সন্তানকে নিয়মিত সময় দিন

আশেক ওসমানী
বাসায় চোরের কোনো স্থান নাই! এতো ছোট বয়সে দোকান থেকে খেলনা চুরি করে নিয়ে এসেছে তোমার ছেলে। এই ছেলে বড় হয়ে কি করবে বলতো? রাতে বাসায় এসেই আমার স্ত্রীর এমন কঠিন কথায় কিছুটা আন্দাজ করতে পারলাম, বাসায় কিছু একটা ঘটেছে। এর মাঝে আমার ছেলে তারিফ ওসমানীর দিকে খেয়াল করলাম, ফুফিয়ে ফুফিয়ে মাথা নিচু করে কাঁদছে। পাশেই বসে আমার ছোট মেয়ে তাইফা ওসমানী ভাইয়ের সব খেলনা নিয়ে খেলছে।
প্রতিদিন বাসায় ঢ়ুকলেই আমার ছেলে সবসময় দৌড়ে এসে জড়িয়ে দরে আমার কপালে চুমু দিয়ে, তার সারাদিনের কাজগুলো মন খুলে বলবে। তারপর আমার শার্ট এর বোতাম খুলে দিবে, লুঙ্গি নিয়ে এসে বলবে, ফ্রেস হয়ে এসো বাবা। আমরা একসাথে খেলবো বাবা!
কিন্তু আজ আমাকে দেখে ওর কান্নার স্পিড বেড়ে গেছে কয়েক গুন। তার কান্না দেখে আমার স্ত্রী বলল, খেলনা চুরি করার সময় এই কান্না কই ছিলো? আর কথা না বাড়িয়ে সোজা রুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে আমার স্ত্রীর কাছে গিয়ে বললাম, প্লিজ বিষয়টা আমি দেখছি, তুমি আর কিছু বলো না। কাল বিষয়টার একটা সুন্দর সামাধান দিবো ইনশাআল্লাহ।
এবার আমি ছেলের পাশে গিয়ে চুপি চুপি বললম। বাবা তোমাকে কাল আরো অনেক খেলনা কিনে দিবো। তারপর ছেলেকে বেসিনে নিয়ে গিয়ে মুখে পানি দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বললম। চলো আমরা কানামাছি খেলি। ও রাজি হলো। রাতে খেলাধুলা ও খাওয়া শেষ করে ঘুমাতে গেলাম।
রাতে ঘুমানোর সময় আমার স্ত্রীকে প্রশ্ন করলাম, আসলে ছেলে কি চুরি করেছে? আমার স্ত্রী বললো ওর জন্য খেলনার কার কেনার সময় ও কোনো এক ফাকে একটি খেলনার ছোট মোটরসাইকেল চুরি করে পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছিলো। এবার আমি বললিাম চুরি করে পকেটে নিয়েছে? নাকি ভুল করে পকেটে নিয়েছে, বুঝলে কেমনে? এবার ও বললো- না বলে পকেটে করে নিয়ে আসা মানে তো চুরি করে আনা, তাই না? উল্টো প্রশ্ন করে বসলো আমায়।
আমি আর কথা বাড়ালাম না, ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে ছেলেকে বললাম, বাবা আজ তোমার সব খেলনা একসাথে নিয়ে খেলবো? ছেলে বেশ খুশি হয়ে তার সব খেলনা বের করলো। তখন খেয়াল করলাম ও ছোট ২টা স্পাইডার কার, যত্ন করে বের করে একপাশে রাখলো, সাথে কাল পকেটে করে নিয়ে আসা মোটরসাইকেলটিও। খেলার এক ফাকে তার প্রিয় ২টি স্পাইডার কার নিয়ে আমার পকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখলাম। ও খেয়ালই করলো না।
হঠাৎ করে ছেলেকে বললাম- সব খেলনা গোছাও, এবার বাইরে খেলতে যাবো। ছেলেটি তার সব খেলনা গোছাতে গিয়ে হঠাৎ করে বলে বসলো, বাবা আমার স্পাইডার কার কোথায়? কোথায় গেলো কার ২টি? এবার ও জোর গলায় ওর মাকে ডেকে বললো, আম্মু-আমার ২টা স্পাইডার কার খুজে পাচ্ছি না। এখন আমি কি দিয়ে খেলবো? বলে কান্না করা শুরু করে দিলো আমার ছেলেটি।
আমার স্ত্রী ওর খেলনাগুলো সব আবার ফ্লোরে রেখে, ২টি স্পাইডার কার খুজতে লাগলো। আর আমি উঠে অন্যরুমে চলে আসলাম। ছেলের কান্না থামায় কে? এবার আমি রুম থেকে বের হয়ে, ছেলের পাশে গিয়ে বল্লাম আচ্ছা বাবা? খেলার সময়কি, ভুল করে আমি পকেটে, তোমার খেলনা ঢুকিয়েছিলাম? আমার পকেটে হাত দিয়ে দেখতো বাবা!
ও আমার পকেটে হাত দিয়ে তার খেলনা ২টা বের করে নিলো, সাথে সাথে ছেলেকে বললাম বাবা? তুমিও কি গতকাল বাবার মতো ভুল করে আংকেলের দোকানের খেলনা মোটরসাইকেলটি পকেটে নিয়েছিলে? আমার ছেলে বললো হ্যাঁ বাবা, আমি ভুল করে নিয়েছিলাম। এবার আমি বললাম বাবা ভুল করে নিয়ে তোমাকে ২টি স্পাইডার কার ফেরত দিয়েছি। তুমিও কি, আংকেলকে আজ খেলনাটা ফেরত দিয়ে আসবে? ও বললো হ্যাঁ বাবা।
তারপর সন্ধ্যায় বাপ-ছেলে গিয়ে খেলনাটা ফেরত দিলাম। দোকানদার বললো- ছোট মানুষ ভুলে নিয়েছে, থাক ফেরত দিতে হবে না। তাছাড়া খেলনাটা খুব কম দামের। এবার আমি বললাম- আপনার খেলনা ফেরত না দিয়ে আমি টাকা ফেরত দিতে পারতাম। কিন্তু কেন দেয়নি জানেন? কারন আমার ছেলে যেনো এটা না শিখে যে, টাকা দিয়ে সব কিছু মূল্য নির্ধারন হয়। আপনার কাছে এটা অল্পমূল্যের একটা বিষয়, কিন্তু আমার কাছে এটা সন্তানের নৈতিকতা শিক্ষার বিষয়।
এর কিছুদিন পর বাজারে গেলাম আমরা। আমার বাবা-মায়ের জন্য পান-সুপারি কিনতে। পান-সুপারি কিনে পাশের দোকানে শাক কিনতে আসছি, এর মধ্যে ছেলে হাতের সুপারি দেখিয়ে বললো, বাবা সুপারি আংকেলের দোকানে যাবো। আমি ভুলে সুপারি নিয়ে আসছি ১টা। তারপর আবার সুপারির দোকানে গেলাম।
সুপারিটা ফেরত দিয়ে, শাক কিনে নিয়ে বাসায় ফেরার পথে আমার স্ত্রী বললো, আমি স্যরি, আমার সন্তান আসলেই ওই দিন খেলনাটা চুরি করেনি, ভুলে পকেটে ঢুকিয়ে ছিলো। এবার আমি বললাম, তুমি স্যরি বলছো কেন? উল্টো তুমি বিষয়টা এভাবে না তুলে ধরলে, আমার ছেলেটাকে কারেকশান করতে পারতাম না। সন্তানের মা হিসেবে তুমিই বেস্ট।
বি:দ্র: সন্তান ভুল করলে তাকে সরাসরি অপরাধী বানানো থেকে বিরত থাকুন। সন্তানকে সাথে নিয়ে প্রতিটা ভুলের জন্য খারাপভাবে না বলে, সুন্দর করে বিষয়টা বুঝাতে নিয়মিত চেষ্টা করুন। তাহলে আপনার সন্তানের মধ্যে নৈতিকতা ও মানবিকতা বৃদ্ধি পাবে।
টিকা: সন্তানকে নিয়মিত সময় দিন, মন খুলে সন্তানের সাথে হাসুন ও খেলাধুলা করুন। সময় পেলেই খেলার ছলে সন্তানের শিক্ষক হয়ে উঠুন।
লেখক: কারাতে, স্ট্রিট ফাইট এন্ড ফিটনেস ট্রেইনার

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *