জয় হোক পিতৃত্বের

মোঃ বাকীবিল্লাহ
মাতৃত্ব নিয়ে আমাদের দেশে অনেক লেখালেখি কিংবা উদ্যোগ চোখে পড়লেও পিতৃত্ব নিয়ে তেমন কিছুই চোখে পড়ে না। অথচ মাতৃত্ব এবং পিতৃত্ব দুটো পরিপূরক। নতুন যারা পিতা হন তারা অনেক সাধারণ বিষয় নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। বিষয়গুলো কিভাবে সামলানো যায় এ বিষয়ে অভিজ্ঞজনেরা ভূমিকা রাখলে নতুনদের দুশ্চিন্তা কমবে অনেকাংশে। তাছাড়া সুন্দরভাবে সন্তান পরিপালনের কৌশল নিয়ে অভিজ্ঞজনদের কৌশল জানলে সবাই উপকৃত হতে পারে।

মাতৃত্ব ও পিতৃত্ব দুটো পরিপূরক

হাইপারেক্টিভিটি একটি টার্ম যা ব্যবহার করা হয় সেই শিশুদের বর্ণনা দিতে যাদের অত্যাধিক এনার্জি কিংবা এক্টিভিটি লেভেল । এ ধরনের শিশুরা সাধারণত রেস্টলেস হয়ে থাকে। এটেনশন ডেফিসিয়েন্সিও খুব কমন একটি দিক তাদের বেলায়। এই শিশুরা কোথাও কোনো একটি কাজ নিয়ে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারে না। কোনো এক দিকে সে তার মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না , তাদের মনোযোগ খুব দ্রুত বদলে যায়। সঠিক সময়ে বুঝতে পারলে অনেকটাই এ ধরনের সমস্যার সমাধান সম্ভব । এখন সচেতনতা বেড়েছে , মানুষ বিষয়টিকে না লুকিয়ে খোলামেলাভাবে কথা বলছে । এতে করে সঠিক সময়ে সঠিক ব্যবস্থা নিতে পারছেন।

চঞ্চলতা শিশুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য

চঞ্চলতা শিশুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু শিশুর অতি চঞ্চলতা আর অমনোযোগিতা তার দৈনন্দিন কাজকে যখন বাধাগ্রস্ত করে, লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটায়, তখন এই প্রবণতাকে বলা হয় এটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার (এডিএইচডি)। এটি শিশুর একধরনের আচরণজনিত সমস্যা। যদি শিশুর মধ্যে এর লক্ষণ থাকে তবে একজন মনোচিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে। এ ধরনের শিশুর বাবা-মায়েদের কিছু নির্দেশনা মেনে চলা উচিত: শিশুর জন্য একটা রুটিন তৈরি করুন। বাড়ির সবাই নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলুন। যেমন ঠিক সময়ে ঘুমানো, খাবার সময় হলে টেবিলে বসা, খেলার সময় খেলা ইত্যাদি। শিশুকে কোনো নির্দেশ দিলে তা বুঝিয়ে বলবেন। রূঢ় আচরণ করবেন না। বকাবকি, মারধর সমস্যার সমাধান নয়। শিশুর ভালো কাজকে প্রশংসা করুন, কখনো পুরস্কার দিন। শিশুর খাদ্যতালিকায় কৃত্রিম রং আর মিষ্টির পরিমাণ কমিয়ে তাজা ফলমূল যুক্ত করুন।

চিন্তাটাকে অন্য দিকে ডাইভার্ট করা

বাচ্চাদের সাথে আপনি যেমন আচরণ করবেন, ওরা শুধু সেটাই ফিরিয়ে দেবে। যেমন ধরুন, আপনার সন্তান উল্টাপাল্টা আচরণ করছে। জেদ করছে। আপনিও দিলেন বকা। ওর জেদ আরো বেড়ে যাবে। আরো বেশি উল্টাপাল্টা আচরণ করতে থাকবে। এক্ষেত্রে কৌশল হচ্ছে তার চিন্তাটাকে অন্য দিকে ডাইভার্ট করা। ওর দিকে একটু মনোযোগী হওয়া। একটু আদর দেয়া। দেখবেন অল্প সময়েই হাওয়া বদলে গেছে।
ট্রাই করে দেখুন না একবার। এ টেকনিকটা একেবারেই কম বয়সীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করুন। ৮/১০ বছরের পর এ টেকনিক কাজে না-ও লাগতে পারে।

ফিনান্সিয়াল লিটারেসি শেখানো

শিশু অনুকরণ প্রিয় । বাবা মা যা শেখাবেন তার চেয়ে বেশি তারা শেখে বাবা মা কী করছেন তা দেখে। শিশুকে ফিনান্সিয়াল লিটারেসি শেখানোর জন্যও একইভাবে বাবা মাকে তার সামনে তুলে ধরতে হবে তারা নিজেরা কিভাবে এই কাজটি করে থাকেন । বাবা মাকে দেখে শিশু এক সময় নিজেও শিখে যাবে। শিশুকে বয়স অনুযায়ী খেলার মাধ্যমে, কথা বলে বোঝাতে হবে। তার প্রিয় খেলনা কোনটি, সেটি কিনতে হলে তাকে কিভাবে সঞ্চয় করতে হবে , এক্ষেত্রে আপনিও তাকে সাহায্য করবেন, বিষয়গুলো জানাতে পারেন। উৎসাহ দিতে পারেন। শিশু কোথায় বেড়াতে যেতে পছন্দ করে তা ভিজুয়ালাইজ করে তাকে উদ্যোগী করতে পারেন সেখানে যাওয়ার জন্য সেও যাতে কিছু সঞ্চয় করে এই ব্যাপারে। এভাবেই বুঝিয়ে , উৎসাহ দিয়ে , ব্যাঙ্ক কিংবা এরকম কিছু উপহার দিয়ে তাকে শেখানো যায় ফিনান্সিয়াল লিটারেসির মতো এই প্রয়োজনীয় বিষয়টি।

রেগে যাবেন না

আমি দেখেছি, সব টোডলারদের (২-৩ বছরের বাচ্চারা) মধ্যে সরি না বলতে চাওয়ার, প্রবণতা থাকে। অনেক পেরেন্ট জোর করে সরি বলাই,যা একদমই অনুচিত। তাহলে কি করব? সরি শব্দকে তার জন্য সহজ করে দিন। কিভাবে? সারাদিনে ছোটো ছেটো তো কত্ত ভুল আপনি ও করেন, তাই নিজে সরি বলার অভ্যাস গড়ে তুলুন। যেমনঃ সে হয়ত বলেছে আজ পাস্তা খাবে আপনি ভুলে ভাত খেতে দিয়েছেন , বাচ্চা এটা দেখে আপ্সেট হবে স্বাভাবিক, আপনি এজন্য তাকে সরি বলুন এবং পরের খাবারে তাকে পাস্তায় বানিয়ে দিন। এতে সে, এক, সরি একটা সহজ শব্দ এবং এটা বলতে লজ্জা পাবার কিছু নাই, তা শিখবে। দুই, আপনি যখন পরের খাবারের সময় তার পছন্দর খাবার দিবেন,তাহলে সে বুজবে, ভুল করলে শুধু সরি বললেই হবেনা, ভুল টাও শুধরাতে হয়। মানুষ, বিশেষ করে মেয়েরা অনেক সময় প্রিয় মানুষের সাথে অনুযোগ করতে পছন্দ করে। এটা আসলে রাগ নয়, এক ধরনের অনুরাগ বলতে পারেন। একে সিরিয়াস ভেবে রেগে যাবেন না।

সন্তানকে কৌশলে শেখানো

সন্তানের ভুল শোধরাতে প্রত্যেক মা-বাবারই নিজস্ব কিছু কৌশল থাকে। এক এক পিতা-মাতা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। তবে কোনোটিই যদি ঠিকমতো কাজ না করে, তাহলে বুঝতে হবে সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত কিছু ভুল হচ্ছে। সন্তানকে নিয়মানুবর্তিতা শেখানোর ক্ষেত্রে মা-বাবার ভুল দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি করা। 

লোকের সামনে বকাঝকা না করা

আপনি হয়তো কোনো শপিংমলে গিয়েছেন, আর আপনার শিশুটি তার জুসের প্যাকেট মাটিতে ফেলে দিয়েছে। আপনি তখন কী করবেন? অনেক মা-বাবাই এ ক্ষেত্রে শিশুকে সবার সামনে বকাঝকা করতে শুরু করেন। এতে শিশুটি ভীষণ অপমানিত বোধ করে এবং মনে আঘাত পায়। শিশুর প্রতি আপনার এই বিরূপ আচরণের কারণে পরবর্তী সময়ে সে হয়তো আপনাকে আর মানতে চাইবে না। এ ধরনের অবস্থায় এভাবে বকাঝকা না করে শিশুটি একা হওয়ার পর তাকে বুঝিয়ে বলুন এবং এসব বিষয়ে আরো সচেতন হওয়ার জন্য অনুরোধ করুন।

বেশি প্রতিক্রিয়া না দেখানো

আপনার সন্তানটি হয়তো ভুলে আপনার কানের দুল টয়লেটে ফেলে দিয়েছে এবং আপনি তার কথা শোনার আগেই তাকে ভীষণভাবে মারতে শুরু করে দিলেন। এ রকমভাবে সব বিষয়েই যদি আপনি তাকে খুব বকাঝকা শুরু করেন, তাহলে কিন্তু আপনার প্রতি তার একটি ভয় জন্মাবে এবং আপনাদের সম্পর্ক নষ্ট হবে। আর সন্তান কোনো কিছু নষ্ট করে ফেললে তো তেমন কিছু করার থাকে না। তাই না? তাই খুব বেশি প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে এমনটি যাতে আর না করে, সে বিষয়ে তাকে সতর্ক করে দিন। ধীরে ধীরে বোঝাতে থাকলে সে হয়তো একসময় ভুলটা ঠিকই বুঝবে। 

আত্মনির্ভরতা শেখানো

ধরুন আপনি অসুস্থ। এদিকে কারেন্ট বিল দেয়ার আজকেই শেষ দিন। আজকে বিল না দিলে লাইন কেটে দেবে। এখন উপায়? ঘরে অবশ্য আপনার উঠতি বয়সী সন্তান আছে, কিন্তু সে জানেই না ব্যাংক কোথায়, ব্যাংকে গিয়ে কী করতে হয়! অতঃপর আর কী করা! সে আরামে পায়ের ওপর পা তুলে গেম খেলতে লাগলো, কেঁদে কঁকিয়ে সেই আপনাকেই যেতে হল ব্যাংকে। এমন অবস্থা থেকে পরিত্রাণ সম্ভব, যদি ছোটবেলা থেকেই আপনার সন্তানকে শেখান কিছু লাইফ স্কিল, শেখান আত্মনির্ভরতা! আসুন জেনে নেয়া যাক বিভিন্ন বয়সে কোন কোন ব্যাপারগুলি শিখিয়ে রাখতে হবে।
২-৩ বছরঃ নিজের টুকটাক কাজ করতে জানার বয়স । এই বয়সে নিজের টুকটাক কাজ সন্তানের করতে পারা উচিত। যেমন- নিজের খেলনা নিয়েকে গুছিয়ে রাখতে শেখা। আপনার হালকা সাহায্য নিয়ে নিজের কাপড় নিজেই পরতে পারা। নিজের জামা নিজেই খুলতে পারা।
নিজের হাতে খেতে পারা। নিজে নিজেই দাঁত ব্রাশ করতে শেখা।
৪-৫ বছরঃ গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ তথ্য মনে রাখা ও টুকটাক নিজের কাজ শেখার বয়স। যেমন- নিজের পুরো নাম, বাসার ঠিকানা ও ফোন নাম্বার মনে রাখতে পারা। আপনার সাথে টুকটাক ঘর পরিষ্কারের কাজে সাহায্য করতে পারা। টাকা চেনা। টাকার সাধারণ ব্যবহার ও মূল্য বুঝতে শেখা। কোন সাহায্য ছাড়া ব্রাশ করতে জানা, মুখ পরিষ্কার করতে জানা, নিজের চুল নিজে আচড়ানো শেখা। নিজের ভালো জামা ও ময়লা জামা আলাদা করতে জানা। নিজের জামা নিজে পছন্দ করে পরতে পারা। স্কুলে যেতে কোনটা পরবে, বিকেলে খেলতে গেলে কোনটা পরবে এই সাধারণ জ্ঞানও যেন এই সময়ে থাকে।
৬-৭ বছরঃ টুকটাক রান্না বান্নার কাজ শিখতে পারার বয়স। যেমন- রান্নার কাটাকুটির কাজ করতে পারা। টুকটাক কিছু খাবার বানানো শিখতে পারা। বাসার পাশের দোকান থেকে টুকটাক মুদিপণ্য কেনাকাটা করতে পারা। নিজে নিজেই টুকটাক ঘর পরিষ্কারের কাজ করতে পারা।
সাহায্য ছাড়াই নিজের বিছানা গোছানো শেখা। নিজের পড়ার টেবিল নিজে নিজে গুছিয়ে রাখা। নিজে নিজেই সম্পূর্ণভাবে গোসল করতে পারা ও নিজেই নিজের কাপড় ধুতে পারা।
৮-৯ বছরঃ দায়িত্বশীলতার সাথে পরিচিত হওয়ার বয়স। যেমন-নিজের কাপড় নিজেই ভাঁজ করে রাখতে পারা। নিজের কাপড় নিজে আয়রন করার স্কিলের সাথে পরিচিত করতে পারেন এই সময়ে। নিজ দায়িত্বে নিজের সকল খেলনার ও ব্যক্তিগত জিনিসের যত্ন নিতে শেখা।
ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা ও সচেতন থাকতে শেখা। নিজে নিজেই রেসিপি সহ সহজ কিছু রান্নার আইটেম তৈরি করতে পারা। পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হতে শেখা।
১০-১৩ বছরঃ স্বাধীন সত্তার সাথে পরিচয় হওয়ার বয়স। যেমন- বাসায় একা থাকতে পারার স্কিল এই সময়ে অর্জন করে ফেলা উচিত। নিজের কেনাকাটা নিজে যেন করতে পারে। বাসায় ওয়াশিং মেশিন, ইস্ত্রি ও ঘরের অন্যান্য যন্ত্রপাতির ব্যবহার জানা। ছোট ভাই-বোন থাকলে তার যত্ন নিতে পারা, তাকে দেখভাল করতে পারা জানা উচিত এই বয়সে। নিজ দায়িত্বে স্কুলের সময়ে প্রস্তুত হয়ে নেওয়া। নিজের স্কুল, কোচিং কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে রুটিন মাফিক কাজ করতে পারার স্কিল গড়ে ওঠা। এই সময়ে তাকে পারিবারিক ছোট খাটো কোন প্রোগ্রামের ম্যানেজারের দায়িত্বটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন।
১৪-১৭ বছরঃ আত্মনির্ভরশীলতার সাথে চলার বয়স- ১৪-১৮ বছর বয়সে ধীরে ধীরে আপনার সন্তানের আত্মনির্ভশীলতাকে আরো বাড়িয়ে নিতে হবে। এই সময়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারার দিকে নজর দিতে পারেন। একই সাথে নিজের যে কোন কাজ নিজে নিজে করতে পারা ও প্রতিটি কাজের গুরুত্ব বুঝতে শেখার দিকেও মনোযোগ দেয়া উচিত। এ সময়ে তার চারপাশের পরিবেশের প্রতি তার দায়িত্বের ব্যাপারেও তাকে আপনি সচেতন করতে পারেন।
সূত্র: পিতৃত্ব

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *