ভিআইপিবান্ধব দেশে ভিআইপি কালচার!

ভিআইপিবান্ধব দেশ দেখলে আপনার মনে হবে- এ কান্ট্রি ফর দ্য ভিআইপি, অফ দ্য ভিআইপি। ভিআইপিদের সবকিছু আলাদা; ভোগের পদ্ধতি, ত্যাগের পদ্ধতি, চলাচলের স্টাইল। জাহাজই শুধু নয় হাসপাতালেও ভিআইপিদের জন্য আলাদা কেবিন, ট্রেনে আলাদা কম্পার্টমেন্ট, আলাদা ওয়েটিংরুম, বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জ, ভিআইপি গেস্ট হাউস, এমনকি ভিআইপি ওয়াশরুম!

বর্ণবাদী সম্পর্কের আধুনিক রূপ

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকার ও সাংস্কৃতিক জের ভিআইপি কালচার; যা ঔপনিবেশিক প্রভু আর দেশীয় প্রজার বর্ণবাদী সম্পর্কের আধুনিক রূপ, একটি মনোবিকার, এক গভীর অসুখ। ভিআইপি- ঔপনিবেশিক অভিজাত-তন্ত্রটি বিষবৃক্ষের মতো! উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজ বাস্তবতায় বহু পুরনো ভিআইপি সংস্কৃতিকে পুনঃনিরীক্ষণ ও পর্যালোচনাপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার এবং এ সংক্রান্ত জনমনস্তত্ত্ব পরিবর্তন-পুনমূল্যায়ন সময়ের অপরিহার্য দাবি।

সাধারণ মানুষের গুরুত্ব নেই

ভিআইপিদের সুখ দেখায় আনন্দ! খুশি করায় তৃপ্তি! বিশেষ কিছু ওনাদের জন্য করতে পারায়ও দারুণ খুশির আমেজ! অনেকে নতুন ভিআইপি হওয়ার স্বপ্ন দেখতেও শুরু করেছেন। ভিআইপিদের সুবিধা দেয়ার জন্য বহুজনের অক্লান্ত মেহনত পরিশ্রম! দেশটিতে সাধারণ মানুষের গুরুত্ব নেই বললেই চলে! ভিআইপি তকমা পেলেই সমাজের উঁচু শ্রেণিতে চলে যায়!

ভিআইপি নামের প্রভু!

ব্যক্তিসত্ত্বার আইনি পরিধি ছাপিয়ে, আইন নির্ধারিত সুবিধার সীমারেখা অতিক্রম করে সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিস্তৃত হয়ে উঠে ভিআইপি কালচার। ভিআইপি কালচার বর্তমানে অভিজাততন্ত্র, জনবিচ্ছিন্নতা, ক্ষমতা চর্চা, বৈষম্য, বর্ণবাদ আর জনদুর্ভোগের সমার্থক। অনেকেই ভিআইপি নামের প্রভু হয়ে উঠতে অনেক বেশি কসরত করে!

উন্নয়নের সুফল পায় ভিআইপিরা

উন্নয়নের সুফলও পায় ভিআইপিরাই। ভিআইপিরা শুধু রাস্তা ব্যবহারে সুবিধা পান এমনটা নয়; বিনোদন সেন্টার বা টুরিস্ট স্পটে। যেখানকার সমাজ ভিআইপি ও অভিআইপিদের জন্য এক নয়! সেখানে যানজটে নাকাল অচল নগরেও ভিআইপিদের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য সড়কে পৃথক ভিআইপি লেন নির্মাণে আনুষ্ঠানিক সরকারি প্রস্তাব হয়! বিমানবন্দরে নিরাপত্তা তল্লাশি থেকে অব্যাহতির সুপারিশ, চিকিৎসার জন্য বিলাসবহুল চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের তোড়জোড়- ভিআইপিদের জন্যই।

ভিআইপিবলয় ও ভিআইপিপ্রীতি

দেশের অভ্যন্তরে ভিআইপিবলয় সৃষ্টি সমাদৃত। দেশটি যেন ভিআইপিদের জন্যই! আমজনতা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবে আর কখনো পুলকিত-শিহরিত হবে, কখনো দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। ভিআইপিপ্রীতি সেখানে তীব্রভাবে বিদ্যমান। ভিআইপিদের সব দাবি পূরণ করে অভিআইপিদের জীবন ধন্য হয়!

নব্য ভিআইপি শ্রেণি তৈরি

নব্য ভিআইপি শ্রেণি তৈরি হয় শেয়ারবাজারের টাকা হরিলুটের মাধ্যমে, উন্নয়ন প্রজেক্টের টাকা মেরে দিয়ে বা ব্যয় কয়েকগুণ বাড়িয়ে, দুর্নীতি করে। আর তাদের খেদমত করে ধন্য হবার মতো জনগণের সাপ্লাইতো ডিমান্ডের চেয়েও বেশি!

ভিআইপিবান্ধব সিস্টেমে ভিআইপি বিপ্লব

ভিআইপিবান্ধব জনগণ ব্যাংকে টাকা রাখেন! ভিআইপিরা জনগণের বিলিয়ে দেয়া সেই টাকা নিয়ে যান। ভিআইপিদের সুখের জন্য সকল সিস্টেম কার্যকরী । একটি ভিআইপি বিপ্লব সংগঠিত হবার দ্বারপ্রান্তে দেশটি । অথচ দেশটির স্বাধীনতা এসেছে আমজনতার মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের মাধ্যমে। তবে স্বাধীনতার সুফল ভাগাভাগির ক্ষেত্রে বৈষম্য ও অসমতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

ভিআইপি মুভমেন্টে ভোগান্তি ও বিড়ম্বনা

অপ্রতুল রাস্তাঘাটে নিত্য যানজটের সঙ্গী এই শহরে ভিআইপি মুভমেন্ট আর ভিআইপি সংস্কৃতির কারণে প্রতিদিন সাধারণ মানুষের অনেক মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়৷ ভিআইপি ভোগান্তি এমন যে অফিস সময়েও- রাস্তা আটকে থাকে, রাস্তা পার হওয়া যায় না, ফুটপাথেও হাঁটতে দেয়া হয় না। ভিআইপি বিড়ম্বনায় কারো ক্লাস মিস হয়, ফুটওভার ব্রিজও বন্ধ করে দেয়া হয়, রাস্তায় আটকে থাকতে হয়, পরীক্ষার হলে ঢুকতে দেরী হয়, জরুরী ভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজনেও রক্তদাতা যথাসময়ে হাসপাতালে পৌঁছতে পারেন না, চাকরির ইন্টারভিউ মিস করেন৷ নানা ধরনের অসুবিধা হলেও ভিআইপিরা প্রায় সময় ডান দিক দিয়ে যান, উলটো দিক দিয়ে যান৷

মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা

নৌরুটে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা ‘ভিআইপি’ সুবিধা। কেউ কেউ সিরিয়াল ভেঙে ভিআইপি সুবিধা নিয়ে অনায়াসে দ্রুত পার হয় নদী, কেউ কেউ বেশ দ্রুত ফেরিতে উঠতে পারেন, পরে এসে আগে পার হয়ে যায়। কিন্তু ভিআইপি সুবিধার ফাঁদে পড়ে ঘাটের টার্মিনালে সিরিয়ালে আগে থেকেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয় সাধারণ যাত্রীদের।

আইন ও রীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো

ভিআইপি কালচারই এমন- যেখানে আইন ও রীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো যায়, ক্ষমতার প্রদর্শনী করা যায়, রাস্তার উল্টো পথে সদর্পে গাড়ি চালানো যায়, আইন যাকে ছুঁতে পারে না, যার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আরাম-আয়েশ এর ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনকে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়, নগর জীবনের কষ্ট-যন্ত্রণা-যানজট-দূষণ-ধূলো-অব্যবস্থার স্পর্শ ছাড়া থাকা যায়। ভিআইপি-র গাড়িতে থাকে লালবাতির ঝলকানি, বাজে গগনবিদারী হাইড্রোলিক সাইরেন, থাকে চলাচলের রাস্তা থেকে জনসাধারণকে সরিয়ে দেওয়ার পুলিশি ব্যতিব্যস্ততা।

ভিআইপি উৎপাদন বৃদ্ধি

অবশ্য ভুক্তভোগী এবং সুবিধাভোগীর অভিজ্ঞতা দুই ধরণের। কোটিপতির উৎপাদনও বেড়েছে, ভিআইপি উৎপাদনও বেড়েছে। বেসরকারি বিমানে ভ্রমণের সময় বোর্ডিং পাসে ভিআইপি সিল দিলে আর বাসে উঠতে হয় না, একটা কার এসে উড়োজাহাজের দোরগোড়া পর্যন্ত বহন করে নিয়ে যায়। স্টেডিয়ামে ওয়াশরুমে যেতে আলাদা লাইন, বিআরটিএতে গাড়ির লাইসেন্স করতে গিয়েও ভিআইপি লাইন, কোভিডের টিকা নিতে ভিআইপিদের জন্য আলাদা বুথ।

বিশেষ সুবিধা অর্জনের অপসংস্কৃতি

ভিআইপিকে অভিনন্দন জানাতে শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক আনা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তার পাশে রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা ধরণের ভিআইপি সংস্কৃতি থাকা উচিত নয়৷ হাসপাতালে ভিআইপি ভর্তি হলে প্রচুর মানুষের সমাগমে সাধারণ রোগীরা মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হন, ডাক্তাররা তাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকেন৷ ফলে ভিআইপি সংস্কৃতিটা অনেকটাই অপসংস্কৃতি হয়ে দাঁড়ায় সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হওয়ায়। অন্যদের বিপাকে ফেলে ভিআইপিদের বিশেষ সুবিধা অর্জনের বিষয়টি অনেকক্ষেত্রেই সুস্পষ্টভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার, পরিষ্কারভাবেই অসাংবিধানিক, সম্পূর্ণভাবে অবৈধ ও বৈষম্যমূলক এবং একই সঙ্গে অনৈতিক ও অমানবিকতারও দৃষ্টান্ত।

আমেরিকা-ইউরোপে ভিআইপিরা

আমেরিকায়-ইউরোপে মন্ত্রীরা যখন চলেন, কেউ টেরও পায় না। তাঁরা গণপরিবহনে উঠে চলাচল করেন।

ভিআইপির বাড়তি সুযোগ সুবিধা নেই সুইডেনে

সুইডেনের জন প্রতিনিধিদেরকে ভালো অংকের হাতখরচ কিংবা বাড়তি কোনো সুযোগ সুবিধাও দেয়া হয় না, বরং জনগণের করের অর্থ ব্যয়ের ব্যাপারেও কড়াকড়ি রয়েছে পার্লামেন্ট সদস্যদের ওপরে৷ সুইডেনে রাজনীতিবিদ হিসাবে শুধুমাত্র দেশটির প্রধানমন্ত্রী সরকারি গাড়ি পান। পার্লামেন্ট সদস্যরা পাবলিক পরিবহনে বিনামূল্যে যাতায়াত করতে পারেন। অন্য অনেক দেশের মতো তারা নিজের জন্য কোনো গাড়ি বা চালক পান না।

জার্মানিতে আলাদা মর্যাদা নেই ভিআইপির

জার্মানিতে সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী কিংবা আইনপ্রণেতারা সড়ক, মহাসড়কে ভিআইপি হিসেবে আলাদা কোনো মর্যাদা পান না৷ এমনকি খোদ চ্যান্সেলরেরও নিজের বাজার নিজে করেন৷ আগে থেকে না জানিয়ে সাধারণ জনতাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে কোনো ভিআইপিকে সেবা দেয় না জার্মান কর্তৃপক্ষ৷

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.