‘ছেইলা-মাইয়াদের লেহা-পড়া করাইতাম পারি না’

জীবন-জীবিকার গল্প : মেথর

মেথরের কাজ করেন সানু (ছদ্মনাম)।
মল সাফ করা, সকল প্রকার ময়লা-আবর্জনা-নোংরা সাফ করাই তার কাজ।
যারা ড্রেন পরিস্কার করেন। মল পরিস্কার করে নিয়ে যায়। জীবন ও জীবিকার তাগিদে অবহেলাকে সহ্য করেন।
পরিবেশ বন্ধু মানুষটির জীবন কাটে উপেক্ষায়, অশ্রদ্ধায়, অনাদরে।
এরা সমাজের সবার কাছেই থাকেন অবহেলিত, বঞ্চিত। অবস্থান সমাজের একেবারে নীচের তলায়।

শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাই সমাজে অস্পৃশ্য মেথরদের কাজ।
এদের হাতের স্পর্শ ছাড়া শহরের পরিবেশ থাকে নোংরা।
এরাই শহরবাসীর জীবনযাত্রা সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখে।
নিজেদের হাত লাগিয়ে ময়লা-আবর্জনা সরিয়ে শহরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন।
কারণে-অকারণে শহরবাসী এদের জাত-সম্প্রদায়ের নাম ধরে গালিগালাজ করেন।
তাদের জীবনযাপনের দিকে সাধারণত শিক্ষিতসমাজ নজর দেন না।
ব্যাপক অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে।

মেথর বলে অবজ্ঞা সমাজের সর্বত্র। নিম্নবর্ণের এসব মানুষদের চরম অবজ্ঞা করা হয়।
সমাজের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা এদের দেখলে নাক সিঁটকায়। তারপরও এরা জাতপেশাকে আগলে রেখেছেন।
বংশপরম্পরায় অবহেলিত-বঞ্চিত এদের প্রতিবেশীর সহানুভূতিও ভাগ্যে জোটে না।
ধর্মীয় কাজেও এরা বৈষম্যের শিকার হয়, খোদ নিজ ধর্মের মানুষের কাছ থেকেই!
অচ্ছুৎ বলে বাচ্চাদের এড়িয়ে যাবার ভয়ে বাচ্চার নাম পরিবর্তন করে, বাবা-মার পরিচয় গোপন রেখে ভর্তি করাতে হয় স্কুলে।

মেথর পট্টিতে যারা থাকেন তাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়। সমাজের নিচুতলাতেই বাস করেন তারা।
মেথর পরিবারের ছেলেকে বিয়ে করার জন্য আরেকটি মেথর পরিবারের মেয়কেই খুঁজে বের করতে হয়।
বাবার এই পরিচয় থাকলে সন্তানরা ঘৃণা-উপহাস-বিদ্রুপের শিকার হন। মেথর জনগোষ্ঠীর অনেকেই অবাঙালি৷
যারা পরিস্কার পরিচ্ছনতার কাজ করেই জীবন চালান, তাদেরই নেই পরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকার পরিবেশ।
কাজের অপ্রতুল সুযোগ,পচা-বাসি খাবার খাওয়া- সভ্য জগতের কাছে একেবারেই অকল্পনীয় একটি জীবনের সাথে মানিয়ে চলেন তারা।

কেউ বলে মেথর। কেউ বলে ধাঙ্গড়। কেউ বলে  সুইপার। কেউ বলে ডোম। কেউ বলে হাড়ি।
যে যাই বলুক- মেথর সম্প্রদায় সমাজে এখনও অশুচি বলেই গন্য। অস্পৃশ্য বলে চিহ্নিতও হন।
যদিও তারাই চারপাশকে পরিচ্ছন্ন ও ক্লেদমুক্ত করে সমাজের শুচিতাকে রক্ষা করেন।
তারা নিজেরাও নিজেদের সম্বন্ধে মনে মনে খারাপ ধারনাই পোষণ করে। হীমন্যতায় ভুগেন।
নিজেদেরকে অন্য আর দশজন মানুষের মতো মানুষ নিজেরাই ভাবেন না। আর অন্যরাতো আরও ভাবেন না।

এদের কিছু সংখ্যক লোক নিয়মিত বেতনে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে।আবার কেউ কেউ চুক্তি বা রোজ হিসেবে অস্হায়ী ভাবেও কাজ করে।
অনেকের দৃষ্টিতে এরা মানুষ নয়। পরিস্কার করার সচল যন্ত্র মাত্র।
যে মানুষই নয়, তার সম্মান পাবার কোনো অধিকারই নেই!
সমাজে মারাত্মক নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হন মেথর পরিবার৷ মানবেতর জীবন যাপন করেন।
পাশার এক ছেলে এক মেয়ে। তাদের নেই শিক্ষা। চরম সুবিধাবঞ্চিত!
মৌলিক অধিকারগুলোও পূরণ হয় না। স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে চরম দুরাবস্থায় দিনাতিপাত।
সীমাহীন কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন কাটে। নিজের জীবনের কোনো মূল্য আছে বলে মনে হয় না তার।

সানু ভূমিহীন মানুষ। নিজের কোনো স্থায়ী বাসস্থান নেই। পরিত্যাক্ত এক ভবনে অস্থায়ীভাবে থাকেন।
ঝুঁকিপুর্ণ বাড়িতে বসবাস করেন তার পরিবার। অসুস্থ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ।
ছোট্ট একটি কক্ষে কয়েকজন গাদাগাদী করে থাকেন।
তারপরও নেই নিরাপদ ঘর। মাথার উপর ছাদের আস্তর খসে পড়ছে।
কোথাও কোথাও এমনভাবে ফুটো হয়ে গেছে যে, সামান্য বৃষ্টি হলে অন্যত্র চলে যেতে হয়।
দেয়ালের ইট ক্ষয়ে ক্ষয়ে পড়ছে। নেই রান্নার ঘর। বিশুদ্ধ খাবার পানির স্বল্পতা তীব্র।

সমাধানের জন্য অনেকের আশ্বাস পেয়েছেন, তবে বাস্তবিক কোনো সমাধান মেলেনি।
নানা আশ্বাস আর কথার ফুল ঝুড়ি শুনতে শুনতেই চলে যাচ্ছে বছরের পর বছর।
নতুন করে আরো সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবাসন সমস্যা সমাধানে কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।
সুবিধা বঞ্চিত শিশুরা শিক্ষা পাচ্ছে না। তাদের জীবনমানও বৃদ্ধি পাচ্ছে না।
প্রতিবেশীরাও তাদের বাড়িতে পা রাখে না, তাদের বাচ্চাদের সাথে নিজেদের বাচ্চাদের মিশতে দেয়া না, খেলতে দেয় না, নিজেরা কথা পর্যন্ত বলে না। তাদের ছোঁয়া তো বহুদূরের কথা, তাদের সাথে পানিও বিনিময় করে না।
কাজেই এলাকায় কখনো পানি বা বিদ্যুৎ না থাকলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদের।

পায়খানার গাদায় কাটে দিন নিচু তলার বা নিচু জাতের কিছু মানুষের।
অনেকে তো খালি হাতেও মানুষের মল-মূত্র পরিষ্কার করে।
অনেকে পর্যাপ্ত যন্ত্র ছাড়াই বিভিন্ন ম্যানহোলে প্রবেশ করেন।
মাটির নিচে থাকা গভীর পাইপলাইনগুলোতে মল-মূত্র সমস্ত হাতেই পরিষ্কার করেন।
জ্যাম হয়ে থাকা পাইপ খোলার চেষ্টা করেন। সকাল-সন্ধ্যা খেটে মরেন।

সব মেথর শ্রেণির জীবনাচরণ এক। পরিস্কার করাই মূলত মেথর শ্রেণির কাজ।
সভ্য সমাজ থোরাই দেখে এই জীবন।
অনেকে বাজারে গিয়ে দোকানির কাছে ভিক্ষা চেয়েও চলতে অভ্যস্ত।
বেতন কম থাকায় সংসারের খরচ শেষে সন্তানদের লেখাপড়ার সরঞ্জামাদি কেনার টাকা তাদের থাকে না।
অথচ এই নীচের তলার মানুষদের ছাড়া শহরের অস্তিত্বই পদে পদে বিপন্ন হতে বাধ্য।
ময়লা ও বর্জ্য পদার্থ  সাফ করার  মাধ্যমে শহরবাসীকে বিভিন্ন রোগের আক্রমণ থেকে বাঁচান।

এই শ্রেণির মানুষের গড় আয়ু কম।
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জীবনযাপন। চিকিৎসার অভাব। সচেতনতার অভাব।
নিগ্রহ ও সমাজ কর্তৃক অবহেলা। সর্বোপরি অনেকেই তাদের অস্পৃশ্য ভাবে।
যেখানে মানুষের পক্ষে থাকা অসম্ভব-সেখানেই থাকে সমাজের ওই নিচু জাতরা।
অনেকেই মাদকাসক্ত। মাদকই যেন এদের সব। অনেকে চলে যাচ্ছে যৌন পেশায়!

সারাজীবন অবহেলিত হয়ে মানসিকতা এমন হয় যে, কেউ একবার আঘাত করলে তারা পাল্টা তিনবার আঘাত করার জন্য প্রস্তুত থাকে।
সহিংসতার পরিমাণ দিনকে দিন আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে। দুঃখকষ্ট মন থেকে খুশির আমেজ কেড়ে নিচ্ছে।
নিপীড়িত ও নির্যাতিত এসব মানুষদের সাথে যা ইচ্ছে তা-ই করা সম্ভব বলে মনে করে অনেকে।
সাধারণত সুইপারদের কলোনিগুলো বানানোই হয় শ্মশানের পাশে, লাশ কাটা ঘরের পাশে, আবর্জনা স্তূপের মধ্যে।
ফলে যারা সারা শহর পরিষ্কার করে, তাদের ঠিকানাই হয় নোংরা জায়গায়।

কেমন চলছে জীবন?
আমরা ময়লা পরিষ্কার করি; আমাদের আবার জীবন আছে নাকি!
জীবন্ত লাশের মতো!

এই কাজে কেন আসলেন?
-তাছাড়া করমু কি? অন্য কিছু কইরা খাওয়ার কোনো লাইন নাই!
বাবা-মা’ও সুইপারের কাজ করেন৷ পড়ালেখা করান নাই।
কিছুদিন স্কুলে গেছিলাম। কিন্তু পরিবারের পরিচয় জানার পর অন্যরা আমার সাথে মিশতো না।
আমিও সংকোচ বোধ করতাম। বাসার পেছন দিয়ে বের হতাম।
যাতে স্কুলের বন্ধুরা আমি কোথায় থাকি তা দেখতে না পায়৷

সবচেয়ে খারাপ লাগে কখন?
-কেউ যখন মেথর বা মেথরের বাচ্চা বলে চেঁচিয়ে ওঠে তখন খুব রাগ হয়!
মেথরের সন্তানকে অনেক স্কুল ভর্তি করে না। ভর্তি করতে রাজি হয় না।
যেন মেথরের সন্তান স্কুলে পড়লে স্কুলের মান-সম্মান-ইজ্জত ধুলোয় মিশে যাবে।
শিক্ষক যদি বলেন- তোমার লেখাপড়ার দরকার নেই, তখন আর বলার কিছু থাকে না।

আর ভর্তি হলেও ক্লাসের সবাই যখন জানতে পারে মেথরের সন্তান, তখন বৈষম্যের শিকার হতে হয়।
কেউ মিশতে চায় না। অচ্ছুৎ ভাবা হয়। তার সব কিছু নোংরা ভেবে স্পর্শ এড়িয়ে চলে সবাই৷
অথচ মেথররা দেশ পরিষ্কার রাখার কাজটি না করলে অবস্থা হবে ভয়াবহ!
কোনো কাজই যে ছোট নয় সেটা অনেকেই বুঝতেই চান না৷

ভবিষ্যতেও আপনি কী এই কাজই করবেন?
হ ভাই। তাছাড়া আর কি করব? উপায় নেই! বিকল্প পথও নেই!
এটা ঠিক- সমাজের মানুষ আমাদের ঘৃণা করেন, এড়িয়ে চলেন। মর্যাদা দেন না, সম্মানও করেন না।
তাই অনেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই পেশাকে ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। কেউবা সঙ্গীতকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
কিন্তু আমিতো অন্য কোনো কিছু করার সুযোগ দেখছি না।

সানুর সাথে কথা বলার সময় তার শিশু ছেলে এস দাঁড়ায়।
তাকে জিজ্ঞেস করি-তুমি স্কুলে পড়ো? ছেলেটি মাথা নাড়ে, না।
বাসায় পড়ো? এবারও সে মাথা নাড়ে, না।
সানু বলে উঠেন, স্যার, আমরা গরিব মানুষ। ছেইলা-মাইয়াদের লেহা-পড়া করাইতাম পারি না!

নিজের জীবন জীবিকা নিয়ে আর কিছু বলবেন?
মেথর হয়ে জন্মেছি। জন্ম থেকেই ক্রীতদাসের জীবন। জন্মটাই আজন্ম পাপ। মেথর পরিবারে জন্ম নেয়ায় সমাজে হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়।
কোনো অধিকার কখনই ছিল না। আবর্জনা সংগ্রহকরা আর পরিষ্কার করাই কাজ।
এমনকি মেথর পরিবার থেকে কেউ শিক্ষিত হওয়ার পরেও মানুষ তাদেরকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে না।
দিনের শুরুতে যাকে একটি নর্দমায় নেমে পড়তে হয়, দিনের শেষেও তার মন থেকে সেই দুর্গন্ধ যায় না।
নোংরা পানির মধ্যে মরা জীব জন্তুর মধ্যে হেঁটে বেড়াতে হয়।
মেথরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করার জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছি কিন্তু পারিনি।

আপনার স্বপ্ন জানতে চাই।
-এমন একটি সমাজ হবে- যেখানে মেথর বলে পরিচয় দিতেও সংকোচ বোধ করব না৷
মেথর পরিবারের সন্তান বলে অপমানিত হতে হবে না। সমাজ থেকে বৈষম্য দূর হয়ে যাবে৷
সবাই সব কাজকে, সব পেশাকে সম্মান করবে। সম্মান করবে দলিত সম্প্রদায়কে, মেহনতী মানুষকে৷

 

 

About আনিসুর রহমান এরশাদ

শিকড় সন্ধানী লেখক। কৃতজ্ঞচিত্ত। কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী। ভেতরের তাগিদ থেকে লেখেন। রক্ত গরম করতে নয়, মাথা ঠাণ্ডা ও হৃদয় নরম করতে লেখেন। লেখালেখি ও সম্পাদনার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সময়ে পাক্ষিক-মাসিক-ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন, সাময়িকী, সংকলন, আঞ্চলিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ ও জাতীয় দৈনিকের সাথে সম্পর্ক। একযুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। পড়েছেন মিডিয়া ও জার্নালিজমেও। জন্ম টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার হাতীবান্ধা গ্রামে।

View all posts by আনিসুর রহমান এরশাদ →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *