নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবার

নৈতিকতার ইংরেজি Morality, ল্যাটিন শব্দ ‘মোরালিটাস’ থেকে আগত; যার অর্থ চরিত্র, ভদ্রতা, সঠিক আচরণ, ভাল বা সঠিক ও খারাপ বা ভুল বিষয়সমূহের মাঝে পার্থক্য। নৈতিকতাকে একটি আদর্শিক মানদণ্ড বলা যেতে পারে যা বিভিন্ন অঞ্চলের সামাজিকতা, ঐতিহ্য, সংষ্কৃতি, ধর্ম প্রভৃতির মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। আবার অনেক ক্ষেত্রে, সামগ্রিকভাবে সমগ্র পৃথিবীর জন্য কল্যাণকর বিষয়সমূহকেও নৈতিকতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। মানুষের সহজাত ও মৌলিক প্রবৃত্তি ও মনোবলই হলো নিয়ম। নিয়ম মেনে চলা বা রক্ষা করা থেকেই নীতি, মূলনীতি বা প্রণালী। নীতির প্রতি মূল্যায়ন, সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন থেকেই আসে নীতিবোধ ও আদর্শিক গুণাবলি। আর এই নীতিবোধ থেকেই নৈতিকতা। অর্থাৎ নিয়ম থেকে নীতি, আর নীতি থেকে নৈতিকতা। নৈতিকতা হলো নীতিবোধ ও গুণাবলির দর্শন অর্থাৎ জীবন দর্শন। জীবনকে সুপথে-সুকাজে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বৈশল্যকরণী। নীতি-নৈতিকতা শেখার ব্যবস্থা থাকা জরুরি, অনুশীলন ও চর্চা প্রয়োজন ।

সমাজে বসবাস

সমাজ ও জাতিসমূহের উন্নতি এবং মানুষের অন্তরের সুখ-শান্তি ও আনন্দ বিধানে আচার-আচরণের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত আচার-আচরণকে সবাই সম্মান করে এবং জীবনের কঠিন পথে অগ্রগতি সাধনে  নৈতিকতার বিধি মেনে চলা দরকার বলে বিশ্বাস করে। যারা নীতি-নৈতিকতার বিষয় খুব কঠোরভাবে মেনে চলে তারা ধর্ম-কর্ম না মানলেও মিথ্যা কথা বলে না, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে না, কোনো কাজের দায়িত্ব অর্পণ হলে যথাযথভাবে আঞ্জাম দেয় এবং সময়ের গুরুত্ব দেয়।

সমাজে বসবাসের জন্য অন্যের সাথে আচরণের দিকটিই প্রধান হয়ে দেখা দেয়। তাই জীবন পথে চলার জন্য ও শান্তি-মুক্তির জন্য উত্তম আচরণের গুরুত্ব অপরিসীম। সেই সর্বাপেক্ষা উত্তম যার নৈতিক চরিত্র ও আচরণ সবচেয়ে ভালো। চরিত্রবান ব্যক্তি বা চরিত্রে অধিকতর উত্তম ব্যক্তি সম্পর্কচ্ছেদকারীর সাথেও সম্পর্ক গড়তে পারে, সদা হাসি-খুশি থাকত পারে, বঞ্চিত করলেও তাকে দান করতে পারে এবং অন্যায় করলেও তাকে ক্ষমা করতে পারে। নীতি-নৈতিকতা সম্পন্নরা মানুষের সাথে এমন আচরণ করে যে, তাদের মৃত্যুতে অন্যরা কাঁদে এবং তারা বেঁচে থাকলে অন্যরা তাদের দীর্ঘায়ু কামনা করে। মন্দ-খারাপ-বদ স্বভাবের মানুষেরা ঘৃণিত ও নিকৃষ্ট। অশালীন ও অসভ্য আচরণকারীদেরকে মানুষ মন থেকে গ্রহণ করে না। নম্রতা ও দয়া প্রদর্শনকারী প্রকৃত কল্যাণ হাসিল করতে পারে।

অমায়িক ব্যবহার

কোনো ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎকালে কথা বলার সময় তিনি মুখ ফিরিয়ে না নেয়া পর্যন্ত নিজের মুখ ফিরিয়ে নেয়া, কেউ মুসাফাহা করার সময় সে হাত সরিয়ে না নেয়া পর্যন্ত নিজের হাত সরিয়ে নেয়া কিংবা উপবিষ্ট লোকদের দিকে পা ছড়িয়ে দিয়ে বসা ঠিক নয়। নম্রতা, ভদ্রতা ও বিনয় মানুষের মর্যাদাকে সুউচ্চ করে ও সম্মান দান করে। উত্তম আচরণ শুধু শরীরকেই সুস্থ রাখে না বরং জীবনোপকরণও বৃদ্ধি করে এবং বন্ধুত্বের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতাকে বাড়িয়ে দেয়।

অমায়িক ব্যবহারের ফলে অনেকে সম্পদশালী ও জনপ্রিয়ও হন। তাদেরকে ভালোলাগায় দূর- দূরান্ত থেকেও লোকজন তাদের কাছে আসে; কারণ তারা আনন্দদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেন, সানন্দ সম্ভাষণ জানাতে পারেন, অত্যন্ত আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন, অত্যন্ত হাসি-খুশি সহকারে সেবাযত্ন করতে পারেন, অন্যদের অন্তরকে নাড়া দিতে পারেন এবং প্রীতি-শুভেচ্ছার মনোভাব দেখাতে পারেন।

উত্তম আচার-আচরণের অধিকারীদের পরিপূর্ণ যুক্তিজ্ঞান ও বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা রয়েছে, তারা সচ্চরিত্রবান এবং উৎকৃষ্ট দ্বারা মন্দ প্রতিহত করতে সক্ষম। এরা অন্যকে অপমান করে না, কোনো অশ্লীল কাজ করে না, নিজেদের প্রতি অবিচার করে না, ভুল-ত্রুটি হয়ে গেলেও ক্ষমা প্রার্থনা করে, জেনে-বুঝে যা করেছে তার ওপর গোঁয়ারতুমি করে না, নিরপরাধকে অভিযুক্ত করে না।

চরিত্রবান হওয়া

চরিত্রবান হওয়া আসলেই কঠিন কাজ। সত্যিকার চরিত্রবানরাই সৎকর্মের নির্দেশ দেয়, অসৎ কর্মে নিষেধ করে, পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে, অপব্যয় করে না, কার্পণ্য করে না, মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে, যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে কাউকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। সচ্চরিত্রবানরা মেহমানকে সম্মান করে, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে, ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে, পুণ্য কাজে আনন্দিত হয় এবং কুকর্মে দুঃখিত হয়।

এরা অধিক লজ্জাশীল, অধিক উপদেশদাতা, স্বল্পভাষী, কর্মপ্রিয়, সত্যবাদী, সৎ, গম্ভীর, ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ, সন্তুষ্ট, সহনশীল, উত্তম সঙ্গী, পুণ্যবান, স্নেহশীল ও প্রফুল্ল। এরা কখনো কুভাষী, অপবাদদাতা, হিংসুটে, বিদ্বেষ পরায়ণ ও কৃপণ নয়। এরা মিষ্টভাষী, সবার সাথে কোমল আচরণকারী, অনুগ্রহপরায়ণ ও দয়ার্দ্রচিত্ত এবং রুক্ষ মেজাজ ও কঠিন হৃদয়সম্পন্ন নয়।

এরা কথা বলার সময় সতর্কতা অবলম্বন করে, ভালো কাজে নির্দেশ দেয়, মন্দ থেকে বারণ করে, সমবেদনা প্রকাশ করে দুঃখ-কষ্টসমূহ সহজ করে, প্রশংসার মাধ্যম বিদ্বেষ দূর করে, সংযত হয়ে কম কথা বলে, চিন্তা-ভাবনা করে কথা বলে, ভালো কাজের জন্য কথা বলে।  শুধু মুখের ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক খারাপ কাজ সংঘটিত হয়। চরিত্রবানরা এসব খারাপ কাজ সচেতনভাবেই এড়িয়ে চলে।

কথা কম বলা

কথা বলার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ইমাম গাজ্জালি বলেছেন: বিশটি গুনাহের কারণ হলো কথা বলা। আর এগুলো হলো : এমন কোনো বিষয়ে কথা বলা যে বিষয়ে জ্ঞান নেই। অযথা বা নিরর্থক কথা বলা। কোনো বাতিল বিষয় নিয়ে কথা বলা। তর্ক-বিতর্ক করা। ঝগড়া করা। বানিয়ে বা অতিরঞ্জিত কথা বলা। অশোভন শব্দ উচ্চারণ বা গালিগালাজ করা। অভিশাপ দেয়া। হারাম গান বা কবিতা পাঠ। অতিরিক্ত ঠাট্টা করা। ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ-উপহাস ও পরিহাস করা। গোপন কথা ফাঁস করে দেয়া। মিথ্যা ওয়াদা করা। মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা কসম করা। পরনিন্দা বা গিবত করা। কথা লাগানো বা চোগলখুরি করা। নিফাক বা দুই রকম কথা বলা। অপাত্রের প্রশংসা। কোনো বাছ-বিচার ছাড়া বা হিসাব ছাড়া কথা বলা। এমন কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করা যা তার নিজের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় অথবা অযথা প্রশ্ন করা।

আল্লামা মাকারেম সিরাজী এগুলোর সাথে আরও দশটি বিষয় যোগ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে: দোষারোপ করা বা অপবাদ দেয়া। মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া। আত্মপ্রশংসা করা। অশ্লীল কথা ছড়ানো, কুৎসা রটানো ও গুজব ছড়ানো। রূঢ় কথা বলা। অযথা পীড়াপীড়ি করা। আক্রমণাত্মক কথা বলা। এমন কারো নিন্দা করা যে নিন্দিত নয়; নন্দিত। অকৃতজ্ঞের মতো কথা বলা। বাতিলের প্রসার করা।  উপকারিতা ও অপকারিতার দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের কথাকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা : সম্পূর্ণ উপকারী কথা। সম্পূর্ণ অপকারী কথা। উপকারী ও অপকারীর মিশ্রণ। উপকারী অপকারী কোনটিই নয়। এই চারটি ক্ষেত্রের তিনটিতে নীরবতা অবলম্বন করার প্রয়োজন রয়েছে। কপটতা, কৃত্রিমতা ও বাহুল্যকথন দ্বারা কথা কলুষিত হওয়া যাবে না।

নীরব থাকা

ধৈর্য, জ্ঞান ও নীরবতা প্রজ্ঞার অন্যতম দিক। মানুষের ভালোবাসা অর্জনের জন্য নীরবতা একটি মাধ্যম অথবা প্রতিটি ভালো কাজের কারণ হলো নীরবতা। নীরবতা সুখের চাবিকাঠি ও ভুলের প্রতিষেধক, অজ্ঞের জন্য চাদর এবং জ্ঞানীর জন্য অলংকার। তবে যেখানে কথা বলা প্রয়োজন সেখানে চুপ থাকা উচিত নয় এবং যেখানে চুপ থাকা প্রয়োজন সেখানে কথা বলা ঠিক নয়। কথা বলা নীরব থাকার চেয়ে উত্তম যদি বক্তা তার কথা বলার পর নিরাপদ থাকে। যে ব্যক্তি বেশি কথা বলে সে সারাদিন কী কথা বলল তার মূল্যায়ন করার জন্য যথেষ্ট সময় পায় না।

অধিক কথা বলা বা বাচালতার জন্যই কথা ভিত্তিহীন ও ভুল হয়। শ্রোতারা বিরক্ত হয় এবং বক্তা তার কথার বলিষ্ঠতা হারায়। অধিক কথা বলা একজন জ্ঞানী ব্যক্তিকে বিপথগামী করে, একজন ধৈর্যশীল ব্যক্তিকে হতাশাগ্রস্ত করে, ভুল ও একগুঁয়েমি বৃদ্ধি করে, বাচালতা মানুষকে পীড়া দেয় ও মানুষও তাকে অসম্মান করে। সব সময় উপকারী ও সত্য কথা বলতে হবে এবং সে কথাই বলা প্রয়োজন যা অন্যের জন্য ক্ষতিকর নয়; কারও মনে আঘাত দিয়ে কোনো কথা না বলা, এমনকি ঠাট্টাচ্ছলেও কারও অনুভূতিতে আঘাত না করা; পশ্চাতে কারো নিন্দা না করা; যারা অপরের নিন্দা করে তাদের কথা না শোনা; কখনো গালিগালাজ না করা এবং যে ক্ষেত্রে বোঝা যাচ্ছে না কথা বলা উচিত কিনা, সেক্ষেত্রে নিশ্চুপ থাকাই কল্যাণকর। কেউ ভালো-মন্দ যে কথাই বলুক না কেন, কখনই উদ্ধতভাবে জবাব দেয়া উচিত নয়; তাকে তা বুঝিয়ে বলতে হবে।

রেগে না যাওয়া

রাগ মানুষের স্বাভাবিক আবেগের মধ্যে একটি। তবে অতিরিক্ত রাগ সম্পর্কের অবনতি ঘটায়, অন্যের কাছে অপ্রিয় করে তোলে আপনাকে। শুধু তা-ই নয়, শরীরেও কিন্তু এর বাজে প্রভাব পড়ে।  যাদের অতিরিক্ত রেগে যাওয়ার প্রবণতা আছে, তাদের হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি থাকে। অতিরিক্ত রাগ বা মেজাজ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়, বিষণ্নতা তৈরি করে, সুখ নষ্ট করে এবং আয়ু কমিয়ে দেয়। টানা দুই ঘণ্টা যদি কেউ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকে, তাহলে তার হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায় বহুগুণে। অতিরিক্ত রাগ মস্তিষ্কের ওপর চাপ ফেলে। মস্তিষ্কের রক্তনালিগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। টানা ছয় ঘণ্টা মন-মেজাজ খারাপ থাকলে বা রেগে থাকলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ হয় শরীরে। রাগে সমস্যা বাড়ে, মানুষের কাছে অপ্রিয় হতে হয়। তাইতো কথায় আছে, রাগলেন তো হারলেন।

হঠাৎ করে রেগে যাওয়ার কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়, হাসির পাত্র হতে হয়, পরিবার-আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। রাগের মাত্রা কমাতে হলে বলার আগে ভাবুন। রাগের মাথায় কিছু বলবেন না। তারপরে সেই কথা নিয়ে অনুশোচনার শেষ থাকে না। কিছু বলার আগে কয়েক মুহূর্ত সময় নিন, একটু ভাবুন এবং অন্যদেরও ভাবার সুযোগ দিন। মাথা ঠাণ্ডা হলে তবেই রাগের প্রকাশ করুন। বিরক্তি প্রকাশ করুন, কিন্তু যুদ্ধের মেজাজে নয়। যত রাগই হোক, অন্যকে অপমান করবেন না। শরীর চর্চা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। কয়েক চক্কর হেঁটে আসুন, কিছু ব্যায়াম করুন- রাগ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। দিনের যে সময়টা ভয়ানক স্ট্রেসের সে সময় নিজেকে কিছুটা ব্রেক দিন। নিজের জন্য শান্ত কিছু সময় বিরক্তিকর অনেক কিছু থেকে মুক্তি দেয়, রাগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

কী কারণে আপনি রেগে যাচ্ছেন সে বিষয়ে মাথা না ঘামিয়ে কিভাবে সমস্যার সমাধান হবে তা নিয়ে মনোযোগী হোন। সমাধান খোঁজার চেষ্টা করুন। অন্যের নিন্দা বা সমালোচনা না করে নিজের পছন্দ-অপছন্দ পরিষ্কার করে জানান। নির্দিষ্ট করে আপনার চাহিদাটা জানান। রাগ পুষে রাখবেন না। ক্ষমা করতে শিখুন। নিজের ব্যবহার নিয়েও খুঁটিয়ে ভাবুন। সবাই সব সময় আপনার মতই ভাববে এতটা আশা করা ঠিক নয়। টেনশন কমাতে হাসি-ঠাট্টার আশ্রয় নিন। তবে নিজের চাপ বা রাগ কমাতে গিয়ে অন্যের অনুভূতিকে আঘাত করে ব্যঙ্গ না করাই ভালো। রিল্যাক্সড হওয়ার কিছু স্কিল প্র্যাকটিস করুন। জোরে জোরে গভীর নিঃশ্বাস ফেলুন। মজার কোনো দৃশ্য ভাবুন। গান শুনুন, বই পড়ুন, যা যা করতে ভালোলাগে সে দিকে বেশি করে মন দিন। যদি কোনোভাবেই আপনার রাগ নিয়ন্ত্রণে না আসে, যদি আপনার রাগ আপনার বা অন্যদের লাগাতার ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

কর্কশ আচরণ না করা

দৃষ্টিতে, কথায়, বক্তব্যে, কর্মকাণ্ডে, অভিব্যক্তি এমনকী নীরবতায়ও কর্কশতা ফুটে উঠতে পারে। অথচ আবেগ, দেখা-সাক্ষাৎ কোমল হলেই কেবল শুধু ভুল ধরিয়ে না দিয়ে ভালো দিকটাতেও আলোকপাত করা সম্ভব। গালাগালি, চিৎকার ও রাগারাগি কর্কশ আচরণ কখনই নয়। মনোযোগ দিয়ে শোনার নমনীয়তা থাকতে হবে, মোলায়েমভাবে কথা বলতে হবে। প্রিয়জন নিহত হলেও শান্ত থাকতে হয়; অথচ কত তুচ্ছ কারণে মেজাজ খারাপ করে ফেলি। রুক্ষ, নীচ, নোংরাভাবে, খুব উচ্চস্বরে কথা বলা, মুখ থেকে থু থু ছেটানো খুবই খারাপ আচরণ। বকাঝকার করতে পারা, রাগতস্বরে কথা বলার মানেই হলো মনে কাঠিন্য বা খারাপ ভাবনা থাকা। কারোর ওপর থেকে মন উঠে গেলে, মনের মধ্যে রাগ ধরে রেখে, ঘৃণা পুষে রেখে তাকে ত্যাগ করে ফেলার মতো অন্তরের কঠোরতাও দেখা য়ায়। মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও নিজের সমালোচনা করতে ব্যর্থরাই অল্পতেই রেগে গিয়ে সম্পর্ককে নষ্ট করে; কাচপাত্র ভেঙে গেলে টুকরাগুলো জোড়া লাগাতে না পারার মতোই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে পারে না। ভালো আচরণ করা, দোষত্রুটি মাফ করা ও ক্ষমা করার ক্ষেত্রে উদার হতে হবে। রাগকে দমন করতে ও ঘৃণার আগুন নিভিয়ে দিতে সাধ্যমতো চেষ্টা করা উচিৎ।

ধৈর্য ধারণ করা

ধৈর্য না থাকলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো কাজ করা সম্ভব নয়।  ধৈর্যশক্তি বাড়াতে নিয়মিত ডায়েরি লেখার অভ্যাস করুন। বিশেষ বিশেষ দিনের ঘটনা, যে ঘটনা খুব ভাবাচ্ছে তা বিস্তারিত লিখে রাখুন। বই পড়া ধৈর্যশীল হবার অন্যতম উপায়, যা মানসিক চাপ কমায়ে মনকে ধীর স্থির করে তোলে। যেকোনো মানসিক চাপ থেকে মুক্তির উপায় হলো মেডিটেশন বা ধ্যান। আত্মবিশ্বাস ও ধৈর্য বাড়ায়, সফলতা অর্জনে সাহায্য করে; তাই আত্মবিশ্বাসী হোন। শরীর ও মন ভালো রাখতে নিজেকে সময় দিন, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নিন, কাজের ব্যস্ততায় নিজেকে ভুলে যাবেন না, নিজের প্রতি মনোযোগ দিন। অন্যের সাথে কখনোই নিজের তুলনা করবেন না।

বাস্তববাদী হয়ে উঠুন। ঘটে যাওয়া ছোট কোনো ঘটনা নিয়ে মন খারাপ করবেন না। ভবিষ্যৎ নিয়েও হা-হুতাশ করবেন না। সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। ধৈর্য হারালে হারায় মেজাজ, হারায় মানসিক প্রশান্তি, জীবনে আনে বিড়ম্বনা। ধৈর্য ধরা কঠিন হলেও আখেরে লাভ ধৈর্যশীলেরই। ধৈর্য বাড়াতে অপেক্ষা করতে শিখুন। অপেক্ষা দীর্ঘমেয়াদিভাবে মানুষকে সুখী করে। মানসিক চাপ থেকে  ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। মানসিক চাপ কমানোর উপায় হলো অপ্রয়োজনীয় কাজগুলো না করা এবং জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আগে শেষ করা। অধৈর্য হবেন না, অস্থিরতার অনুভূতি কমান, শিথিল থাকার চেষ্টা করুন, গভীরভাবে শ্বাস নিন, শান্ত থাকুন, অবশ্যই  স্বস্তি মিলবে।

ধৈর্য ধরুন; থেমে যাবেন না। ধৈর্য কম থাকায় একটু বেশি তাড়াহুড়ো করার প্রবণতায় আক্ষেপই করতে হয়। নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিটা বেশি শক্তিশালী হলে সরল ব্যাপারও সঠিকভাবে  বোঝার বিবেচনা শক্তি থাকে না। পরিবর্তনের জন্য নেয়া  উদ্যোগে শতভাগ সফলতা নাও আসতে পারে- এটি মানতেই হবে। বীজ বপন করলে গাছ জন্মানো কিংবা ফল ধরার সম্ভাবনাও থাকে। তবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের সময়টুকু অপেক্ষা করতে হয়। সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন (!) কেউ কান চিলে নিয়েছে শুনেই কানে হাত না দিয়ে চিলের পিছনে ছুটবে না।

পরের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে তৃপ্তি পাওয়া ও অপরের আত্মমর্যাদায় আঘাত দিয়ে আনন্দ লাভ করা নিজের সম্মান, ব্যক্তিত্ব রক্ষা ও বিকাশেও সুবিধের নয়। উন্নত দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারীরাই মানুষ হিসেবে বড় হতে পারে, সত্যিকারের বিজয়ী হতে পারে এবং সাফল্যের ভয়কে জয় করতে পারে।  সে ব্যর্থতা আসলেই ভেঙ্গে পড়ে না, হতাশ হয় না। পরাজয় থেকেও শিক্ষা নিয়ে সমৃদ্ধ হয়। সমস্যা-ত্রুটি চিহ্নিত করে সমাধান কৌশল বের করে। আর বিজয়-সফলতা আসলে নতুন প্রেরণা লাভ করে। কথায় বলে, সবুরে মেওয়া ফলে। অল্পতেই হতাশ হয়ে ধৈর্য হারিয়ে ফেললে সফলতা আসে না।

কঠোর পরিশ্রম

কঠোর পরিশ্রমে অসাধ্য সাধন করা যায়। বেশি প্রতিভাবান, মেধাবী ও সুযোগ প্রাপ্ত মানুষকেও পেছনে ফেলে সেরা হয়ে উঠা যায়। পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি।  কঠোর পরিশ্রমের ক্ষেত্রে শারীরিক শক্তির পাশাপাশি মানসিক শক্তি ও বেশকিছু নিয়ম ও শৃঙ্খলা জড়িত। বড় কাজগুলোকে ছোট ছোট কাজে ভাগ করা এবং সেগুলো পূর্ণ মনোযোগের সাথে সম্পন্ন করতে হবে। সব সময়েই একসাথে একাধিক কাজ করলে দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যাবেন, মস্তিষ্ক কোনো কাজেই ঠিকমত ফোকাস করবে না। তাই একই সময়ে মাত্র একটি কাজেই মনোযোগ দিন। কাজের সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া চেক করা ও চ্যাট করা থেকে বিরত থাকুন।

কাজের সাথে সম্পর্কিত না হলে ফোনে কথা বলবেন না। শরীরকে চাঙ্গা রাখতে রিচ ফুড পোলাও, মাংস, বেশি তেল দেয়া খাবার এবং ফাস্টফুড ও কোমল পানীয় পরিহার করুন। কারণ ওজন বেড়ে গেলে বা থাইরয়েড হরমোন সঠিকভাবে        নিঃসরণ না হলে অল্প কাজেই ক্লান্ত হবেন, শরীরের জয়েন্টগুলো সব সময়ে ম্যাজম্যাজ করবে, মেমোরি ঠিকমত কাজ করবে না, দীর্ঘ সময় ধরে পরিশ্রম করতে পারবেন না। মাংসের বদলে ডিম ও মাছ খাওয়ার অভ্যাস করুন। ফুলকপি, বাঁধাকপির মতো সবজি কম খেয়ে- মিষ্টি কুমড়া, সবুজ শাক, ফল জাতীয় সবজি-পটোল, বরবটি ইত্যাদি বেশি করে খান।

সারাদিন চাঙ্গা থেকে কাজ করতে সকালের নাস্তা করুন। চা-কফি খাওয়া কমিয়ে দিন। প্রচুর পানি পান করুন। গ্রিন টি খাওয়ার অভ্যাস করুন। একটানা অনেকক্ষণ কাজ করলে একঘেয়ে লাগে, মনোযোগ নষ্ট হয়ে যায়। মনোযোগ ধরে রাখতে ও দ্রুত ক্লান্ত  না হতে নির্দিষ্ট সময় পর পর অল্প সময়ের ব্রেক নিয়ে আবার কাজ করুন। প্রতি আধা ঘন্টা পরপর ৫/৭ মিনিটের জন্য একটু হাঁটাহাঁটি করলে, বা চোখ বন্ধ করে থেকে আবার কাজে বসেন- তবে আপনি আবার প্রথমবারের মতো গভীর মনোযোগ দিতে পারবেন। এটা একদম পরীক্ষিত কৌশল।

পরিশ্রম করার ক্ষমতাকে ধরে রাখতে বিশ্রাম ও ঠিকমত ঘুমকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রাতে ৮ ঘন্টা ঘুমানো উচিত।  তা না পারলেও অন্তত ৬ ঘন্টা ঘুমাতেই হবে। সকাল সকাল ঘুমিয়ে সকাল সকাল ওঠার অভ্যাস না করতে পারলে কাজের সময়ে শরীর ও মস্তিষ্ককে পূর্ণ মাত্রায় খাটাতে পারবেন না। পরিশ্রম শেষের ফলাফল ভেবে কাজ করুন। আসলে কঠোর পরিশ্রম যারা করেন তারা সব সময়ে পরিশ্রমের ফলাফলের দিকে চোখ রাখেন। দীর্ঘ সময় কঠোর পরিশ্রমের শক্তি ধরে রাখতে ফিট থাকার কোনো বিকল্প নেই।  আর ফিট থাকতে হলে নিয়মিত শরীরচর্চা অবশ্যই করতে হবে।

বেস্ট সেলিং লেখক হ্যাল ইলরোড১১৭  তার ‘মিরাকেল মর্নিং’ বইয়ে লিখেছেন যে, প্রতিদিন সকালে কিছুটা সময় ব্যায়াম বা শরীরচর্চা করলে সারাদিনে ক্লান্তি সহজে আপনাকে কাবু করতে পারবে না। দিনের শুরুতে যদি মাত্র ১০ মিনিট এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কিছু হাল্কা এক্সারসাইজ করেন, তবে সারাদিন আপনার শরীর অনেক বেশি চাঙ্গা থাকবে। পরিশ্রমী মানুষদের সাথে চলার চেষ্টা করুন, এতে নিজের মাঝেও পরিশ্রম করার ইচ্ছা আর অভ্যাস সৃষ্টি হবে।

ক্ষমা করা

মানুষের বহু গুণের মধ্যে একটি ক্ষমাশীলতা। ক্ষমা করে দিলে দ্বন্দ্ব মিটমাট হয়। পছন্দনীয় মানুষকে ক্ষমা করে দেওয়ার প্রবণতা বেশি কাজ করে। কিন্তু অপরিচিত মানুষকে সহজে ক্ষমা করতে চাই না আমরা। সমাজের অল্প কিছু মানুষের মধ্যে কম-বেশি ক্ষমা করে দেওয়ার গুণ বিদ্যমান। প্রতারণা, মিথ্যা, প্রতিজ্ঞা ভাঙা ইত্যাদি ক্ষমার অযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়। সিদ্ধান্ত নিয়ে কাউকে ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয়টি যার যার মনের ওপর নির্ভর করে। আবেগীয় ক্ষমার বিষয় মনের আবেগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কম বয়সী শিশুদের মাঝে ক্ষমাশীলতা সবচেয়ে বেশি কাজ করে। ২-৩ বছর বয়স থেকেই মানুষের মাঝে ক্ষমা অনুভূতি কাজ করতে থাকে।

ক্ষমা না করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত মানুষকে হালকা হতে দেয় না। দৈহিক শক্তি ও সামর্থ্য কমিয়ে দেয়। আত্মকেন্দ্রিক মানুষরা অন্যকে বেশ সহজে ক্ষমা করে দিতে পারেন। আবার বহির্মুখী মানুষরা অন্যের কাছ থেকে ক্ষমা বেশি বেশি আশা করেন। ক্ষমা করে দেওয়ার গুণ হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখে। ক্ষমা করে দিতে পারলে উচ্চ রক্তচাপ কমে আসে এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। ঘন ঘন ক্ষমা চাওয়া ভালো দেখায় না। কিছু হলেই যদি  ক্ষমা চাইতে থাকে, তবে অন্যরা মনে করতে পারেন যে এটি তার স্বভাব।  আসলে যা বলছে তা মেনে কাজ করছে না। ধর্মভীরু মানুষদের মধ্যে অন্যদের চেয়ে বেশি ক্ষমাশীলতার চর্চা করতে দেখা যায়।

পেশাগত মূল্যবোধ

চার্লস ডিকেন্স বলেছিলেন, জীবনের চারটি জিনিস ভাঙার সময় কোনো ধরনের শব্দ হয় না; কিন্তু এর পরিণাম হয় খুবই বেদনাদায়ক। তা হলো বিশ্বাস, সম্পর্ক, হৃদয় ও প্রতিজ্ঞা। এগুলোর মূল শেকড় গ্রথিত পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের ভেতর। কর্মকাণ্ড নীতি, সততা ও আদর্শবর্জিত হলে মানবিকবোধগুলো অহর্নিশ ক্ষয় হয় নীরবে, নিভৃতে। জন্ম হয় দেশে দেশে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সন্ত্রাসবাদ আর অনৈতিকতার।

যেকোনো পেশাজীবীর অসততা ও অনৈতিকতার কর্মফল সভ্য সমাজ গড়ার অন্তরায়। একজনের আদর্শচ্যুতি অন্যদের চিন্তা-চেতনা-ধ্যান-ধারণা ও মননশীলতার উর্বরতা বিনষ্ট করে, শারীরিক-আর্থিক ক্ষতির মাধ্যমে প্রাণও বিনষ্ট করে। প্রতিটি পেশাই সুনির্দিষ্ট কিছু মূল্যবোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, পেশার সততা-নৈতিকতা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। হোক রাজনীতিবিদ, চিকিৎসক, শিক্ষক, আইনজীবী বা সরকারি কর্মকর্তা।

সততা

সম্মান ও সততা শব্দ দুটি একই মুদ্রার দুই পিঠ। সম্মানিত হতে চাইলে অবশ্যই সৎ হতে হবে। এর অর্থ হলো সততার সঙ্গে চলা, সত্য কথা বলা। সততার গুণে মানবজীবন সুন্দর ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সততা বজায় রাখতে গিয়ে মাশুলও দিতে হতে পারে। ‘খুব ছোটবেলায় জর্জ ওয়াশিংটন একবার একটা চেরিগাছ কেটে ফেলেছিলেন। ভীষণ রেগে গিয়েছিলেন তার বাবা। ছোট্ট ওয়াশিংটন তখন বলেছিলেন,‘আমি মিথ্যা কথা বলতে পারি না। হ্যাঁ, আমিই গাছটা কেটেছি।’ বাবা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘তোমার এই সততার দাম হাজারটা গাছের চেয়ে বেশি।’

সৎ ও কর্মনিষ্ঠ ব্যক্তির জীবন ব্যর্থ হয় না। সফলতার জন্য শর্টকাট পথ খোঁজা, মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে এগিয়ে গেলে প্রকৃত সফলতা আসে না। অসততার আশ্রয় নিয়ে সাময়িক সুবিধা লাভ করলেও ভেতরটা ফাঁপা হওয়ায় বেশি দূর যাওয়া যায় না। সততা অনেকগুলো গুণের সমাহার। সত্যনিষ্ঠা, আন্তরিকতা, স্পষ্টবাদিতা, সরলতা, নিরীহতার যে কোনো একটি বা একত্রে সব কটিই সততার ভেতর পড়ে। সততা হচ্ছে- সত্যের অনুসারী মানুষের সৎ থাকার প্রবণতা, অন্যায়-অনাচার থেকে সাবধানে দূরে রাখা, অবৈধ কাজকর্ম থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা, ন্যায় ও সত্যের প্রতিফলন ঘটানো, চরিত্রের বিকাশ ঘটানো এবং সৎ ও আদর্শ জীবন যাপন ইত্যাদি।

সততার বৈশিষ্ট্যময় জীবন যার তিনি সত্যবাদী, বিবেকবান, মিথ্যার আকর্ষণকে পাত্তা দেন না, টাকার কাছে বিক্রি হন না, উন্নতির জন্য তাড়াহুড়া করেন না, ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দেন না, ধনী হতে অসৎ পথে চলেন না এবং অন্যায়কে ঘৃণা করেন। মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটলে সততা বিদায় নেয়। জীবনের সার্থকতার জন্য, ন্যায় ও সত্যের পথে জীবন পরিচালনার জন্য এবং অন্যায়-অবৈধ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য সততা অ­­­­­ত্যাবশ্যক। পারিবারিক পরিবেশ হতে হবে সত্যবাদী ও সততার অনুকূলে। অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুদের সত্যবাদী ও সৎ হতে শিক্ষা দেবে।  সততা সুন্দর, সততা মহান। চরিত্রকে মহিমান্বিত করতে, জীবনকে সফলতায় ভরে দিতে এবং সুখী-সমৃদ্ধ-সুন্দর জীবনযাপন করতে সততার চর্চা অপরিহার্য।

সততা ও সত্যবাদিতার জন্য মানুষ সকলের প্রিয়পাত্র হন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সততার পরিচয় দেয়া, ছেলেবেলা থেকেই সৎ থাকার অভ্যাস করা, সততার অনুশীলন করা দরকার। সুখী-সফল-সার্থক-সমৃদ্ধ ও সুন্দর জীবনযাপনের জন্য আমাদের সততা অর্জনে ব্রতী হতে হবে, সৎ থাকার অভ্যাস করতে হবে। সৎ গুণসম্পন্ন মানুষ চরিত্রবান ও মহৎ হওয়ায় সমাজে সবার বিশ্বাসভাজন হয়ে থাকে। সততা মানুষকে নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান করে থাকে। সৎ ব্যক্তি কখনো অন্যায় ও অসত্যর কাছে মাথানত করে না।

ব্যবসায়ীর সততা খুব গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে; বাড়ছে রোগের প্রকোপ। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে বাজারে বিক্রি হওয়া খাদ্যপণ্যের শতকরা ৫০ শতাংশ ভেজাল। মধু-ঘি-আচারে মরিচ আর তেঁতুলের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু এসবের ফ্লেবার। ৫ কেজি ময়দা, রঙ আর একটি টমেটো দিয়ে বানানো হয় এক ড্রাম সস। রাস্তায় হকারদের ১ মিনিটে দাঁত পরিষ্কার করার ওষুধ আর মুড়ি সাদা করতে ব্যবহার করা হয় হাইড্রোজ। চিটা গুড় দিয়ে তৈরি হয় তালমিস্ত্রি। ইথালিন দিয়ে ৩৫ ধরনের ফল পাকানো হয়। মাছে ফরমালিন, ফল ও শাকসবজিতে কার্বাইড, তৈরি খাবারে ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ও রঙ মেশানো হয়। ভেজাল খাদ্যের কারণে মানুষের ডায়রিয়া, আমাশয়সহ পেটের পীড়া হচ্ছে। ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ও রঙ মিশ্রিত খাদ্য নিয়মিত গ্রহণের ফলে হৃদরোগ, কিডনির রোগ; ক্যান্সারেও আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ।

নিজের পায়ে দাঁড়ান

পরের উপর ভরসা করার অর্থই হচ্ছে- নিজেকে তুচ্ছজ্ঞান করা। বিতর্ক এড়িয়ে চললে বিপদও এড়ানো যায়। নিজের প্রতি বেখেয়াল থেকে অন্যের প্রতি খেয়াল রাখা যায় না। অন্যের সাথে তুলনা করে নিজেকে অবমূল্যায়ন করবেন না। নিজেকে যে মূল্যহীন ভাবে সে মূল্যায়ন পায় না। বিক্রি হওয়াটাই লজ্জার, আর কম দামে বিক্রি হওয়াটা আরো বেশি লজ্জাষ্কর। এগিয়ে যেতে লড়াইয়ের সময় এখনই, বর্তমানকে উদযাপন করুন। অন্যের মানসিকতা পরিবর্তনের চেষ্টার চেয়ে নিজের মানসিকতায় পরিবর্তন আনুন। আপনার কাজেই আপনার পরিচয়, প্রশংসা বা নিন্দায় নয়। সবার পছন্দের হতে চায় যে সে ব্যক্তিত্বহীন। মানুষের ভুল হবেই, মানুষতো ফেরেশতা নয়! ভুলের ওপর স্থির থাকা শয়তানের লক্ষণ। কৃতজ্ঞ মন নিশ্চিন্ত জীবন যাপনে সক্ষম। সীমাবদ্ধতা আছে বলেই সুযোগের সদ্ব্যবহার জরুরি। অন্যের বিশ্বাসের মর্যাদা দিন, আপনার বিশ্বাসের মর্যাদা মিলবে। আত্মার সৌন্দর্য যত বাড়াবেন, দৈহিক সৌন্দর্য তত পরাজিত হবে। ধোঁকা দেয়ার বুদ্ধি কিংবা ধোঁকা খাওয়ার বোকামি দুটোই অগ্রহণযোগ্য।

সক্ষমতার উন্নয়ন

চিন্তা ছাড়া কর্ম ব্রেক ছাড়া গাড়ির মতো। নিখুঁত দেখাতে মুখোশ পরা বিপজ্জনক ভণ্ডামি। লোভ-লালসাকে দমন করে ভোগবিলাসে হেরে যাওয়াও বিজয়। চোখে দেখে পরিস্থিতি যেমন অনুভব হয় বাস্তবতা হতে পারে ভিন্ন। সাফল্য-ব্যর্থতা দুটোই ক্ষণস্থায়ী, তাই অতি আনন্দ ও হতাশা উভয়ই পরিত্যাজ্য। ধৈর্য বাড়লে আস্থা বাড়ে, সক্ষমতার উন্নয়ন হয়। পুঁজিবাদে যত বেশি দাম তত বেশি মূল্যবান। সঠিক উদ্দেশ্যে অন্তর আলোকিত, কাক্সিক্ষত ফলাফলে আবেদন অবিরত। লজ্জাহীন মানুষ পশুর চেয়েও অধম। অন্যের পতনে যে আনন্দিত হয়, তার উত্থানও বেদনার। যার অন্তর ঠিক নেই তার কিছুই ঠিক নেই। সুস্থ শরীরে অসুস্থ মন বিপদজনক আর অসুস্থ শরীরে সুস্থ মনও নিরাপদ। মসৃণভাবে জীবন পার কালে কঠিন দিন আসবে মনে হয় না।

চাহিদা সীমিত রাখা

চাহিদা সীমিত রাখতে পারা জীবনকে সহজ করে। অপূর্ণাঙ্গ জীবনকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টাতেই গতিশীলতা। অতৃপ্ত মন সহজেই প্রবৃত্তির দাস হয়ে পড়ে। চাওয়া যদি হয় অসীম, নিরিবিলি জীবন হয় কঠিন। যা আছে তা মূল্যায়নে অক্ষম যিনি, লোভ-লালসা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম নন তিনি। জনপ্রিয় হওয়া ও অন্যের স্বীকৃতি লাভ দ্বারা জীবনকে মাপবেন না। নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারাই বড় কৃতজ্ঞতা। অসৎ চরিত্রের মানুষ কখনই উত্তম মানুষ নয়। বিনয়ীরা নত হয়েই বড় হয়। অন্যের প্রতি নির্দয় হয়ে নিজের প্রতি সদয় আচরণের প্রত্যাশা অযৗক্তিক। লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত ব্যক্তি নিজের গন্তব্যে পৌঁছতে পারেন না। সমালোচনায় কান দিলে আলোচনার পাত্র হওয়া যায় না। ইতিবাচক কাজে লেগে থাকতে নেতিবাচক কথা শুনার মানসিকতা দরকার। নিন্দাও যাকে কর্মোদ্দীপ্ত করে সে কখনো নিরাশ হয় না।

সীমানা অতিক্রম না করা

দ্বিমুখী নীতি মানেই বড় ধরনের প্রতারণা। বিরক্তিকর জিনিসকে উপেক্ষা করে আগ্রহের কাজে মনোযোগ বাড়ান। আন্তরিক হলে ভিন্নমতের মানুষের সাথেও বন্ধন হতে পারে। আপনার সম্পর্কে অন্যে যা বলে আপনি আসলে তা নন, আপনি তাই যা আপনার অন্তরে দৃশ্যমান হয়। নিজের সীমানা অতিক্রম না করাই আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য। মিথ্যুক বিভ্রান্তি ছাড়ায়, মিথ্যা কষ্টদায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। চেহারার সৌন্দর্যের চেয়ে চরিত্রের মাধুর্যতা অধিক মূল্যবান। ফেসবুকে লাইক-শেয়ারের ওপর আত্মমর্যাদা নির্ধারিত হয় না। তুচ্ছ বিষয়ে অতি মনোযোগে জীবন হয় উত্তাল তরঙ্গে মাঝিহীন নৌকার মতো। অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে ফেলতে না পারলে জীবন হয় সুগন্ধি ছাড়া গোলাপের মতো।

 

পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *