`আমাদের দেশে কষ্টের কোনো দাম নেই’

জীবন-জীবিকার গল্প : বাদাম বিক্রেতা

বাদাম বিক্রেতা বাসিত। যখন আয়-রোজগার ভালো হয় তখন সুখ থাকে। করোনার সময় যখন বেচা-বিক্রি খারাপ ছিল তখন এমনও দিন যায় দুবেলা দুমুঠো অন্ন জোগাতেও নিদারুণ কষ্ট হতো। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে মোটামুটি ভালোই আছেন।

দুঃখ-যন্ত্রণার জীবন পরিবর্তনে জীবন ও জীবিকার তাগিদে শহরে এসেছিলেন। এরপর থেকে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে পথে পথে, বাজার-বন্দরে, অলিগলি ঘুরে বাদাম বিক্রি করছেন। কেনাবেচা বাড়াতে পথচলা মানুষকে মুগ্ধ করেন গান গেয়ে। তিনি এখন অনেকেরই পরিচিত মুখ, তার ভাজা বাদামের স্বাদ অনেকেরই মুখে মুখে। তার বাদাম খেতে ভারি মজা হবার পেছনের কারণ ভাজাটা ভালো ও কড়া, সাথে সুস্বাদু লবণও দেন ।

স্বচ্ছল জীবনের স্বপ্ন পূরণ না হলেও জীবন থেমে থাকেনি। সহজ প্রকৃতির মানুষটি যে কোনো মানুষকে হাসিতে বরণ করে নিতে পারেন। প্রথম দিকে খেয়ে-না খেয়ে রেল লাইনের পাশে গলায় বাদামের ডালা গলায় ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে বাদাম বিক্রি করতেন। পরে হাতে চালানো ভ্যানগাড়ির ওপরে ছোট্ট চুলায় গরম বালুর মধ্যে ভেজে চিনা বাদাম, ভুট্টা, ছোলা, ডাবলি, সিমের বিচি, হেঁটে-হেঁটে বিক্রি করতে শুরু করেন।

সারাদিন রোদে-গরমে কষ্ট করার পরও দিন শেষে পাঁচ-দশ টাকা থেকে ১০০, ২০০, ৫০০ টাকা গুনতে দরুণ ভালোলাগে: সারা দিনের ক্লান্তি, দুঃখ, কষ্ট ভুলে যান। সংসারে তার বাড়তি কোনো আয় নেই, নেই কোনো আবাদি জমি। মাঝেমাঝে স্ত্রীও তাকে বাদাম ভেজে গরম গরম নিয়ে সকাল বেলা বের হতে সহযোগিতা করেন।
সারাদিন রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বাদাম বিক্রি করতে কেমন লাগে?

বাদামের লাভ দিয়ে কোনোভাবে আমার সংসারের থাকা-খাওয়া চলে, অন্য কোনো কাজকর্ম জানি না। তাই অভাবের সংসারে এর চেয়ে ভালো কিছু আর করার নেই। দারিদ্র্যের কশাঘাতে লেখাপড়া শেষ করতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে এই পথ বেছে নিয়েছি। মাঝখানে কিছুদিন ফুটপাথে কসমেটিক্সের ব্যবসা করতে চেয়ে আর্থিকভাবে আরো ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছি।

মুখে চিন্তার ভাঁজ নিয়ে বাসিত বলেন, এখন দেখছি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে আগের মতো বেশি পরিমাণে বাদামও বিক্রি হয় না। আগের মতো ক্রেতারা বাদাম কিনতে চায় না। বাজারে এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ সবকিছুর দাম চড়া। বাদাম কিনতে হচ্ছে বেশি টাকা দরে। বাদাম বিক্রির কাগজের দামও বেড়েছে। বেশি দাম দিয়ে কেনায় বাদামের পরিমাণে কম দিতে হচ্ছে অথবা টাকা বেশি নিতে হচ্ছে। কিন্তু সবকিছুর দাম যে বেড়েছে এটা অনেকেই বোঝতে চায় না। ফলে কোনো উপায় দেখছি না।

বাদাম বিক্রি করার কারণে সামাজিকভাবে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন কী?

গরিবের আবার সমাজ! জীবনই যেখানে চলে না সেখানে কে কী বললো তা ভেবে কী লাভ! আসলে আমাদের দেশে কষ্টের কোনো দাম নেই। অথচ বিদেশে আমেরিকার মতো দেশে বাদাম বিক্রেতা থেকে প্রেসিডেন্টও হওয়া যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন জিমি কার্টার। প্রতিবেশি ভারতেও চা বিক্রেতা থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন নরেন্দ্র মোদী!

অথচ আমাদের দেশে বাবা কী করেন তা জেনে ছেলে-মেয়েকে ঘৃণা করা হয়, অবহেলা করা হয়, লজ্জা দেয়া হয়। বাদাম বিক্রেতাও মানুষ এই বিষয়টি যেন মানুষ চিন্তা করে। কারণ আমরা কারো ক্ষতি করি না ব্যবসা করে পেট চালাই। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে সকালের খাবার খেয়ে বের হই আর রাতে বাসায় ফিরি; কাজে থাকি কারো কোনো ক্ষতি করি না।

আপনিতো পড়ালেখা করেছেন মনে হচ্ছে?

সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের আর্থিক অবস্থা হয় করুণ। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে পড়ালেখাও বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের খাবার ও খরচের টাকা যোগাড় করতে গিয়ে সংসারের ভার কাঁধে তুলে নিয়ে যে বাদামের টুকরি নিয়ে বের হয়ে বিক্রি শুরু করেছিলাম, তা এখনো চলছে।

শহরের প্রত্যেক রাস্তায় আমার পদচারণা আছে, এই প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতে হয়। এ পেশায় মন টানে না বলে কয়েকবার ভিন্নকিছু করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস মোটেই সুবিধা করে ওঠতে পারিনি। ফলে নিরুপায় হয়ে বাদাম বিক্রেতাই রয়ে গেছি। গ্রামের ঘর বড়ি ঠিক করতে পারিনি।

আপনি আয়-রোজগারের জন্য ভিন্ন কী করতে চেয়েছিলেন?

কসমেটিক্সের ব্যবসা করতে চেয়েছিলাম। দিনে ফেরি করে বাদাম বিক্রির পাশাপাশি রাতে ভ্যান চালক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলাম। একটুও আরাম-আয়েশের চিন্তা করিনি। দিন-রাতের পরিশ্রমে ইনকাম বাড়লেও বারবার অসুস্থ হয়ে পড়তাম। চিকিৎসায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় আর কিছুদিন পুরোপুরি আয় বন্ধ থাকায় সবমিলিয়ে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি। পরে ভ্যান চালানো বন্ধ করে দিই।

অভাবের সংসারে সবাইকে নিয়ে কিভাবে একটু সুখে থাকা যায় এমন চিন্তা করেও কোনো কূলকিনারা করতে পারিনি। বছরের পর বছর কাটছে হতদরিদ্র অবস্থায়। বাদাম বিক্রি করার জন্য ‘বাদাম বাদাম’ বলে চিৎকার করে গলা ফাটালেও কপাল খুলেনি, ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। আয়ের ভিন্ন কোনো পথ না থাকায় এই কাজই করে যেতে হচ্ছে।

ভবিষ্যত স্বপ্ন বা ইচ্ছা জানতে চাই।

জীবনে চাওয়া পাওয়ার একটাইশত কষ্ট করে হলেও সন্তানদের সুশিক্ষিত করবো।  ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষিত  করতে বাকী জীবনটাও প্রয়োজনে বাদাম বিক্রি করবো। সংসারে অভাব অনটন থাকায় অর্থের অভাবে নিজের চিকিৎসাও করাতে পারি না তবে  ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাচ্ছি।

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.