মেধাবী সন্তান গড়ার সহজ উপায়

মিজান রহমান

বাবা-মা হিসেবে আমরা চাই, আমাদের সন্তান হোক সুখী এবং স্বাস্থ্যবান। সেই সঙ্গে আমরা চাই আমাদের সন্তান হোক স্মার্ট তথা মেধাবী। এ কথা বলাই বাহুল্য যে, স্মার্ট শিশু মানে হলো স্মার্ট মস্তিষ্ক! কিন্তু শিশুর উন্নত মস্তিষ্ক বা শিশুকে মেধাবী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কী চাই? পুষ্টিকর আর প্লেটভর্তি খাবার?

একাডেমী অব পেডিয়াট্রিকসের বিশেষজ্ঞগণ জানাচ্ছেন, শিশুর প্রকৃত বিকাশ তথা ভবিষ্যত সামাজিক এবং আবেগিক দক্ষতা গঠনে সহায়ক পরিবেশের জন্য একজন বাবা-মা হলেন সত্যিকারের কুশীলব। এক্ষেত্রে পারিবারিক শিক্ষার অংশ হিসেবে জন্মের পর থেকেই বাবা-মা এই ৫ টি গোপন R অনুসরণ করলে স্কুলযাত্রা শুরুর আগে শিশু হবে দারুণভাবে প্রস্তুত! চলুন জানা যাক কী সেই ৫ টি গোপন R।

পড়া

এক. R ফর Reading। মানে একসঙ্গে পড়া!

আপনি হয়তো ভাববেন, তিন-চারমাসের শিশুর সামনে ছড়া পড়লে আর গান করলে তাতে সে কিইবা বুঝবে! আমেরিকান একাডেমী অব পেডিয়াট্রিকসের একদল চিকিৎসাবিজ্ঞানী আর মনোবিজ্ঞানী বলছেন, যতো অল্প বয়সেই হোক, পারিবারিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে তথা খেলাচ্ছলে প্রতিদিন শিশুর সঙ্গে বাবা-মা পড়ায় অংশ গ্রহণ করলে, তা শিশুর ভাষাগত দক্ষতা, দ্রুত পড়তে শেখা, এবং আবেগিক সক্ষমতা গড়তে সহায়তা করে এবং অতি অল্প বয়সের এই আনন্দ পাঠ একটি শিশুর সারাজীবনে প্রভাব ফেলে। এ ধরণের মিথস্ক্রিয়া শিশুর মস্তিষ্কের কােষ তথা স্নায়ুকে দৃঢ় করার মাধ্যমে শিশুর কল্পনা শক্তি বাড়ায়।

ছড়া

দুই. R ফর Rhyming: ছড়ার তালে সারাদিন খেলুন, কথা বলুন, করুন গান, আর গড়াগড়ি খান

একাডেমী অব পেডিয়াট্রিকস, শিশুর সঙ্গে খেলাধুলায় যেমন উৎসাহ দিচ্ছে তেমনি শিশুর সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলায় উৎসাহ দিচ্ছে। একাডেমী বলছে, শিশু তার চারপাশে যা কিছু দেখছে, তার চারপাশে যা কিছু ছড়িয়ে আছে, এসব বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলুন। বাড়িতে, শপিং মলে, ভ্রমণকালে যখন যেখানে যা সামনে পড়ে সেসব নিয়ে শিশু কথা বলতে না পারলেও বাবা-মায়ের এসব নিয়ে বকবক করে যাওয়া শিশুর উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

রুটিন

তিন. R ফর Routine: খাওয়া, ঘুম সব হবে নিয়ম করে!

আমরা বুড়ো হয়ে যাই কিন্তু নিয়মানুবর্তিতা শিখি না। একমাত্র এই কারণেই মুটিভেশনাল বক্তারা টাইম ম্যানেজমেন্ট নিয়ে বই লিখেন লাখ লাখ টাকা আয় করে থাকেন। অথচ একাডেমী অব পেডিয়াট্রিকস জানাচ্ছে, শিশু বয়সে সঠিক অভ্যাস গড়ে দিলে শিশুর সারাজীবনে এর ইতিবাচক প্রভাব থেকে যায়। বড় হয়ে আর টাইম ম্যানেজমেন্ট শিখতে হয় না! রুটিন করে পরিবারের সকলে মিলে খাওয়া-দাওয়াও শিশুর স্বাস্থ্যকর মানসিকতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে বলে একটা নিবিড় গবেষণা পরিচালনা করেছে একাডেমী অব পেডিয়াট্রিকস।

পুরষ্কার

চার. R ফর Reward: শিশুর যে কোনো ভালো সাফল্যে বাহবা দিন

যখনই দেখবেন আপনার সন্তান ভালো কিছু করছে তাকে বাহবা দিন। একাডেমী অব পেডিয়াট্রিকস বলছে, সন্তানকে বাহবা দেওয়া হলো অল্প বয়সে সন্তানকে দেওয়া অত্যন্ত দামী একটা উপহার। তাকে ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি নিজে ভালো কাজের রোল মডেল হয়ে যাওয়াও ইফেক্টিভ এবং পজিটিভ প্যারেন্টিংয়ের উদাহরণ। অল্প বয়সে সন্তান উৎসাহ এবং বাহবা পেলে সন্তানের মাঝে অধিক আত্মনিয়ন্ত্রণ গড়ে উঠে। অল্প বয়সে গড়ে উঠা শিশুর সামাজিক, আবেগিক এবং আচরণগত দক্ষতাই ভবিষ্যতে স্কুলের সাফল্যের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

সম্পর্ক

পাঁচ. R ফর Relationships: নিবিড় সম্পর্কও সমাধান

বাবা-মা এবং সন্তানের সুন্দর সম্পর্ক শিশুকে এডভার্স চাইল্ডহুড এক্সপেরিয়েন্স (ADEs) এর ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে। এডভার্স চাইল্ডহুড এক্সপেরিয়েন্স (ADEs) হলো, শিশুর কিছু অস্বাভাবিক আচরণ! যেমন, কোথাও কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছেন, আপনার শিশু পছন্দের চেয়ারে বসতে না পারলে টেবিলের জিনিষ ছুড়ে ফেলা শুরু করে।

বাসায় জিনিষপত্র ছুড়ে ভেঙ্গে ফেলা তো অতি পরিচিত ঘটনা! এগুলোই ADEs। শিশুর সঙ্গে বাবা-মায়ের কোমল, শ্রদ্ধাপূর্ণ এবং সঙ্গতিপূর্ণ সম্পর্কের ফলে যেমন সন্তান ADEs প্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত হয় তেমনি ভবিষ্যতে শিশুর সুদৃঢ় মানসিক গঠনের মাধ্যমে স্কুলে শিশুর ভালো ফলাফলে সহায়ক হয়।

আপনিই আপনার শিশুর প্রকৃত শিক্ষক। প্রকৃত শিক্ষকের ভূমিকা পালন করলে শিশুর বিকাশের জন্য কোনো নির্দিষ্ট খেলনারই দরকার হবে না। পড়তে শেখার জন্য কোনো নির্দিষ্ট মোবাইল আ্যাপেরও দরকার হবে না। আপনিই চমৎকারভাবে গড়ে তুলতে পারেন আপনার শিশুর ভবিষ্যত স্কুলের দিনগুলো! অনুসরণ করতে হবে কেবল ৫ টি R। R eading, R hyming, R outine, R ewards, এবং R elationships।

*Credit Note: American Academy of Pediatrics যুক্তরাষ্ট্রের শিশু বিশেষজ্ঞদের একটি জনপ্রিয় প্লাটফর্ম। এই লেখাটি একাডেমী অব পেডিয়াট্রিকসের প্যারেন্টিং ওয়েবসাইট হেলদিচিলড্রেন ডট অর্গ থেকে সংগৃহীত। হেলদিচিলড্রেন ডট অর্গ প্রশিক্ষিত শিশু বিশেষজ্ঞ দ্বারা পরিচালিত। এই সাইটে প্রকাশিত লেখা HON বা হেলথ অন নেট কর্তৃক সার্টিফাইড।

লেখকঃ প্যারেন্টিং বিষয়ে কলাম লেখক ও অনুবাদক

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *