পরিবারে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা জরুরি

আনিসুর রহমান এরশাদ

পরিবারে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। পরিবারে সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা হলে বিশুদ্ধ মনের মানুষ গড়ে ওঠে। সংস্কৃতিবান মানুষ মানে  ভদ্র-সভ্য-বিনয়ী মানুষ, সুরুচিশীল ও পরিচ্ছন্ন মানুষ, সুন্দর মনের ও মার্জিত স্বভাব-চরিত্রের মানুষ, নতুনকে মেনে নেয়ার  হৃদয় সম্পন্ন মানুষ, উদার চিন্তা-চেতনা-কল্পনা সম্পন্ন উৎকর্ষ আত্মার মানুষ। যিনি সংস্কৃতিমনা; তার আচার-ব্যবহার আকর্ষণীয়, পারিবারিক কাজকর্মও চমৎকার, সামাজিক ক্রিয়াকাণ্ড দৃশ্যমান, রাজনৈতিক কর্মধারা যৌক্তিক বিবেক দ্বারা পরিচালিত, সামাজিকতা কাক্সিক্ষত মানে উত্তীর্ণ, সামগ্রিক জীবন পরের কল্যাণে নিবেদিত ও মঙ্গলকামী। সুস্থধারার বিনোদন রুচিবোধকে উন্নত করে। তাই ভালো গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপনচিত্র  প্রভৃতির চর্চা করা প্রয়োজন।

প্রচারমাধ্যমের সচেতনতা

পরিবার সম্পর্কিত বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত নাটক, সিনেমাগুলোতে পারিবারিক মূল্যবোধের বিষয়ের চেয়ে পারিবারিক কলহকে আবশ্যিক করে দেখানো হচ্ছে। স্টার প্লাস, জি বাংলার মতো ভারতীয় চ্যানেলগুলো বাংলাদেশের পারিবারিক বন্ধনকে ধ্বংস করছে। দেশের টেলিভিশনে প্রচারিত বিদেশি সিরিয়াল ও ডাবিংকৃত সিরিয়াল আমাদের পারিবারিক বন্ধনকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে; যা সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা ও পরকীয়ার জন্য প্রধান দায়ী। চলচ্চিত্র, নাটক ও সমাজ বাস্তবতা থেকেও অপরাধের পাঠ নিচ্ছে কিশোর-তরুণরা। পারিবারিক ভাঙনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। যে সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অমিল থাকে, সেখানকার সন্তানরাও মানসিক সমস্যায় ভোগে। ভবিষ্যতে ওই সন্তান জড়িয়ে পড়ে নানা অপরাধে।

সুস্থ প্রজন্ম গঠন

পরিবারে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার ফলে জাতিসত্তা ও স্বকীয়তা সম্পর্কে সচেতন থাকা যায়, দেশের উন্নতি-অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা যায়, সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব থেকে জাতিকে বাঁচানো যায়। শালীনতার ভিতরে থেকে সঙ্গীত-নাটক-আবৃত্তি-অভিনয়-নৃত্যকলা-চলচ্চিত্র-চিত্রকর্ম ও সাহিত্য চর্চা মানুষের কল্যাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যেই পরিবারে পারিবারিক লাইব্রেরি আছে, বই পড়া ও লেখালেখির অভ্যাস আছে, পরিবারের সদস্যদের সুস্থ বিনোদনের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার মানসিকতা আছে, বইমেলায় যাওয়া থেকে শুরু করে লাইব্রেরিতে যাওয়া কিংবা বই কেনার প্রবণতা আছে; সেই পরিবারের সদস্যদের সুখ-শান্তি-মানসিক তৃপ্তি বেশি থাকে। সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা মানুষকে উদারতা শেখায়, সবার সঙ্গে মিশতে শেখায়, সৃজনশীলতা তৈরি করে আনন্দে মাতিয়ে রাখে এবং সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার মতো কাজে তাদেরকে উজ্জীবিত করে, সুস্থ প্রজন্ম গঠন করে।

নষ্ট সংস্কৃতি রোধ

সংস্কৃতিচর্চা গুরুত্বপূর্ণ হবার কারণ হচ্ছে- যে সুস্থ সংস্কৃতিবান নয়,  সে যে পেশারই হোক না কেন তার কর্ম ও আচরণে জাতি আর্থ-সামাজিকভাবে উন্নত হয় না। সংস্কৃতি জীবনকে সুন্দরের পথ দেখায় আর অপসংস্কৃতি মানুষকে অসুন্দরের পথে নিয়ে যায়, অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। অপসংস্কৃতি জাতীয় মূল্যবোধকে গলাটিপ হত্যা করে, বিবেকের দরজায় কড়া লাগায়।  অপসংস্কৃতি মানুষকে তার মা, মাটি ও দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। অপসংস্কৃতি দিয়ে মনের চাহিদা মেটালে আমরা পিছিয়ে পড়ব, নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য থেকে দূরে সরে যাব, মূল্যবোধহীন ও নীতি-নৈতিকতার চেতনাহীন হব।

অপসংস্কৃতি তাই যা- ব্যক্তিজীবন ও সমাজকে অবক্ষয়ের গহ্বরে নিক্ষেপ করে, অনাচার-শোষণ-বঞ্চনাকে লোভ-লালসার কারণে সঠিক মনে করে, অনিয়ম-দুর্নীতি করেও বিলাসী যিন্দেগি যাপনে উৎসাহিত করে, মাদকাসক্তিকে বৈধতা দান করে, ধর্ষণ করে হলেও যৌন চাহিদা মিটিয়ে পাশবিক আনন্দ লাভে প্রলোভিত করে, অপহরণ-হত্যা করেও নিজের স্বার্থ হাসিলের দানবিক মানসিকতা তৈরি করে, ছিনতাই-চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস করে হলেও অর্থ-ক্ষমতা-সাফল্য লাভের চাহিদা তৈরি করে, নিজস্ব প্রকৃতি-চিন্তা-বিশ্বাসের বিপরীত রীতিনীতি মানতে প্রলুব্ধ করে। অপসংস্কৃতি ঠিক ততটাই ক্ষতিকর যতটা ক্ষতিকর বহুমূত্রে আক্রান্ত রোগীর জন্য চিনি। নষ্ট সংস্কৃতির চর্চায় বাড়ে পারিবারিক অশান্তি, কুটনামি, পরকীয়া, ডিভোর্স, ঝগড়া, হিংসা, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সন্দেহ।

মূল্যবোধ সম্পন্ন প্রজন্ম

যে পরিবারে বয়স্করা সংস্কৃতিমনা; সেই পরিবারে ছোটরাও নীতি-নৈতিকতা, সত্যভাষণ, কথা ও কর্মে সঙ্গতি স্থাপনের নির্দেশনা পেয়ে মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সত্যিকার মানুষ হিসেবে গড়তে পরিবারে সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার বিকল্প নেই। বড়দের প্রতি সম্মান আর ছোটদের প্রতি স্নেহ করার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য জাগ্রত থাকলে বৃদ্ধ পিতা-মাতাদের সন্তানদের থেকে পৃথক হয়ে অসহায় জীবন যাপন করতে হবে না। নবীনেরা প্রতিনিয়ত যান্ত্রিক, নিষ্ঠুর, নির্দয়, নির্লজ্জতার উপাদানগুলো চর্চা করে বড় হবে না, বিপথগামী হবে না, জঙ্গি হবে না।

উত্তম বিনোদন ব্যবস্থা ও সময় কাটানোর জন্য পর্যাপ্ত উত্তম বিকল্প উপায় থাকলেই কেবল সন্তানেরা পর্ন দেখবে না, নোংরা ও অশ্লীল লেখা পড়বে না, নৈতিক বিপর্যয়ের শিকার হবে না। অভিভাবকদের শত ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারকে একান্ত সময়দানের অপরিহার্যতা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। পরিবারের এক সদস্যের সাথে অন্য সদস্যের মনোমালিন্য চললে, পারিবারিক সমস্যা সমাধান না করে গোপন রাখলে নষ্ট হতে থাকে পারিবারিক সংস্কৃতি। বাবার সাথে সন্তানের, ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের আর্থিক বিষয়কে কেন্দ্র করে ঝগড়া হয়ে সুস্থ সংস্কৃতি অপহত হচ্ছে, সমাজের সংস্কৃতি আহত হচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা প্রেম ভালোবাসার মাধ্যমে আন্তরিক ও কৌশলী হলেই সমাজকে পরিবারের পক্ষ থেকে সুন্দর সংস্কৃতি উপহার দিতে পারে।

রুচিবোধের উন্নয়ন

শিক্ষাবান্ধব পরিবার মাত্রই সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র। মা-বাবা যদি হয় শিক্ষিত, মার্জিত, রুচির অধিকারী, সহনশীল, বিবেকবান, সংস্কৃতিবান; তবে সন্তানদের মধ্যে ন্যূনতম ইতিবাচক গুণাবলির উপস্থিতি খুব সহজেই লক্ষণীয় হয়। পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার শক্তিশালী বন্ধনে তৈরি হয় মানবিকতা ও ইতিবাচকতা, যা বিচার-বুদ্ধিহীন কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে ও রাখতে ভূমিকা রাখে।

সামাজিক বৈষম্যের কারণে সংকট বৃদ্ধি মোকাবেলা কঠিন হলেও পরিবারের কর্তা যদি মননশীল ও সৃজনশীল হয় তবে সহজেই সামাজিক- সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সাথে পরিবারের অন্য সদস্যদের সুস্থ জীবন যাপন নিশ্চিত করতে পারে। আবহমান বাংলার সংস্কৃতিকে রক্ষা করার মাধ্যমেই নতুন প্রজন্মের জন্য সুস্থ-স্বাভাবিক মানবিক গুণাবলি বিকাশের পথ উন্মুক্ত রাখা সম্ভব হবে। তাই বাংলাদেশের স্বতন্ত্র ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও সভ্যতার ধারকদেরকে নিজ জাতির    সংস্কৃতিচর্চায় মনোনিবেশ করতে হবে।

কুসংস্কারমুক্ত সচেতনতা

সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে কুসংস্কারমুক্ত একটি প্রগতিশীল ও আধুনিক পরিবারের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়, অসাম্প্রদায়িক সচেতনতা সৃষ্টি হয়। যেখানে স্নেহশীল, পারস্পরিক সৌহার্দ্যবোধ সম্পন্ন, মানবিক, সামাজিক হয়ে গড়ে ওঠে নবীনেরা; সেখানে পারিবারিক শিক্ষাটা পুরোটাই পাশ্চাত্য কেন্দ্রিক ও সংস্কৃতির ধারণাটাও দেশজ না হলে সচেতন বুদ্ধিমত্তায় প্রখর দূরদৃষ্টি সম্পন্ন দেশপ্রেমিক মানুষ গড়ে উঠবে না। অপসংস্কৃতি আপনজনদের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল ধরায়, বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি করে, হতাশা বাড়ায়, আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ায়।

সুস্থ ও সহিষ্ণু সংস্কৃতিচর্চা প্রাত্যহিক জীবন যাত্রায় নিয়ম শৃঙ্খলা আনে, সৎ থাকার প্রবণতা তৈরি করে। পরিবারে সাংস্কৃতিক পরিবেশ সমাজের নিজস্বতা বিবেচনা রেখেই হতে হবে। সুস্থ সংস্কৃতির নান্দনিক বিকাশের মাধ্যমেই ঐতিহ্যের লালিত সেতুবন্ধনে অনায়াসে পৌঁছতে পারে মানুষ, মানববৃত্তির উত্তম প্রকাশ ঘটতে পারে, নৈতিকতা সমৃদ্ধ সমাজ গড়তে পারে এবং ব্যক্তি উন্নত-আত্মবিশ্বাসী ও সংস্কৃতিবান হতে পারে। উন্নত সংস্কৃতিবান মানুষ জ্ঞানী মানুষ, শৈল্পিক সৌন্দর্যবোধ সম্পন্ন মানুষ, বিনয়ী আচার-আচরণে অভ্যস্ত মানুষ, নৈতিকতাবোধে উজ্জীবিত আইন মানায় অভ্যস্ত নাগরিক।

প্রসারিত দৃষ্টি

সুস্থ সংস্কৃতি মানুষের প্রয়োজন পরিপূরণে অত্যন্ত কল্যাণময় সত্য ও বাস্তবতা, যা মানব প্রকৃতির অন্তর্গত চাহিদার পরিতৃপ্তি ও চরিতার্থতারই ফসল। হৃদয়ানুভূতি, চিত্তবৃত্তি, আবেগ-উচ্ছ্বাস ও মানসিক ঝোঁক-প্রবণতার সাথে সংস্কৃতির নিবিড় সম্পর্ক। সুস্থ সংস্কৃতির ফলে ব্যক্তিসত্তা লাভ করে সংরক্ষণ ও প্রতিরক্ষার অনুভূতি। সুস্থ সংস্কৃতি ব্যক্তি মানুষের কর্মক্ষেত্র ও কর্মশক্তি ব্যাপকতর করে দেয়; চিন্তাশক্তিকে দেয় গাম্ভীর্য ও গভীরতা, দৃষ্টিকে করে প্রসারিত, স্বভাবগত চরিত্রে আনে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন; যার অনিবার্য পরিণতি সামষ্টিক ও টেকসই কল্যাণ।

একটি ব্যক্তির উন্নতি তখনি সম্ভব, যখন তার পারিবারিক পরিমণ্ডলে সংস্কৃতি ও সভ্যতা পুরোপুরি সংরক্ষিত হবে। সংস্কৃতি হচ্ছে মন ও মগজকেন্দ্রিক আবর্তন-বিবর্তনের স্বতঃস্ফূর্ত ও উন্মুক্ত বহিঃপ্রকাশ। এই কারণে স্বাধীন-মুক্ত পারিবারিক-পরিবেশেই সংস্কৃতি যথার্থ উৎকর্ষ লাভ করতে পারে। স্বাধীন-মুক্ত মানে বল্গাহীন বা যা ইচ্ছে তাই করা নয়; সংস্কৃতি আর অপসংস্কৃতি গুলিয়ে ফেলার ব্যাপারে যথেষ্ট সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।

ঐতিহ্যের বুনিয়াদি শিক্ষা

জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার কারণে দিন দিন মানুষের সৌখিন ও মননশীলতার চর্চা কমছে, পঠন-পাঠনের অভ্যাস কমছে। অনলাইন-ইন্টারনেট, ফেসবুক-টুইটার-ইউটিউব, মোবাইল ফোন এবং আকাশ সংস্কৃতির মাঝে বোধ তৈরির স্থায়িত্ব কম। তারপরও সচেতন পরিবারগুলো দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করেন, লালন করেন এবং প্রজন্মান্তরে প্রবহমান রাখেন। সৃজনশীলতা, কৃষ্টি, সভ্যতা, পারিবারিক সম্প্রীতির ঐতিহ্যের বুনিয়াদি শিক্ষা দেন।

পুরোনো অভ্যাস, পুরোনো ধ্যান ধারণা, পুরোনো ঐতিহ্য আর পুরোনো সংস্কৃতি ও জীবনধারার সবকিছু ভেঙে গেলেও নতুন করে সুস্থ সংস্কৃতির বুনিয়াদ পাকা না হওয়া বেশি আশঙ্কার। এমতাবস্থায় পারিবারিক ঐতিহ্য গড়ে তুলুন। নিয়মিত সাধারণ একটি আয়োজন পরিবারের ঐতিহ্য হয়ে উঠতে পারে। যেমন- একসাথে খাওয়া, দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া, গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, একসাথে রোগী দেখতে যাওয়া ইত্যাদি। সমাজের সংস্কৃতির মূল কেন্দ্রই হচ্ছে সমাজের প্রতিটি পরিবার।

সঠিক জীবনবোধ

প্রকৃত মানব হিসেবে গড়ে ওঠার অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে সংস্কৃতিচর্চা। পারিবারিক সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল, পরিমার্জনীয় ও চলমান। সময়ের নিগড় বেয়ে যা গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে, তাই একসময়ে এসে সবাই মেনে চলে। গৃহের পরিবেশকে প্রশান্তময় রাখা, বাচ্চাদের উপর অতিরিক্ত পাঠ না চাপানো, উন্মাদনামূলক বিনোদন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ না করাও সুস্থ বিকাশে অপরিহার্য। সন্তানকে বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে পারিবারিক মূল্যবোধ ও সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা।

সঠিক জীবনবোধ এবং সমাজ সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণার জন্য নানা ধরনের সাংস্কৃতিক সংগঠন, দলগত খেলাধুলার সুযোগ করে দিয়ে নানা সংস্কৃতির মানুষের সাথে মেশার যোগ করে দিতে হবে। যা তার চিন্তার ক্ষমতা বাড়াবে, জীবনে সঠিক পথে চলার ক্ষমতা বাড়াবে। পরিবারের একজন সদস্যের বুদ্ধি-জ্ঞান, চিন্তা-ভাবনা ও মননশীলতার উৎকর্ষতাই পরিবারকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত দুর্গ বানাবে না। অধিকাংশের দৈনন্দিন জীবনে যদি প্রকৃত শিক্ষা বা জ্ঞানের আলো সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে তবেই আস্তে আস্তে পরিবারটি সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়।

সৃজনশীলতার চর্চা

যে ছেলে-মেয়ে খেলাধুলা করে, বই পড়ে ও সংস্কৃতিচর্চা করে সেই ছেলে-মেয়ে আলোকিত মানুষ হয়। যারা গান গাইছেন, কবিতা  লিখছেন, ছবি আঁকছেন কিংবা ডিজাইন করছেন সবাই কিন্তু সংস্কৃতি চর্চা করছেন। আর যারা এগুলো শুনছেন বা দেখছেন তারা সৃজনশীলতার মধ্যে রয়েছেন। সঙ্গীতের শক্তি অসীম। মেধা মননে হৃষ্ট, ভাষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্যের দীর্ঘ ইতিহাসে গৌরবান্বিত জাতির প্রতিটি পরিবারে সঙ্গীত হতে পারে প্রেরণার উৎস। সন্তানদের সংস্কৃতিমনা করে তুলুন, যাতে সুস্থ  সংস্কৃতি চর্চা একেকটি পরিবারকে একেকটি সুরক্ষিত দুর্গে পরিণত করে।

সুস্থধারার সংস্কৃতি চর্চা

এখনই পরিবার সম্পর্কিত সুস্থধারার সংস্কৃতি চর্চা বাড়াতে না পারলে দ্রুতই পারিবারিক বন্ধন ঢিলেঢালা হয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। পারিবারিক বন্ধন হারালে মানবিক বোধ নিজেদের বিকলাঙ্গ ঘোষণা করে চলে যাবে মহাকালের অতল গহ্বরে। যেখান থেকে ফেরার কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না। সুতরাং সময় থাকতে সাবধান হওয়া সময়ের অপরিহার্য দাবি। যেকোনো বাস্তবতায় নড়বড়ে পরিবার, বিয়ে বহির্ভূত শিশুদের জন্ম, বয়স্ক পিতা-মাতার সেবাযত্নহীন জীবনযাপন নির্মম বাস্তবতা। মানুষে মানুষে সন্দেহ, হিংসা, ঘৃণা, লোভ, ক্রোধ আর অবিশ্বাস বেড়ে চলছে।

প্রতারণা ও ছলচাতুরী করে অন্যকে ঠকিয়ে নিজে এগিয়ে যাওয়া বা বিজয়ী হওয়ার মানসিকতা  দেখা যাচ্ছে। সন্তান নেয়ার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের সংজ্ঞা পাল্টে যাচ্ছে। প্রতিটি পরিবারের সামাজিক মর্যাদা ও জীবনচর্চা ভিন্ন ধরনের হচ্ছে। যদিও পরিবারগুলো এখনো সমাজের মজবুত কোষ ও বাচ্চাদের বড় করার একমাত্র মজবুত আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে চলছে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা যেই পরিবারে যত বেশি হবে, সেই পরিবারের সদস্যগণ জীবনে ততবেশি সার্থকতা লাভে সক্ষম হবেন। শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চায় মানবীয় গুণাবলির উৎকর্ষ সাধন হয়, আলোকিত মানুষ গড়া সম্ভব হয়।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে

পরিবারগুলো ক্রমাগত পরিবর্তনশীল অবস্থায় থাকে, উন্নয়নের এক পর্যায় থেকে আরেক স্তরে চলে আসে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পারিবারিক সংস্কতিতেও পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়। একেকজনের ভূমিকা ও প্রত্যাশাও বয়সভেদে পরিবর্তন হয়। পরিবারের সংস্কৃতির আলোকেই পরিবারের মান নির্ণীত হয়। সুনীতির অনুশীলন পরিবারগুলোকে মানবসম্পদ তৈরির কারখানায় পরিণত করে। ব্যক্তিত্ব ও ইমেজ গড়তেও ভূমিকা রাখে।

ভালো পরিবার ভালো সমাজ তৈরি করে। অনুপ্রাণিত করার মতো সদস্য থাকলে প্রেরণা নেয়ার মতো সদস্যের অভাব হয় না। সবসময় সুখের পিছনে ছুটতে গিয়েই অনেকে অসুখী হন। মনের শান্তি লাভ করার উপায় শিখতে হয় পরিবার থেকেই। সম্পদ অর্জনে স্বাস্থ্য ব্যয় করা আর স্বাস্থ্য ফিরে পেতে সম্পদ ব্যয় করায় জীবন সন্তুষ্ট হয় না। পরিবারের সদস্যরা যদি একসাথে মিলেমিশে থাকেন ও পরস্পরের কল্যাণকামী হন তবে শান্তি বিরাজ করে।

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *