ভাই বড় ধন রক্তের বাঁধন

আনিসুর রহমান এরশাদ

অনেক বড়ভাই বাবার মতো। পরিবারে যদি বাবা-মায়ের বিয়োগ-বিচ্ছেদ ঘটে তবে বড় ভাই ছোটদের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে। আর পিঠাপিঠি ভাই থাকলে মিষ্টি দ্বন্দ্বের শেষ নেই। কে কোন খাটে শুবে, কোন পাশে শুবে, কোন চেয়ার-টেবিলে বসে পড়বে, কোন প্লেটে খাবে তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলে। জগতের হেন কোনো তুচ্ছ বিষয় নেই যা সেই বয়সে সেই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হবার অযোগ্য। এমনও হয় যে একজনের প্রয়োজন কিন্তু আরেকজনের প্রয়োজন নেই- অথচ ঠিকই দুটি কিনতে হয়! এমনকি রং থেকে শুরু করে ব্র্যান্ড সবই এক হতে হয়! চোখে মুখে ঝিলিক দিয়ে যায় দুষ্টুমি! তবে একজন বড়ভাইয়ের পক্ষেই সম্ভব হয় নিজে সাধারণ সেলফোন ব্যবহার করেও ছোটভাইকে স্মার্টফোন কিনে দেয়া। আবার একজন বোনই পারে- নিজের হাতখরচের টাকা বাঁচিয়ে, নাস্তা না করে টাকা জমিয়ে ভাইকে নতুন শার্ট-পাঞ্জাবি কিনে দিয়ে চমকে দিতে।

বিনিময়হীন সেবায় নিয়োজিত নিরন্তর

ছোটভাই থাকলে তাদেরকে কম-বেশি আদর করা যায়, বড়ভাই থাকলে তাদের কাছ থেকে আদর পাওয়া যায়। বড়ভাই না থাকলে মিষ্টি ভাবী পাওয়া যায় না, দেবর হিসেবে সুবিধা আদায় করা যায় না, তালত ভাইবোনদের সাথে বেশ দুষ্টুমি করাও যায় না। বড়ভাই হিসেবে দাদাগিরি দেখানো আর ছোটভাইদের গম্ভীর হয়ে থাকা সাধারণত পছন্দের বিবেচিত হয় না। অনেক বড়ভাইকে দেখা যায় বাবার অনুপস্থিতিতে সংসারের হাল ধরেন এবং নিজে কায়িক পরিশ্রম করে ছোট ভাইবোনদের পড়াশুনা করান। অনেক বড়বোন মায়ের অনুপস্থিতে মায়ের মতো আদর দিয়ে ছোট ভাইবোনদের লালন-পালন করেন। এই ত্যাগ বা কষ্টের কোনো বিনিময় লাগে না; স্নেহ আর শ্রদ্ধাই এখানে যথেষ্ট।

মৃদু ঝগড়ায়ও অনেক আনন্দ

ছোটবেলায় ভাইয়ের সাথে মিলে হৈচৈ করা, রাতে ঘুমাতে গিয়ে কে কোথায় শোবে তা নিয়ে জল্পনা কল্পনা করার মজাই আলাদা। কেউ বলে তুই বেশি নড়াচড়া করিস আমি তোর পাশে শোব না। কেউ বলে তুই নাক ডাকিস, কেউ বলে এটা, কেউ বলে ওটা- এভাবে পরস্পরের দোষ ধরার প্রতিযোগিতা চলে। ভাইদের মাঝে যেমন কিছু কমন মিল থাকে, আবার অনেকক্ষেত্রে একেক জনের একেক রুচি হয়। কেউ লম্বা টাই পরতে চায় তো কেউ নেক টাই। প্রতিযোগিতা চলে-মোড়ক উন্মোচনের পর নতুন সাবান দিয়ে প্রথম গোসল করা নিয়ে, টুথপেস্টের ঢাকনা খোলার পর সেটা দিয়ে প্রথম ব্রাশ করা নিয়ে, বিদেশ থেকে পাঠানো বাবার চিঠির খামে লাগানো ডাকটিকিট সংগ্রহ নিয়ে, নতুন টাকা কিংবা কয়েন সংগ্রহ নিয়ে। জিতে গেলে ভ্রু উঁচু করে একখানা বাঁকা হাসি দেয়া! এইসব পাগলামি ভীষণ স্মার্ট হয়তো বানায় না, বড়দের মাঝে হুলুস্থুলও পরে না; কিন্তু একজনের ঈর্ষাতুর চোখগুলোর হাহাকারের দিকে তাকিয়ে আরেকজনের বিজয়ের হাসি দেখা যায়। পিঠাপিঠি হলে প্রতিনিয়ত আরেকজনের কিভাবে দোষ বের করা যায়, কিভাবে ঝগড়া করা যায়, কিভাবে মায়ের বকুনি খাওয়ানো যায়, কিভাবে পচানো যায় সেই চেষ্টায় থাকে। কিছু দুষ্টুমি, কিছু ঝগড়া, কিছু মজার স্মৃতি সবমিলিয়ে ছোটবেলার দিনগুলো চলে।

অনিন্দ্যসুন্দর ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক

ছোটরা বড়ভাইয়ের কোলে-পিঠে চড়ে বড় হয়। বড়ভাইয়ের সাথে ঝগড়া বা মারামারি যাই হোক না কেন, বাবা-মায়ের বকা খেতে হয় বড়ভাইকে। পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে বড়ভাইয়ের ছোট হয়ে যাওয়া পোশাক পরার মধ্যেও ছোটভাইয়ের একটা আনন্দ থাকে। ছোটভাই অনেক চিন্তামুক্ত জীবনযাপন করতে পারে বলে তাদের মধ্যে রসবোধের পরিমাণ বেশি হয়। বাড়ির সবচেয়ে ছোট হওয়ার সুবাদে বয়ঃজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে কিভাবে মিশতে হয় সেই শিক্ষা ছোটবেলাতেই পায় ছোটরা। ভ্রাতৃত্বের অনিন্দ্যসুন্দর সম্পর্ক মঙ্গল কামনায় আকুতিতে ভরপুর, সুদৃঢ় ও অটুট থাকুক।

বড়ভাই ছোটদের রোল মডেল

বড়ভাইদের জন্য অনেক বেশি আনন্দের বিষয়টি হচ্ছে- তারা ছোটদের রোল মডেল, অনুকরণ যোগ্য ব্যক্তি, অনেক কিছু অনুকরণ করে, অদ্ভুত প্রশ্নের জবাব দিতে হয়। বড়ভাইয়ের চলন-বলন ছোটদেরকে আকর্ষণ করে, ছোট ভাইবোনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। অনেক ছোট ভাইবোনের কাছে বড়ভাই আদর্শ মানুষ, সবচেয়ে আপন মানুষ। পরিবারে বড় ছেলে হবার অনুভূতি অসাধারণ- ছোট কেউ না থাকলে কিন্তু তারাই পরিবারের সবচাইতে ছোট হতেন। মজার কিছু দেখলে চোখে চোখে কথা বলে আলাদা ধরণের আনন্দ নেওয়া যায় শুধুমাত্র ছোটভাই থাকলেই। মজা নিতে বলতে পারেন ‘তোকে, আমি এ এক আঙুলের সমান দেখেছি’। অনেক ছেলেমানুষি কাজ করা থেকেও নিজেকে বিরত রাখতে পারেন ছোটদের দিকে তাকিয়ে। বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু মা দিচ্ছেন না একা বাইরে যেতে। ছোটভাইকে দেখিয়ে অনায়েসেই বলা যায় ‘ওকে পার্কে নিয়ে যাই’ বা ‘ও আইসক্রিম খেতে চাচ্ছে’। বড়ভাই প্রয়োজনে ছোট ভাইবোনের দায়িত্ব গ্রহণ করে; যদিও ছোটবেলায় মারামারি-অভিমান-বন্ধুত্ব সবই চলে।

প্রশ্ন-উত্তরের খেলার সঙ্গী

ছোটবেলায় অদ্ভুত অনেক জিনিস মাথায় ঘুর ঘুর করে। একরত্তি ছোটভাই এটার মানে কি, ওটা কেনো হলো-জিজ্ঞেস করে। ছড়া-গল্প-কবিতা শুনার আবদার করে। হরেক রকমের প্রশ্ন করে। পাখির গায়ে ঢিল ছুড়লে পাখিরা ব্যথা পায় কি-না? শীতে বিড়ালটার ঠাণ্ডা লাগে কি? সূর্য পশ্চিম দিকে ডুবে কেন? পাখি আকাশে উড়তে পারে আমরা কেন পারি না? নানীর চুল কেন সাদা? তুমিও কি ছোট ছিলে? -ইত্যাদি। চান্স পেলেই কাঁধে চড়া, ইচ্ছে হলেই কোলে উঠা আর নরম নরম পিচ্চি দুহাতে চুল খামচে ধরে হুকুম করা চালাও ঘোড়া। আর ছোটবোন ভয় পেয়ে বড়ভাইকে বেশ মানলেও অভিমানে মুখ ভার করে গাল দুটো ফুলায়। বোনের চোখে পানি দেখলে একেবারেই গলে যায় ভাইয়ের শক্ত কঠিন মনও।

বিপদে সবার আগে এগিয়ে আসে

জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়ে এগিয়ে আসেন ভাই; অর্থ-বুদ্ধি আর পরামর্শ দেন। ভ্রাতৃত্বের আদি ও অকৃত্রিম সম্পর্কের শুরু জন্মের পর মুহূর্ত থেকেই, খুব ভালো একজন বন্ধু হয়ে ওঠা। মনের ভেতরের খবর, ভালোলাগা-মন্দলাগা ভাই সবচেয়ে ভালো জানে। সারাটা দিন ভাই হয়তো মারামারি করছে, একে অন্যকে ভেঙচিয়ে রাগাচ্ছে, শখের খেলার পুতুল ভেঙে দিচ্ছে অথবা খেলার বলটা ঘরের জানালা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে, মায়ের কাছে নালিশ করছে, মতের অমিল হলেই চিল্লাচিল্লি করছে, অপছন্দের কিছু ঘটলেই কান্নাকাটি করছে। কিন্তু খাওয়ার সময় একসাথে বসেই খাচ্ছে, শোবার ঘরে একসাথেই ঘুমুচ্ছে, একসাথেই টিভিতে মুভি দেখছে, ভূতের গল্প শুনে প্রবল আতঙ্কে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরছে, যেকোনো বিপদে সবার আগে এগিয়ে আসছে। কেউ শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে, মানসিকভাবে ভালো না থাকলে, সুস্থ না থাকলে; স্নেহ-ভালোবাসার কারণেই ভাই কষ্ট অনুভব করে। কথায় আছে, ‘ভাই বড় ধন রক্তের বাঁধন।’

ভাইয়ের যত্ন ক্লান্তি ও বিরক্তিহীন

পরম স্নেহ-মমতায় লালন-পালন, নিরলস সেবা দান, কোনো ক্লান্তি ও বিরক্তিহীন যত্ন দিয়ে মানবতাকে উঁচুতে তুলে ধরেন ভাই। ভাইয়ের সহমর্মিতা, মানবিক মান্যতা, শ্রদ্ধা, সম্মান, ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির হিসেব না করার কারণেই এখনো পরিবার এতো সুন্দর। কখনো চকবার-আইসক্রিম আনার আবদার, কখনো তুমুল ঝগড়া, আড়ি কাটা; আবার অল্প সময়ের মধ্যেই ভাব হয়ে যায়! ভাইদের বড়রা ছোটদের নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে, নিজেদের অপূর্ণ ইচ্ছাগুলো ছোটদের দিয়ে পূরণ করার চেষ্টা করে। পবিত্র ভালোবাসার এই সম্পর্ক মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষের হৃদয়ের গভীরে গেঁথে দেন! ভাইয়ের বেশি মনোযোগ থাকা দোষের নয়। বড়ভাইয়েরা রক্ষাকর্তা হিসেবে ভালো, পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করতে ভূমিকা রাখে, ছোটদের প্রতি একটু বেশি আশার কারণে মাঝে মাঝে তীব্রভাবে ভৎসনাও করেন, সর্বদা চান ছোটরা যেন সঠিক পথে চালিত হয়।

ভাই তো ভাই-ই

ভাই তো ভাই-ই। ভাই শব্দের মধ্যে আছে জীবনের নানা স্মৃতি আর ভালোলাগা-মন্দলাগার হিসেব-নিকেশ। বোন বললো ভাইয়া আসার সময় এটা নিয়ে এসো, বললো পারব না। অথচ আসার সময় ঠিকই নিয়ে এলো। বাসায় আসার সময় কিছু নিয়ে আসা, রাতে বাসায় ফেরার অপেক্ষা, সুযোগ পেলেই এই সেই নিয়ে গল্পে মেতে ওঠা, কখনো কখনো ঝগড়া-তর্ক, কখনো সিরিয়াস বিষয় কখনো মামুলি বিষয় আবার কখনোবা আষাঢ়ে গল্পেও মেতে ওঠা। পিঠাপিঠি ভাইবোন একই সাথে বড় হলে ছেলেবেলা থেকেই একে অপরের সাথে ঝগড়া করে আবার ভাবও অনেক। কখনোই একজন অন্যজনকে ছেড়ে কোনো কিছু করতে চায় না।

বোনের কষ্টে ব্যাকুল ভাইয়ের হৃদয়

ক্লাস থেকে ফেরার পথে চকোলেট-আইসক্রিম আনা, ধমকে ভীত আবার কিছু বললে লাজুক লাজুক ভঙ্গি, এতোটুকুন ছোট্টবোনকে বিয়ের সিদ্ধান্তে ভাই প্রতিবাদ করে! এদেশে পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেলে যে মেয়ে কেঁদেকেটে একাকার হয়, নায় না খায় না, সেই মেয়েই বধূর বেশে শ্বশুরবাড়ি যায়!  বোনের কষ্ট লাঘবে কিছু করতে না পারলে  কোনো কাজে ভাইয়ের মন বসে না, বোনের কথা মনে হলেই বুকের বাঁ দিকে চিনচিনে ব্যথাটা মোচড় দিয়ে ওঠে। প্রজাপতির মতো চঞ্চল বোনের কষ্ট ভাবতেই ভাইয়ের মনটা দুঃখে ভরে ওঠে, চোখ দুটো ছলছল করে, অশ্রুসজল ভাই কাঁদতে থাকে আর গান শুনতে থাকে- ‘সে আমার ছোটবোন, বড় আদরের ছোটবোন’। বোন শ্বশুরবাড়ি যায়, তবে ভাইবোনের মধুর সম্পর্ককে নতুন কোনো সম্পর্ক এতটুকু ম্লান করতে পারে না। প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে বোনের বিয়ের পর অনেক দূরত্ব ও পরিবর্তন হলেও ভাইয়ের সাথে ভালোবাসায় ভরপুর সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তন দেখা যায় না। বিয়ের পর নিজের সাংসারিক জীবন ও স্ত্রী নিয়ে ব্যস্ততার পরও ভাই শ্বশুরবাড়িতে ব্যস্ত বোনকে দেখতে যায়, বোনের কোনো সমস্যা হলে দ্রুত ছুটে আসায় কষ্ট কমে পরিবারের সব মানুষেরই।

 

About আনিসুর রহমান এরশাদ

শিকড় সন্ধানী লেখক। কৃতজ্ঞচিত্ত। কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী। ভেতরের তাগিদ থেকে লেখেন। রক্ত গরম করতে নয়, মাথা ঠাণ্ডা ও হৃদয় নরম করতে লেখেন। লেখালেখি ও সম্পাদনার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সময়ে পাক্ষিক-মাসিক-ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন, সাময়িকী, সংকলন, আঞ্চলিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ ও জাতীয় দৈনিকের সাথে সম্পর্ক। একযুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। পড়েছেন মিডিয়া ও জার্নালিজমেও। জন্ম টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার হাতীবান্ধা গ্রামে।

View all posts by আনিসুর রহমান এরশাদ →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *