্য জানা থাকা দরকার। সাক্ষাৎকারের গতিপথ ঠিকঠাক রাখতে হাতের কাছে একটি প্রশ্নের তালিকা তৈরি করে রাখা দরকার। সেজন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন।

প্রয়োজনীয় রিসার্চ, স্টাডি, হোমওয়ার্ক ধারণাগত পরিচ্ছন্নতা তৈরি করে। সাক্ষাৎকার গ্রহনের সময় পুরোপুরি সক্রিয় ও মনোযোগী শ্রোতা হয়ে উঠতে হয়। প্রশ্ন করার পর যতক্ষণ না উত্তর শেষ হচ্ছে ততক্ষণ ধৈর্য ধরে শোনা উচিত।

সাক্ষাৎকারের কেন্দ্রবিন্দু বা ফোকাস কী বা সাক্ষাৎকার থেকে কী বের করে আনার পরিকল্পনা রয়েছে তা ঠিক করে রাখা দরকার। সাক্ষাৎকার গ্রহনের জন্য সেরা জায়গা বেছে নেয়া, সাক্ষাৎকার দাতার জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করা, সঠিক সময়ে সঠিক প্রশ্ন করাটা জানা এবং সাক্ষাৎকারের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

শুরুতে কঠিন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা না করে তুলনামূলক সহজ ও কম বিতর্কিত প্রশ্ন দিয়ে সাক্ষাৎকার শুরু করা ভালো। অনুশীলন, অনুশীলন ও অনুশীলনের মাধ্যমেই কেবল ভালো সাক্ষাৎকার গ্রহণের কৌশলকে শানিত করা যায়। সাক্ষাৎকার শেষ হওয়ার পর, আর কিছু যোগ করতে চান কিনা জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে।

খুব কম সাংবাদিকই কী কী তথ্য জানা দরকার সেটা ভালোমতো বুঝে নিয়ে স্ট্র্যাটেজি তৈরি করে তারপর সাক্ষাৎকার নিতে যান, সাক্ষাৎকার নিতে যাওয়ার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেন। ভালোভাবে নোট নেয়া, রেকর্ডার ব্যবহার করা আর রেকর্ডিংগুলো সঙ্গে সঙ্গেই লিখে ফেলারও দরকার হয়। বিচারবুদ্ধি, বোধ ও উদ্দেশ্যকে কাজে লাগাতে হয়।

তাছাড়া লেগে থাকা, সবসময় বিনয়ী আর শ্রদ্ধাশীল থাকা, চুপচাপ থাকা, উত্তরে ব্যাখ্যা দিতে হয় এমন প্রশ্ন করা, প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট হওয়া নিশ্চিত করা, সাক্ষাৎকারদাতার সঙ্গে সৎ থাকা, সাক্ষাৎকারদাতাকেই শেষ কথা বলতে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। কখনোই ইগোতে আঘাত করা উচিত নয়।

About আনিসুর রহমান এরশাদ

শিকড় সন্ধানী লেখক। কৃতজ্ঞচিত্ত। কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী। ভেতরের তাগিদ থেকে লেখেন। রক্ত গরম করতে নয়, মাথা ঠাণ্ডা ও হৃদয় নরম করতে লেখেন। লেখালেখি ও সম্পাদনার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সময়ে পাক্ষিক-মাসিক-ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন, সাময়িকী, সংকলন, আঞ্চলিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ ও জাতীয় দৈনিকের সাথে সম্পর্ক। একযুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। পড়েছেন মিডিয়া ও জার্নালিজমেও। জন্ম টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার হাতীবান্ধা গ্রামে।

View all posts by আনিসুর রহমান এরশাদ →

Leave a Reply

Your email address will not be published.