যথাযথ সেলফ-ইমেজ নিয়ে বড় হোক শিশু

শারমিন শামুন

সেলফ-ইমেজ একজন মানুষের জীবনীশক্তি এবং মানসিক শক্তি। আমাদের শিশুরা কি নিজেদের কাছে নিজেদের বোঝা, ব্যর্থ, অসহায়, দূর্বল ভাববে, নাকি খুবই ইতিবাচক মনের এবং ব্যক্তিত্বের সফল মানুষ হবে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আবশ্যক পাঠ দেয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। সকল শিশু শর্তহীন ভালোবাসার মধ্যে যথাযথ সেলফ-ইমেজ নিয়ে বড় হোক এটাই প্রত্যাশা।

সেলফ-ইমেজ কী?

‘Self Image’ শব্দটির সাথে আমরা প্রায় সবাই পরিচিত। এর আক্ষরিক অর্থ যদি করি তবে দাঁড়ায় ‘নিজের ছবি’। আমরা তো নিজের ছবি সবাই-ই দেখি–ফোনে, কম্পিউটারে, পেপার প্রিন্টেড ভার্সনে, এমনকি আয়নায় দাঁড়ালেও দেখি। কিন্তু এই  সেলফ-ইমেজ মানে কিন্তু নিজেকে কেবল বাহ্যিকভাবেই দেখা নয়, ভেতর থেকে দেখাও। সহজ করে বলতে গেলে আমি আমার কাছে কেমন, আমার চোখে, আমার বিচারে আমি কেমন, আমার সম্পর্কে আমার কি ইম্প্রেশন, আমি কি পারি, কতদূর পারি, আমার আইডিওলজি কি— এটাই সেল্ফ ইমেজ।

শিশুর সেলফ-ইমেজ

একটি ছোট শিশুরও তার নিজের কাছে তার একটি সেলফ-ইমেজ থাকে। তবে তা কেমন হবে তা সাধারণত মা-বাবা এবং পরিবেশের উপর নির্ভর করে। তবে মা-বাবাকে সেল্ফ ইমেজ তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়। আর এই কাজটি শিশুর ছোটবেলা থেকেই শুরু করতে হয়।

সেলফ-ইমেজ তৈরির উপায়

সন্তানের নিজের একটি সুন্দর এবং শক্তিশালী সেলফ-ইমেজ তৈরিতে আমরা মা-বাবা হিসেবে ছোট-বড় অনেক ধরণের কাজ বা পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারি। আমি আজ সেদিকে না গিয়ে বরং এই ক্ষেত্রে করা আমাদের কমন কিছু ভুল নিয়ে লিখছিঃ

নিজের নামে পরিচয় করানো

একটু খেয়াল করলে দেখবেন আমাদেরকে ছোটবেলায় আমাদের মা-বাবারা যখন অন্যের কাছে পরিচয় করিয়ে দিত, তখন বলতো আমার মেয়ে বা ছেলে। এমনকি অনেক সময় অনেক মা-বাবা তো পরিচয় করানোটাও বুঝতো না বা দরকার মনে করতো না।

কিন্তু প্যারেন্টিং এক্সপার্টরা বলেন শিশুকে ছোটবেলা থেকেই পরিচয় করাবেন আগে তার নিজের নামে৷ অনেকটা এমনঃ এই হলো আনন্দিতা, আমার মেয়ে। মানে আগে তার নাম বলবেন তারপর আপনার সাথে ওর সম্পর্ক। এতে সাইকোলজিক্যালি শিশুরা নিজেকে একজন স্বতন্ত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ভাবতে শিখে।

দূর্বলতায় ফোকাস না করা

অনেক মা-বাবাই খুব হেয়ালি করেই যেন সাত-পাঁচ না ভেবেই শিশুকে শোনাতে থাকে তুমি এটা পারো না/ পারলে না, তুমি কেন পারো না, তুমি তো এটা জানোই না। আরো এমন অনেক ধরনের মন্তব্য করি শিশুর অনেক না পারার জায়গাগুলোতে। কিন্তু তাতে করে শিশু নিজেকে ব্যর্থ ভাবতে থাকে এবং তার যা পারার সামর্থ্য ছিলো সেগুলোও ধীরে ধীরে তার মন থেকে সরে যায়।

তাই অবশ্যই শিশু কি পারে/পারছে সেগুলোকে গুরুত্ব দিন। আর দূর্বলতাগুলোর উপর কাজ করুন। এই সক্ষমতাকে আপনি উৎসাহ এবং চ্যালেঞ্জ দিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে ওর না পারার বিষয়গুলো ওকে চেষ্টা করার জন্য আগ্রহী করে তুলতে পারেন।

শুধু জয়ই না চাওয়া

শিশুরা যেকোন বিষয়ে অনেক বেশি আগ্রহ নিয়ে চেষ্টা করে যদি মা-বাবা পাশে থেকে তাকে সাহস এবং উৎসাহ দেয়। আপনার উৎসাহ ওকে আরো বেশি বেশি চেষ্টা করতে আগ্রহী করবে। হার-জিত যাই হোক, শিশুর চেষ্টাকে এপ্রিশিয়েট করুন। শিশু কিছু না পারলে তাকে নেতিবাচক কিছু না বলে আমরা যদি বলি আমরা আবার চেষ্টা করবো তবে সে স্বস্তি পায় এবং আবার ওই কাজটি করার জন্য মনকে প্রস্তুত করতে পারে। মোটকথা আমাদের মনোভাব যেন এমন না হয় যে আমরা তার কাছে শুধু জয়ই চাই।

ঘরের কাজে যুক্ত করা

আমরা অনেক মা-বাবাই ভাবি শিশু আবার কি কাজ করবে, ওর করার দরকার কি, আমরা তো আছিই। কিন্তু এটা একটা ভুল ধারণা, ভুল সিদ্ধান্ত। যার ফলাফল আমাদের এবং আমাদের সন্তানদেরও ভোগ করতে হতে পারে। তাই শিশুকে ছোটবেলা থেকেই বয়স উপযোগী কাজ দিয়ে ঘরের কাজে অংশগ্রহণ করা শেখাতে হবে–ছেলে-মেয়ে সবাইকে অবশ্যই।

২ বছর থেকেই শুরু করতে পারেন তাদের বিভিন্ন কাজ দেয়া। এতে করে শিশুরাও নিজেদেরকে পরিবারের বড়দের মতোই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ভাবতে শেখে এবং একই সাথে কাজও শেখার সুযোগ পাবে, তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ বাড়বে। যেকোন কাজ শিশুকে দেয়ার আগে অবশ্যই বড়রা সুন্দর করে তাকে করে দেখাবেন।

 শর্তহীন ভালোবাসা

এই টার্মটি অনেকেই বুঝতে ভুল করে থাকেন। শর্তহীনভাবে ভালোবাসা বললে অনেকে মনে করে সন্তানকে ভালোবাসবো তবে তার কাছে কোন প্রত্যাশা না রেখে। বিষয়টি ঠিক এরকম নয়। সন্তানকে শর্তহীন ভালোবাসার মানে হলো–তাদের প্রতি আমাদের ভালোবাসার যেন কোন পূর্বশর্ত না থাকে।

যেমনঃ তুমি পরীক্ষায় এ+ পেলে, তুমি ফার্স্ট হলে, তুমি খুব ভালো চাকরি পেলে, আমি যা বলি তুমি তাই তাই শুনলে তোমাকে ভালোবাসবো এমন যেন না হয়। এই শর্তাধীন ভালোবাসা সন্তানকে পরিপূর্ণ মানুষ হতে দেয় না, নিজের স্বকীয়তা তৈরি হতে দেয় না, এমনকি নিজস্ব কোন ব্যক্তিত্ব এবং নৈতিকতাবোধও তৈরি হয় না। হয় তারা শুধুই মা-বাবার প্রত্যাশার জীবন যাপন করে যায় অথবা তা না পারলে ব্যর্থ এবং বিপর্যস্ত জীবন যাপন করে।

মা-বাবা হিসেবে দায়িত্ব

মা-বাবা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সন্তানকে তার জীবনের পথে একজন গাইড হিসেবে পাশে থেকে সাপোর্ট দেয়া, ভালো-মন্দ চিনতে সাহায্য করা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া শিখতে সাহায্য করা, তাকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, তাকে দিয়ে আমাদের মনের মতো করে সব করানো নয়। এই জায়গাটায় আমরা অনেক মা-বাবাই ভুল করে থাকি।

সন্তানের কোন খারাপ আচরণ বা কাজের জন্য কখনো আপনার আর তার মধ্যে ভালোবাসা, যত্ন এগুলোকে বাজি রাখবেন না। তাতে কখনো সন্তানের ভালো হয় না। বরং সন্তানকে এটা বুঝানো বা রিয়ালাইজ করানো অনেক বেশি কার্যকরী যে মা-বাবা তোমাকে ভালোবাসে তাই তোমাকে ভালো দেখতে চায়। তার প্রতি আপনার শর্তহীন ভালোবাসাই বরং ওকে তাড়িত করবে ভালো আচরণে, ভালো কাজে।

 

পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *