সম্পর্ক গড়া সম্পর্ক সুরক্ষা ও সম্পর্কের বিকাশ

জীবন চলার পথে বহু মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক এক সম্পর্কের অনুভূতিও একেকরকম। সম্পর্ক ভাঙে, সম্পর্ক গড়ে। সম্পর্ক গড়ে তোলার চেয়ে, সম্পর্ক রক্ষা করা বেশি কঠিন। সম্পর্ক দৃঢ় রাখতে সম্পর্কের ব্যাপারে যত্নশীল হতে হয়। আর সম্পর্ক নষ্ট করার ক্ষেত্রে উদাসীনতা-অবহেলাই যথেষ্ট! ভালোবাসা আর ঘৃণা-অবজ্ঞা একসাথে চলতে-থাকতে পারে না। ভালোবাসা থেকেই সুস্থ-সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠে, আর ভালোবাসার মধ্য দিয়েই তা বিকশিত-সুশোভিত হয়।

সম্পর্ক যখন গভীর হয়, তখন বন্ধন ধরে রাখতে অধিকারের প্রতি সচেতন থাকতে হয়। সম্পর্ক স্বল্পস্থায়ী হবে নাকি সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হবে তা নির্ভর করে মেনে নেওয়া ও মানিয়ে নেওয়ার ওপর। ঢিলেঢালা সম্পর্ককে সুখী সম্পর্কে উন্নীত করতে হলে বৈধ সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। পারস্পরিক সম্পর্ক সুরক্ষার তাগিদ অত্যন্ত জোরালো। সম্পর্ক মানে বিশ্বাস, সম্পর্ক মানে আস্থা, সম্পর্ক মানে বিপদেও পাশে থাকা। সম্পর্কে ভারসাম্য রক্ষা না করলে সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়।

টেকসই সম্পর্কের জন্য- মিলগুলোকে উপলব্ধি করতে হয়, অমিলগুলোকেও সম্মান করতে হয়, যোগাযোগ রাখতে হয়, অন্যের সত্তাকেও মনে রাখতে হয়, হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়, অন্যকেও অসাধারণ ভাবতে হয়, অন্যকেও জিতাতে হয়, নিজের দোষকে নিজের ঘাড়েই চাপাতে হয়, প্রাণবন্ত হতে হয়, পাশে থাকতে হয়।

কত ধরণের সম্পর্ক! স্রষ্টা-সৃষ্টির সম্পর্ক। ভাই-বোনের সম্পর্ক। মা-বাবা ও সন্তানের সম্পর্ক। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। মালিক-শ্রমিকের সম্পর্ক। বন্ধুত্বের সম্পর্ক। ব্যবসায়িক সম্পর্ক। প্রেমের সম্পর্ক। ভালোবাসার সম্পর্ক। নেতা-কর্মীর সম্পর্ক। আধ্যাত্মিকতার সম্পর্ক। সহযোগিতার সম্পর্ক। সম্পর্কহীন সম্পর্ক। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। রক্তের সম্পর্ক। বৈবাহিক সম্পর্ক। পেশাগত সম্পর্ক। অর্থনৈতিক সম্পর্ক। পারিবারিক সম্পর্ক। ক্ষমতার সম্পর্ক। আত্মীয়তার সম্পর্ক।

যেকোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রেই একটি সীমানা ও সীমাবদ্ধতা থাকে। সম্পর্ক বাঁচাতে গিয়ে সেই সীমানোকে ভেঙে ফেলা হলে পরবর্তীতে সেই সম্পর্কই নড়বড়ে হয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কও বিরূপ আচরণের কারণে বিষাক্ত সম্পর্কে পরিণত হতে পারে। একটি সম্পর্ক সুন্দর কিংবা অসুন্দর করার জন্য কিছু বাক্যই যথেষ্ট। সম্পর্ক সুন্দর রাখতে চাইলে বলার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। সম্পর্ক মানে শুধু আবেগ নয়, সম্পর্ক মানে শুধু আনন্দ নয়; সম্পর্ক মানেই একসাথে ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতাও।

বহু পুরোনো সম্পর্কেও এমন পরিস্থিতি হতে পারে যে, সম্পর্কের উষ্ণতা কমতে কমতে সম্পর্ক শেষ করা ছাড়া বিকল্প উপায় থাকে না। এর পেছনের অন্যতম কারণ শারীরিক বা মানসিক অন্তরঙ্গতা দিন দিন কমতে থাকা। অন্তরঙ্গ সম্পর্ক এমন আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক যেখানে উপলক্ষ্য ছাড়াও সঙ্গীকে উপহার দিতে হয়, হাসিমুখে সাধারণ ত্যাগ স্বীকার করলেও অসাধারণ প্রশংসা করতে হয়। সুসম্পর্ক প্রয়োজনীয়, সুসম্পর্কে সন্তুষ্টি জরুরি।

ভালো সম্পর্ক হলো সম্মান, সততা ও দায়িত্ববোধের মিশেল; যা সম্পর্কের ধারা ঊর্ধ্বমুখী রাখে। অযৌক্তিকভাবে সম্পর্ক নষ্টের পরিণতি ভয়াবহ। সারাজীবন ধরে যে নানারকম সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার ভিন্ন ভিন্ন দায় রয়েছে। সেসব দায়-দায়িত্ব এড়াতে সম্পর্ক ছিন্ন করার মাঝে কোনো বাহাদুরী নেই। যে সম্পর্কে দায়িত্ব থাকে না, শুধু দায়বদ্ধতা থাকে; সে সম্পর্ক আসলে কোনো সম্পর্ক নয়। আস্থাহীন-নির্ভরতাহীন সম্পর্ক বয়ে বেড়ানো যন্ত্রণাদায়ক। সম্পর্ক কোনো ফুলের বাগান নয়, এটা হল একটা উঁচু-নিচু রাস্তা।

সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে- যার সঙ্গে সম্পর্ক তাকে যথাযোগ্য সম্মান দেওয়া; তার প্রতি শিষ্টাচারপূর্ণ আচরণ প্রদর্শন করা, অসম্মানজনক কোনো আচরণ না করাটা জরুরি। নিবিড় সম্পর্কের জন্য নিবিড় যত্ন-পরিচর্যা দরকার হয়। জীবনে প্রতিটি সম্পর্ক মধুর হবে, এমন নয়। ভুল মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধন হয় এমন, যে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর স্বস্তি মিলে। যেহেতু সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনেক কিছু, তাই যদি কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা জীবনকেই নিরর্থক-অর্থহীন করে ফেলে; অনেকসময় সেই সম্পর্ক বজায় রাখা থেকে বেরিয়ে যাওয়াটা হয় অধিক কল্যাণকর।

আনুষ্ঠানিকতার সম্পর্কের চেয়ে আন্তরিকতার সম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।আসলে সম্পর্কের গতি প্রকৃতি বেশ চমকপ্রদ। সম্পর্কের কোনো কোনো স্মৃতি হৃদয়ে গেঁথে থাকে দীর্ঘকাল। সেখানে ভালোবাসার সম্পর্ক উন্নত করা যায়, যেখানে সম্পর্ক ধরে রাখতে নিজের মূল্যবোধ বিসর্জন দিতে হয় না বা মানসিক সমস্যার কারণ হয় না। মূল্যবোধের সঙ্গে আপস করে টিকিয়ে রাখা সম্পর্ক কখনো মধুর হয় না। প্রমাণ দিয়ে দিয়ে যে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হয়, সেই সম্পর্কে জীবন হয় একটি কঠিন পরীক্ষাক্ষেত্র! কর্তব্যবোধ থেকে জানান দেয়া, সময় দেয়া ও নিজ নিজ দায়িত্ব পালনই যথেষ্ট হওয়া উচিত।

সম্পর্ক সঠিক রাখার জন্য রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই জরুরি। মাথা ঠান্ডা রাখতে পারলে- সম্পর্ক হয় গল্পের মতো সুন্দর। পারস্পরিক বোঝাপড়া সঠিক-সুন্দর হলে একটু ঝামেলাতেই হাত বদলের চিন্তা করতে হয় না। মানুষের সম্পর্কগুলো আলো-বাতাসের মতো সহজ-স্বাভাবিক হতে পারে আন্তরিকতা, সমানুভূতি আর সহমর্মিতার মিশেলে। যার কথায় মন প্রশান্ত হয়, কাজে-কর্মে মন নির্ভরযোগ্য হয় এবং চিন্তা-চেতনা থেকে অন্তর আশ্বস্ততা লাভ করে- তার সাথে সম্পর্ক ইতিবাচক গতি লাভ করে। সম্পর্কের স্বচ্ছতা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা কমায়।

যেকোনো সম্পর্কের জন্য মিথ্যা ক্ষতিকর। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্পর্কে ছন্দপতন ঘটে- সঠিক যোগাযোগ না হওয়ায়, সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর তা রক্ষার ক্ষেত্রে সুন্দর মানসিকতা লালন না করায়, শ্রদ্ধাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি না থাকায়, আন্তরিক ভাব স্পষ্ট ও ভাষা প্রয়োগ যথাযথ না হওয়ায়। আধুনিক যুগে সম্পর্কের সমীকরণ যেহেতু সময়ের মতোই কঠিন, তাই সুন্দর ভাষাভঙ্গি, সহৃদয় কথাবার্তা বলা ও শব্দ প্রয়োগে সতর্ক হওয়া সম্পর্ককে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ একটি সম্পর্ক তৈরি হতে অনেকটা সময় লাগলেও ভেঙে যেতে এক মুহূর্তই যথেষ্ট।

About আনিসুর রহমান এরশাদ

শিকড় সন্ধানী লেখক। কৃতজ্ঞচিত্ত। কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী। ভেতরের তাগিদ থেকে লেখেন। রক্ত গরম করতে নয়, মাথা ঠাণ্ডা ও হৃদয় নরম করতে লেখেন। লেখালেখি ও সম্পাদনার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সময়ে পাক্ষিক-মাসিক-ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন, সাময়িকী, সংকলন, আঞ্চলিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ ও জাতীয় দৈনিকের সাথে সম্পর্ক। একযুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। পড়েছেন মিডিয়া ও জার্নালিজমেও। জন্ম টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার হাতীবান্ধা গ্রামে।

View all posts by আনিসুর রহমান এরশাদ →

Leave a Reply

Your email address will not be published.