ভিডিও গেমস আসক্তি মনঃস্বাস্থ্য সমস্যা

ভিডিও গেমস শিশুদের মারাত্মক আসক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।  মোবাইলের গেমসের প্রতি প্রচণ্ড আসক্তির কারণে কোমলমতি শিশুদের মানসিক বা আচরণগত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছে।  অনেক বাবা-মা আত্মতৃপ্তিতে ভোগেন কারণ তার সন্তান ইন্টারনেট থেকে সব তথ্য, অ্যাপস ডাউনলোড করতে পারে এবং খুব ভালো গেইম খেলতে পারে। ভিডিও গেমে আসক্তি মানসিক রোগ। ভিডিও গেমের অতিরিক্ত আসক্তিতে একদিকে যেমন শিশু-কিশোরদের সামাজিকীকরণ বাধাগ্রস্ত হয় তেমনি মেধা বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এক নজরে দেখে নিন লুকিয়ে রাখুন

ভিডিও গেমস  কী?

ভিডিও গেমস হচ্ছে এক ধরনের ইলেকট্রনিক গেম্‌স যা ব্যবহারকারীর সাথে ভিডিও ডিভাইজে পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ভিডিও গেমসকে আজকাল তার জনপ্রিয়তার জন্যে যন্ত্রে ডিস্‌প্লে ডিভাইজ ব্যবহৃত হয়। ভিডিও গেমস খেলার জন্য যে সকল ইলেকট্রনিক সিস্টেম ব্যবহৃত হয় তাকে বলা হয় প্লাটফর্ম। যেমন পার্সোনাল কম্পিউটার এবং ভিডিও গেম কনসোল। তাছাড়া ভিডিও গেমস ব্যবহৃত হয় ইনপুট ডিভাইজ। যেমন পি.এস.পিতে খেলার জন্য ব্যবহৃত গেম কন্ট্রোলার, জয়স্টিক। কম্পিউটারে খেলার জন্য কী-বোর্ড ও মাউজ ব্যবহৃত হয়।

ভিডিও গেমস  খেলার ক্ষতি

ফোনে নিত্যনতুন ভিডিও গেম পাওয়ার ফলে মাঠে খেলার প্রতি আগ্রহ তেমন দেখা যায় না। এর ফলে তাদের মধ্যে একঘেয়েমিতা লক্ষ্য করা যায় এবং সামাজিকতা তেমন বৃদ্ধি পায় না। কিন্তু শিশুর জন্য খেলাধুলা খুবই জরুরি। খেলাধুলার মাধ্যমেই শিশুদের দৈহিক বৃদ্ধি ও গঠন সৃজনশীলতা, ভাষার দক্ষতা, সামাজিকতা, কল্পনাশক্তি বাড়ে এবং সমবয়সিদের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষমতা এর মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এছাড়া শিশু মাঠে বা পরিবারের খেলার মাধ্যমে যেমন আনন্দ, আরাম পাবে এবং অনুমান ক্ষমতা বাড়বে; সেসঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হৃদ্যতা, সহমর্মিতা, সহানুভূতি বাড়বে এবং সহপাঠীদের সঙ্গে খেলার মাধ্যমে মতবিনিময়, মতামত, অন্যের কথাকে শ্রদ্ধা, সম্মান দিতে শিখবে।

কম্পিউটার গেম্স

যেসব গেমস সাধারণত কম্পিউটারে খেলা হয়ে থাকে তাকে কম্পিউটার গেম্স বলে। বর্তমানে ডেস্কটপ কম্পিউটারে গেমস খেলা, বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সাধারণত গেম সফটওয়্যার হিসেবে থাকে। এটি ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে অথবা কিনে খেলা যায়। এছাড়াও গেমসের বিভিন্ন সিডি বা ডিস্ক পাওয়া যায়। এছাড়াও বিভিন্ন অনলাইন গেমসও রয়েছে। কম্পিউটারে গেম খেলার প্রতি নেশাকে  মানসিক রোগ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

আর্কেড গেম্স

আর্কেড গেম্স অথবা কয়েন-আপ হচ্ছে মুদ্রা-চলিত বিনোদন-মূলক যন্ত্র, যা সাধারণত শুঁড়িখানা এবং প্রভৃতি বিনোদন দানকারী স্থাপনায় থাকে। অধিকাংশই ভিডিও গেম, পিনবল যন্ত্র এবং যান্ত্রিক বৈদ্যুতিক গেম (যেমন ক্লাও ক্রেনস্)।

কনসোল গেম্স

কনসোল গেমস হচ্ছে এমন গেমস যা কিছু বিশেষ ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রে খেলা হয়ে থাকে। এসব যন্ত্রকে গেম কনসোল বলা হয়ে থাকে। কিছু উল্লেখযোগ্য গেম কনসোল হলঃ XBox, Playstation, Nintendo, Wii ইত্যাদি।

হ্যান্ডহেল্ড গেম্স

হ্যান্ডহেল্ড গেমস হল এমন গেমস যা এক হাতে বহনযোগ্য এক প্রকার ছোট যন্ত্রে খেলা হয়ে থাকে। এসব যন্ত্রকে হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইস বলে। এ যন্ত্রে একটি স্ক্রিন, একটি স্পীকার এবং কিছু বাটন থাকে। ১৯৭০ সালে্র দিকে এসব গেমের উৎপত্তি ঘটে। ২০০০ সাল পর্যন্ত এসব গেম অনেক জনপ্রিয় ছিল। মোবাইল গেমসের আবিষ্কারের পর এর জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। পরবর্তীতে কম্পিউটার গেমস, মোবাইল গেমস এবং কনসোল গেমসের উন্নতি ঘটায় এ জাতীয় গেম জনপ্রিয়তা হারায়। যেমন : Gameboy

মোবাইল গেম্স

যে সমস্ত গেম মোবাইল এ খেলা হয়ে থাকে তাকে মোবাইল গেম বলে। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এ জাতীয় গেমের উদ্ভব ঘটে। সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত মোবাইল গেম ছিল Tetris যা Hagenuk MT-2000 ফোনে ১৯৯৪ সালে প্রথম পাওয়া যায়। এরপর নোকিয়া তাদের Nokia 6610 ফোনে Snake গেমটি যুক্ত করে যা পরবর্তীতে অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করে। স্মার্টফোনের আবিষ্কারের পর মোবাইল গেমের জনপ্রিয়তা বহুগুনে বেড়ে যায়। বর্তমানে এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় গেম প্লাটফর্ম। বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় মোবাইল গেমগুলো হলঃ Clash Of Clans, Clash Royale, PUBG MOBILE, FreeFire, Among Us ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় “PUBG” ও “FreeFire”

ভিডিও গেম আসক্তি মানসিক রোগ

ভিডিও গেমের প্রতি শিশু-কিশোরদের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। তবে এই আসক্তিকে সম্প্রতি ‘মানসিক রোগের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি জানায়, গেমিংয়ে আসক্ত ব্যক্তি মূলত অন্য সব কিছুর প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে। এছাড়া কারো সঙ্গে মিশতে না পারা, ঘুম, খাওয়া-দাওয়ায় অনিয়ম তো রয়েছেই।

মেজাজ খিটখিটে বানায় ভিডিও গেমস্

যুদ্ধের গেম খেলতেই বেশি আগ্রহ শিশুদের। প্লে-স্টেশনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তৈরি করা একটা গেমের প্রায় পুরোটা জুড়েই দেখা যায় যুদ্ধ সহিংসতা আর রক্তপাত। এই খেলাগুলো আসলে শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

প্রতিনিয়ত এসব ভিডিও গেম খেললে শরীরে এক ধরণের হরমোন নি:সরণ হয়। এতে শিশু সব কিছু নিয়েই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। বাবা মায়ের অবাধ্য হয়ে যায়। মেজাজ খিটমিটে হয়ে যায়।

গেমিং ডিজঅর্ডারের লক্ষণ কী?

‘গেমিং ডিজঅর্ডার’ এর বিভিন্ন লক্ষণ রয়েছে। লক্ষ্য রাখতে হবে শিশু কতটুকু সময় ধরে গেম খেলছে। মা-বাবা খেলা বন্ধ করতে বললে সে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়। কিছু কিছু বাচ্চা আছে যাদের গেম খেলতে নিষেধ করলে তারা ভীষণ রেগে যায়, ভীষণ চেঁচামেচি করে। সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে সে হয়তো গেমে আসক্ত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে গেমারদের দুই থেকে তিন শতাংশ ‘গেমিং ডিজঅর্ডারে’ ভোগে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় তো সরকার এমন আইন করেছে যাতে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুরা মধ্যরাত থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত অনলাইন গেম খেলতেই না পারে। জাপানে কেউ যদি একটি নির্দিষ্ট সময়ের বেশি গেম খেলে তাকে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। চীনের ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠান টেনসেন্ট শিশুরা কতক্ষণ গেম খেলতে পারে তার সময় বেঁধে দিয়েছে।

ভিডিও গেমস পছন্দের কারণ

কোন কারন ছাড়া আপনার বাচ্চা ভিডিও গেমস পছন্দ করে এটা আসলে সম্ভব নয়। এমন হতে পারে সে হয়তো তার বন্ধুদের সাথে ভিডিও গেমস এর বিভিন্ন সমস্যা এবং সমাধান নিয়ে আলোচনা করতে পছন্দ করে অথবা এমনও হতে পারে যে আপনার বাচ্চা ভিডি গেমসের বিভিন্ন লেভেল গুলো একের পর এক অতিক্রম করে সর্বশেষ লেভেল এ পৌছানোকে অনেক দুঃসাহসিক এবং প্রচন্ড আত্মসম্মানের কাজ মনে করে।

শিশুরা জন্মগত ভাবেই প্রচন্ডরকম কল্পনাপ্রবণ এবং কৌতুহলী। শিশুদের এই বৈশিষ্ট্যগুলোর কথা মাথায় রেখেই ভিডিও গেমসগুলোর ডিজাইন করা হয়েছে তাদের সহজাত কল্পনা এবং কৌতুহল মেটানোর উপায়ে গেমস গুলোকে তাদের কাছে উপভোগ্য করে তুলতে।

ভিডিও গেমসের অসুবিধা

ভিডিও গেমসের অনেক নেগেটিভ প্রভাব বাচ্চাদের এমনকি প্রাপ্তবয়স্কদের উপরেও রয়েছে। ভিডিও গেমসের অসুবিধাসমূহ হচ্ছে-

অনলাইন ভিডিও গেমস খেলার সময় বাচ্চারা বিভিন্ন এগ্রেসিভ অনলাইন কন্টেন্ট দেখার সুযোগ পায়। এসব ভায়োলেন্ট কন্টেন্ট দেখার ফলে বাচ্চাদের বিভিন্ন শারীরিক এবং মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।

“গ্র্যান্ড থিফ অটো” এবং “কল অফ ডিউটি” এর মতো ভিডিও গেমসগুলি বাচ্চাদেরকে অনলাইনে গুলি করার এবং হত্যা করার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যা শিশুর কোমল বিকাশের অন্তরায়।

নিউরোসাইকোলজিস্ট আলভারো বিলবাও এর মতে অনস্ক্রিন যে কোন নতুন প্রযুক্তি আমাদের প্রচণ্ড অধৈর্য্য করে তোলে এবং হতাশা সহ্য করার সহনশীলতা ও অনেক হ্রাস করে। এছাড়া এসব প্রযুক্তি আমাদের মস্তিস্কের এমন এক অংশকে শান্ত করে রাখে আসলে সেটার শান্ত না থেকে নিয়মিত কাজ করা উচিৎ।

যে কোন ভিডিও গেমসের কোন স্তর উত্তীর্ণ হতে পারলে খেলোয়ারদের মস্তিস্কে ডোপামিন নামক এক আনন্দ হরমোন এর নিঃস্বরন বেড়ে যায়।  এই ডোপামিনের দীর্ঘমেয়াদি নিঃস্বরণ নিঃসন্দেহে ভিডিও গেমসের প্রতি মানুষের এডিকশন প্রবলবেগে বাড়িয়ে দেয়।

২০১১ সালের মে মাসে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য ওয়্যারলেস ডিভাইসগুলিকে কে সম্ভাব্য কারসিনোজেন হিসেবে ঘোষনা করে। এসব ডিভাইস সাধারণত এক বৈদ্যুতিক অতীচৌম্বকীয় বিকিরণ নির্গমন করে যেটা আমাদের জন্য কারসিনোজেনিক। এ জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এসব ডিভাইস কে ক্লাস টু-বি কারসিনোজেন ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত করে রেখেছে।

ভিডিও গেমস আসক্তি

ভিডিও গেমসের আসক্তির প্রধান সংবেদনশীল লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, খেলতে না পারলে অস্থিরতায় ভোগা এবং প্রচণ্ড বিরক্ত হওয়া। এছাড়া পরবর্তী সেশনের চিন্তা অথবা পূর্ববর্তী এক্টিভিটির চিন্তায় সবসময় বিভোর হয়ে থাকা।

ভিডিও গেমস এ ব্যয় করা সময়ের লাগাম টেনে ধরার জন্য যে কোন প্রাপ্ত বয়স্ক অথবা বাচ্চাদের ক্ষেত্রে যা করণীয় তা হলো, প্রথমেই ভিডিও গেমস খেলার জন্য নির্দিষ্ট কোন সময়সীমা বেঁধে নেয়া এবং এই সময়সীমায় মেনে চলার ক্ষেত্রে নিজেকে কঠোর হতে বাধ্য করা।

ফোন, ভিডিও গেমস খেলার ডিভাইস অথবা অন্যান্য অনলাইন ডিভাইসগুলো সব আপনার খাবার রুম আর বেড রুম থেকে দুরে রাখা। গান শোনা, প্রার্থনা করা, ব্যায়াম করা, ঘুরতে যাওয়া, বন্ধু অথবা পরিবারের অন্য সকল সদস্যদের সাথে গল্প গুজব করায় বেশী করে নিজেকে ব্যস্ত করা।

কম্পিউটার গেমস আসক্তি

কম্পিউটার গেম আসক্তি বলতে কম্পিউটারে অতিরিক্ত এবং অস্বাভাবিক গেমস খেলাকে বুঝায়। সত্যিকারের দুনিয়ায় বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকার পরিবর্তে একজন এডিক্টেড কম্পিউটার খেলোয়ার সবসময়ই কম্পিউটার গেম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আসক্ত খেলোয়ার প্রায়শই নিজেকে পরিবার এবং সমাজের অন্য সকল সদস্যদের থেকে দূরে রাখে। পরিবারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার পরিবর্তে সে ব্যস্ত থাকে কম্পিউটার গেমসে তার র‍্যাঙ্কিং ,উচ্চতর মর্যাদা এবং সফলতার চিন্তা নিয়ে।

কম্পিউটার গেমস এর আসক্তির চিকিৎসা এখনো তেমন প্রতিষ্ঠিত নয়।যাই হোক, ওয়ান টু ওয়ান কাউন্সেলিং এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পরামর্শ এখানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। কম্পিউটার গেমস এ আসক্ত একজন খেলোয়ারের একজন সাইক্রিয়াটিস্টের পরামর্শ নেওয়া অতীব জরুরী । একজন সাইক্রিয়াটিস্ট ভুক্তভোগীর সাথে বিস্তারিত কথা বলে তার আসক্ত হওয়ার লেভেল এবং রিকোভার করার পর্যায় ও ভালো বুঝতে পারবেন।

গেমস অ্যাপস

বছর কয়েক আগেও ভিডিও গেমস খেলার জন্য সিডি ইউজ করতে হতো। কিন্তু এখন বিভিন্ন গেমস এপসগুলো এখন সিডি ইনপুট না করেও, মোবাইল বা কম্পিউটারে গেমস খেলা যায়। প্রতিবছর অসংখ্য গেমস  অ্যাপস বাজারে বের হচ্ছে। শুধুমাত্র গেমিং এর জন্য বিভিন্ন গেমস এপস এর সুবিধা সহ কোন কোন সেলফোন এর ফিচার করে সেটা বাজারে উন্মুক্ত করা হয়েছে।

প্লে স্টোর গেমস

এটি আপনার অ্যান্ড্রয়েড চালিত ফোন, ট্যাবলেট বা অ্যান্ড্রয়েড টিভি ডিভাইসের জন্য অ্যান্ড্রয়েড গেমস এপস স্টোর। গুগলের অফিসিয়াল এই স্টোর এপস থেকে আপনি কম সময়ে, এবং নিরাপদে বিভিন্ন গেমস এপসগুলো ডাউনলোড করে নিতে পারেন।

ভিডিও গেমস আসক্তি থেকে বাঁচুন

ভিডিও গেমস আসক্তি একটি ভয়াবহ মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাধি যা অনেকের জীবনে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। একটি ভিডিও গেমস আসক্ত লোকের পক্ষে সাধারণত ১০ ঘন্টার বেশি গেমিং এ ব্যস্ত থাকা খুবই স্বাভাবিক , যা সাধারণত বেশীরভাগ রাত্রেই হয় এবং এজন্য অনেকে না ঘুমের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ও ভোগেন।

একজন ভিডিও গেমসে আসক্ত ছাত্র বা ছাত্রীর পড়াশোনা ঠিকমতো হয় না যার ফলে পড়াশোনা মাঝ পথে বন্ধ হয়ে স্কুল বা কলেজ থেকে ঝরে পরার সম্ভাবনা ও থাকে। উন্নত বিশ্বে এমনও নজীর আছে, অতিরিক্ত ভিডিও গেমস আসক্তির জন্য স্বামী স্ত্রীর বিবাহবিচ্ছেদ ও হয়ে গেছে।

ভিডিও গেমস আসক্তি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যার মধ্যে এখন আর সীমাবদ্ধ নেই, বরংচ এটি এখন একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধির মত নীরবে এক সকরুণ ধ্বংসের পথে আমাদের ক্রমশ টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তাই, এই ধ্বংস থেকে পরিত্রাণ পেতে এখনই আমাদের সবার সর্বোচ্চ সচেতন হওয়ার সময় এসেছে।

ভিডিও গেমসের নেগেটিভ যত দিক

ভিডিও গেমসের নেগেটিভ দিকগুলো নিয়ে নতুন করে আর কিছুই বলার নেই। কারণ আপনারা যারা অভিভাবক রয়েছেন কিংবা আমার মতো যারা অনেকদিন ধরে ভিডিও গেমস জগতে রয়েছেন তারা ভিডিও গেমসের নেগেটিভ দিকগুলো সম্পর্কে হালকা-পাতলা ধারণা রাখেন। তবুও আজকের টিউনে ভিডিও গেমসের নেগেটিভ দিকগুলো আমি তুলে ধরলাম:

কম্পিউটারের উপর চাপ

ভিডিও গেমস এবং শুধু গেমসের মধ্যে তুমুল পার্থক্য রয়েছে। যা আমরা সাধারণত বুঝতে পারি না। খেয়াল করে দেখবেন যে ভিডিও গেমস দুটি শব্দের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে, একটি হচ্ছে ভিডিও এবং অপরটি হচ্ছে গেমস। কোনো একটি কম্পিউটার গেম তখনই ভিডিও গেম হয় যখন সেটি থ্রিডি প্রযুক্তিতে হয়ে থাকে। বর্তমান যুগের ৯০% গেম হচ্ছে ভিডিও গেম, তাই এ নিয়ে বেশি কনফিউজ হবার কারণ নেই। আর বলা বাহুল্য যে সকল ধরনের ভিডিও গেমসই কম্পিউটারের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে বেশিক্ষণ সময় ধরে কোনো ভিডিও গেম চালিয়ে রাখলে দেখবেন যে কম্পিউটার স্বাভাবিকের থেকে বেশি হিট হচ্ছে বা বেশি চাপ নিচ্ছে। শুরুর দিকে এটি তেমন কোনো সমস্যা না হলেও পরবর্তীতে এটি কম্পিউটারের মারাত্বক সমস্যার দিকে ধাবিত হতে থাকে। তবে সীমিত ও সুস্থ নিয়মে ভিডিও গেম খেলতে কম্পিউটারে তেমন ক্ষতি হয় না।

ব্রেনের উপর চাপ

ভিডিও গেমস খেললে ব্রেনের ব্যায়াম হয় এটি টিউনের শুরু দিকে আমি বলেছি। কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই আপনি যখন জীমে তুলনামূলক ভাবে বেশিক্ষণ ধরে জীম করবেন তখন আপনার শরীলের উপর চাপ পড়বে, শরীল দূর্বল দূর্বল লাগবে। ঠিক তেমনটি বেশিক্ষণ ধরে ভিডিও গেমস খেললে লক্ষ্য করবেন যে মাথা ব্যাথা করছে, চোখ ব্যাথা করছে, মাথার তালু স্বাভাবিকের থেকে বেশি গরম হয়ে আছে।

টাকা পয়সা নষ্ট

আসলে কোনো ভিডিও গেমই কিন্তু ফ্রি নয়। Free to Play গেমসগুলোও কিন্তু ব্যবসায়িক চক্করের মাধ্যমে বানানো হয়ে থাকে। আপনি ভিডিও গেম ডিক্স হিসেবে কিনলে সেখানে টাকা খরচ হচ্ছে, অরিজিনাল ডিক্স কিনলে তো কথাই নেই একটি গেমের পেছনেই ২ হাজার থেকে ৪/৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে যায়।   নেট থেকে ডাউনলোডেও  খরচ হচ্ছে। কারণ পিসি অন রাখতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, ব্রডব্যান্ড লাইন হলেও একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নেটের বিলও এই গেমসের পিছনে খরচ হচ্ছে। আর যারা নিয়মিত গেমিং ক্যাফেগুলোতে গিয়ে গেমস খেলেন তারা একটু হিসেব করলেই বেরিয়ে যাবে প্রতিমাসে গেমিং ক্যাফেতে আপনার কত খরচ হচ্ছে।

কিশোর বয়সে উগ্রতা

অনেক ছেলেমেয়ে রয়েছে যারা ভিডিও গেমসকে শুধুমাত্র বিনোদনের জায়গা হিসেবে দেখে। আবার কিছু কিছু কিশোর বয়সী ছেলেমেয়ে রয়েছে যারা ভিডিও গেমসের প্রতি প্রায় নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তাদের জন্য ভিডিও গেমস বেশ বিপদজনক। তারা ভিডিও গেমসকে বাস্তবিক জীবনে প্রয়োগ করতে যায় এবং এটাই তাদের জীবনে বিপদের কারণ হিসেবে হয়ে দাড়ায়।

যেমন জিটিএ সিরিজের গেমসগুলো মারামারি বা সংঘর্ষমূলক হওয়ায় এখান থেকে সংর্ঘষগুলো শিখে নিয়ে এই কিশোর-কিশোরীরা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে যায় এবং তখনই তাদের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এছাড়াও ভিডিও গেমস খেলার সময় কেউ তাদেরকে কোনো কথা বললে বা প্রয়োজনে বিরক্ত করলে তারা অনেক উগ্রপন্থি হয়ে যায়। এমনি ভিডিও গেমস খেলার সময় তারা বাবা-মাকেও অমান্য করে বসে।

শরীর মোটা হয়ে যাওয়া

নিয়মিত ও দীর্ঘসময় ধরে ভিডিও গেমস খেললে শরীর মোটা হয়ে যাবার আশঙ্কা বেশি থাকে। আবার  যদি কোনো ভারী কাজ না করেন কিংবা ব্যায়াম না করেন তাহলে তো কথাই নেই। প্রোফেশনাল গেমার  ছাড়া যারা বিনোদনের জন্য নিয়মিত ভিডিও গেমস খেলে তারা অধিকাংশই স্বাস্থ্যবান ।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ক্ষতি

বেশিক্ষণ করে ভিডিও গেমস খেললে কিংবা ভিডিও গেমসের প্রতি নেশাগ্রস্ত হয়ে গেলে আপনার কিংবা আপনার ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার ক্ষতি হবেই।

গালিগালাজ ও অভদ্রতা

অপ্রাপ্তবয়স্করা যখন “প্রাপ্তবয়স্ক”দের জন্য নির্মিত ভিডিও গেমসগুলো খেললে খারাপ জিনিসগুলোই বেশি শিখবে। বড়দের গেম ছোটরা খেললে তা নেগেটিভ প্রভাব ফেলে। গালিগালাজ ও অভদ্রতা শেখে বেশি।

ভিডিও গেমস নিছক বিনোদন

ভিডিও গেমস যেন বিনোদন থেকে মৌলিক চাহিদা না হয়ে যায়। ভিডিও গেমস খেলবেন টাইম পাসের জন্য, লেখাপড়ার ক্ষতি করে কিংবা কাজের ক্ষতি করে ভিডিও গেমস খেলার কোনো অর্থই হয় না। ভিডিও গেমস আপনাকে বিনোদন ছাড়া আর কিছুই দিবে না। তাই ভিডিও গেমসকে বিনোদনের জায়গাতেই রাখুন।

ভিডিও গেমসের ব্যাপারে ইসলাম

কিছু কিছু ভিডিও গেম দেখায় সবাই শত্রু, এদের মেরে ফেলো। খেলে উঠে আশেপাশের সবাইকে অনেক সময় শত্রু মনে করে। আবার রেগে গেলে মনে হয় হাতে কিছু থাকলে গেমের মতো সবগুলোকে যদি শেষ করতে পারতাম! আবার কোনো কোনো গেমে কারো ঘরে ইচ্ছে মত ঢুকে তার সাথে সেক্স করা যায়। তখন উঠে মনে হয় যদি বাস্তবটাও এমন হতো!

 এসব গেম খেলতে খেলতে একসময় গেম আর বাস্তবতার মধ্যে কোন পার্থক্য মনে হয় না। গেমের একটা রেশ থেকেই যায়। কখন মারমুখো হয়ে যায়। কখন কার সাথে কী শুরু করেছেন সেই নিয়ন্ত্রন যদি না থাকে তার মানে  হারাম কাজে ডুবে গেছেন, শয়তানের পথে হাটছেন। ‘যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হয় আমি তার জন্যে এক শয়তান নিয়োজিত করি। অতপর সে তার সঙ্গী হয়।’ (সুরা যুখরুফ : আয়াত ৩৬)

যে কোন প্রকার জিনিষ যা আল্লাহ-কে বিশ্বাস অথবা তাকে মনে করা অথবা তাকে ভয় করা থেকে আপনাকে ভুলিয়ে রাখে, আল্লাহ-র উপর থেকে বিশ্বাস নষ্ট করে, আপনাকে মানুষ থেকে পশুর মত আচরণ করতে বাধ্য করে তাই হারাম।

ভিডিও গেমস খেলা কি হারাম?

ইসলামে দুই ধরণের খেলা জায়েজ। শারিরীক উপকার নিহিত। যেমন দৌড়, ফুটবল ও ক্রিকেট ও হতে পারে। দ্বীনের শত্রুর বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণমূলক খেলা। যেমন তীরন্দাজী, ঘোড় দৌড় ইত্যাদি। এসব খেলা জায়েজ থাকার জন্য শর্ত দু’টি। যথা- ফরজ ও ওয়াজিব কোন ইবাদতে বিঘ্ন না হতে হবে। এর সাথে আর কোন গোনাহের বিষয় মিলিত না হতে হবে। যেমন জুয়া, বেপর্দা ইত্যাদি। এছাড়া বাকি সব খেলাই অহেতুক হওয়ায় মাকরূহ বা নাজায়েজ।

ভিডিও গেম এ অনর্থক খেলার মাঝে শামিল। এর দ্বারা শারিরিক কোন উপকার নেই। অহেতুক সময় নষ্ট করা, তাই এটি অপছন্দনীয়। কিন্তু বর্তমানের ভিডিও গেমগুলোতে নানা ধরণের হারাম মিউজিক থাকে। যা সম্পূর্ণই নাজায়েজ। আর এসব মারামারি দৃশ্যগুলো বাচ্চাদের মন মগজে খুবই খারাপ প্রতিক্রিয়া  সৃষ্টি করে থাকে।

বাচ্চাদের প্রতিহিংসা পরায়ন, প্রতিশোধী মনোভাবাপন্ন বানিয়ে দেয়। এসব ভিডিও গেম এবং সিনেমাগুলোর এ্যাকশন দৃশ্যগুলোর কুপ্রভাবে কম বয়সী বাচ্চাদের দ্বারাও বড় বড় অপরাধমূলক কাজ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই এসব অহেতুক ভিডিও গেম থেকে বিরত রাখাই জরুরী। মোবাইল বা কম্পিউটারে যেসব খেলা হারাম বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত, হারাম কিছুর সংশ্লিষ্টতা থাকায় এগুলো খেলা জায়েজ নেই।

এতে সময়ের অপচয় রয়েছে, মেধার অপচয় রয়েছে। এটা এক ধরনের ভয়ানক নেশা হয়ে উঠেছে, যার কারণে শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক বা বয়স্কদের জন্য এটি ক্ষতিকর। ক্ষতিকর কাজগুলো ইসলামী শরিয়তের মধ্যে একেবারেই নিষিদ্ধ। এর মাধ্যমে আপনার কোনো উন্নতি হয় না। তবে সীমিত সময়ে বিনোদনের জন্য কেউ এটা করলে, জায়েজ হতে পারে। উত্তম হচ্ছে এটা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। যখনই এটা নিয়মিত করবে, তখনই এটি হারাম হয়ে যাবে। কারণ, এর মধ্যে ক্ষতি রয়েছে অনেক বেশি।

তথ্যসূত্র

trendybangla.com

zeenews.india.com

www.ntvbd.com

www.bbc.com/bengali

 

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *