‘আমি তিনবেলা পেট ভরে খেতে পারলেই খুশি’

জীবন-জীবিকার গল্প : ফুল বিক্রেতা

ফুল বিক্রিকারী পথশিশু রেহেনা। ফুলই তার জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম। ফুল তার কাছে শুধুই শুদ্ধতা, পবিত্রতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক নয়। ফুল বিক্রি করেই তার সংসার চলে।

ফুল বিক্রির ব্যবসায়ীদের ফুলের দোকান রয়েছে। অথচ ভাসমান ফুল বিক্রেতা রেহেনার নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। কোনোদিন শাহবাগে, কোনোদিন রমনা পার্কে, কোনোদিন কাটাবনে, কোনোদিন টিএসসির আশেপাশে ফুল বেঁচেন। তবে বিভিন্ন বড় গণ অনুষ্ঠানাদি ও মেলাগুলোতেও অংশ নেন। মাঝে মাঝে পুরোনো একটি সিমেন্টের বস্তা বিছিয়ে ফুল নিয়ে বসেও পড়েন।

ভ্রাম্যমাণ ফুল বিক্রেতা রেহেনার কাছ থেকে প্রিয়জনদের শুভেচ্ছা জানাতে অনেকেই ফুল কিনেন।

আর রেহেনার মা পাইকারি ফুলের বাজার থেকে ফুল কেনেন। মহাজনের কাছ থেকে বাকিতে ফুল নেয়, বিক্রি শেষ করে টাকা দেয়। তবে ফুল বাজার থেকে চেয়ে কিংবা কুড়িয়ে আনা ফুলও বিক্রি করেন। কেজি দরে রজনীগন্ধা আর শ হিসেবে গোলাপ কিনেন রেহানার মা।

তবে মাঝেমাঝে বেশি বিক্রি হলে বা প্রথম ধাপে কেনা ফুল শেষ হলে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকেও কেনেন। সাধারণত ১লা ফাল্গুন বা ভালোবাসা দিবসের মতো বিভিন্ন বিশেষ দিবসগুলোতে এমনটি হয়। এসব দিনে বেচাকেনা খুব ভালো হয়, আয় রোজগারও খুব ভালো হয়।

ফুল বিক্রেতা রেহানার মতো অনেক পথশিশু ঢাকায় রয়েচে যারা ফুল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে।

এদের দেখা যায়- বিজয় সরণিতে! ফার্মগেটে! গুলিস্তানে! বিজয় নগরে! পান্থপথ সিগনালে! ধানমন্ডি বত্রিশে! ভিআইপি ট্রাফিক সিগন্যাল পয়েন্টে! বিভিন্ন পার্কে! বড় বড় শপিংমলের সামনে! রাস্তার সিগন্যাল, ফুটপাথ ও রেলওয়ে স্টেশনে!

আসাদগেটের আড়ং ক্রসিংয়ে! শহীদ মিনার এলাকায়! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, লাইব্রেরি চত্বর, চারুকলা এলাকাতে! সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে! বোটানিক্যাল গার্ডেনে!

ফুল বিক্রিকারী পথশিশু রেহেনাকে এই এলাকায় তার মামা ফুল বিক্রির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সাধারণত ব্যক্তিগত ছোট গাড়ির যাত্রীরাই তার কাছ থেকে ফুল কিনে থাকে। রেহানার আয় বাবাসহ তাদের চারজনের সংসার একটু স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে সহযোগিতা করে।

এত ছোট বয়সে স্কুলে না গিয়ে ফুল বিক্রি করতে হচ্ছে কেন?

আমরা গরিব মানুষ। বাবা কিছু না জানিয়ে কোথায় যেন চলে গেছেন। মা পরে জানতে পেরেছেন বাবা বিয়ে করে অন্যত্র চলে গেছে। আমার ছোট আরো দুই বোন রয়েছে। সংসারে অভাব-অনটন আছে। টাকা-পয়সার টানাটানি লেগেই থাকে।

মা যা আয় করে তা দিয়ে বাসা ভাড়া দিয়ে ঠিকমতো খাবারই জুটে না। মা একলা সংসার চালাইতে পারে না বলেইতো স্কুলে না গিয়ে ফুল বেঁচি। আগে নিয়মিতই স্কুলে যেতাম। এখন আর পড়ালেখা করার সময় ও সুযোগ মিলে না। পড়ালেখা করতে এখনো ইচ্ছা করে। কিন্তু আমি যদি পড়ালেখা করি তাহলে আমার ফুল বেঁচবে কে? ভাত খামু নাকি স্কুলের টাকা দিমু। স্কুলে পড়তেও তো টাকা লাগে।

মাঝে মাঝে এই কাজ করতে আর মন চায় না। তবু তিন বেলা খাবারের নিশ্চয়তার জন্য শহরে টিকে থাকার লড়াই করি। রাস্তার কুত্তা বিলাইয়ের মতো জীবন যাপন করি। ফুলের ব্যবসার কোনো ঠিক নাই। কোনো দিন মোটামুটি লাভ হয়। কোনো দিন ফুল থেকে যায়। থেকে গেলে মায়ের বকাও খেতে হয়। এছাড়া কিছু করার নাই, আপনাকেও বলার নাই। দিন যত যাচ্ছে ততই অসহায়ত্ব বাড়ছে। খুব কষ্টে আছি। বড় হচ্ছি আর অনেক নরপিশাচদের কুনজরে পড়ছি।

তোমার আম্মু কী করেন?

আমরা সবাই নানীদের সাথে বস্তিতে থাকি। পেট চালাতে মা কখনো বিজয় সরণিতে, কখনো খামারবাড়িতে, সংসদ ভবনের সামনে আবার কখনো চন্দ্রিমা উদ্যানের ভেতরে ফুল বিক্রি করেন। মা রজনীগন্ধার সঙ্গে গোলাপের পাপড়ি মিলিয়ে মালা গাঁথেন। আমিও আগে মায়ের সাথেই ফুল বিক্রি করতাম। এখন আয়-রোজগার বাড়াতে আলাদাভাবে অন্য এলাকায় বিক্রি করি।

তুমি কিভাবে ফুল ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করো?

কখনো হাতে টকটকে লাল একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে গাড়ির গ্লাসে টোকা দিয়ে বলি, স্যার দিমু একখান মালা। স্যার একটা ফুল ন্যান স্যার।

যানজটে বাহন থামলে জানালার পাশে গোলাপের তোড়া নিয়ে গিয়ে বলি, আফা লন না একখান গোলাপ। আফা একটা মালা ন্যান। আপা আপনেরে অনেক সুন্দর লাগতাছে। এই গাজরাডা মাথায় দেন। আমি দিয়া দিতাছি।

কখনো রিকশায় বসা অবস্থায় পাশ থেকে আবদার করি, ভাইজান একটা ফুল লন। ভাইয়া আফারে কিইন্না দেন না একখান ফুল।

কখনো পার্কে উপস্থিত দর্শনার্থীদের সামনে ফুল ও ফুলের মালা হাতে নিয়ে দাঁড়ায়ে থাকি। বলি, ভাইয়া একটা গোলাপ নেন। আপারে দিবেন। মাত্র দশ টেকা।

মাঝেমাঝে টুকটাক ইংরেজি ভাষাতেও বলি।

গাড়ির যাত্রী, রিকশার যাত্রী, পথচলতি ব্যক্তি ও ঘুরতে বেড়াতে আসা লোকজন অনেকে ফুল কেনার অনুরোধ রাখেন।

তোমার ভালোলাগার মুহূর্ত জানতে চাই।

আমি তিনবেলা পেট ভরে খেতে পারলেই খুশি। আর ছোট ভাইবোনের জন্য কিছু করতে পারলে আনন্দ পাই। মানুষের ভালো ব্যবহার পেলে ভালো লাগে। সব ফুল সন্ধ্যার আগেই বিক্রি হয়ে গেলেও ভালো লাগে। অনেকে ফুলের দামের চেয়েও হাতে অতিরিক্ত টাকা তুলে দিলে খুশিতে চোখে পানি চলে আসে।

তোমার খারাপলাগার মুহূর্ত জানতে চাই।

কেউ হয়ত ফুল নেয়, কেউ নেয় না। তবে অনেকেই খুব জোরে ঝাড়ি দেয়। আবার বকা দিয়ে বলে ফুল লাগবে না। এরকম খারাপ ব্যবহার করলে খুবই কষ্ট লাগে। অনেক সময় কেউ খারাপ ব্যবহার করলে শুনেও না শোনার ভান করে পাশ কাটিয়ে এড়িয়ে যাই। তবে খুবই খারাপ লাগে।

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.