মানবসম্পর্কের শীর্ষবিন্দুতে পারিবারিক বন্ধন

আনিসুর রহমান এরশাদ

বিশ্বে বিদ্যমান উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখার জন্য পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানবাধিকার, জনসংখ্যা ও নারীর অগ্রগতি পরিবার দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত। তাই রাষ্ট্রের সামাজিক উন্নয়নের জন্য পরিবারের ভূমিকা, দায়িত্ব ও অধিকার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মৌলিক মানবিক অধিকার, মানুষের মর্যাদা এবং ছোট-বড় জাতি ও স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে ন্যায্য অধিকার ও ব্যাপকতর স্বাধিকারের মাধ্যমে সামাজিক অগ্রগতি সাধন ও জীবনমান উন্নয়নের জন্য পরিবার হচ্ছে মৌলিক ভিত্তি; সমাজের সর্বনিম্ন ইউনিট, লক্ষ্য নির্ধারণের কেন্দ্রস্থল। পারিবারিক বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বন্ধন দৃঢ়করণ ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অথচ দুর্বল হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন।

বিচ্ছিন্নতা পুঁজিবাদী সমাজের সামাজিক-মনস্তাত্বিক সমস্যা; এর বীজ রোপিত রয়েছে সমাজের অভ্যন্তরে। মানুষ গ্রাম থেকে শহরে  আসছে, একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাচ্ছে,  গ্রামের বিবাহিত নারীরা কাজে শহরে আসার সময় সন্তানকে নিজের বাবা-মায়ের কাছে রেখে আসছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি বা ব্যবসায় সম্পৃক্ত হলে এক পরিবারে থেকেও মা-বাবা ও সন্তানেরা দিন কাটাচ্ছে যে যার মতো করে, কেউ কাউকে সময় দিতে পারছে না, হয়ে পড়ছে বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ। স্বভাববিরুদ্ধ ও ইচ্ছাবিরুদ্ধ কাজ করায় পরিণত হচ্ছে যন্ত্রে, হচ্ছে মূল্যবোধের পরিবর্তন। তালাক বাড়ায় সিঙ্গেল প্যারেন্ট পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে; যার প্রভাব পড়ছে সন্তানদের দেখাশোনায় ও সমাজের ওপর। একক পরিবারে শিশুরা যৌথ পরিবারের শিশুদের মতো সবার যত্ন পাচ্ছে না।

পারিবারিক বন্ধন ও পরিবারে মূল্যবোধ চর্চাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে বলছেন সমাজতত্ত্ববিদ বা মনস্তত্ত্ববিদেরাও। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, বাবা-মায়ের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পারা, পরিবার থেকে প্রয়োজনীয় পথনির্দেশ না পাওয়া, শৃঙ্খলা চাপিয়ে দিয়ে অতিরিক্ত কঠোরতা দেখানো এবং মানসিক যোগাযোগ কমে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত এখনকার তরুণেরা। দূরত্ব বৃদ্ধির কারণে বঞ্চনা, মাদকাসক্তি, অবসাদগ্রস্ততা, যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে।

সন্তানদের পড়াশোনার বিষয়ে অতিরিক্ত চাপ দিলেও সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে আগ্রহ কম বাবা-মায়ের। অথচ সন্তানের আবেগপ্রবণ  জীবন ও পরিমণ্ডলে অভিভাবকদের অংশ নেয়া এবং সন্তানদের সঙ্গে অভিভাবকদের মানসিক যোগাযোগ থাকার ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ। পারিবারিক বন্ধন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বাড়ানো প্রয়োজন; কারণ সন্তানরা নিজেদের সমস্যা পরিবারে তুলে ধরতে না পেরে বিপথে যাচ্ছে। মা-বাবাকেই সন্তানদের সাথে মানসিক দূরত্ব কমাতে এগিয়ে আসতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদলে সন্তানদের বেশি বেশি সময় দিতে হবে, ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টিও সন্তানদের শেখাতে হবে।

জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে পরিবার। পরিবারকে এড়িয়ে সার্থক জীবনের সন্ধান পাওয়াটা খুব কঠিন। সন্তানের জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে বাবা। হতাশা দূর করে আশার আলো দেখাতে পারে মা। ব্যর্থতা ঠেলে সফলতার লক্ষ্যে পৌছাতে অনুপ্রেরণা দিতে পারে ভাই। অন্ধকার গলিপথ থেকেও আলোর মহাসড়কে নিয়ে আসতে পারেন বোন। স্বপ্ন দেখাতে, লক্ষ্য ঠিক করে দিতে এবং লক্ষ্যে পৌঁছাতে ভুমিকা রাখতে পারে পরিবারের অন্যরাও। পরিবারের জন্যই জীবনের দুর্গম-কঠিন পথও খুবই মসৃণ হতে পারে।

যদি পরিবার থেকেই লক্ষ্যের প্রতি দৃঢ় মনোবল রাখা, লক্ষ্যে পৌঁছাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা থাকা, উত্থানে সংযম প্রদর্শন, পতনে ধৈর্য ধারণ, পরিশ্রম করা শেখানো যায় তাহলে জীবনের গুঢ় রহস্যটাই তার সামনে উন্মুক্ত হয়ে যাবে। শিশুকাল থেকেই যদি বুঝতে শিখে-  স্রষ্টা-সৃষ্টির সম্পর্ক, মহাবিশ্বের ভাষা, স্বপ্ন পূরণের পথ, সাফল্যের আসল রহস্য, জয় করার সাহস, ঝুঁকি নেয়ার ভয় কাটিয়ে উঠার উপায়; তাহলে তার বাস্তব জীবন সুন্দর না হয়ে পারে না। কৃতজ্ঞতার চর্চা শেখাতে হবে ছোটবেলা থেকেই। কারণ শিখরে পৌঁছে যারা শিকড় ভুলে যায়; তারা পরগাছা, চরম অকৃতজ্ঞ।

গতিশীলতার পথ পেতে হলে- মনের গভীরের তীক্ষ্ণ প্রত্যয়, ইতিবাচক জীবনবোধ, বাস্তবতাকে গভীরভাবে বুঝা,অন্তরাত্মার দেখা পাওয়া, কঠিন সত্যকেও গ্রহণ করা, গতানুগতিকতা ধারা থেকে বের হয়ে আসা, জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া, জীবনের আশীর্বাদগুলোকে চিহ্নিত করা, একঘেঁয়েমি থেকে মুক্তি পাওয়া জরুরি। জীবন মানেই গতিশীলতা-সংগ্রাম, জীবন মানে কখনোই স্থিরতা বা স্থিতিশীলতা নয়।

নিজে ভালো হলে আশেপাশের সবকিছুর পরিবর্তন ভালো দিকে যায়, পরিবার থেকে শুরু করে সবখানে তা প্রতিফলিত হয়। পরিবারেই শিক্ষা পেতে হবে- সুযোগকে কাজে লাগানোর, যেমন আছে তেমন মেনে না নেয়ার, অসম্ভবকে উপেক্ষা করার, ঘুরে দাঁড়ানোর, অন্য আরেকজনের জীবনযাপন না করার, স্বপ্ন দেখা বন্ধ না করার, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার, পরিস্থিতি থেকেই উতরে যাওয়ার শিক্ষা নেয়ার, ইতিবাচক চিন্তা করার, সত্যিকারের ভালোবাসার, গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাবার ও আত্মার উন্নয়ন ঘটানোর।

জীবন শুরু পরিবারে, পরিবারেই বেড়ে ওঠা।  অক্ষম, অচল, নির্বাক শিশুকে মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যরা আদর-যত্ন দিয়ে বড় করে তোলে। সে চলাফেরা করতে শেখে, কথা বলতে শেখে। জীবনের সর্বস্তরে পরিবারের সদস্যরা বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে পাশে থাকে। ব্যক্তির কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেকাংশে পরিবারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।

ব্যক্তিজীবনে সংকট দেখা দিলে, কোনো জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হলে ঘুরে ফিরে পরিবারের সদস্যদের কাছে ছুটে আসে। মুরব্বি ও সমবয়সীদের বুদ্ধি-পরামর্শ পেতে চেষ্টা করে। ফলে মানবসম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত পরিবার হচ্ছে সবচেয়ে স্থিতিশীল ইউনিট। জৈবিকপ্রক্রিয়া, সামাজিক রীতিনীতি, আইনি চর্চা, মানবিক আবেদন ও আবেগ আচরণ ধারার এক অতুলনীয় সম্মিলন ঘটেছে পরিবারে। ফলে পারিবারিক বন্ধন মানবসম্পর্কের শীর্ষবিন্দুতে তার অবস্থান অটুট রেখেছে।

সুন্দর জীবনের অন্যতম শর্ত সুন্দর পারিবারিক সম্পর্ক। পরিবার কতগুলো হৃদয়ের সমষ্টি, যেখানে আছে জীবনের প্রবাহ, আছে স্নেহ-মায়া-মমতা-ভালোবাসা, আছে উষ্ণ আবেগ, যত্ন আত্তি-পরিচর্যা, আছে নিরাপত্তা, মিলেমিশে থাকার প্রবল বাসনা, আছে সহনশীলতা এবং একে অন্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা। পারিবারিক বন্ধনের প্রভাব দারুণ কর্মব্যস্ততায় কিংবা নিবিড় অবসর মুহূর্তে প্রতিটি মানুষকে স্পর্শ করে। সদস্যদের সম্পর্ক চমৎকার ও আন্তরিক হলে পরিবার হয় সুন্দর জীবনের অনুপ্রেরণা, সুখ-শান্তিময় মানবীয় আবাস এবং নৈতিক চরিত্র গঠনের প্রকৃষ্ট ক্ষেত্র। পারস্পরিক দয়া-করুণা-সহানুভূতি, দায়িত্বশীলতা, আন্তরিক সহযোগিতা, অন্তরের স্বতঃস্ফূর্ত দরদ ও প্রণয়-প্রীতি, অপরিসীম স্নেহ-ভালোবাসার বন্ধন থাকলে পরিবার হয় সুখ-শান্তি ও সর্বাঙ্গীণ উন্নতির অনাবিল উৎস

বিজ্ঞানীরা মানব সম্পর্কের বিস্তৃত জাল বিবেচনা করে  চার ধরণের আত্মীয়তার সম্পর্ক চিহ্নিত করেছেন। একজন ব্যক্তি তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনীর সাথে জৈবিক বন্ধনে যুক্ত। জৈবিক বন্ধনের আরেক নাম রক্ত সম্পর্কীয় বন্ধন। কোনো নারী-পুরুষ তাদের শ্বশুর-শাশুড়ি বা এদের জ্ঞাতিদের সাথে বৈবাহিক বন্ধনে সম্পর্ক যুক্ত। রক্ত বা বৈবাহিক সুত্রে আবদ্ধ নয় এমন ব্যক্তিদের সাথেও আমরা জ্ঞাতিদের মতই আচরণ করি। এটাকে পাতানো আত্মীয় বা কাল্পনিক বন্ধনও বলা হয়ে থাকে। প্রথাগত বন্ধন প্রথা অনুসারে আমরা বাবা-মার বয়সী লোকদেরকে যথাক্রমে আংকেল-চাচা অথবা আন্টি-খালা ইত্যাদি নামে সম্বোধন করে থাকি। অপর দিকে বড় ভাইদের সমবয়সী হলে তাকে ভাইয়া-ভাইজান ইত্যাদি নামে ডাকার রেওয়াজ আছে।

পরিবার প্রথার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এমনকি পারিবারিক পবিত্র বন্ধনের প্রতি গুরুত্বারোপ করা সার্থক ও অর্থবহ জীবনের জন্যই প্রয়োজনীয়। পারিবারিক বন্ধন বজায় রাখা স্থিতিশীলতার বোধ এবং আধ্যাত্মিক প্রশান্তি এনে দেয়। তাই মায়া-মমতা, অনুশাসন আর নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে আধুনিক ব্যস্ত জীবনেও পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ়করণেই সামগ্রিক কল্যাণ নিহিত। হাদীসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্কে রক্ষা করে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করি। আর যে ব্যক্তি তা ছিন্ন করে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করি।

 

পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *