অফিস পলিটিক্সের সাতকাহন

অফিস পলিটিক্স কাজের জায়গায় বিষাক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। অন্যের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারে লিপ্ত হওয়াটা এক ধরনের নেতিবাচক আচরণ, অনর্থক কার্যকলাপ ও ক্ষতিগ্রস্ত মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। সম্পদ, প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার জন্য কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক আচরণ ও কাজগুলাই অফিস পলিটিক্স।

অফিস পলিটিক্স কেন?

কর্মরতরা অফিস পলিটিক্সে লিপ্ত থাকেন- আলাদা সুযোগ গ্রহণের জন্য, বিশেষ সুবিধা ও মনোযোগ লাভের উদ্দেশ্যে, প্রমোশনের জন্য, বেতন-ভাতা বৃদ্ধির জন্য, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবহারের জন্য, তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের জন্য, অন্যকে প্রভাবিত করার সুযাগের জন্য, বৃহত্তর পরিমণ্ডলে ক্ষমতা ও প্রভাবকে বিস্তৃত করে প্রতিপত্তি বাড়ানোর জন্য, প্রতিপক্ষকে কাবু করার জন্য, পছন্দের ব্যক্তির পজিটিভ ইমেজ তৈরির জন্য এবং অপছন্দের ব্যক্তির নেগেটিভ ভাবমূর্তি তৈরির জন্য।

অফিস পলিটিক্স মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে- অল্প পরিশ্রমে বেশি সুবিধা লাভের জন্য চেষ্টা করায়, অল্প সময়ের মধ্যে নিজের সামর্থ্যের অতিরিক্ত কোন কিছু অর্জনে সচেষ্ট হওয়ায়, প্রতিষ্ঠানের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান ব্যবস্থায়, অতিরিক্ত পরিমাণে একে অন্যের সমালোচনা করায়, অতিরিক্ত মাত্রার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ থাকায়, কর্মীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হওয়ায়, অন্যের কাজে নাক গলানোয়, স্বজনপ্রীতির পরিবেশে, কর্মরতদের একে অন্যের প্রতি ঈর্ষায়, কর্মীদের কাজের অসম মূল্যায়নে, নিজের পজিশন-কে অতিরিক্ত প্রায়োরিটি দিয়ে অন্যদের ছোট করে দেখে তাদের পেছনে লাগায় এবং নিজের স্বার্থে সকলের মধ্যে কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরি করায়।

অফিস পলিটিক্সের প্রভাব

অফিস পলিটিক্স প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে যা তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সংঘাত তৈরি করে। অফিস পলিটিক্সের পরিবেশ সৃষ্টি হলে একজন আরেকজনের ব্যাপারে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করার অভিযোগ করেন। কোনো কিছু জানা প্রয়োজন হলেও সহকর্মীকে অপছন্দ করার কারণে প্রশ্ন করেন না। অফিস পলিটিক্স কতটা খারাপ হবে তা নির্ভর করে জড়িতদের চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর!

অফিস পলিটিক্স এড়াতে

অফিস পলিটিক্স ডিল করতে হলে- অফিস রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করতে হয়, এনালাইসিস করতে হয় এবং সমাধানের উপায় বের করতে হয়, শক্ত সিদ্ধান্তও নিতে হয়। সাধু সাজলে বা ধোয়া তুলসীপাতা হলেই অফিস পলিটিক্সে জড়ানো লোকদেরকে সব সময় এড়িয়ে চলা যায় না। এধরনের অবস্থার সম্মুখীন হলে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হয়, ফাঁদে না পরে বাঁচতে হয় ।

কিছু লোকের রাজনৈতিক গতিবেগ লক্ষ্য করা কষ্টকর হলেও প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়। রেপুটেশন ভালো এমন সফল ব্যক্তিরা কি করে তা ফলো করতে হয়, মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং থেকে বাঁচতে কমিউনিকেশন স্কিল ভালো হতে হয়, নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য শুনেও তা পজিটিভলি নিয়ে নিজেকে ইম্প্রুভ করার জন্য কাজে লেগে পড়তে হয়; এতে অফিসে খারাপ পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া থেকে বেঁচে যাওয়া যায়।

অফিস পলিটিক্স এড়াতে- অনেকে কলিগদের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করে, পাওয়ারফুল ব্যাক্তিদের সাথে এক্সট্রা খাতির রাখে, বন্ধু নির্বাচনে সচেতন থাকে, ইগো ত্যাগ করে, বিনয়ী হয় এবং দায়িত্বশীল হয়। অন্যের কাজের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। নিজের কাজ যথাসময়ে শেষ করেন। হেল্পফুল মানসিকতা নিয়ে অন্যকে তার কাজ করতে সহযোগিতা করেন। অন্যের পছন্দের মানুষ হন। সব সময় হাসিমুখে থাকেন। কম কথা বলার অভ্যাস করেন। সিনিয়রদের সাথে বাকবিতন্ডায় যান না। পার্সোনাল ইস্যু নিয়ে গল্প করেন না। রসালো সমালোচনা থেকে দূরে থাকেন।

অফিস পলিটিক্সের লাভ-ক্ষতি

সাধারণ ও সরল মনের মানুষেরা কর্মক্ষেত্রকে ফেয়ার ও পলিটিক্সমুক্ত মনে করে। ব্যত্যয়কে দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যবশত বলে মনে সান্ত্বনা খোঁজেন। তবে দৃশ্যমান ঘটনাবলির আড়ালে অফিস পলিটিক্সে জড়িতরা স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রতিষ্ঠানের সম্পদ এবং তথ্যপ্রবাহকে নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করতে কুটিলতার আশ্রয় নেন। প্রতিষ্ঠানের ভালো-মন্দের প্রতি ফোকাস না করে নিজেদের ফায়দা লুটেন।

অফিস পলিটিক্সের ভালো-খারাপ নির্ভর করে সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্যের ওপর, তাদের পারস্পরিক মেলামেশার প্যাটার্নের ওপর। ব্যক্তিস্বার্থের জন্য লালায়িত হলে অফিস পলিটিক্স ক্ষতিকর উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠানের কালচার ও উৎপাদনশীলতাকে নষ্ট করে ফেলে। স্বার্থসিদ্ধির জন্য দল ভারী করা, একটি ইস্যুকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া, তাদের লক্ষ্যপূরণে হাতিয়ার হিসেবে সরল মানুষদেরও কাজ করা পরিস্থিতি খারাপ করে ফেলে।

অফিস পলিটিক্স সাধারণত তাদেরই বেশি ক্ষতি করে যারা কূটনৈতিকভাবে অন্যদের তুলনায় দুর্বল। ষড়যন্ত্রের শিকার হয় নিরীহরাই। দৃশ্যত মনে হতে পারে অফিস পলিটিক্সের কারণে অনেকে সুবিধাজনক পর্যায়ে পৌছে যায়। তবে নিজের কাজে সেরা হয়ে উঠলে পারফরমেন্সও পলেটিক্স ছাড়াও টিকে থাকার নিশ্চয়তা তৈরি করে। লৈখিক ও মৌখিক কথাবার্তা বেশ স্মার্ট হলে, যোগাযোগ স্থাপনে দক্ষ হলে তা কিছুটা নিরাপত্তার দেয়াল তৈরি করবে।

অফিস পলিটিক্সের ভূমিকা

প্রতিষ্ঠানের স্ট্র্যাটেজি তৈরি, বার্ষিক বাজেট প্রক্রিয়া, পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং সাংগঠনিক নেতৃত্বের ধরনের ক্ষেত্রে অফিস পলিটিক্স ভূমিকা রাখে । সম্পৃক্তরা প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্যের প্রবাহকে পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত, পরিচালিত ও সংরক্ষিত করেন। অনেকের কাছে অফিস পলিটিকস এমন একটি খেলার মতো; যা সহকর্মীদের সঙ্গে সহকর্মীকে অথবা সাধারণের সঙ্গে উর্ধ্বতনদেরও সম্পৃক্ত করে ।

অফিস পলিটিক্স এর প্রভাব অত্যন্ত ক্ষতিকর; যা প্রতিষ্ঠানের জন্য ভয়ংকর ব্যাপার। কর্মীরা অন্যের ক্ষতি সাধন করতেই ব্যস্ত থাকলে তাদের কাজে মনোযোগে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়, সার্বিক উৎপাদন ও উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে, কর্মীদের মধ্যকার নেতিবাচক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠানে নেতিবাচক পরিবেশের সৃষ্টি করে। দলীয় কাজ পিছিয়ে পড়ায় প্রতিষ্ঠানও এগিয়ে যেতে পারে না, কাজও সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা সম্ভব হয় না।

অফিস পলিটিক্সের ফলাফল

অফিস পলিটিক্স নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে, পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করে, কাজের যথাযথ মূল্যায়নের অভাব দেখা দেয়, কর্মীদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করে, প্রতিষ্ঠানের কাজে অনীহা বৃদ্ধি পায়, কাজের চেয়ে অকাজে মনোযোগ চলে যায়, ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে দুশ্চিন্তা অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করে এবং একে অন্যকে বিশ্বাস করতে পারে না।

অফিস পলিটিক্সের শিকার হলে অনেকসময় নবীন, প্রতিভাবান ও যোগ্য কর্মীর ক্যারিয়ার ও পার্সোনাল লাইফ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সিনিয়র কর্মীও ভুক্তভোগী হয়। তারপরও প্রতিক্রিয়া দেখাতে যতটা সম্ভব নিজেকে সংযত রাখতে হয়। কর্পোরেট কার্লচার মেনে তর্ক না করে ভদ্রতার সাথে বিষয়টি নজরে আনতে হয়।

অফিস পলিটিক্স থেকে সুরক্ষা

অফিস পলিটিক্স থেকে সুরক্ষায়- অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্ব-সংঘাত থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকতে হবে। অন্যের কাজে নাক না গলিয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দিতে হবে। সবসময় অন্যের কাজের ভুল না ধরে প্রশংসাও করতে হবে, সৎ থাকতে হবে, নিজের কাজে সবসময় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।

অপ্রয়োজনীয় কিছুতে প্রতিক্রিয়া দেখানো বন্ধ করতে হবে। অন্যের ব্যক্তিগত ফাইল বা তথ্যে হস্তক্ষেপ না করা, অন্যের বিরুদ্ধে গুজব না ছড়ানো, নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করে তাতে মনোযোগ ধরে রাখা, নিজের কাজকে উপভোগ করা এবং সবসময় নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যের ব্যক্তিগত সমস্যায় নিজে যুক্ত হওয়া, কমেন্ট করা, মতামত দেয়া বা ঘাটাঘাটি করা উচিৎ নয়। গুজব ছড়ানোর বদ অভ্যাস থাকলে তাদের সঙ্গ এড়িয়ে চলতে হয়। অফিসে মেজাজ গরম না করে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। অফিস পলিটিক্স এমন এক ঝামেলা যা সামলাতে না পারলে কারো কারো চাকরিও চলে যায়।

তাই ঝামেলার কারণ বোঝতে হয়, পরিস্থিতিকে মেনে নিতেও শিখতে হয়, কারো পক্ষ না নিয়ে নিরপেক্ষ থাকতে হয়, কোনো এক পক্ষের হয়ে কথা বলা এড়াতে হয়। কারণ ভুল মানুষের পক্ষে আপনার সমর্থন অন্যের ক্ষতির কারণ হতে পারে। কোনো বিষয় ব্যক্তিগত ভাবতে হয় না, নিজের কাঁধে নিতে হয় না, ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিতে হয় না; বুদ্ধি করে এড়িয়ে যেতে হয়। রাগ করে ই-মেইল পাঠাতে হয় না; কারণ তা কর্তৃপক্ষের কাছে চলে যেতে পারে।

অফিস পলিটিক্স বন্ধের কৌশল

অফিস পলিটিক্স ব্যক্তির ক্যারিয়ার উন্নয়নেও বাধা সৃষ্টি করে। ব্যবসায় সফল হতে কর্মীদের মধ্যে সুষ্ঠু প্রতিযোগীতার পরিবেশ তৈরি করে বন্ধ করতে হবে অফিস পলিটিক্স। এজন্য ব্যবস্থাপককে হতে হবে চটপটে, সত্যবাদী, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সতর্ক, নৈতিকভাবে পজেটিভ এবং সব পরিস্থিতি মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা সম্পন্ন। নানা রকমের মানুষকে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকতে হবে। সকলকে ভিন্নভিন্ন কৌশলে আস্থায় আনতে হবে; যাতে কোনোভাবেই পলিটিক্স শুরু হয়ে যেতে না পারে।

অফিস পলিটিক্স বন্ধ করতে হলে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও দীর্ঘ মেয়াদে চিন্তা-ভাবনা দরকার। অন্যদের প্রত্যাশার বিষয়ে অবহিত থাকতে হয়। সহজভাবে সবকিছু উপস্থাপন করতে হয়। অন্যদের মতামত গুরুত্বের সাথে নিয়ে নিজের উপর আস্থা বাড়াতে হয়। খারাপ আচারণ করলেও আন্তরিকতার সাথে আলাপ করতে হয়। পরিমিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিতে হয়। কাজ শিখতে সহায়তা করতে হয়। ভুল করলে সবার সামনে ঝাড়ি না দিয়ে শেখার সুযোগ করে দিতে হয়। কর্মী না ভেবে সহকর্মী ভেবে প্রতিষ্ঠানের প্রতি ভালোবাসা বাড়াতে হয়।

পলিটিক্সমুক্ত অফিস যেভাবে

পলিটিক্সমুক্ত অফিসের জন্য- দক্ষতার সাথে ভালো কাজ করলে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হয়, প্রশংসা করে কাজের স্পৃহা বাড়াতে হয়। সুন্দরভাবে বোঝায়ে অপ্রয়োজনীয় সময় নষ্ট করার বাজে প্রবণতা বন্ধ করতে হয়। বিপদে-আপদে সহকর্মীদের প্রতি দয়ালু হতে হয়। উর্ধ্বতনদের অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হয়। কাজের প্রতি ভালোবাসা বাড়াতে সফলতা ও স্বপ্নের কথা শেয়ার করতে হয়।

অফিস পলিটিক্সে জড়িতরা প্যাঁচে ফেলতে চাইলে দক্ষতার সাথে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়! অফিসের ক্যাফেটেরিয়ায় কানাঘুঁষো চলে! গোল টেবিল বসিয়ে কাপে কফি নিয়ে চলা গসিপে হাঁড়ির খবর বের হয়! অফিসের অন্দরে কী চলে সে খবর ডেস্কে বসে পাওয়া যায় না!
অফিস পলিটিক্সের শিকার না হতে চাইলে- সহকর্মীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক দরকার। নিজের সম্পর্কে অন্যদের ভাবনাও জানা দরকার। অনেকে হালকা মজা করে সম্পর্ক ভালো করে তথ্য পায়। অনেকে সিনিয়রদের তেল লাগায়! অনেকে তেলবাজি আর লবিবাজিতে ব্যস্ত থাকেন! অনেকে অন্যদের চালনা করতে ভালোবাসেন এমন নিয়ন্ত্রক সহকর্মীর সঙ্গে ব্যালেন্স করে চলেন!

অফিসে অশান্তি এড়াতে হলে কেউ মাত্রা ছাড়ালে তার ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করা যাবে না। কারণ নিত্যদিনের অফিস পলিটিক্স আর কূট-কচালিতে নাস্তানাবুদ হয়ে তাদের সঙ্গেই বেশ কয়েক ঘণ্টা কাটানো যন্ত্রণাদায়ক। তাই নোংরা অফিস পলিটিক্সে কোনঠাসা হওয়া থেকে বাঁচতে সচেষ্ট থাকুন।

অফিস রাজনীতির শিকার

প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিক তথা অর্থনীতিবিদ চাণক্যের কথায়, নিজের কাছে সৎ থাকাটাই জরুরি। কিন্তু আপনার সততা যদি আপনার দুর্বলতা ভেবে বসে কেউ তবে আপনি রাজনীতির শিকার হবেন। চোখ কান খোলা রাখতে হবে প্রতিটি পদক্ষেপে। বিশ্লেষণ করে পথ এগোনো মানেই আপনি খারাপ কাজ করছেন তা নয়।

অফিস পলিটিক্সের শিকার হলে- টিটকিরি, নোংরা কথা আর হাসাহাসি মানসিক চাপ বাড়ায়। কেউ কেউ পালিয়ে না গিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে জটিলতার মোকাবিলা করেন। কষ্ট দেয়ার জন্য খারাপ আচরণগুলো করা হলেও নিজের মতো থাকেন। যে যাই বলুক না কেন পাত্তা দেন না। তাদের কার্যকলাপ দেখে-শুনে-বুঝেও চুপ করে থাকেন!

আসল দোষীকে খুঁজে বের করতে না পারলে, আসল শত্রুকে চিনতে না পারলে পুন পুন ঝামেলায় পড়তে হয়। কেউ ক্ষতি করতে চাইলে তার কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হয়, নিজের বিষয়গুলো তাকে জানানো বন্ধ করতে হয় এবং অফিসের কাজগুলোও তার সঙ্গে না করাই ভালো। কেউ ভুল করলেই তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভুল করা যাবে না। আপনি যা করছেন তা অন্যদের বুঝতে দিন, নতুবা আশপাশের ব্যক্তিরা ধরে নেবে কিছু করছেন না।

অফিস পলিটিক্স থেকে বাঁচার উপায়

অনেকে অফিস পলিটিক্স থেকে বাঁচতে- কথা কম বলেন। বেশী করে কথা শুনেন। কোনকিছুতেই না বলেন না। বসের চামচামি করেন। তেল মারেন। শত্রুকে বড় পিড়ি দেন। আবার অনেকে- নিজের কাজটি ভালোভাবে করেন। মার্জিত ভাষায় কথা বলেন। সততা, নীরবতা আর মৃদু হাসির চেষ্টা করেন। নিজেকে সবসময় নিষ্টাবান ও ঝুকিমুক্ত মনে করেন। হাসিমুখে কথা আর ভালোবাসা দিয়ে মন জয় করেন।

নিজের শক্তিশালী অবস্থান তৈরী করেন। নিজের দুঃসময়ে পক্ষে কথা বলার মানুষ তৈরী করেন। নিজের কাজটিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেন। অন্যকে যথাসম্ভব সাহায্য করেন। রাজনীতি নিয়ে কথা হলে নিরব থাকেন। তারা মনে করেন- কাজ ভালো জানলে ও করলে কেউ ক্ষতি করতে পারে না। তেল মেরে ক্ষমতা পাওয়া গেলেও কাজ জানা না থাকলে তা ধরে রাখা যায় না।

মনে রাখতে হবে- অন্যদের প্রতি সম্মান ও মানবিকতাবোধ সম্পর্ক এগিয়ে নেয়। ব্যর্থতার পেছনে অন্যের দোষ না থাকলে বিষয়টি নিয়ে অন্যদের বিরক্ত করার মানে হয় না। সামান্য ত্রুটির জন্য সম্পূর্ণ কাজ ভণ্ডুল হয়ে যেতে পারে। কোনো প্রশ্ন করার কারণ কিংবা উদ্দেশ্য না জেনে উত্তর দেয়া ঠিক না। নিজের মূল্য নিজেকে জানতে হয়। শুধু প্রয়োজনীয় বিষয়ে সংক্ষিপ্ত মিটিং করতে হয়। পরচর্চা না করে যা বলা উচিত তাই বলতে হয়। একে অন্যের প্রতি ঈর্ষা ছড়ানো ছাড়তে হয়।

ঝামেলা এড়াতে অফিসের সবার সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখতে হয়। কারো সঙ্গেই ইচ্ছাকৃত খারাপ ব্যবহার করা ঠিক না। ভালো ব্যবহার করলে প্রতিপক্ষ সৃষ্টি হয় না। কথা কাটাকাটি বা মনোমালিন্য হলে বসকে জানিয়ে রাখুন। অধীনস্থদের সুযোগ-সুবিধা জেনে তাদের যৌক্তিক দাবি কর্তৃপক্ষের সামনে পেশ করুন। অফিসে সবসময় সময় মতো আসুন। জরুরি কাজ আগেই সেরে ফেলুন। কাজ দিয়েই নিজেকে প্রমাণ করে যোগ্যদের তালিকাতে ঢুকুন। সাধারণত লক্ষ্য পূরণে সফল হলেও ভালো পজিশন অর্জন করা যায়।

অফিস পলিটিক্সে নোংরামি

অফিস পলিটিক্সের শিকার হলে অনেকের জন্যই কাজ করা কঠিন হয়ে উঠে। হয়তো কাজ ভালো পারে, কাজে বেশ অভিজ্ঞতাও আছে, বসও খুব ভালো জানে, বড় বড় কাজের দায়িত্বও পান! তাকে দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকেন, নির্ভরতাও পান! অথচ কিছু সহকর্মী ভালো পারফর্মেন্সকে ভালোভাবে নিতে পারেন না। নানাভাবে ক্ষতি করার চেষ্টা করে। কোনোদিন ড্রয়ারের চাবি হারায়! কোনোদিন জরুরি ফাইল টেবিলের ওপর থেকে হাওয়া হয়ে যায়!

অফিস পলিটিক্স এমন যে- নিজের অফিসেই ইমেল হ্যাক হবার ঘটনা ঘটে। কর্মস্থলেই ওঁত পেতে থাকে সাইবার দস্যু। নজরদারি চালানো হয় ব্যক্তিগত এবং পেশাদারি নথিতে। অফিস পলিটিক্স গভীরতর ষড়যন্ত্রেও রূপ নেয়। বিনাদোষেও চাকরি ছাড়তে হয়।

অফিস পলিটিক্সের ফাঁদ

অফিসিয়াল এটিকেট জানা না থাকায় ফাঁদে পা দিয়ে কেউ কেউ ঝগড়া করেন, রেগে যান, চাকরি করা সম্ভব নয় জানান, ভালো ভালো জব অফার আছে বলেন এবং অযৌক্তিক কথা বলেন। আপত্তিকর কোনো কথা শুনলে চিৎকার করেন, প্রতিবাদ জানান! অনেকে অন্যরা ক্ষতি করলে ঠেকানোর চেষ্টা করলেও নতুন করে জটিলতা তৈরি করা এড়াতে তাদের ক্ষতি করতে যান না!

অপদস্থ করলেও ঠাণ্ডা মাথায় ভদ্রতা বজায় রেখে সহকর্মীকে কথা বলাতেই কল্যাণ। তবে বেমালুম ঘটনা চেপে না গিয়ে পরিস্থিতি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করাতে আলোচনা বা সুন্দর ভাষায় ই-মেইল করা যেতে পারে। কাজের জায়গায় এ ধরনের আচরণ কারোরই করা ঠিক নয় এবং এটা অফিসের কাজের পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে বলা যেতে পারে।

বিপক্ষে দল পাকানোর চেষ্টায় সবার সঙ্গে নিজের বিষয় শেয়ার করা ঠিক না। কাজে সহযোগিতা চাইলে কষ্ট হলেও মন থেকেই সহযোগিতা করলে অনেক সময় ভুল ধারণা ভেঙে যায়। সেক্ষেত্রে বিরক্তি, রাগ, কষ্ট এসবের ছাপ চেহারায় ফুটিয়ে না তুলে স্বাভাবিক আচরণ করতে হয়। হীনম্মন্যতায় না ভুগে নিজের কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হয়। নিজের কাজগুলো এমন ভালোভাবে করতে হয়, যাতে কেউ কোনো খুঁত ধরতে না পারে। সৃজনশীল হয়ে কাজে আনতে হয় নতুন মাত্রা।

অফিস রাজনীতির নানা দিক

অনেক সময় চাকরি টিকিয়ে রাখতে হলে অফিস রাজনীতিতেও ঝানু হতে হয়! কারণ রাজনীতির লড়াইটা অনেক অফিসে হয় দ্বিমুখী, অনেক অফিসে হয় ত্রিমুখী। অফিস রাজনীতির ঘ্রাণ অনেকের নাকেই লাগে। খুব হাসি মুখে পেটে কীভাবে ছুরি চালিয়ে দিতে হয় সেই হিসাবটা করপোরেট দুনিয়ার অনেকেই জানে। কর্মক্ষেত্রে কূট রাজনীতি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান যাদের তাদেরও সাবধান থাকতে হয়। যেসব কর্মস্থলে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো গোপন মাইন পাতা থাকে সেখানে খুব সাবধানে পা ফেলতে হয় যাতে পা ফসকে না যায়!

অফিস পলিটিক্সের উৎপত্তি

ছোট একটা মনোমালিণ্য কর্ম পরিবেশে স্থায়ী শত্রু তৈরি করে দিতে পারে, যে অগোচরেই হয়ত ভুল ধরার কাজে সব সময় নিয়োজিত হয়ে যাবে। কোনো কলিগ কাজে ফাকি দিলে তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বুঝবে, আপনার অযাচিত পেরেশান না হলেও চলবে! অন্যকে নিয়ে ভেবে নিজের কাজের কোয়ালিটি কমানোর দরকার নাই। কেউ কেউ অন্যের কাজের ভুল খুঁজে নিজে হিরো হতে এবং অন্য কলিগদের সাথে আড্ডাতে তা বলে নিজেকে বড় প্রমাণ করতে।

কিছু লোক থাকে যারা পরিশ্রম ছাড়াই অন্যের উপর ভর করে বা উপর মহলে তোষামোদ করে উপরে উঠতে পলিটিক্স শুরু করে। ফলে কোম্পানিতে অফিস পলিটিক্স আছে, ছিল এবং থাকবে। কোম্পানি যত বড়, পলিটিক্সও তত বেশি। তবে কর্তাদের অফিস পলিটিক্স ম্যানেজ করতে হবে। পরস্পর বিরোধিতার মানসিকতা নয়, সহ-অবস্থানের মানসিকতা দরকার হবে।

সাধারণত অনেকে অপেক্ষাকৃত ভালো থাকার আশায় অফিস পলিটিক্সের আশ্রয় নেন। অমুক বেশি ভালো করে ফেলল, এই বুঝি আমার চাকরিটা চলে যাবে- এই সকল ভয় থেকেও অফিস পলিটিক্স শুরু হয়। সুফলটা নিজের পক্ষে নেয়ার জন্য, অন্যের ভালো দেখতে না পারায়, ক্ষমতার অপব্যাবহার করায়, একজনের কাজের ক্রেডিট আরেকজনে নিয়ে নিলে- অফিস পলিটক্স মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

অফিস পলিটিক্সে ঠিক-বেঠিক

অফিস পলিটিক্সের শিকার হলে তার দিকে অনেকেই বাঁকা চোখে তাকায়, অন্দরমহলে চারদিকে বাজে ফিসফাস শুরু হয়। তাই অফিসে সুসম্পর্ক গড়ে উঠলেও অফিসিয়াল কাজের বিষয়ে কাউকে ভরসা করবে না, বিশ্বাস করবেন না। কারণ গলদ থাকলে দিন শেষে দায়ভার নিতে হবে আপনাকেই। নিজের কাজ নিজে করবেন। খেয়াল রাখবেন- আপনার ভালো কাজের ক্রেডিট অন্য কেউ নিয়ে যাচ্ছে কি না, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি-না কিংবা যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন কি না । খুব কঠোর থাকা বা খুব নরম থাকা; কোনোটিই ঠিক না।

কর্পোরেট জগতে কর্পোরেট পলিটিক্স

কর্পোরেট জগতে একে অন্যকে ঘায়েল করতে কর্পোরেট পলিটিক্স চলে। দক্ষ ও মেধাবী একজন কঠোর পরিশ্রম সত্ত্বেও চাটুকারের ঈর্ষার শিকার হওয়ায় বছর শেষে পদোন্নতি পায় না। আরেক চাটুকার অদক্ষ হয়েও চামচামি করে পদোন্নতি পেয়ে যায়। আরেকজন সহকর্মীকে ভুল করতে দেন এবং পরে বসের কাছে গিয়ে তার ভুলটি প্রকাশ করে সংশোধনের করার কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেরা কর্মীরাই বেশি রাজনীতির সম্মুখীন হন।

অফিস পলিটিক্সের ব্যবচ্ছেদ

এমন অনেকে থাকেন- যারা অফিসের কাজ কিছুই পারে না। কাজ শিখতেও চান না। তবে বড় বড় কথা বলে এমন ভাব দেখায় যেন পুরো অফিসের কাজ শুধুমাত্র সেই করছে। অনেকের কাজ করার নূন্যতম যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা ছাড়াও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে অফিসে ঢুকে পড়েন, বেতনটাও বাড়িয়ে নেন নানান রকম ছলচাতুরী করে। সবাইকে ভালো মানুষ দেখালেও মনের কুৎসিৎ রূপটা বেখেয়ালেই অনেক সময় বের হয়ে যায়। অমানুষ নিরব ঘাতক ফাঁকিবাজ ভন্ডরা ভালো মানুষের ভান ধরে থাকে; কাজ না করে পাকনা পাকনা কথা বলে। অকারণে সুযোগ পেলেই অপছন্দের সহকর্মীকে খোচা দিয়ে কথা বলে। অবজ্ঞা করে কথা বলে।

অনর্থক কোনো বিষয়ে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়লে, পরস্পরকে দোষারোপ করলে অথবা কোনো কাজের কৃতিত্ব দাবি করলে কোনো পক্ষকে গুরুত্ব না দিয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ এবং লক্ষ্যের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কোনো একটি পক্ষ অবলম্বন না করে উভয়ের মধ্যে সাধারণ যোগাযোগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, উভয়ের বক্তব্য শুনতে হবে এবং বিচার-বিশ্লেষণ করে উভয়ের বক্তব্যের সমন্বয় করে তৃতীয় মতামত উপস্থাপন করতে হবে। এমনভাবে সমস্যাটি সমাধানের কিছু উপায় বাতলে দিতে হবে যেন কেউ নিজেকে বঞ্চিত মনে না করে। কিছু নির্দেশনা ও নিয়ম-নীতি তাদের সামনে স্পষ্ট করে তুলে ধরতে হবে।

অফিস পলিটিক্স ও বাস্তবতা

চুপ করে মাথা নিচু করে নিজের কাজ করে যাওয়া সহজ সরল ভালো ভদ্রলোকও অফিস পলিটিক্সের বলি হতে পারেন। কারণ তিনি অফিসে নিয়মিত যথাসময়ে আসায় কারা দেরী করে আসেন তার সাক্ষী হয়ে যান। সারাদিন অনেক কাজ করে বা পরিশ্রম করে বললেও কাজে ফাঁকি দেয়ার সাক্ষী থাকায় অনেক অসুবিধার কারণ হয়। পরিশ্রমী দক্ষ ভালো মানুষের বিরুদ্ধেও খারাপরা জোটবদ্ধ হতে পারে। ক্ষমতাবান মামা-চাচা না থাকলে দুষ্টদের যুগে সবচেয়ে উপযুক্ত কর্মীরও চাকরি চলে যেতে পারে।

 

About আনিসুর রহমান এরশাদ

শিকড় সন্ধানী লেখক। কৃতজ্ঞচিত্ত। কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী। ভেতরের তাগিদ থেকে লেখেন। রক্ত গরম করতে নয়, মাথা ঠাণ্ডা ও হৃদয় নরম করতে লেখেন। লেখালেখি ও সম্পাদনার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সময়ে পাক্ষিক-মাসিক-ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন, সাময়িকী, সংকলন, আঞ্চলিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ ও জাতীয় দৈনিকের সাথে সম্পর্ক। একযুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। পড়েছেন মিডিয়া ও জার্নালিজমেও। জন্ম টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার হাতীবান্ধা গ্রামে।

View all posts by আনিসুর রহমান এরশাদ →

Leave a Reply

Your email address will not be published.