প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্কে উপভোগ্য জীবন

আনিসুর রহমান এরশাদ

প্রতিবেশী জীবনের আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। প্রতিবেশীর সাথে মানুষের সম্পর্ক সকাল-সন্ধ্যা, রাত-দিন, মাস ও বছরের বা সারা জীবনের। প্রাত্যাহিক জীবনে যাদের প্রয়োজনীয়তা আমরা সবচেয়ে বেশি অনুভব করি তারা হলেন প্রতিবেশী। প্রতিবেশী যদি মন্দ হয় তাহলে ভোগান্তির আর শেষ থাকে না। প্রতিবেশী ভালো পেলে সবাই খুশি হয়। জীবনকে আনন্দময় আরামদায়ক ও উপভোগ্য করতে ভালো প্রতিবেশীর কোনো বিকল্প নেই। ভালো প্রতিবেশী পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। যেকোনো মূল্যে  প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা উচিত। প্রতিবেশী বলতে মুসলিম, নেক বান্দা, ফাসেক, বন্ধু, শত্রু,পরদেশী, স্বদেশী, উপকারী, ক্ষতিসাধনকারী, আত্মীয়, অনাত্মীয়, নিকটতম বা তুলনামূলক একটু দূরের প্রতিবেশী সবাই অন্তর্ভুক্ত।

আর প্রতিবেশী সাধারণত তিন শ্রেণির হয়ে থাকে এবং তাদের হকও বিভিন্ন দিকে লক্ষ করে কম বেশি হয়ে থাকে। ১. এক দিক থেকে হক থাকে। অনাত্মীয় বিধর্মী প্রতিবেশীর  হক শুধু প্রতিবেশী হওয়ার ভিত্তিতে। ২. দুই দিক থেকে হক থাকে। মুসলিম প্রতিবেশীর সাথে আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক নেই। এ ব্যক্তির হক প্রতিবেশী ও মুসলিম হওয়ার দিক থেকে। ৩. তিন দিক থেকে হক থাকে মুসলিম আত্মীয় প্রতিবেশীর। এ ব্যক্তির হক প্রতিবেশী, মুসলিম ও আত্মীয় হওয়ার দিক থেকে। তবে প্রত্যেক শ্রেণীই যেহেতু প্রতিবেশী তাই প্রতিবেশীর সকল হকের ক্ষেত্রে সবাই সমান হকদার। সবসময় প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করা ও প্রতিবেশীকে সম্মান করা উচিত।

সুসম্পর্ক বজায় রাখা 

কোনো প্রকারের প্রতিবেশীকেই কষ্ট দেয়া, অনিষ্ট-ক্ষতি করা এবং অনিরাপদ করে তোলা ঠিক নয়। নিজে তৃপ্তিসহকারে খাবার গ্রহণ করলে পাশের প্রতিবেশী খাদ্যাভাবে অভুক্ত যাতে না থাকে তা খেয়াল রাখতে হবে। প্রতিবেশীদের খোঁজখবর রাখতে হবে, তাদের সাথে কলহ বা অন্যায় আচরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।  প্রতিবেশীরাই বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে একে অপরের কাছে প্রথমে এগিয়ে আসে। প্রতিবেশীর যথাযথ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সামাজিক শান্তি নিশ্চিত হয়। সামাজিক কাজ-কর্ম, বিয়ে-শাদিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজনের চেয়ে প্রতিবেশীরাই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে ও সুখ-দুঃখে সবার আগে আমাদের আঙ্গিনায় পা পড়ে প্রতিবেশীদের। তাই প্রতিবেশীদের অধিকার বা হক সবচেয়ে বেশি।

প্রতিবেশীদের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা মানে ধর্মে ধর্মে, জাতিতে জাতিতে, শ্রেণিতে শ্রেণিতে, পেশায় পেশায়, দেশে দেশে ভালো সম্পর্ক বজায় থাকা। যেখানেই আমরা থাকি না কেন প্রতিবেশীদের নিয়েই থাকতে হয়। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সাধারণত নিকটতমজন হলেও সহযোগিতার বিবেচনায় সবচেয়ে নিকটতমজন প্রতিবেশী, প্রয়োজনে হাত বাড়ালেই তাদের পাওয়া যায়। প্রতিবেশীদের সাথে স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা আছে বলে বৈরিতাও স্বাভাবিক। তথাপিও সুষ্ঠু কর্ম পরিবেশ ও উন্নত জীবন-যাপনের স্বার্থে প্রতিবেশীদের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা উচিত। প্রতিবেশীদের কাছে যিনি ভালো তিনিই প্রকৃত ভালো মানুষ। কারো সম্পর্কে ক্লিন সার্টিফিকেট দেয়ার একমাত্র ক্ষমতা রাখে প্রতিবেশীরা।

সদাচরণ করা

প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ করা, অধিকারের প্রতি লক্ষ  রাখা, বিপদ-আপদে সাহায্যের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া, উত্তম আচরণ তথা সদ্ব্যহার করা, সুখে-দুঃখে খোঁজখবর নেয়া, সেবাযত্ন করা, সামনে-পেছনে মঙ্গল কামনা করা, পারস্পরিক আচরণে সাদা মনে সম্প্রীতি-সুসম্পর্ক ও সদ্ভাব বজায় রাখা, পারস্পরিক সম্পর্ক ও অধিকারের বিষয়ে সচেতন থাকা, কাউকে কোনো ব্যাপারে কষ্ট না দেয়া, কোনো রূপ ঝগড়া-বিবাদ-কলহ-ফ্যাসাদ-কথা কাটাকাটি এড়িয়ে চলা, তাৎক্ষণিক বিবাদ মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করা, সমবেদনায় সমভাগী হওয়া, দাওয়াত দিলে কোনো রূপ অবহেলা-গড়িমসি না করে যোগ দেয়া, কেউ মারা গেলে তাৎক্ষণিক শোকগ্রস্ত পরিবারের মাঝে গিয়ে আত্মীয়-স্বজনকে সমবেদনা জানানো,  সম্ভব হলে শোকার্তের ঘরে খাবার-দাবার পাঠিয়ে দেয়া, দাফনে-কাফনে শরিক হয়ে দায়িত্ব পালন করা, শোকাহতদের সৎপরামর্শ ও সাহায্য করতে এগিয়ে যাওয়া, দরিদ্র শ্রেণির পরিবার হলে সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সাহায্য দেয়া এবং সব সময় একে অপরের উপকারের মানসিকতা পোষণ করা।

অধিকার আদায় 

পাড়া-প্রতিবেশীর অধিকার হচ্ছে- যদি এক প্রতিবেশী অপর প্রতিবেশীর কাছে ধার (কর্জ) চায়, তাহলে তাকে কর্জ দেয়া; যদি একে অপরকে দাওয়াত করে, তবে তা গ্রহণ করা; প্রতিবেশীর কেউ অসুস্থ হলে তার সেবা করা; যদি কখনো একে অপরের কাছে কোনো বিষয়ে সাহায্য প্রার্থনা করে, তবে তাকে অভাব-অভিযোগে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা; প্রতিবেশীর দুঃখে সমবেদনা প্রকাশ করা; প্রতিবেশীর আনন্দে তাকে মোবারকবাদ বা অভিনন্দন জানানো; প্রতিবেশীর উপকারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা; প্রতিবেশীর মৃত্যু হলে জানাযায় অংশগ্রহণ করা; প্রতিবেশীর অনুপস্থিতিতে তার সব ধরনের সহায়-সম্পদের হেফাজত করা। এমনকি কোনো প্রতিবেশীর বাড়ির পাশে বাড়ি নির্মাণে অনুমতি ছাড়া তাঁর বাড়ির চেয়ে উঁচু বাড়ি নির্মাণ না করা। পাড়া-প্রতিবেশী পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে সহনশীল ও সহযোগিতার মাধ্যমে উত্তম আচরণ করা। একে অন্যের প্রতি আন্তরিকতা প্রদর্শন করা কর্তব্য। প্রতিবেশী মুসলিম হোক অমুসলিম হোক সবারই হক ভালো আচরণ পাওয়া।

প্রতিবেশীকে কষ্ট দিলে মানুষের নিন্দা ও স্রষ্টার অসন্তুষ্টি মিলে। প্রতিবেশীর অনিষ্ট থেকে নিরাপদ হতে প্রতিবেশীর সাথে মন্দ আচরণ সমাধান নয়। প্রতিবেশী কষ্ট পায় এমন কথা বলা যাবে না, প্রতিবেশীর দোষ প্রকাশ না করে  ঢেকে রাখতে হবে। আর প্রতিবেশীর খোঁজ খবর রাখা, বিপদে আপদে এগিয়ে যাওয়া, একে অপরের সুখ-দুঃখের শরিক হওয়া, হাদিয়া আদান প্রদান করা, সেবা শুশ্রƒষা করা, প্রতিবেশীর কেউ মারা গেলে সান্ত্বনা দেওয়া, কাফন দাফনে শরিক হওয়া, একে অপরের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া, প্রতিবেশীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রতিবেশীর কষ্টের কারণ হয় এমন সব ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকাই একজন ভালো প্রতিবেশীর স্বভাবজাত বিষয় হওয়া উচিত। প্রতিবেশীর হক আদায় করা জরুরি।

উত্তম প্রতিবেশী

প্রতিবেশীদের মধ্যে উত্তম হল সেই প্রতিবেশী যে তার নিজের প্রতিবেশীর কাছে উত্তম, মেহমানদের আপ্যায়ন করে, প্রতিবেশীর কল্যাণকামী, যার অনিষ্ট থেকে প্রতিবেশীরা নিরাপদ, যে ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে, প্রতিবেশীকে তুচ্ছ জ্ঞান করে না। প্রতিবেশীর মধ্যে যদি এতিম, গরিব, নিঃস্ব, স্বামীহীনা ও মিসকিন থাকে তবে তাদেরকেও অনুষ্ঠানাদিতে দাওয়াত দিতে হবে, তাদেরকে দরজাসমূহ থেকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয়া যাবে না। সবচেয়ে নিকৃষ্ট অনুষ্ঠানাদি হচ্ছে সেটি যাতে ধনীদের দাওয়াত দেয়া হয় আর গরিবদের পরিত্যাগ করা হয়।

তাছাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে বিবস্ত্রকে কাপড় পরিধান করানো, ক্ষুধার্তকে অন্ন দান করা, পিপাসায় পানি পান করানো, দুর্বলদের সাথে কোমল ব্যবহার করা, দাস-দাসী হলেও তাদের সাথে সদয় ব্যবহার করা। পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে আচার-আচরণ, সদ্ভাব-সহানুভূতি, সহমর্মিতা, মধুময় সম্পর্ক বজায় রাখা এবং হক সঠিকভাবে আদায় করা সামাজিক অতি মহৎ কাজ। নিজ ঘর বা বাসার চারপাশে বসবাসকারী অন্তত ৪০ ঘর লোক প্রতিবেশী।

পরস্পর প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব, কর্তব্য ও মানবিকতা রয়েছে। এসব থেকে উদাসীন থাকা উচিত নয়। যে স্বীয় প্রতিবেশীর দৃষ্টিতে ভালো সেই সর্বোত্তম প্রতিবেশী। প্রতিবেশীর সাথে সর্বদা ভালো আচরণ করাই উত্তম প্রতিবেশীর গুণ। মন্দ আচরণ করলেও তার সাথে ভালো আচরণ করতে হবে। মন্দ প্রতিবেশীর ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করা ও ক্ষমা প্রদর্শন করা বড় হিম্মতের কাজ।

যে লোক তৃপ্তির সঙ্গে পেট ভরে খায় এবং আরাম-আয়েশে সুখনিদ্রায় কাটায়; অপরদিকে তারই প্রতিবেশী হয়তো না খেয়ে অনাহারে ধুঁকে ধুঁকে কষ্ট পায় সে প্রকৃত মানুষ নয়। প্রতিবেশীদের প্রেরিত উপঢৌকন-হাদিয়া সামান্য হলেও তাচ্ছিল্য করা বা তুচ্ছ ভাবা ঠিক নয়। কেউ যদি এক প্রতিবেশীর প্রেরিত হাদিয়া-উপহার ফিরিয়ে দেয় বা অবজ্ঞা করে না রাখে; তাহলে পরস্পরের মধ্যে সহমর্মিতাবোধ থাকে না, হিংসা-বিদ্বেষ বেড়ে যায়। এমনকি সম্পর্কচ্ছেদ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তাই যার ঘরের দরজা নিজের ঘরের কাছে সে অগ্রাধিকার পাবে।

আমরা যার সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানি কিংবা আমাদের সম্পর্কে যারা সবেচেয়ে ভালো জানেন তারা হলেন প্রতিবেশী। তাই এখনো কারো সম্পর্কে জানতে আমরা তার প্রতিবেশীর দ্বারস্থ হই। রাসুল (সা.) তার ইহুদি প্রতিবেশীদের সঙ্গেও ভালো ব্যবহার করতেন, সুখ-দুঃখের সংবাদ নিতেন। এমনকি অসুখ-বিসুখ হলে সেবা-শুশ্রƒষা করতেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ভাব, সুন্দর আচার-আচরণ করার মাধ্যমে উত্তম প্রতিবেশী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনে সচেষ্ট হতে হবে। প্রতিবেশী এক বুড়ি নবীজির নামাজে যাবার পথে সব সময় কাঁটা পুঁতে রাখত তাঁকে কষ্ট দেয়ার জন্য। একদিন নবীজি কাঁটা সরাতে গিয়ে না পেয়ে ভাবল নিশ্চয় বুড়িমার কোনো অসুখ হয়েছে। নবীজি তাকে দেখতে গেলেন।

হযরত ওমর (রা.) গভীর রাত পর্যন্ত প্রতিবেশীদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে খোঁজ নিতেন কারো কোনো দুঃখ-কষ্ট আছে কি না। একদিন নিজে মাথায় করে অভুক্ত প্রতিবেশীর ঘরে আটার বস্তা পৌঁছে দেন। সনাতন ধর্মের মনোসংহিতায় আছে ‘যে ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে খাদ্য না দিয়ে নিজে খায় সে নরকবাসী হবে।’ বৌদ্ধধর্মের সদ্ধর্ম্ম রত্মচৈত্য, উপদেশ পর্বে ১৭৪ পৃষ্ঠায় আছে ‘কৃপণতা ত্যাগ করিয়া যথাশক্তি দান করা এবং তাহাতে প্রীতি উৎপাদন করা, ভিক্ষুসঙ্ঘ, পথিক, যাজক ও দীন-দুঃখী এমনকি পশুপক্ষীকেও যথাশক্তি দান দিয়া উপকার করাকে দানগুণ বলে।’

অধিকারে হস্তক্ষেপ

প্রতিবেশীর অধিকারে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। সবচেয়ে ক্ষীণস্বার্থ হলো ব্যক্তিস্বার্থ অথচ এ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে না পারায় প্রতিবেশীর স্বার্থ নিয়ে আজকাল খুব কম জনই ভাবে। শহরে বাড়িওয়ালারা ভাড়াটিয়া প্রতিবেশীদের সাথে  ইচ্ছা করেই ভালো সম্পর্ক রাখে না। কারণ ভালো সম্পর্ক থাকলে বছর বছর ভাড়া বাড়ানো সম্ভব নয়, থাকলে থাকুন না থাকলে চলে যান বলা সম্ভব নয়। একইভাবে অফিসের বড় কর্তা ছোটদের সাথে কিংবা মালিক-শ্রমিকদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখে না। কারণ ভালো সম্পর্ক থাকলে বল প্রয়োগের মাধ্যমে অতিরিক্ত কাজ আদায় করা সম্ভব নয়। ভালো সম্পর্ক থাকলে প্রতিবেশীরা বেশি বিরক্ত করবে, অধিকার খাঁটাবে ভেবে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে দেখা যায়।

প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া বা তার অধিকার নষ্ট করা মস্ত বড় অপরাধ। একই অন্যায় প্রতিবেশীর ক্ষেত্রে করলে অন্যের তুলনায় দশ গুণ বেশি বা বড় বলে গণ্য হয়।  দশজন নারীর সাথে ব্যভিচারের চেয়েও প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার বেশি মারাত্মক অপরাধ। প্রতিবেশীর বাড়িতে চুরি করা দশ বাড়িতে চুরি করার চেয়েও বড় অন্যায়। দুই প্রতিবেশী তাদের বাড়ির সীমানা নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। যে প্রতিবেশীর শক্তি বেশি সে জোরপূর্বক নিজের সীমানা বাড়িয়ে নেয়। এটা বসতবাড়ির ক্ষেত্রে যেমন হয় ফসলের জমির প্রতিবেশীর সাথে আরো বেশি হয়। যাকে বলে ‘ জমির আইল ঠেলা’।

খারাপ প্রতিবেশী

খারাপ প্রতিবেশী হচ্ছে- যে নিজে পেটপুরে খায় অথচ পাশের প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে; প্রতিবেশীর খোঁজ খবর রাখে না। অর্থবল বা জনবল আছে বলে প্রতিবেশীর হক নষ্ট করা বা তাকে কষ্ট দেওয়া অনেক বড় অন্যায়। কোনো ভালো মানুষ প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। যে ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয় সে অমানুষ।  জানালা দিয়ে উঁকি দেয়া, চলা ফেরার ক্ষেত্রে দৃষ্টি অবনত না রাখা, প্রতিবেশীর বাসার সামনে ময়লা ফেলা, জোরে ক্যাসেট বাজানো, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময় প্রতিবেশীর ঘুম বা বিশ্রামের ক্ষতি করা, প্রতিবেশীর চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া, গৃহপালিত পশুর মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া ইত্যাদি। মন্দ প্রতিবেশী না হয়ে ভালো প্রতিবেশী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ একজন মন্দ প্রতিবেশী সাধারণ জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করবে বা আমাকেও মন্দের দিকে নিয়ে যায়।

সুসম্পর্কের প্রভাব 

সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ প্রতিবেশীদের মধ্যে সুসম্পর্কের অভাব। আর দুর্নীতি, গুম, খুন, ধর্ষণ ও মাদকের পেছনে কাজ করছে মূলত সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। প্রতিবেশীদের মধ্যে সুসম্পর্ক সামাজিক বন্ধন মজবুত করে সামাজিক অবক্ষয় রোধ করতে পারে, সামাজিক জীবনকে টিকিয়ে রাখতে পারে। তাই মানবসমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে সচেতনতা প্রয়োজন। শহরের মানুষের মাঝে প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে চরম অবহেলা পরিলক্ষিত হয়।

বছরের পর বছর পার হয় পাশের বাড়ির কারো সাথে কোনো কথা হয় না, খোঁজ খবর নেওয়া হয় না; বরং বিভিন্নভাবে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া হয়। অনেক প্রতিবেশীই এমন আছে, যাদের দেখে বোঝার উপায় নেই যে, তারা অভাবে দিন কাটাচ্ছে। আবার  কখনো চাইবেও না। এক্ষেত্রে  কর্তব্য নিজে থেকে তাদের খোঁজ খবর রাখা এবং দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন পন্থা অবলম্বন করা, যাতে সে লজ্জা না পায়। এজন্যইতো যাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে এটা বলে দেয়া জরুরি নয় যে, আমি তোমাকে যাকাত দিচ্ছি; বরং ব্যক্তি যাকাতের যোগ্য কি না এটুকু জেনে নেয়াই যথেষ্ট।

হাদিয়ার আদান-প্রদান

প্রতিবেশীদের পরস্পরের সুসম্পর্ক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে হাদিয়ার আদান-প্রদান খুবই কার্যকর পন্থা। এর মাধ্যমে হৃদ্যতা সৃষ্টি হয় ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন মজবুত হয়। এক প্রতিবেশী আরেক প্রতিবেশীকে হাদিয়া দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য জিনিস হাদিয়া দিতেও উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিবেশীকে হাদিয়া দিতে সংকোচবোধ না করতে বলা হয়েছে। বাসায় ভালো কিছু রান্না হলে প্রতিবেশীকে না জানালেও রান্নার ঘ্রাণতো তাকে জানিয়ে দেয়; পাশের বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হচ্ছে। ঘ্রাণ পেয়ে ছোটদের মনে তো আগ্রহ জাগবে তা খাওয়ার। সুতরাং তাদের দিকে খেয়াল রেখে ঝোল বাড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে হোক বা নিজে একটু কম খাওয়ার মাধ্যমে হোক সামান্য কিছু যদি পাঠিয়ে দিলে ঐ ছোট্ট শিশুর মনের ইচ্ছা পুরণ করা হবে।

যে খাবার তৈরি করে  তাকেও খাওয়াতে হবে, একসাথে বসিয়ে খাওয়াতে না পারলেও দু’এক লোকমা হলেও দিতে হবে। কারণ এ খাবার প্রস্তুত করতে গিয়ে সে এর ধোঁয়া ও আগুনের তাপ যেমন সহ্য করেছে তেমনি এর সুঘ্রাণ তার নাকে ও মনে লেগেছে। ভালো কিছু রান্না হলে মাঝে মধ্যে কাজের বুয়ার সন্তানদের জন্য কিছু দেয়া উচিত। প্রতিবেশী যদি দরিদ্র হয় তাহলে খাবারের বিষয়ে তার হক আরো বেশি। কারণ দরিদ্রকে খানা খাওয়ানো যেমন অনেক পুণ্যের কাজ তেমনি দরিদ্রকে খানা না-খাওয়ানো গুনাহর কাজ।

প্রয়োজনে ছাড় দেয়া

প্রতিবেশীর মধ্যে যেমন আছে নিকট প্রতিবেশী, নিকটতম প্রতিবেশী ও তুলনামূলক একটু দূরের প্রতিবেশী তেমনি আছে মুসলিম ও বিধর্মী। এক্ষেত্রে বেশি নিকটবর্তী বা নিকটতম প্রতিবেশীকেই আগে হাদিয়া দিতে হবে, যদিও সে বিধর্মী হয়।  অনেক সময় এমন হয়, প্রতিবেশীর প্রয়োজনে কিছু ছাড় দিতে হয়। কিংবা নিজের কিছু ক্ষতি স্বীকার করলে প্রতিবেশীর অনেক বড় উপকার হয় বা সে অনেক বড় সমস্যা থেকে বেঁচে যায়। এসব ক্ষেত্রে প্রতিবেশীর প্রয়োজন পূরণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

দৈনন্দিন জীবনে আমাদের ছোটখাট অনেক জিনিসেরই প্রয়োজন হয়। কোনো বস্তু হয়তো সামান্য, কিন্তু তার প্রয়োজন নিত্য। যেমন লবণ খুব সামান্য জিনিস, কিন্তু তা ছাড়া চলে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য পাশের বাড়ি বা প্রতিবেশীর দ্বারস্থ হলে তা দেয়া উচিত। গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় ছোটখাট সাহায্যদানে বিরত থাকে এমন প্রতিবেশীকে ধিক। নিজের জমি বা বাড়ি বিক্রি করতে চাইলে আগে পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশীকে জানাতে হবে। যদি সে কিনতে না চায় তাহলে অন্যের কাছে বিক্রি করা যাবে। হতে পারে এ জমিটি তার প্রয়োজন বা এমন ব্যক্তি তা ক্রয় করল যার কারণে সে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে ইত্যাদি। তাই তাকে না জানিয়ে কারো কাছে বিক্রি করা যাবে না।

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *