আন্তরিক আন্তরিকতা ও আন্তরিকতার শক্তি

আন্তরিক মানুষকে সবাই পছন্দ করে। কারণ তারা মনের ভাব অকপটভাবে প্রকাশ করে, পরিবেশ-পরিস্থিতি-অবস্থা-বাস্তবতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে। তবে অনিয়ন্ত্রিত আন্তরিকতা অগ্রহণযোগ্য। আন্তরিকতা মাত্রা ছাড়ালে বিরক্তিকর হয়ে যায়।

আন্তরিকতা অর্থ হৃদ্যতা। আন্তরিকতার শক্তি অত্যন্ত প্রবল। তবে আন্তরিকতার শক্তি সবাই অনুধাবন করতে পারে না। খুব কম মানুষই আন্তরিকতার উচ্চ সামর্থ্যকে বুঝতে পারে। যে নিজে অন্তরঙ্গ হয়, তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়াও যায়।

চারিত্রিক সৌন্দর্য আন্তরিকতাকে আকর্ষণীয় করে আর দুশ্চরিত্রবানের আন্তরিকতা অগ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়। যার সদিচ্ছা আছে, তার আন্তরিকতা হয় উপভোগ্য। যার মানসিকতা সুন্দর, সে যে পর্যায়েই যান না কেন – তার আন্তরিকতা থাকে।

নিজের প্রয়োজনে অত্যন্ত আন্তরিকতা দেখানো আর অন্যের দরকারে ‍আন্তরিক না হওয়া কপটতা। প্রকৃতই যিনি আন্তরিক তিনি ভাবনার ক্ষেত্রেও আন্তরিক, কর্মের ক্ষেত্রেও আন্তরিক। সাধনার ক্ষেত্রেও আন্তরিক চিত্ত প্রয়োজন।

আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা আন্তরিক বিশ্বাসের বিপরীত আচরণ। শিক্ষক যদি আন্তরিকতা নিয়ে পড়ান, বক্তা যদি আন্তরিকতা নিয়ে বলেন, লেখক যদি আন্তরিকতা নিয়ে লিখেন- তার ফলাফল ভালো হবেই।

আন্তরিক ধন্যবাদ জানানো, আন্তরিক হতে চেষ্টা করা, আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করা, আন্তরিক আহ্বান জানানো, আন্তরিক সেবা, আন্তরিক ভক্তি, আন্তরিক শ্রদ্ধা, আন্তরিক মোবারকবাদ, আন্তরিক শুভেচ্ছা- সবই গুরুত্বপূর্ণ।

সমাধানযোগ্য সমস্যার সমাধানে আন্তরিকতার অভাব না থাকলে সেই সমস্যার সমাধান সহজেই হয়ে যায়। বুলিসর্বস্ব আন্তরিকতা নিয়ে কোনো কর্মসূচিই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায় না।

আন্তরিক অভীপ্সা সযত্ন প্রয়াসে অন্যরকম গতি পায়। টীমওয়ার্কে আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করা মানে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করা।
আন্তরিকতার সাথে হাতে-কলমে কাজের মাধ্যমে দক্ষ কারিগর হওয়া যায়। প্রশাসন আন্তরিক হলে অব্যবস্থাপনা দূর করা যায়। আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করলে পুরস্কৃত হোক- না হোক তাতে কিছু যায় আসে না!

অনেকে মুখে আন্তরিক কথা বললেও মনে আন্তরিকতার অভাব থাকলে তা ঠিকই কাজে প্রকাশ পায়। ধর্মীয় অনুশাসন পালনেও আন্তরিকতার দরকার হয়। হত্যাকাণ্ডের পর সঠিকভাবে তদন্ত ও যথাযথ বিচার করতেও আন্তরিকতার দরকার হয়।

যেখানে সত্যিকারের আন্তরিকতা থাকে না, সেখানে মিথ্যা-প্রতারণা-স্বার্থপরতা-কৃত্রিমতা থাকে। সব সম্পর্কেই যত্ন বা আন্তরিকতা খুব জরুরি। হোক সেটা মাতৃস্নেহ কিংবা পিতৃস্নেহ! আন্তরিক না হলে পরিশ্রমী হওয়া যায় না, শৃঙ্খলাপরায়ণ থাকা যায় না।

আন্তরিকতা প্রয়োজন হয় ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে, দক্ষতার সংকট দূর করতে। আন্তরিকতা সুযোগ করে দেয়- সর্বস্ব দিয়ে নিজের অতিথিকে অ্যাপায়ন করানোর, অন্যের মনে স্থায়ী আসন গাড়ার, অন্যকে আকৃষ্ট করে নিজের কাছে টানার, ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেয়ার, অন্যের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার, অন্যের জন্য ঘরের দরজা ও মনের দরজা খুলে দেয়ার।

আন্তরিক ব্যবহার- পরকে আপন করে, শব্দের চেয়ে চাহনিকে শক্তিশালী করে, হৃদয়ের মাহাত্ম্য বৃদ্ধি করে, বাইরের চোখের চেয়ে মনের চোখকে শক্তিশালী করে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাছে টেনে রাখে, শিল্প-দক্ষতার চেয়ে অন্তরকে শক্তিশালী করে, সংকট নিরসনকে সহজ করে।

আন্তরিক না হলে- দুর্নীতি দূর করা যায় না, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না, জনগণের সমস্যা সমাধান করা যায় না, শিশুশ্রম বন্ধ করা যায় না, ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেয়া যায় না, মানবাধিকার সুরক্ষা করা যায় না, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না, গণতন্ত্র সমুন্নত রাখা যায় না, আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা যায় না, প্রতিবেশী-মিত্র দেশগুলোর সাথেও সুসম্পর্ক বজায় রাখা যায় না।

সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা দরকার- বায়ুর মানোন্নয়নে, পার্লামেন্ট প্র্যাকটিসে, মামলার জট কমাতে, রোগীদের হাসিমুখে সেবা প্রদানে, কর্মসূচি বাস্তবায়নে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে, মানবাধিকার রক্ষায়, মানুষের প্রকৃত উন্নয়নে, শান্তি আলোচনায়, শরণার্থীদের ফেরত পাঠাতে, প্রবাসীদের প্রতি দায়িত্ব পালনে, বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য দমনে, দায়িত্ব পালনে, সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে, রপ্তানি-বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে, সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে, শিক্ষার উন্নয়নে ও কর্মক্ষেত্রে শান্তিময় পরিবেশ নিশ্চিতকরণে ইত্যাদি।

About আনিসুর রহমান এরশাদ

শিকড় সন্ধানী লেখক। কৃতজ্ঞচিত্ত। কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী। ভেতরের তাগিদ থেকে লেখেন। রক্ত গরম করতে নয়, মাথা ঠাণ্ডা ও হৃদয় নরম করতে লেখেন। লেখালেখি ও সম্পাদনার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সময়ে পাক্ষিক-মাসিক-ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন, সাময়িকী, সংকলন, আঞ্চলিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ ও জাতীয় দৈনিকের সাথে সম্পর্ক। একযুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। পড়েছেন মিডিয়া ও জার্নালিজমেও। জন্ম টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার হাতীবান্ধা গ্রামে।

View all posts by আনিসুর রহমান এরশাদ →

Leave a Reply

Your email address will not be published.