‘না খেয়ে মরার চেয়ে করোনায় মরা ভালো’

জীবন-জীবিকার গল্প : রিকশাচালক

রিকশাচালক মন্টু (ছদ্মনাম)।  শহরের অলি-গলিতে রিকশা চালান।
কেউ কেউ সম্বোধন করেন- রিকশাওয়ালা! এই রিকশা! রিকশা যাবে?
রিকশার মাঝে যেন চালক মন্টুর নামটা ঢাকা পড়ে গেছে। যেনো মন্টুই সেই যানবাহন যেটা তিনি চালান।
জীবনের বিবর্ণ বাস্তবতা তাকে রিকশা চালাতে বাধ্য করেছে।
তিন চাকার সাথে রিকশাওয়ালার জীবনের গল্প মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে।

জীবিকার জন্য রোদে পুড়ে- বৃষ্টিতে ভিজে টানা ১৫ বছর ধরে রিক্সা চালানোর মতো শ্রমসাধ্য কাজ করছেন মন্টু।
প্রথম ৫ বছর ছিলেন মৌসুমি রিকশাচালক। দশ বছর ধরে রিকশা চালানোই মূল পেশা।
এখন আর গ্রামে কৃষিকাজ করেন না। আগে বছরে দুই চার মাসের জন্য ঢাকায় আসলেও এখন ঢাকাতেই স্থায়ী।
যখন কোনো পুঁজি ছিল না, প্রশিক্ষণ ছিল না। চরম দারিদ্রতার কারণে প্রাইমারীর গণ্ডি পেরানোর আগেই শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটেছিল।
তাৎক্ষণিক উপার্জনের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন রিক্সা চালানোকে। তখন ইচ্ছা ছিল- কিছু সঞ্চয় করে গ্রামাঞ্চলে গিয়ে কর্মের ব্যবস্থা করে নেবে। কিন্তু ১৬ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেও, হাড়ভাঙা কায়িক পরিশ্রমের পরও সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি।

রাস্তার পাশের চা স্টল, মুদি দোকান, গ্যারেজ, বস্তির বাসা কিংবা রিকশা থামিয়ে বিশ্রাম করেন।
স্যাঁতসেঁতে রুমে গাদাগাদি করে থাকেন। মশা, ছারপোকা, তেলাপোকা, ইঁদুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ !
আয় রোজগার আগের চাইতে বাড়লেও জীবনমানের কোনো উন্নতি হয়নি। নিম্নমানের জীবনযাপন করেন। খাবারের জন্য নির্ভর করেন অস্থায়ী খাবার দোকান ও ফুটপাতের হোটেলের ওপর। স্বাস্থ্যকর-পুষ্টিকর খাবার দাবারের অভাব প্রকট। দিনের খাওয়া সারেন বিভিন্ন টংয়ের দোকানে রুটি, কেক ও চা খেয়ে। ভাত খাওয়ার পয়সা সাশ্রয় করেন।

রাস্তাঘাটে সস্তায় পুষ্টিকর খাবার বিক্রির ব্যবস্থা না থাকায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। রাস্তাঘাটে সুপেয়-বিশুদ্ধ পানি পান না। টয়লেটের তীব্র সংকটে ভুগেন। বেশিরভাগ সময় ড্রেনে বা গাছপালার আড়ালে টয়লেটের কাজ সারেন। ফলে মাঝে মাঝেই অসুস্থ থাকেন। জ্বর-কাশি, ঠাণ্ডা, গায়ে ব্যথা, দুর্বলতা, ডায়রিয়া বা জন্ডিস- একের পর এক রোগ লেগেই থাকে। পায়ের পেশিতে টান পড়ে। রয়েছে নিরাপদ খাবার-পানির অভাব, রাস্তার খোলা খাবার খাওয়ার প্রবণতা আর প্রচলিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে যাওয়ার অনীহা। সময় আর খরচ বাঁচানোর জন্য নির্ভর করেন হাতুড়ে চিকিৎসকের উপর।

চাকা ঘুরলে পয়সা আসে, চাকা না ঘুরলে পয়সা আসে না। ফলে যখন শরীর অসুস্থ থাকে তখন অনেক সময় পেটে পানি ছাড়া দানা পড়ে না।
নগরে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়, কিন্তু গরীব রিকশাওয়ালা মন্টুর ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি হওয়ায় বিকাশে টাকা পাঠায়। ভালো কিছু করার বা পাবার আশায়ই পরিবারকে গ্রামে রেখেই চলে এসেছিলেন, ভেবেছিলেন ভালো কিছু হলে স্ত্রী-সন্তানদেরও ঢাকায় নিয়ে আসবেন। কিন্তু তাদের নিয়ে আসার মতো অবস্থা পনের বছরেও হয়নি। বাকি যিন্দেগিতেও হবে কি-না ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন তিনি। তিন চাকায় ভর করা জীবন সংগ্রাম আজীবন চালিয়ে যেতে হবে বলে মনে হয় তার!

মন্টুর দুঃখ ৪০ বছর বয়সে এসেও কমবয়সী অনেক যাত্রীরও থাপ্পড় খেতে হয়! যে পারে সে তার গায়ে হাত তোলে! সেদিন হঠাৎ করেই বৃষ্টি নামল! যাত্রী বৃষ্টি থেকে বাঁচতে কিছু চাইলেন। কিন্তু ছাতা-রেইনকোট-পলিথিন কিছু না থাকায় গালিগালাজ করেন। ভিজে ভিজে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার পর ভাড়া না দিয়েই চলে যেতে উদ্যত হন। ভাড়া চাইলে তেড়ে গিয়ে সজোরে থাপ্পড় মারেন গালে। একের পর এক উত্তপ্ত বাক্য ছুড়েন। কাক ভেজা মন্টু নির্যাতনের একপর্যায়ে আঘাত সইতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যান। একের পর এক নাকে-মুখে আঘাত করায় জ্ঞান হারানোর পর রাস্তার লোকজন মাথায় পানি ঢালে। জ্ঞান ফিরলে জানেন- যাত্রীটি ছিলেন বাড়িওয়ালা, প্রভাবশালী আর পাড়ার দাদা। নির্যাতনের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা এর আগেও তিনি দেখায়েছেন।

আজ মন্টু ভুল করেননি। মাথায় পলিথিন দিয়ে নিজে বৃষ্টি থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন। সংসারে খাওয়ার মানুষ ৫ জন। তাই  ঝরো ঝড়ো বাদলা দিনেও ঝড়-বৃষ্টি-বাদলা উপেক্ষা করে বের হতেই হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও রিকশা চালাতে হচ্ছে। অবশ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে বড় ধরণের প্রভাব স্বাস্থ্যের ওপর পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে তার। তারপরও বাস্তবতা হচ্ছে- রিকশা চালকরা এসব স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে ভাবার সময় পান না। পথে রিকশা নষ্ট হয়ে গেলে বাধ্য হয়ে রিকশা ঠেলে নিয়ে যেতে হয়।

মন্টু  বলেন- আমি আমার রিকশাটাকে খুব ভালোবাসি এবং আমি আমি রিকশাটার কাছে অনেক কৃতজ্ঞ। আমি সব সময় রিকশার খেয়াল রাখি  এবং সাবধানতার সাথে রিকশা চালাই।  রিকশা পরিস্কার -পরিচ্ছন্ন রাখি এবং সূর্যের প্রখর রোদ ও বৃষ্টি থেকেও নিরাপদে রাখার চেষ্টা করি। রিকশা বিচ্ছিন্ন দিন আমার কাছে বড্ড নিরানন্দের। রিকশাকে ঘিরেই আমার স্বপ্ন, পরিবারের খাওয়া-পড়ালেখা-চিকিৎসা । রিকশার প্যাডেলের ওপরই আমার আয়। আর  এ আয় দিয়ে চলে সংসার।

মন্টু লম্বা হওয়ায় তাকে রিকশাটা নুয়ে চালাতে হয়। ফলে তার গায়ে সবসময় কম-বেশি ব্যথা থাকেই। দীর্ঘসময় টানা কাজ করলে ব্যথা প্রকট হয়। কিন্তু রিকশার ওপর নিজের জীবিকা নির্ভর করায় তা এড়াতেও পারে না। অনেকদিন ধরে ভেবে আসছেন- নিজের উচ্চতার আলোকে সঠিক মাপমতো একটি রিক্সা অর্ডার দিয়ে বানায়ে নেবেন! অথচ এমনটি করার সুযোগ আছে কি-না এখনো তা-ই জানেন না। এখন ভাবছেন মটরের রিকশা কিনতে পারলে পায়ের প্যাডেলের রিকশা চালানো বন্ধ করবেন।

মন্টুর আয়ের পুরোটাই নির্ভর করে পরিস্থিতির ওপর। যেদিন রিকশা নিয়ে বের হতে পারে না, সেদিন রোজগারও নেই। তাই বলে পুষিয়ে নেয়ার জন্য সুযোগ পেলেই কখনো আকাশছোঁয়া রিকশা ভাড়া দাবী করেন না মন্টু। রিক্সায় ফেলে যাওয়া বা রাস্তায় পড়ে থাকা অন্যের পয়সার লোভ করেন না মোটেই। অনেকবারই সততার নজির রেখে প্রশংসিত হয়েছেন। তিনি বলেন- কষ্ট করে টাকা আয় করার মাঝে সুখ আছে। আমার ঘাম ঝরানো টাকায় আমার মা-বউ-ছেলে-মেয়েরা খেয়ে পরে বাঁচে। আমি সৎ পথে কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রিকশা চালিয়ে অর্থ উপার্জন করি। কষ্ট করে নিজের সংসার চালাই। মরে গেলেও হারাম নিজেও খামু না, তাদেরও খাওয়াব না।

মৃত্যুকে অনেকবার কাছ থেকে দেখেছেন মন্টু। একবার ভারি বৃষ্টিতে রোডে পানি জমে যায়। বৃষ্টির পানি থেকে রিকশা সরাতে গিয়ে তলিয়ে থাকা বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে মৃত্যু হয় এক রিকশাচালকের। তার রিক্সাও একই জায়গায় পাশাপাশি ছিল, একইসাথে যেতেও চেয়েছিল!  কিন্তু যাননি!

করোনাকালে প্রথম দিকে খুব ভয়ে ভয়ে রিক্সা চালাতেন! শুনেছিলেন- করোনা হলে শ্বাসকষ্ট হয়। গরিব রিকশাচালক থাকেন বস্তির ভাড়া ঘরে মেসে। অক্সিজেন কেনার সামর্থ্য কি আর তার থাকে! তবে এখন আর ভয় পান না। বলেন- না খেয়ে মরার চেয়ে করোনায় মরা ভালো। এমনিতেই রিকশা চালিয়ে যে টাকা উপার্জন হয় তা দিয়ে চলতে খুব কষ্ট হয়, গ্রামে টাকা পাঠায়ে ঘর ভাড়া আর খাওয়া দাওয়ার খরচের পর আর টাকা থাকে না। কষ্টেই চলে জীবন। তারপর করোনার কারণে বসে থাকলে কি আর পেটে ভাত জুটবে- প্রশ্ন তার।

দৈনন্দিন কাজের ব্যাপারে মন্টু বলেন- সকালে ঘুম থেকে উঠি। নামাজ পড়ি।  সস্তা খাবার খাই। তিনচাকার রিকশা নিয়ে বের হই। জীবিকার সন্ধান করি। কখনো কখনো যাত্রী ছাড়াই অনেকটা পথ রিকশা চালাই যাত্রীর খোজে। সূর্যের প্রখরতা বাড়ে, যাত্রী বাড়ে। পা দিয়ে ভার বয়ে পায়ে পেডেল করে নিয়ে যাওয়াটা অনেক বেশি কষ্টকর। তবু সকাল থেকে সন্ধ্যা  পর্যন্ত রিকশা চালাই। কখনো কখনো দুপুরের খাবার না খেয়েও সারাদিন কাটাই।

নিজের জীবন নিয়ে বলেন- এখন দেহে বল আছে তাই অনেকক্ষণ না খেয়ে কাজ করে যাওয়ার ক্ষমতাও আছে। বৃদ্ধ হলে, অসুস্থ হলে, মরে গেলে পরিবার ও সন্তানদের কি হবে ভেবে দুশ্চিন্তা হয়। তবে যখন নামাজ পড়ি, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আল্লাহর উপর ভরসা করি। গরিবের কেউ নেই আল্লাহ আছে, তিনেই আমাদের রক্ষা করবেন। ছেড়া, ময়লা, পুরনো কাপড় পরা স্ত্রী-সন্তানদের মুখ ভেসে উঠলে কিছুটা কষ্ট লাগে। ঘরে আগামীকালের কিছু খাবার আছে, পরশু কী খাব জানি না। তারপরও চিন্তা করি না। আল্লাহ রিজিকের মালিক; তিনিই ব্যবস্থা করবেন।

About আনিসুর রহমান এরশাদ

শিকড় সন্ধানী লেখক। কৃতজ্ঞচিত্ত। কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী। ভেতরের তাগিদ থেকে লেখেন। রক্ত গরম করতে নয়, মাথা ঠাণ্ডা ও হৃদয় নরম করতে লেখেন। লেখালেখি ও সম্পাদনার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সময়ে পাক্ষিক-মাসিক-ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন, সাময়িকী, সংকলন, আঞ্চলিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ ও জাতীয় দৈনিকের সাথে সম্পর্ক। একযুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। পড়েছেন মিডিয়া ও জার্নালিজমেও। জন্ম টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার হাতীবান্ধা গ্রামে।

View all posts by আনিসুর রহমান এরশাদ →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *