মানুষ বনাম অমানুষ : অচেনা মানুষকেও চেনার কৌশল

জর্জ বার্নার্ড শ বলেন, দু’টো জিনিস থেকে তোমাকে চেনা যায়: একটি হচ্ছে নিঃস্ব অবস্থায় তোমার ধৈর্য আর অন্যটি হচ্ছে যখন তোমার সব আছে তখন তোমার আচরণ। ওয়াল্টার স্কট বলেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে মানুষ বন্ধু এবং শত্রুকে চিনে নিতে পারে, আর যে তা পারে না সে তার ভুলের জন্য মাশুল দেয়।

স্বার্থপর চেনা কেন মুশকিল?

সবসময় স্বার্থপর চেনা মুশকিল। স্বার্থপরেরা নিজের দিকটাই বড় করে দেখেন। অন্যের স্বার্থ তার কাছে তুচ্ছ। আলোচনার সব বিষয় নিজের দিকে নিয়ে যায়। নিজের মহত্ত্ব প্রকাশে গর্ব করে। সে চায় সমাজের  আর দশজন তাকে সব ক্ষেত্রে আলাদা করে দেখুক। স্বার্থপরতার মাত্রা হিসেবে অধিকাংশ স্বার্থপর মাঝামাঝি পর্যায়ের। যদিও কেউ কেউ চরম পর্যায়ের স্বার্থপরতায় লিপ্ত থাকে। কিছু স্বার্থপর নিজেকে বড় করে উপস্থাপন করে। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করে। প্রথম দেখাতেই এদের ভালো লাগতে পারে যে কারোর। কিন্তু দীর্ঘ সময় পর এদের থেকে অনেক নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য বেরিয়ে আসে। লাজুক এবং শান্ত প্রকৃতির স্বার্থপর রা আগ বাড়িয়ে নিজেকে বড় করে দেখাতে আসে না এবং বেশি কথা বলে না। তবে যখন তাদের সঙ্গে কেউ কথা বলতে আসে তখন কম কথার মাঝেও নিজেকে বড় করে জাহির করতে চেষ্টার কমতি থাকে না। কেউ প্রবলভাবে কর্তৃত্বপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করে। লাজুকরা নিজেকে সহজে স্পষ্ট করে উপস্থাপন করে না এবং সংকীর্ণ প্রকৃতির হয়। কিন্তু তারা দৃঢ়ভাবে মনে করে তাদের দিন একদিন আসবে। নিজেকে নেতা হিসেবে জাহির করে । নিজেকে সর্বদা নেতৃত্বের পর্যায়ে রাখতে তৎপরতা দেখায়। এরা যে করেই হোক না কেন নেতা হতে চায়।

নিজের অবস্থান আরো বড় করে দেখানোর জন্য বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ মানুষের নাম উল্লেখ করে এবং তাদের বিখ্যাত উক্তি, সূত্র, ঘটনা প্রভৃতি তুলে ধরে। একপ্রকার স্বার্থপর নিজের শ্রেষ্ঠত্বকে জাহির করতে তার ভালো ভালো পছন্দের জিনিসের নাম উল্লেখ করে। সব স্বার্থপরই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশে তৎপর থাকে।  সব স্থানে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়ার একটা প্রবল তৎপরতা দেখায়। বিভিন্ন স্টাইলের চুল, নখ প্রভৃতি দিয়ে অন্যের কাছে আকর্ষণের কারণ হতে শারীরিকভাবেও তৎ্পরতা দেখায়। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম একপ্রকারের স্বার্থপর নিজেকে সভ্য এবং মহৎ হিসেবে উপস্থাপন করে। নিজের সমালোচনা কেউ করলে সহ্য করতে পারে না। সমালোচনা কোনোভাবেই মেনে নেয় না। নিজের সমালোচনামূলক কোনো নেতিবাচক কিছু স্বীকার করে না। ব্যর্থতার দিকগুলো এড়িয়ে যাবে । কাছের বন্ধু বা সহপাঠী বিপদে বা খারাপ পরিস্থিতিতে থাকলে তাদের এড়িয়ে যাবে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে এরা অন্যকে সন্দেহের চোখে দেখে। প্রতারণাপূর্ণ মনোভাব থাকে, প্রতারণামূলক আচরণ করে থাকে। কখনই নিজেকে স্বার্থপর হিসেবে মনে করে না। আত্মমর্যাদায় তুঙ্গে  থাকা স্বার্থপরেরা নিজের স্ট্যাটাস সব সময় উঁচুতে রাখতে সচেষ্ট থাকে।

বাচাল কারা?

কথা বলার সময় অতিরিক্ত এবং অপ্রয়োজনীয় কথা বলবে। কথায় বাচালতা দেখা যাবে। মিথ্যা বলবে।  অপ্রাসঙ্গিক কথা বলবে এবং কথায় কথায় তর্ক করবে। নিজেকে বড় মনে করবে, যেন দুনিয়ার সব কিছু সে একাই বুঝে। নিজের বড়ত্ব বলে বেড়াবে। অহংকারী হবে, নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করবে। অন্যের সময়ের মূল্য দেবে না। অন্যে বিরক্ত হলেও বলেই যাবে।

অন্যের ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাভাবনা বুঝার উপায়

মুখের গঠন, হাঁটার ধরণ কিংবা শব্দচয়ন প্রতিটি মানুষের আলাদা। কারো মুখের গঠন লম্বা, কারো গোল, আবার কারো চৌকো। কেউ ধীরে হাঁটেন, কেউ দ্রুতলয়ে। কেউ সামনের দিকে তাকিয়ে হাঁটেন, কেউ মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটেন। কথা বলার ক্ষেত্রেও রয়েছে প্রত্যেকের নিজস্ব স্টাইল। কেউ ধীরস্থিরভাবে গুছিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। আবার কেউ স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা না করেই কথা বলতে শুরু করেন। যারা সাধারণত দ্রুত গতিতে হাঁটেন তারা সাধারণত আত্মবিশ্বাসী ও মানসিকভাবে শক্তিশালী হন, যে কোনো কিছু দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করেন, যথেষ্ট প্রাণবন্ত ও মনোদৈহিকভাবে শক্তিশালী হন । এরা দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল ও সহজেই রেগে যায়। যারা ধীর গতিতে হাঁটেন তারা কিছুটা শান্ত ও ভাবুক প্রকৃতির, কোনো ধরনের ঝামেলায় জড়াতে পছন্দ করেন না, হুট করে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন না এবং যে কোনো কাজ ধীরস্থিরভাবে করতে পছন্দ করেন।

হাতের লেখায় মানুষ চেনা

হাতের লেখার মাধ্যমে কমপক্ষে ৫ হাজার ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। হাতের লেখায় স্পেস কম – যারা কোনো কাজ পরিকল্পনা মতো করতে পারেন না। সময় ও প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তারা অসচেতন। পরিকল্পনা ছাড়াই কাজে নেমে পড়েন, আশানুরূপ ফল পান না। যাদের লেখার মধ্যে প্রয়োজনীয় স্পেস থাকে, তারা পরিকল্পিত উপায়ে কাজ করতে পছন্দ করেন এবং নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন। এরা স্বাধীনচেতা। কাজকে অন্যের কাছে কীভাবে সহজবোধ্য ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায় সে বিষয়ে সচেতন। অনেকে এক পৃষ্ঠায় লিখলে তার ছাপ পরবর্তী কয়েক পাতায় চলে যায়। এরা কোনো বিষয়ে প্রতিজ্ঞা করলে তা রক্ষা করার চেষ্টা করেন। কখনো কখনো একগুঁয়ে প্রকৃতির হতে দেখা যায়। এদের কিছু বুঝাতে যুক্তি ও বুদ্ধির প্রয়োগ করতে হয়।

লেখা ডানদিকে হেলে থাকে, তারা সাধারণত আবেগপ্রবণ ও বন্ধুভাবাপন্ন হয়ে থাকেন। লেখা সোজা হলে, তারা যথেষ্ট যুক্তিবাদী ও সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাকেন। বাস্তবভিত্তিক চিন্তা ও পরিকল্পনা করতে পছন্দ করেন। আবেগ দিয়ে তারা পরিচালিত হন না। লেখার সময় যদি অক্ষরগুলো বাম দিকে হেলে থাকে তারা সাধারণত আত্মকেন্দ্রিক হয়ে থাকেন। সহজে অন্যদের সঙ্গে মিশতে পারেন না। তাদের বন্ধুবান্ধবের সংখ্যাও কম হয়ে থাকে। যাদের লেখা খুবই হালকা হয় তাদের মধ্যে জীবনীশক্তির অভাব থাকতে পারে। আলস্য কিংবা খেয়ালীপনা লক্ষ্য করা যেতে পারে। এরা কোনো বিষয়ে পরিপূর্ণরূপে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। যাদের লেখার গতি বেশি তারা সাধারণত সময় সচেতন হয়ে থাকেন। দ্রুত চিন্তা ও কাজ করতে পছন্দ করেন।

 শব্দচয়নে মানুষ চেনা

কারো পছন্দ অন্যকে খোঁচা দিয়ে কথা বলা, কারো বা পছন্দ অন্যকে অনুপ্রাণিত করা। যারা দ্রুত কথা বলেন তাদের মধ্যে মানসিক স্থিরতার অভাব থাকে। অনেক সময় গোপনীয় বিষয় এরা মনের অজান্তেই প্রকাশ করে ফেলে। যারা ধীরে কথা বলেন তারা যে কোনো বিষয় গুছিয়ে প্রকাশ করতে পারেন। যে কোনো জটিল বিষয় যুক্তি ও বুদ্ধির মাধ্যমে সহজবোধ্য করে তুলতে পারেন। একশন ওয়ার্ড ও শব্দচয়নের ধরণ থেকেও মানুষ চিনে নিন। যারা সব কথায় বলেন, ‘চেষ্টা করব’। তারা কাজের প্রতি সচেষ্ট নন, অসফল বা হীনমন্য।  যারা বলেন ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি’, তারা কম আবেগপ্রবণ, অন্যার কথার কম গুরুত্ব দেন, আত্মবিশ্বাসী। খেয়াল করুন কন্ঠের জোর।

নাম মনে রাখায় মানুষ চেনা

নাম মনে রাখা এটি একটি ভালো গুণ। কিছু লোক থাকে যারা কারো নাম একবার শোনার পর তা মনে রাখে। পরবর্তীতে দেখা হলে নাম ধরেই সম্বোধন করে। এ ধরনের লোকেরা সাধারণত খুবই বুদ্ধিমান ও যোগাযোগে দক্ষ হয়ে থাকে। সংগঠক কিংবা নেতা হিসেবেও তারা সফল হন। এরা সহজেই যে কারো সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।

আই কন্ট্যাক্টে মানুষ চেনা

শারীরিক ভাষা বা বডি ল্যাংগুয়েজ থেকে বোঝা যায় আসলে তার মস্তিষ্কে কি চলছে।  যারা চোখে চোখ রেখে কথা বলেন তারা প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী হন। এরা যে কোনো উপায়ে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে সচেষ্ট থাকেন। এদের সঙ্গে মিথ্যা কিংবা ছলনার আশ্রয় নিলে ক্ষতিটা নিজেরই হয়।

চলার ধরনে মানুষ চেনা

যারা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে যান। মুহূর্ত পর আবার হাঁটতে শুরু করেন। পথিমধ্যে পকেট কিংবা ব্যাগ হাতড়ে নিশ্চিত হয়ে নেন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কিংবা অন্যান্য জিনিস ঠিক আছে কিনা। এরা কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও ভুলোমনা। এ ধরনের মানুষ মাঝেমধ্যে শিশুসুলভ আচরণ করেন। প্রায়ই ভুল করে দরকারি কাজ ফেলে অন্যকাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। হাটার ধরণ খেয়াল করুন। যখন সামনের দিকে না তাকিয়ে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে হাটেন তখন বুঝতে হবে আত্মবিশ্বাস খুবই কম। আত্মবিশ্বাসী মানুষ  সামনে তাকিয়ে হাটেন এবং জীবনেও যে কোন সমস্যা সরাসরি মোকাবেলা করেন।

ছলনার ফাঁদ বুঝার উপায়

লোভীরা সাধারণত মিষ্টিভাষী হয়ে থাকেন। অনেক বন্ধু থাকে, তবে প্রকৃত বন্ধু থাকে না। শুধু প্রয়োজনেই মানুষের সাথে মিশে থাকেন। প্রয়োজন শেষ হলে যতদ্রুত সম্ভব কেটে পরেন। সুযোগ বেশি পেলে তারা বন্ধুত্ব নষ্ট করতে দ্বিধাবোধ করেন না। সবসময় হিসেব কষে কাজ করেন। হুটহাট করে কিছু করে না। যেখানে লাভ বেশি সেদিকেই যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। অল্পতে সন্তুষ্ট থাকে না। উদ্দেশ্য পূরণে বা চাহিদা মেটাতে যত সম্ভব মানুষের কাছে যায়। সব কিছুতেই একটা তাড়াহুড়োভাব থাকে। কোনো কিছুই স্থীরভাবে করে না। একটা কাজ করে থেমে থাকে না। লোভ সামলাতে পারে না। অনেক বেশি কথা বলে। বাচাল প্রকৃতির হয়ে থাকে। কথা শুরু করলে থামতে চায় না। ভালো কথাই মিষ্টি স্বরে বলে। অতিরিক্ত কথা বলে, বারবার একই কথা বলে, যেকোনো জিনিসের জন্য ধরনা ধরে উত্যক্ত করতে পছন্দ করে। কিছু বিশেষ ছলনায় প্ররোচিত করে ,আটকে ফেলেন ছলনার ফাঁদে। কখনো চোখের দুই ফোঁটা জলে, তেমন কোনও কষ্ট ছাড়াই পটিয়ে ফেলে, কাজের চাপে অতিষ্ট হওয়ার অভিনয় করে, সহকর্মীকে গাধার মতোন খাটিয়ে নিয়ে।

আচরণে মানুষ চেনা

ছলগুলো ধরার চেষ্টা করুন।মানুষ যখন নার্ভাস বোধ করেন তখন আসল অনুভূতি ঢাকতে তিনি বার বার কেশে গলা পরিষ্কার করেন। কেউ হয়ত কথা বলার সময় অন্য দিকে তাকিয়ে থাকেন কিছু গোপন করতে চান।অঙ্গভঙ্গি খেয়াল করুন। তুলনামূলক আচরণ খেয়াল করুন। মানুষটি যেমন আচরণ আপনার সাথে করছেন তেমন কি তিনি সবার সাথেই করছেন? রুমের অন্যান্য মানুষের সাথে কথা বলার সময়ও কি তিনি একই রকম থাকছেন? তাদের বসার ধরণ, বডি ল্যাংগুয়েজ খেয়াল করুন। মনে থেকেই খুশী হয়ে হাসলে মুখের, গালের, চোখের মাসল প্রসারিত হয়। পছন্দ করে তাকালে তার মুখের মাসল শিথিল থাকবে। মানসিক অবস্থার সাথে শরীরের সরাসরি সংযোগ রয়েছে। মানুষটি যখন ভ্রু কুঁচকে আছেন বা মুখ শক্ত করে আছেন তখন বুঝতে হবে তিনি মুখে যা প্রকাশ করছেন আসলে তা ভাবছেন না।

নকল আচরণ

মানুষকে চিনতে পারার ক্ষমতা আপনার জীবনকে করবে অনেক সহজ। কারণ সব মানুষই একটি মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ায়। জীবনে চলার পথে এই মুখোশধারী মানুষগুলো চেনা  খুব জরুরী। মুখোশধারী মানুষগুলোর প্রকৃতি চেনা যেমন খুব সহজ তেমনি খুব কঠিনও বটে। স্বল্প মেয়াদের লোভী মুখোশধারীরা  আপনার সাথে প্রতারণা করবে আর দীর্ঘ মেয়াদের মুখোশধারীরা আপনাকে ব্যবহার করে সর্বোচ্চটা লুফে নেওয়ার প্রচেষ্টায় যখন সফল হবে তখনই ছুড়ে ফেলবে আপনাকে। এরা মনে রাগ নিয়েও মুখে হেসে যায়। বন্ধুর পেছনে লুকিয়ে থাকে শত্রু। সামাজিক কাঠামোই মানুষকে মুখোশ পরে থাকতে বাধ্য করে। নিজের সারাদিনের প্রতিটি আচরণ বিশ্লেষণ করে দেখুন ঠিক যা অনুভব করছেন সেই অনুযায়ী আচরণ করেছেন কিনা! সত্য আবেগকে আড়াল করে আনুষ্ঠানিক আচরণ করেছেন কিনা!

মৌলিক অবস্থা বুঝে মানুষ চেনা

মানুষটি কি ইন্ট্রোভার্ট নাকি এক্সট্রোভার্ট? সে কি সহজে রেগে যায়? তার প্রকাশ কিরকম? অহংকারী? মানুষটি কি সব সময় স্ট্রেসড থাকেন? এই উত্তরগুলো খুব সহজেই মানুষটি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে আপনাকে।

বোকাদের চেনার সহজ উপায়

নির্বোধরা নিজের অন্ধকার দিক স্বীকার করেন না। নিজের ভুলগুলো বেমালুম অস্বীকার করার প্রবণতা এক ধরনের কনফার্মেশন বায়াস বা নিশ্চিত হওয়াজনিত পক্ষপাতদুষ্টতার তৈরি করে। বায়াস ব্লাইন্ড স্পট বা পক্ষপাতদুষ্ট অন্ধবিন্দু ধরনের ব্যক্তিরা নিজের ভুলগুলো স্বীকার করতে চায় না। বিনয়ী হয়ে নিজের ভুল স্বীকার করতে প্রস্তুত নন। অথচ বিনীতভাবে নিজের ভুল স্বীকার করাকে ওপেন-মাইন্ডনেস বা খোলামনা হিসেবে দেখা হয়। কোনো বিষয়ে অতি আত্মবিশ্বাসী কিংবা নিশ্চিত হওয়ার আগে এটির ঠিক বিপরীত যুক্তিগুলো ভাবেন না, অন্যদেরও মত নেন না। এতে করে নিজের দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত হয় না। ভুল হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।নিজের সঙ্গে তর্ক করেন না, অন্যের সাথে তর্ক করেন। কর্মসংশ্লিষ্ট নীতিগত বিষয়গুলো এড়িয়ে যান। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে পারেন না।

মিথ্যাবাদী চেনবেন যেভাবে

কথা বা কাজ দিয়ে প্রতারিত করার চেষ্টা মিথ্যাচার। কারও মিথ্যা ধরতে হলে চোখ নয় নিজের কান-দুটো ব্যবহার করুন। তারা কি তাদের বসার আসনের চারদিকে ঘোরাঘুরি করছে? তারা কি ইঙ্গিত করছে? তাদের মুখের ভঙ্গি কেমন? এর বাইরের সংকেতগুলি হচ্ছে মৌখিক: আমরা যা বলি এবং যেভাবে বলি। যারা মিথ্যাবাদী তারা সাধারণভাবে কম কথা বলে; তারা একটি প্রশ্নের পর উত্তর দিতে দীর্ঘ সময় নেয়; এবং তারা মিথ্যা থেকে নিজেদের দূরত্ব দেখাতে চায়: তাই ‘আমি’, ‘আমার’ এবং ‘আমি’ শব্দগুলো প্রায়শই বাদ পড়ে যায়। জটিলতাপূর্ণ সামাজিক বিশ্বে দিক-নির্দেশনার জন্য অনেকক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে মিথ্যা। ফলে কৌশলপূর্ণ হওয়াটা আসলেই আপনার এবং অন্য সবার জন্য ভালো। সামাজিক প্রজাতির বিবর্তনে কৌশলগত প্রতারণার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

খারাপ মানসিকতার মানুষ চেনার উপায়

খারাপ মানসিকতার মানুষ চেনার দারুণ উপায় হচ্ছে- আর্থিক লেনলদেন করা৷ আর্থিক লেনদেনে জড়ালেই মুখোশ খুলে প্রকৃত  রুপ বের হয়। অনেক ভালো আচরণের মানুষও  অর্থের কাছে পরাজিত হয়। অর্থ ইস্যুতে খোলস ভেঙ্গে আসল মানুষটি বেড়িয়ে আসে। বাইরে থেকে যাদের চেহারা দেখলে হৃদয় গলে যায়, যাদের কথা শুনলে অশান্ত মন নিমিষেই শান্ত হয়ে যায়, তাদেরও খারাপ মানসিকতা আছে কিনা বুঝা যায় লেনদেন করলে। কিছু মানুষকে একদিনেই চেনা যায়। কিছু মানুষকে একমাসে চেনা যায়। কিছু মানুষকে পাঁচ মাস, এক বছর, পাঁচ বছরেও চেনা যায় না। এমন কিছু মানুষ আছে যাদের সারাজীবনেও চেনা যায় না। কারণ অনেকেই নিজেদের চেহারাগুলোকে প্রতিদিন একবার করে সততার আয়নায় দেখেন না।

অন্তর্মুখী মানুষ চিনবেন কিভাবে?

অন্তর্মুখী মানুষেরা সচরাচর যা করে তা হলো – ভিড় এড়িয়ে যায়, উৎসবে অনুষ্ঠানেও কম দেখা যায়। ভিড়ে যাওয়া ঠেকাতে অজুহাত দেয়। অপরিচিত মানুষদের সাথে গুছিয়ে কথা বলতে পারে না বা চায় না। পাবলিক স্পিকিং পারে না, পারলেও এড়িয়ে যায়। বলার সুযোগ দিলে যথেষ্ট পরিনত কথা বলতে পারেন। সচরাচর বয়সের তুলনায় পরিণত মস্তিষ্কের হয়ে থাকেন। বন্ধু বান্ধবের পরিমাণ কম হয়। অন্যের কথা মন দিয়ে শোনেন । বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজেদের আবেগ ও অনুভূতি লুকিয়ে রাখেন। অনুভূতি খোলাখুলি প্রকাশ করলে সচরাচর খুব জেনুইন হয়ে থাকেন । জনসমাবেশের মধ্যেও মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকেন বা ব্যস্ত হওয়ার ভান করেন। রাস্তায় যাওয়ার সময়ে সোজাসুজি কারো দিকে তাকান না। রাস্তায় অনেক সময়ে পরিচিত মানুষদেরও এড়িয়ে যান। বেশিরভাগই প্রকৃতিপ্রেমিক। বেশিরভাগ মানুষই প্রচুর বই পড়েন। কল রিসিভ করতে সময় নেন। অনেকদিন পর কেউ ম্যাসেজ করলে উত্তর দিতে সময় নেন। ঝগড়াঝাঁটিকে ভয় পান। বেশ কিছুটা সময় একলা থাকাও পছন্দ করেন। হঠাৎ আসা কল বা ম্যাসেজ এর নোটিফিকেশনকে ভয় পান। ঘুমোনোর আগে মোবাই ফোন বন্ধ রাখেন। নিজেদের হয়ে কথা বলতে চিঠি লেখার মতো অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করেন। অপরিচিতদের সাথে যোগাযোগে ভালো করেন না।

প্রোফাইল পিকচার ব্যবহার করেন না। অপমানিত বা দুঃখিত হলেও পাড়া মাথায় করে তুলি না। হালকা কথাবার্তার চেয়ে দার্শনিক এবং গভীর ধরণের কথা বার্তায় বেশি আগ্রহী হন। উঁচু স্তরের আইকিউ থাকে। ৬০ ভাগ মানুষ অন্তর্মুখী। বিশ্লেষণী শক্তি এবং অন্তর্দৃষ্টি বেশি হয়। প্রয়োজনে খোলামেলা কথা বলতে অস্বস্তিতে পড়েন না। সাহায্য চাইতে লজ্জা পাওয়ায় স্বনির্ভরতা বেশি। বন্ধুর ক্ষেত্রে একে অন্যকে বোঝেন। নিঃসঙ্গতাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেন। নিজের একটা কল্পনার জগত থাকে এবং সে জগতটি তারা তাদের মত করেই সাজিয়ে তুলে। সাধারণ বিষয় বা প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করার চেয়ে জটিল জটিল বিষয়ে আগ্রহ বেশি। জটিল বিষয় সহজে বুঝতে পারলেও সহজ বিষয় বুঝতে কষ্ট হয় বেশি। ব্যাক্তিগত কথা অন্যকে বলা অপছন্দ করে অন্যের ব্যাক্তিগত কথায়ও আগ্রহ থাকে না। প্রায়ই কথা বলতে বলতে নিজেকে গুটিয়ে ফেলে। অনেক কথা তারা ছোট্ট একটা হাসি অথবা দৃষ্টি বিনিময়ের মধ্যমেই করে থাকে। যে কোনো অনুষ্ঠানে প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে, গেলেও সুবিধামত কোনো এক কোণায় যেয়ে বসে যায়।হাঁটতে পছন্দ করে এবং চলার সময় সাধারণত নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটে। কিছু বলার চেয়ে তা লিখতে বেশি পছন্দ করে। ফোনে কথা বলায়ও অনীহা। কথা বলার সময় তার দিকে তাকিয়ে না থেকে অন্য কিছুর উপর দৃষ্টি রাখে। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা না বলে যা বলার তা সরাসরি বলে দেয়। কোনো ঘটনাকে যত উপায়ে সম্ভব বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন। সাধারণত নিজেদের কাজ নিজেরা করতে পছন্দ করে। প্রায়ই নিজেদের আবেগ অনুভূতিগুলো নিজেরাই বুঝতে পারে না অন্যকেও বুঝাতে পারে না। কিছু কিছু বিষয়ে ভীষণ সেনসেটিভ। মানুষের চেয়ে পোষা প্রাণীদের সাথে সময় কাটাতে বেশি পছন্দ করে।

একই জায়গায় ঘন্টার পর ঘন্টা কাটানোর অদ্ভুত ক্ষমতা থাকে। নিজেদের জীবনের কিছু পরিবর্তন করতে ততটা আগ্রহী নয়। কেউ তাকিয়ে থাকলে অস্বস্তি ও বিরক্তি দুটোই লাগে। বিশেষদিন বলতে কিছু নেই সবদিন একই রকম। অনেকের মাঝে থেকেও একাকীত্ব অনুভব করে। অন্যের কষ্ট সহজেই বুঝতে পারে এবং সে অনুযায়ী সহমর্মিতা ও সাহায্য করার চেষ্টা করে।এরা অন্যের সমালোচনা করার চেয়ে আত্মসমালোচনাই বেশি করে। নিজেকে জানে বেশি। যে কোনো কাজ খুব মনোযোগের সাথে করে এবং তাতে নিজের সর্বোচ্চটা দেয়ার চেষ্টা করে। এদের বুঝার মত বেশি মানুষ থাকে না, যে যতটুকুই বুঝে তার অধিকাংশই ভুল বুঝে।অকারণ আড্ডা এদের পোষায় না। তবে পছন্দের বিষয়ে কথা বলতে দিলে এরা ঘন্টার পর ঘন্টা বক্তৃতা দিয়ে যেতে পারেন। এদের পছন্দকারী মানুষের সংখ্যা অনেক সময় তুলনামূলকভাবে কম হয়। অনেকেই অহংকারী ভেবে বসতে পারে। প্রচার ও প্রচারণায়ও পিছিয়ে থাকেন। ঋণ নিতে কুন্ঠিত বোধ করেন। একান্ত বাধ্য হয়ে নিলেও যতটা দ্রুত সম্ভব পরিশোধের ব্যবস্থা করেন। মানুষের সাথে যোগাযোগ কম রাখেন। কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে আগ্রহী নন। স্পটলাইট থেকে সর্বোচ্চ দূরত্ব বজায় রাখেন। রাগের তুলনায় অভিমানের মাত্রাটা একটু বেশি-ই হয়ে থাকে। সাধারণত ঘরকুনো। পৃথিবী ঘুরে বেড়ানোর চেয়ে বৃষ্টির দিনে লেপ মুড়ি দিয়ে নন-ফিকশন পড়া এদের কাছে অনেক বেশি আনন্দের। জন্মদিনের তারিখ খুব কম মানুষ-ই জানে। অনেক সময় আনস্মার্ট হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। খুব কাছের মানুষ বাদে এদের বিশেষ দক্ষতা বা দুর্বলতাগুলো সম্পর্কেও তেমন কেউ জানে না। মানুষের অঙ্গভঙ্গি বা বডি ল্যাংগুয়েজ বিশ্লেষণের ক্ষমতা রাখেন। বেশ গুছিয়ে কথা বলতে বা লিখতে সক্ষম। বাসের সবচাইতে কোণার সিটখানা বা ক্লাসের শেষের দিকে বেঞ্চগুলোই এদের প্রিয়।

বাহ্যিক উদ্দীপনার চাইতে অভ্যন্তরীণ চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি এবং মেজাজের দিকে বেশি মনোনিবেশ করে। অনেক লোকের সাথে সময় কাটানোর পরে ক্লান্তি অনুভব করেন। সামাজিক ইভেন্টগুলি এড়িয়ে চলার প্রবণতা দেখা যায়। অন্যের চারপাশে সময় কাটায়ে নিজেকে তালায় আবদ্ধ রেখে। নির্জনতা উপভোগ করেন। কয়েক ঘন্টা একা থাকা ভাল সময় মনে হয়।সামাজিক বৃত্তটি ছোট হতে থাকে। সাধারণত বন্ধুদের অনেক সতর্কতা সহকারে বেছে নেয়। অতিরিক্ত লাজুক হয়। অত্যধিক উদ্দীপনা বিক্ষিপ্ত এবং অবিচ্ছিন্ন বোধ করে।সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। খুব আত্ন-সচেতন। নিজ অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতাগুলি পরীক্ষা করতে অনেক সময় ব্যয় করে। অন্তর্মুখীরা কেবল তাদের নিজের মনে জিনিসগুলি সম্পর্কে চিন্তা করা এবং পরীক্ষা করা উপভোগ করে। নিজের সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন উপভোগ করেন। দেখে ভালভাবে শিখতে পছন্দ করেন। সাধারণত পর্যবেক্ষণের পরে নিজেকে শেয়ার করে। অন্যদের কোনও কাজ সম্পাদন করতে দেখতে পছন্দ করে, যতক্ষণ না তারা অনুভব করে যে তারা নিজেরাই কাজগুলো করতে পারে। তারা একা থাকতে বেশি পছন্দ করে। কলে কথা বলার থেকে চ্যাট্ বেশি পছন্দের। রাস্তায় যাওয়ার সময় নীচের দিকে তাকিয়ে হাঁটে। তাদের ফোন সাইলেন্ট বা ভাইব্রেশন মোডে থাকে। কথা কম বলে, কিন্তু একবার মুখ খুললে চলতেই থাকে। ভিড় ভাট্টা পছন্দ করে না। ভাবে বেশি। ভালো ঘুমোনার অভিনয় করতে পারে।

বহির্মুখীরা আসলে কেমন?

বহির্মুখীদের সাধারণত বন্ধু এবং পরিচিতদের মধ্যে বিস্তৃত চেনাশোনা থাকে। বহির্মুখীরা এমন পরিস্থিতিতে সাফল্য লাভ করে যেখানে প্রচুর ক্রিয়াকলাপ এবং বিরক্ত হওয়ার খুব কম সম্ভাবনা থাকে। বহির্মুখীরা ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়া এবং হ্যান্ডস অন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখতে পছন্দ করে। বহির্মুখীরা সাধারণত পরীক্ষা এবং ত্রুটির মাধ্যমে শিখতে থাকে। যেসব কাজে সামাজিক যোগাযোগ প্রচুর পরিমাণে প্রয়োজন হয় বহির্মুখীরা এমন কাজে আবেদন করতে পছন্দ করে।

হাফিংটন পোস্ট, ডেইলি মেইল ফোর্বস, টেলিগ্রাফইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *