সহস্রাব্দ প্রজন্মের এ টু জেড

আনিসুর রহমান এরশাদ

সহস্রাব্দ প্রজন্ম  অনেক বেশি উদার।  জলবায়ু পরিবর্তন ও তার হুমকির বিষয়ে অধিক সচেতন। এরা তথ্য বিপ্লবের যুগে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন,  যখন রোবট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্মার্ট মেশিনের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়েছে। আসলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে  আশা-আকাঙ্ক্ষা-ইচ্ছা, জীবনধারা-জীবনযাত্রা, সম্পর্ক, চিন্তা-ভাবনা, পছন্দ-অপছন্দ, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার-আসক্তি-প্রয়োগ, আচার-আচরণ ইত্যাদি বদলে যাচ্ছে।  চাহিদাতেও এসেছে নতুনত্ব। সময়ের সঙ্গে ব্যাপকভাবে বদলে যাচ্ছে  শিক্ষা, সংস্কৃতি, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সন্তানের ওপর পরিবারের প্রভাব বা পরিবারের ওপর সন্তানের প্রভাব। দেশ, সময়, স্থান, কালভেদে এই বদলে  যাওয়া হয় বিভিন্ন ধরণের-রূপের-রকমের।

সহস্রাব্দ প্রজন্মের এ টু জেড

১৯২৮-১৯৪৫ সালে জন্ম নেওয়া  প্রজন্মকে  সাইলেন্ট জেনারেশন বলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সময়কে গ্রেটেস্ট জেনারেশনের (সবচেয়ে মহৎ প্রজন্ম) সময়কাল ধরা হয়। ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম বেবি বুমারস। ১৯৬৫ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে বলা হয় জেনারেশন এক্স বা ‘বেবি বাস্ট’ বা বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তার প্রজন্ম।  ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ সাল সময়ের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে বলা হয় সহস্রাব্দ প্রজন্ম বা মিলেনিয়াল জেনারেশন বা জেনারেশন ওয়াই। পোস্ট মিলেনিয়াল যারা ১৯৯৭ এর পর জন্মেছে।১৯৯৬ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণ করা প্রজন্মটিই হলো জেনারেশন জেড। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্য যাদের জন্ম, তাদের ‘আইজেন’ বলা যায় (২০০৭ সালে আইফোন, ২০১০ সালে আইপ্যাড বাজারে আসে)।

সহস্রাব্দ প্রজন্ম কেন গুরুত্বপূর্ণ

আগের প্রজন্ম কর্মক্ষেত্র থেকে অবসরে যাওয়া শুরু করার কারণে এই প্রজন্ম সারা বিশ্বেই অর্থনীতির জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ । আগের প্রজন্ম ধীরে ধীরে স্বল্প ভোগের জীবনে চলে যাচ্ছে। তাদের চাহিদাও কমছে। যারা  চাকরির বাজারে ঢুকেছেন, তাদের চাহিদা বাড়ছে, ভোগও বাড়ছে। উদ্যোক্তাদের কাছে এই  প্রজন্ম পণ্য বিক্রি ও ব্যবসা বাড়ানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলছে।

সহস্রাব্দ প্রজন্ম সম্পদ, তাদের ওপরেই নির্ভর করছে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ। ডিজিটাল জ্ঞানে সমৃদ্ধ এবং মানবিক গুণাবলি অর্জনে যত্নশীল এই প্রজন্মই আগামী পৃথিবীর সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান অনুঘটক। যারা প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং অন্যান্য ক্ষেত্র দাবিয়ে বেড়াচ্ছে। যাদের মেধা, শ্রম ও উদ্যম যথাযথভাবে কাজে লাগালে চমক লাগানোর মতো অগ্রগতির সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল।

বিপদে-আপদে এ প্রজন্মও ঝাঁপিয়ে পড়ে। অন্যদের সহযোগিতা নিয়ে হলেও অসহায় অসুস্থদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। টোকাইদের জন্য সংগঠন করে তাদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করে। সহস্রাব্দ প্রজন্মের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডিজিটাল জ্ঞান। তবে এর সঙ্গে মানবিক গুণাবলি অর্জনেও যত্নশীল এই প্রজন্ম। ইতিবাচক থাকতে চায়। খুব সহজে ও দ্রুত পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে পারে।

করোনা পরিস্থিতিতেও ইতিবাচক আচরণগত পরিবর্তন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, ঘরে থেকে কাজ করা, সব দিক থেকেই অন্য প্রজন্মের তুলনায় সহস্রাব্দ প্রজন্ম এগিয়ে আছেন। ঘরে থেকে কাজ করা, গণপরিবহণ ব্যাবহার না করা, বিভিন্ন সমাজসেবামূলক পদক্ষেপগুলো নেওয়ার ক্ষেত্রগুলোতেও মিলেনিয়ালরাই এগিয়ে রয়েছেন। সমাজসেবামূলক কাজগুলো, অন্যদের সচেতন করা, নতুন ধরনের সময়োপযোগী পদক্ষেপগুলো নেবার ক্ষেত্রেও এই প্রজন্মের মানুষদেরই নেতৃত্ব দেখা যাচ্ছে।

রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে  পরিবর্তনের ধারা সূচনা করেছেন। পড়তে ভালোবাসে। পাবলিক লাইব্রেরিগুলিতে ঘুরে দেখ। ই-বইয়ের চেয়ে মুদ্রণ বই বেশি পড়ে। পরিকল্পনায় অবদান রাখে । স্ব স্ব উন্নতি ভালবাসে। বেশি নান্দনিক। বেশি  শিক্ষিত। কাজের বিষয়ে অনেক চিন্তাভাবনা করে। ভ্রমণ করতে পছন্দ করে। মাংসমুক্ত হচ্ছে।  নিরামিষভোজ বা নিরামিষাশী হচ্ছে।

বৈচিত্রতা পছন্দ করে। কৃতজ্ঞতার বোধও রয়েছে। টেকনিক্যালি উপযুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক, পরিবর্তনে বিশ্বাসী এবং বহু টাস্কিংয়ে উত্সাহী। নতুন দক্ষতা শিখতে আগ্রহী। সহনশীল বিকল্প জীবনধারার সন্ধানী। কর্মজীবনে ভারসাম্য আনার প্রত্যাশী, যদিও পারে না। সমতা চায়, আত্মবিশ্বাসী হতে চায় এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী হতে চায়। প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার করে। দক্ষতার সাথে কাজ করে। কঠোর পরিশ্রমও করে।

সহস্রাব্দ প্রজন্মের প্রবণতা

ছবি তোলা হোক, গেম খেলা হোক, বন্ধু-পরিবারের সঙ্গে কথা বলা হোক বা গুগলে কিছু সার্চ করা হোক – সবকিছুর জন্য স্মার্টফোন ব্যবহার করে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানের লবিতেও কোটটাই ছাড়া সাধারণ অফিসিয়াল পোশাকে তরুণ নির্বাহী দেখা যায়। তাদের সঙ্গে সেলফি তোলতে আপত্তি করছে না। নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে তরুণ প্রজন্মকে নেতৃত্বের পর্যায়ের নিয়ে আসছে। ইন্টারনেট ছাড়া জীবনযাপনের কথা কিছুতে ভাবতেও পারে না। এদের অনুপ্রেরণার কারণ ফ্যাক্ট বেইজড, ইফেক্টিভ এবং কেইস স্পেসেফিক। সবকিছু খুব সহজে হাতের কাছে চায়।

যাদের জন্ম ১৯৮০ সালে বা তার আশে পাশে, তারাই প্রথম ই-মেল এবং ইন্টারনেট জেনারেশন। এরা ‘গুগল’ সার্চ ইঞ্জিনকে চোখের সামনে জন্মাতে দেখেছেন। ‘অরকুট’ ছাড়িয়ে ‘ফেসবুক’, ‘ফেসবুক’ থেকে ‘হাইক মেসেঞ্জার’— এই প্রজন্ম প্রত্যেক মুহূর্তেই নিজেকে আপডেট করে চলেছে। সহস্রাব্দ প্রজন্মের মধ্যে নিজেদের পাসওয়র্ড অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করার প্রবণতা অত্যন্ত বেশি। বিনোদনের নতুন নতুন উপায় খুঁজছে। খুব সহজে মনোযোগ পেতে চাচ্ছে। অর্থ উপার্জনের নতুন নতুন উপায় খুঁজছে।  ইমেল, টেক্সট মেসেজিং, এবং নতুন সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে বন্ধুদের এবং সহকর্মীদের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পছন্দ করে। সন্তানদের নজরদারি, নিরীক্ষণ বা শৃঙ্খলা করার লক্ষ্যে টেকনোলজি ব্যবহার  করে।

ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন পছন্দ করে এবং এবং  প্রচুর ব্যবহার করে। ইন্টারনেট ও সামাজিক মিডিয়ায় পণ্য-সেবার মূল্যায়ন করার জন্য যথেষ্ট সময় ব্যয় করে। অনলাইন ক্রয়-বিক্রয়ের প্রতি  ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। উচ্চতর একাডেমিক শিক্ষা এবং পেশাদার যোগ্যতা অর্জনে আগ্রহী।ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাটে সময় দিয়ে স্ট্রেস রিলিজ করার চেষ্টা করে। সহজে, অল্প পরিশ্রম করেই প্রতিক্রিয়া -প্রশংসা পাওয়ায় আত্মতৃপ্ত হয়। ফ্রি বক্তৃতা  তাদেরকে প্রভাবিত করে না । অনেকে খুব অস্থির, খুব অল্প সময়ে অনেক কিছু পেতে চায়। নতুন ট্রেন্ডগুলো ফলো করে, নতুন পদ্ধতিতে মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে চায়।

নতুন নতুন ব্যবসা করতে  ও উদ্যোগ নিতে ইচ্ছুক। পরিবারকে অগ্রাধিকার দেয়, পরিবার-কেন্দ্রিক হয়। অবিবাহিতরাও ভ্রাতুষ্পুত্র, ভাতিজা এবং ভাইবোনদের সাথে সময় কাটানোর প্রয়োজন মনে করে। এরা নিয়োগকর্তাদের কাছে নিজেদের উচ্চ প্রত্যাশা ব্যক্ত করতে দ্বিধা করে না, কর্মক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ  মোকাবেলায় ঝুঁকি নিতে এবং কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে ভয় পায় না। অর্থপূর্ণ কাজ করতে চায় এবং কঠিন প্রশিক্ষণ নিতেও দ্বিধা করে না। ওয়েবসাইট , সার্চ ইঞ্জিন ও মোবাইল প্রযুক্তির তাত্ক্ষণিক অ্যাক্সেসের উপর নির্ভর করে। অনকেই বাবা মায়ের মতো কেনাকাটা করে না, চিন্তা-ভাবনা আলাদা। পরিবর্তন অনিবার্য মনে করে।

ফ্যাশনে নিজের স্টাইল স্টেটমেন্ট তৈরিকে গুরুত্ব দেয়। পোশাকে রঙের ব্যবহারে নানা ধরনের বাধ্যবাধকতা মানে না। ধরাবাঁধা নিয়ম থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। শুধু ট্রেন্ডি থাকার জন্য পোশাক  কেনে না। সহজে অ্যাক্সেসযোগ্য হয়, অন্যদের সাহায্য করতে চায়, নিজের ভূমিকা-অবদান দেখাতে চায়। ক্রমাগত প্রতিক্রিয়া জানাতে চায়। কর্মক্ষেত্র-কাজ-ভূমিকাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করে। অনলাইনে সময় ব্যয়ের পরিমাণ বেড়েছে, স্মার্টফোনগুলিতে বেশি ব্যক্তিগত ডেটা স্টোর বেশি করা হচ্ছে। চিন্তা থাকে নিজেদের মতো করে কিছু করার। ব্যবসা করার সুযোগ পেলে বা নিজের মতো কিছু করার সুযোগ পেলে চাকরি ছেড়েও দেয়।

সহস্রাব্দ প্রজন্মের উপর প্রভাব

২০১২ সাল থেকে তরুণদের আচরণ ও মানসিক অবস্থার হঠাৎ পরিবর্তন আসে। ২০০৭ সাল থেকে ২০০৯ সালের বৈশ্বিক মন্দা সহস্রাব্দ প্রজন্মের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বাড়ছে। শিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত যুবক-যুবতীরা নিজেদের পছন্দমতো কাজ পাচ্ছেন না, পছন্দ অনুযায়ী কাজ না পেয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। সকল প্রগতিশীল মতবাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে।

আইজেন প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমকে সম্বল করে। তাদের আচরণ ও আবেগের ধরন আগের চেয়ে আলাদা, যা তাদের জীবনকে হয়তো আরো বেশি অর্থপূর্ণ করে তুলবে। উন্নত যৌনশিক্ষা এবং পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতার কারণে সহস্রাব্দ প্রজন্ম তাদের আগের প্রজন্মের চেয়ে অনেক কম যৌন সহবাস করছেন। সহস্রাব্দ প্রজন্ম তাদের ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী। আর সম্পর্কে জড়ানোর ক্ষেত্রে আগের প্রজন্মের চেয়ে তারা অনেক বেশি সাবধানী-সাবধানী-যত্নবান-বাছাইপ্রবণ।

আইফোনে আসক্ত ‘আইজেন’ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর স্মার্টফোনের প্রভাব তীব্র। বন্ধুর সান্নিধ্যে কম সময় কাটায়, ডেটিং কমছে,  ঘুম কম হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে বাড়ছে একাকিত্ব। একাকিত্বের এই হার বাড়ায় সাইবার নিপীড়ন, হতাশা, উদ্বেগ এবং আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে। ইন্টারনেটের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে। ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট তৈরি হয়েছে।২০১১ থেকে আইজেনের মধ্যে আত্মহত্যা ও অবসাদের মাত্রা ধাঁই ধাঁই করে বাড়ছে।

বার্ন-আউটের ঝামেলায় থাকে, ক্লান্তি কিছুতেই পিছু ছাড়ে না, মাইগ্রেনের সমস্যা ও মাথা যন্ত্রণা থাকে, কাজে মন বসে না, পারফরম্যান্সের লেখচিত্রও হয় ক্রমশ নিম্নগামী, খিটখিটে আচরণ বাড়ে, নৈরাশ্যবাদী হয়ে ওঠে, কর্মক্ষেত্রে মারাত্মক কাজের চাপ কাবু হয়ে পড়ে এবং ছিদ্রান্বেষণ অন্যদের জন্য বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠে। কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা ওয়ার্ক স্ট্রেস সামলাতে না-পারার প্রভাব ও অফিস-বাড়ি ভারসাম্যের অভাবে পেশাগত জীবনেই পড়ে, তছনছ করে দেয় ব্যক্তিগত জীবনকেও।

মিলেনিয়ালদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের স্বাস্থ্যহানি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। যেসব মিলেনিয়ালদের বয়স ২০১৭ সালে ৩০-৩৪ এর মধ্যে ছিল তারা ২০১৪ সালের জেন এক্স এর ৩৪-৩৬ বছর বয়সীদের থেকে কম স্বাস্থ্যবান। চাকরির বাজার সংকুচিত হওয়া নিয়ে শঙ্কিত। নিরাপত্তা ও সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে। রাজনীতি নিয়ে অনীহার পাশাপাশি একধরনের রাজনীতি-বিরোধিতা রয়েছে।

সহস্রাব্দ প্রজন্মের নেতিবাচক দিক

পরিবার-পরিজন নিয়ে, স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর মতো সময় কম। দেখা হলে বা  কথা হলেও আন্তরিকতা নেই এই স্মার্টফোন প্রজন্মের। কারণ সেই স্পর্শ নেই, নির্ভরতা নেই, অনুভূতিহীন যেন। ঘরে ঘরে স্মার্টফোনে জীবনধারায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন।একই ছাদের নিচে থেকেও পরিবার-পরিজনের কাছ থেকে যেন অনেকটাই দূরে, মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে কম, উত্তর দেয় সংক্ষিপ্ত, পরিবারের সদস্যদের দিকে মনযোগ থাকে কম, বিছানায় শুয়ে-বসে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখে। আশপাশে তাকানোর সময় নেই যেন।

বদলে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ধরন। ব্লু-হোয়েল গেমে আসক্তরা মানসিক সমস্যা ও বিষণ্নতায় ভোগে আত্মহত্যাকেও অ্যাডভেঞ্চার মনে করছে। সামাজিক বন্ধনগুলো আগের মতো না থাকায় পরস্পরের প্রতি মমত্ব, জীবনের প্রতি দায়বোধ বা কর্তব্যবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। কাছের মানুষকেও আপন করতে না পারায় হতাশাবোধের প্রবণতা বাড়ছে। ফেসবুক, টুইটার, ভাইবার বা হোয়াটস অ্যাপে থাকা অচেনা মানুষকেই আপন ভাবছে, নিজের মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে ফেলছে।

ভিন্ন রকম অভিজ্ঞতা ও চমক চাচ্ছে। দৃষ্টিভঙ্গি ও জগৎ আলাদা হয়ে যাচ্ছে। সময় কাটায় সাইবার জগতে, বসেও ব্যস্ত মুঠোফোন নিয়ে। সামনাসামনি কথা বলার চেয়ে স্মার্টফোনে কথা বা চ্যাটে ব্যস্ত থাকছে। রাতের পর রাত জেগে থাকে ইন্টারনেটে, রঙিন দুনিয়ায় ঘোরাঘুরি করে। ঘুম কমায় ও অনিশ্চয়তায় পেয়ে বসছে অবসাদ। বন্ধুর সঙ্গে শপিং মলে ঘুরে ঘুরে শপিং করাকে শখ মনে করে। স্ন্যাপচ্যাটে বার্তা দেওয়া-নেওয়া চলতে থাকে। সত্যিকার মানুষের চেয়ে আইফোন-আইপ্যাডকেই বেশি প্রিয় মনে করছে,  হতাশা বাড়ছে।

খুব উদ্বিগ্ন। উদ্বেগের সম্মুখীন হচ্ছে। কম স্বাস্থ্যকর।  উচ্চ হারে হতাশার অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। হতাশার প্রকোপ বেড়েছে। ডায়াবেটিসের মতো পরিস্থিতি বেড়েছে। ব্যাক্তিগত, সামাজিক এবং জাতিগত হাতাশা দেখা যাচ্ছে। একটি কাজে লেগে না থেকে সবসময় কিছু নতুন এবং ভাল কিছু খুঁজেন। বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে চাকরি গ্রহণ না করে না নিজেই কর্মসংস্থান তৈরিতে উদ্যোগী হয়। প্রত্যাশা  সম্ভাবনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

সমস্যায় জর্জরিত সহস্রাব্দ প্রজন্ম

সহস্রাব্দ প্রজন্মরা মূলত আচরণগত সমস্যার মুখোমুখি যা ডিপ্রেশন ও হাইপারেক্টিভিটির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের দশরকম ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। যেমন – মেজর ডিপ্রেশনের শিকার, উপদানগত বিশৃঙ্খলা, এলকোহল প্রবণতা, হাইপারটেনশন, হাইপারেক্টিভিটি, সাইকোটিক অবস্থা, ক্রোন রোগ, উচ্চ কোলেস্টেরল ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার প্রবনতা, টাইপ টু ডায়াবেটিস ইত্যাদি। করোনা ভাইরাস নিয়ে মিলেনিয়ালদের দুশ্চিন্তার হার হচ্ছে ৫০% এবং প্রজন্ম-জেডদের ৪৪%।

সমাজে থেকেও আইডেনটিটি ক্রাইসিস, বিভ্রান্তি ও হতাশার মত মানসিক সমস্যার শিকার হচ্ছে সহস্রাব্দ প্রজন্ম। ানেকের আবেগ এবং জীবনবোধ চরমভাবে উপেক্ষিত হওয়ায় এদের বেশিরভাগই রাজনীতিকে ঘৃণা করছে! প্রাইভেসিতে হস্তক্ষেপ করার ভয় বাড়ছে। ভয় হীন জীবন কাটানোর উপায় কমছে। ব্যক্তিগত জীবন ব্যক্তিগত থাকছে না। গোপনীয়তা সম্পর্কে উদ্বেগ দূর হচ্ছে না। অনেকে দ্বৈত জীবনযাপন করছে। নিরাপদে জীবন কাটানোর সুযোগ পাচ্ছে না ।

মিলেনিয়াল প্রজন্ম তার পুরো জীবনে ২৭৫০০টি সেলফি তুলবে বলে এক হিসাবে বলা হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে তারা মোটামুটি এক ঘণ্টার মতো সময় ব্যয় করেন মনের মতো সেলফি তোলার কাজে। প্রতিবছর হাঙরের আক্রমণে যত না মানুষ নিহত হন, তার চেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ মারা গেছেন গত বছর ঝুঁকিপূর্ণ সেলফি তুলতে গিয়ে। বেশিরভাগ সময় আধুনিক প্রযুক্তির গ্যাজেট বা ডিভাইস নিয়েই কাটে ফলে সামাজিকতা, মানুষের সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বলার সৌজন্য শিষ্টাচার অথবা ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন রপ্ত করার দক্ষতা তারা অর্জন করতে পারে না।

মিডিয়াতে চব্বিশ ঘন্টা ধরে ঘটে চলা সন্ত্রাসবাদ ও বিপর্যয়গুলি তাদের মধ্যে অসহায়তা ও অকারণ ভয়ের জন্ম দিচ্ছে এবং নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যান্ত্রিক জীবনশৈলী, ইঁদুরদৌড় এর জীবন তাদের ব্যর্থতার সাথে মানিয়ে নেয়ার সমস্যা, অসহিষ্ণুতা এবং ফ্রাস্ট্রেশনকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলছে। কর্মজীবনে ওয়ার্ক শিডিউলের সঠিক বন্টন না হওয়ার কারণে তারা অবসর বিনোদন পায় না যা তাদের ইমোশনাল রিস্ক ফ্যাক্টরকে ঝুঁকিপূর্ণ করার অবস্থায় নিয়ে গেছে।

সহস্রাব্দ প্রজন্মের বিরুদ্ধে অভিযোগ

মিলেনিয়ালস প্রজন্ম আপনারে লয়ে বিব্রত! আত্মকেন্দ্রিক! একত্রিতভাবে সমাজের পরিবর্তন সাধনে সেভাবে এগিয়ে আসছে না। ব্যাপারটি বিশ্লেষণের আগে ‘মিলেনিয়ালস প্রজন্ম’ শব্দবন্ধের উৎপত্তি নিয়ে কিছু বলা যেতে পারে। ১৯৮২ থেকে থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত যাদের জন্ম তারা ‘মিলেনিয়ালস জেনারেশন’। উইলিয়াম স্ট্রাউস ও নিল হাউ ১৯৮৭ সালে প্রথম এ নামের উদ্ভাবন করেন। ২০১৩ সালে ‘টাইম’ ম্যাগাজিন মিলেনিয়ালস প্রজন্মের আরেক নাম দেয়্র, ‘মী মী মী’, অর্থাৎ ‘আমাকে আমাকে আমাকে’ বা ‘আমার আমার আমার’। বোঝাই যাচ্ছে কোন অর্থে তা ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ একে ‘নার্সিসাস প্রজন্ম’ নামে আখ্যায়িত করেছে।

এরা আবেগ-অনুভূতিহীন, আবেগশূন্য, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ-স্নেহ-প্রেম-ভালোবাসা কম,  যৌথ অপরাধ প্রবণতা বাড়ায় নষ্ট প্রজন্ম, হাসতে হাসতে খেলতে খেলতে নিজের ক্ষতিও করে, অন্যের প্ররোচনায় মানুষের বড় ধরনের ক্ষতি করতেও দ্বিধা করে না। ষাট দশকের মতো কোনো রেনেসাঁ আনতে পারছে না।

সমস্যার সমাধান ও করণীয়

জীবনযাত্রার সামান্য বদল পরিস্থিতির আশাতীত উন্নতি ঘটাতে পারে। কর্মীকে বুঝতে হবে, পেশার বাইরে একটা বড় জীবন আছে, যেটা উপভোগ করা দরকার। বসকেও বুঝতে হবে যে, কাজের চাপ মাত্রাতিরিক্ত বাড়লে কর্মদক্ষতা ও পারদর্শিতা ভীষণ মাত্রায় কমে যায়। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই এমন পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়, যার জেরে কর্মীর অফিস ও বাড়ির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সমস্যা হয়। পেশার বাইরের বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে নিখাদ আড্ডা দিলে এবং সাপ্তাহিক ছুটির বাইরে মাঝেমধ্যে একদিন ছুটি নিয়ে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটালে বার্ন-আউটের সমস্যায় পড়তে হয় না।

কর্মক্ষেত্র ও ব্যক্তিগত জীবনকে আলাদা রাখা, পেশার বাইরের সম্পর্কগুলিতে সময় দেওয়া ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা এবং নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস বার্ন-আউটের সমস্যাকে অনেকটাই ঠেকিয়ে রাখতে পারে। কাজের জন্য জীবন নয়, জীবনের জন্য কাজ। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে কর্মজীবনের অনুপ্রবেশ, মাল্টি-টাস্কিংয়ে অসুবিধে এবং তার জন্য পিছিয়ে পড়ার ভয়, ঊর্ধ্বতনের অন্যায্য ও একপেশে আচরণের শিকার হওয়া, কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি কর্তৃপক্ষের অবহেলা, কর্মীদের মধ্যে কাজের অসম বণ্টন চরম ক্ষতি করে।

সর্বক্ষণের ক্লান্তি, কাজের প্রতি অনীহা, সহকর্মীর খুঁত ধরা, প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নেতিবাচক ভাবনা, পারফরম্যান্সে পিছিয়ে পড়া দেখা দেয়। প্রত্যেককে বুঝতে হবে যে, বেশিক্ষণ কাজ করাটা কাজের কথা নয়। আসল কথা হল, কী ও কতটা কাজ করলাম। কর্মসংস্কৃতির সেই পরিবেশ তৈরি হতে হবে। প্রাথমিক সেবপ্রদানের কেউ না থাকার ফলে তারা বিচ্ছিন্ন মনে করে। সেল্ফ কেয়ার ট্রেনিং বা স্বযত্ন কেন্দ্রিক হয়ে উঠতে হবে, যা তাদের উন্নত খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, শরীরচর্চা সহ দীর্ঘস্থায়ী সমাধানমূলক জীবনযাপন মানের সুরক্ষা প্রদান করবে। তাদের রোগের উপসর্গ ও লক্ষণগুলি তাদের নিজেদেরকেই শনাক্ত করতে শিখতে হবে।

জীবনধারার সঠিক রূপরেখা ও হেলথ কেয়ার সুনিশ্চিত করতে হবে। আচরণ গত সমস্যার সন্মুখীন হলে তা শরীর ও মন উভয় দিক থেকে বিবেচনা- বিচার করতে হবে। বন্ধুভাবাপন্ন পরিবেশে স্বচ্ছন্দ হয় যা তাদের সংস্কৃতি, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি এবং লিঙ্গগত পরিচয় এর সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ। তাদের এরকম পরিবেশে মেলামেশার কাজে উৎসাহিত করতে হবে। কাজের ক্ষেত্র প্রসারিত করতে হবে এবং সমস্যাগুলিকে সরাসরি তুলে ধরতে হবে।

এদেরকে সর্বোচ্চ মাত্রায় উৎপাদনক্ষম শ্রমশক্তি বা মানবসম্পদে রূপান্তরিত করা, শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের গুণগত মান বাড়ানো, মেধা-সৃজনশীলতা-উদ্ভাবনক্ষমতাকে উৎসাহিত করা দরকার। গতানুগতিক চিন্তা ও চর্চার বিপরীতে নতুন নতুন সৃজনশীল উদ্যোগের প্রতি উৎসাহ ও সহযোগিতা প্রয়োজন। স্মার্টফোনের যুগেও স্মার্টফোন ব্যবহার করতে হবে সঠিকভাবে। অন্তর্জালের পাশাপাশি আশেপাশের মানুষগুলোর কাছ থেকেও কোনও নোংরা প্রস্তাবে পা ফসকে না যায়। সাফল্যের গল্প শোনানো। জীবনের কোনও ধাপেই ব্যর্থ হলে সেটাকে ব্যর্থতা না ভেবে সাফ্যলের পথে এগিয়ে যাওয়ার সিঁড়ি বলেই মনে করিয়ে দেওয়া। ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া। ইন্টারনেট গেমের প্রতি আসক্তি কমিয়ে খেলাধুলোর প্রতি আসক্তি বাড়ানো।

যারা শহুরে পরিবেশে মানুষ তারা যেন মাঝে মাঝে গ্রামে গিয়ে ছেলে মেয়েদের শেকড়ের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিবে। মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখা। ঠিকমতো ঘুমানো, পাঠ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ওপর জোর দেয়া। জীবনের সত্যকে জানার জন্য, পড়ার আনন্দের জন্য যে পাঠ সেটা পড়তে হবে ছাপানো বইয়েই। পাসওয়র্ড কখনওই কারও সঙ্গে শেয়ার না করা, ইন্টারনেট ব্যবহার করার সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকা যাতে ভুলবশত কোনও পপ-আপ অ্যাড বা অ্যাডাল্ট সাইটের বিজ্ঞাপনে ক্লিক না হয়ে যায়, ফোন বা ডিভাইসে খুব ভাল টোটাল সিকিউরিটি প্যাক ইনস্টল করা এবং পাবলিক ওয়াই-ফাইয়ের ব্যবহার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, বিজনেস ইনসাইডার, ফোর্বস, বিবিসি বাংলা, দ্য ইন্ডপেন্ডেন্ট,  প্রথম আলো ও দ্য আটলান্টিক

আনিসুর রহমান এরশাদ

About আনিসুর রহমান এরশাদ

শিকড় সন্ধানী লেখক। কৃতজ্ঞচিত্ত। কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী। ভেতরের তাগিদ থেকে লেখেন। রক্ত গরম করতে নয়, মাথা ঠাণ্ডা ও হৃদয় নরম করতে লেখেন। লেখালেখি ও সম্পাদনার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সময়ে পাক্ষিক-মাসিক-ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন, সাময়িকী, সংকলন, আঞ্চলিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ ও জাতীয় দৈনিকের সাথে সম্পর্ক। একযুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। পড়েছেন মিডিয়া ও জার্নালিজমেও। জন্ম টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার হাতীবান্ধা গ্রামে।

View all posts by আনিসুর রহমান এরশাদ →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *