অনুভূতির রঙিন জানালায় উজ্জ্বল-স্নিগ্ধ বন্ধুত্ব

আনিসুর রহমান এরশাদ

পারস্পরিক সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের ব্যাপারে সচেতন থাকুন। অসচেতন বন্ধুর চাইতে সচেতন শত্রু উত্তম। অসচেতন ব্যক্তির গভীর সংস্পর্শ সচেতন ব্যক্তির বড় বিড়ম্বনা। কী ধরনের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা শুধু তাই দিয়ে নয়, কাদের সঙ্গ এড়িয়ে চলে তাই দিয়েও মানুষের চরিত্র বিচার হয়।

প্রত্যেকের মধ্যেই প্রতিভার স্ফুলিঙ্গ বিদ্যমান। চরিত্রবান মানুষের সংস্পর্শে এসে এই স্ফুলিঙ্গ সহস্র শিখায় দীপ্তিমান হয়ে উঠতে পারে, আর সম্পর্ক রক্ষা করতে প্রয়োজন অন্যের প্রতি আগ্রহ, অন্যকে বোঝার চেষ্টা, হাসি হাসিমুখ। অতিদর্প ভালো নয়, আড়ালে সমালোচনা কখনো নয়; অন্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রচেষ্টার দ্বারা মহত্ত্বর জীবনে উত্তরণের পথ খুলে যেতে পারে।

বন্ধুত্ব আসলে কী?

বন্ধুত্ব হচ্ছে দুই অথবা তার অধিক কিছু মানুষের মধ্যে একটি সম্পর্ক বিশেষ যাদের একে অপরের প্রতি পারস্পরিক স্নেহ রয়েছে। বন্ধুত্বকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের খুব কাছের একটি অংশ ধরা হয়।

বন্ধুত্ব নিয়ে এরিস্টটল বলেছেন-‘বন্ধু কি? এক আত্মার দুইটি শরীর। দুর্ভাগ্যবান তারাই যাদের প্রকৃত বন্ধু নেই। একজন ব্যক্তি তার বন্ধুর সাথে একইভাবে সম্পর্কিত যেভাবে সে নিজে নিজের সাথে সম্পর্কিত, যেহেতু একজন বন্ধু একজন ব্যক্তি এবং তাই তার নিজের একটা চিন্তাধারা আছে সুতরাং বন্ধু হচ্ছে ওই একই চিন্তাধারায় বিশ্বাসী ব্যক্তি।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- ‘গোলাপ যেমন একটি বিশেষ জাতের ফুল, বন্ধু তেমনি একটি বিশেষ জাতের মানুষ। বন্ধুত্ব বলিতে তিনটি পদার্থ বুঝায়। দুই জন ব্যক্তি ও একটি জগৎ। অর্থাৎ দুই জনে সহযোগী হইয়া জগতের কাজ সম্পন্ন করা। আর, প্রেম, বলিলে দুই জন ব্যক্তি মাত্র বুঝায়, আর জগৎ নাই। দুই জনেই দুই জনের জগৎ। একটা কথা কিন্তু আছে প্রেম মন্দির ও বন্ধুত্ব বাসস্থান। মন্দির হইতে যখন দেবতা চলিয়া যায় তখন সে আর বাসস্থানের কাজে লাগিতে পারে না, বাসস্থানে  দেবতা প্রতিষ্ঠা করা যায়।’

প্লেটো বলেছেন- ‘বন্ধুদের মধ্যে সবকিছুতেই একতা থাকে।’

আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন-‘আমাদের রহস্যময়তার পরীক্ষণে প্রাপ্ত সবচেয়ে সৌন্দর্যময় জিনিসগুলো হলো শিল্প, বিজ্ঞান এবং বন্ধুত্ব।’

হেলেন কেলার বলেছেন- ‘অন্ধকারে একজন বন্ধুর সঙ্গে হাঁটা আলোতে একা হাঁটার চেয়ে ভালো।’

সিসেরো বলেছেন- ‘কখনো কোনো বন্ধুকে আঘাত করো না, এমনকি ঠাট্টা করেও না’।

নিটসে বলেছেন-‘বিশ্বস্ত বন্ধু হচ্ছে প্রাণরক্ষাকারী ছায়ার মতো। যে তা খুঁজে পেলো, সে একটি গুপ্তধন পেলো’।

এমিলি ডিকেনসন বলেছেন-‘আমার বন্ধুরা আমার সাম্রাজ্য’।

সক্রেটিস বলেছেন-‘বন্ধুত্ব গড়তে ধীরগতির হও। কিন্তু বন্ধুত্ব হয়ে গেলে প্রতিনিয়তই তার পরিচর্যা করো। বন্ধুদের বিশ্বাস ও পছন্দের ওপর নির্ভর করে সত্যিকারের বন্ধুত্ব।’

ইউরিপিদিস বলেছেন-‘একজন বিশ্বস্ত বন্ধু দশ হাজার আত্মীয়ের সমান।’

রবার্ট লুই স্টিভেন্স বলেছেন-‘কোনো মানুষই অপ্রয়োাজনীয় নয় যতক্ষণ তার একটিও বন্ধু আছে।’

শিবরাম চক্রবর্তী বলেছেন-‘বন্ধু পাওয়া যায় সেই ছেলেবেলায় স্কুল-কলেজেই। প্রাণের বন্ধু। তারপর আর না। আর না? সারা জীবনে আর না? জীবন জুড়ে যারা থাকে তারা কেউ কারো বন্ধু নয়। তারা দুরকমের। এনিমি আর নন-এনিমি। নন-এনিমিদেরই বন্ধু বলে ধরতে হয়।’

বন্ধুর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে জর্জ হার্ভার্ট বলেছেন, ‘একজন বন্ধু হলো সর্বোৎকৃষ্ট আয়না।’ তার মানে, এই আয়নাতে প্রতিমুহূর্তে সে নিজেকে দেখবে। শুধু বাহ্যিক অবয়বকে নয়, ভেতরটাকেও। বন্ধুত্বটা হওয়া চাই হাত আর চোখের সম্পর্কের মতো। হাতে ব্যথা লাগলে চোখে জল আসে। আর চোখে যদি জল ঝরে, তবে হাত এগিয়ে যায় তা মুছে দিতে।

অসাধারণ বাগ্মিতার জন্য সুপরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ষোড়শ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মতে, ‘একজন ব্যক্তির জীবনের ভালো দিকটা গড়ে ওঠে তার বন্ধুত্ব দিয়ে। অনুভূতির যত রঙিন জানালা আছে তার মধ্যে বন্ধুত্বের জায়গাটি সবচেয়ে উজ্জ্বল ও স্নিগ্ধ। বন্ধুকে পাশে রেখে চলা যায় সীমাহীন পথ।’

বন্ধু আর বন্ধন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বন্ধুত্ব মানেই যেন হৃদয়ের সবটুকু আবেগ নিংড়ে, ভালোবাসা দিয়ে মন খুলে জমানো কথা বলা। বন্ধুর জন্য গেয়ে ওঠা- হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে, দেখা হবে তোমার-আমার অন্যদিনের ভোরে। বন্ধু মানে গভীর মমতা, গভীর মায়া, গভীর ভালোলাগা। জীবনের এমন কোনো বিষয় নেই, যা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা যায়।

শীত বিকেলের সেই মিঠে রোদ, সব ভুলিয়ে দেওয়া বন্ধুর হাসি, তরুণ বেলার সেই জমজমাট আড্ডা। বন্ধু হচ্ছে যারা একে অপরকে সম্মান, নির্বিশেষে বিশ্বাস এবং যারা ব্যক্তিগত উৎসর্গমূলক কাজে সহায়তা করে। প্রত্যেকেরই জীবনকালে বন্ধুত্ব বিকাশে এবং একটি প্রতিশ্রুতি ও সমর্থন যথেষ্ট পরিমাণ গুরুত্ব প্রদান করা উচিত। যেহেতু বন্ধুত্ব সরাসরি আত্মসম্মান, আত্মবিশ্বাস, এবং সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখে।

বন্ধুত্বের জন্য যা আবশ্যক

বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য আবশ্যক বিষয়গুলি হচ্ছে-পারস্পরিক বিশ্বাস, একে অপরের সঙ্গ উপভোগ করা, সহানুভূতি থাকা, পারস্পরিক চিন্তা-ভাবনা ও মূল্যবোধের গুরুত্ব দেওয়া, কম্প্রোমাইজ করার ক্ষমতা থাকা, মানসিক সমর্থন দেওয়া। অন্যের ভালো কিভাবে হবে এই বাসনা থাকা, কঠিন সত্যের স্বীকার করে হলেও নিজের সততার প্রমাণ দেওয়া। প্রয়োজনে সবার জন্য ইতিবাচক, গভীর কোনো সিদ্ধান্তে পৌছাতে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করা। তুমি কি করছ এটা নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে কোনো সংশয় না থাকা। একে অপরের সাথে ঝগড়া করলে বা মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে, সহানুুভূতির সাহয্যে তা মিটিয়ে ফেলা।

বন্ধুত্বের মধ্যে থাকবে: ১. রমণ: সময় নিয়ে একসাথে কাজ এবং জীবনের অভিজ্ঞতা ভাগ। ২. ট্রাস্ট: বিশ্বাস যে আমাদের বন্ধু আমাদের পক্ষ থেকে এটা করছে। ৩. সম্মান এবং বোঝাপড়া: বিশ্বাস যে আমাদের বন্ধু তাদের নিজস্ব মতামত অধিকার আছে। ৪. সহায়তা: আমাদের বন্ধু সাহায্য করা এবং প্রয়োজনে সাহায্য পাওয়া। ৫. বিশ্বাসপ্রবণ: আমাদের বন্ধুদের সাথে গোপনীয় বিষয় ভাগ করা।

ইমাম গাযালী (রহ.) বলেছেন, যার সাথে বন্ধুত্ব করবে তার মধ্যে পাঁচটি গুণ থাকা চাই- বুদ্ধিমত্তা, সৎ স্বভাব, পাপাচারী না হওয়া, বিদআতি না হওয়া ও দুনিয়াসক্ত না হওয়া।

হযরত আলী (রা.) বলেছেন, মূর্খের সঙ্গে বন্ধুত্ব করো না; সে তোমার উপকারের চেষ্টা করে তোমার ক্ষতি করবে। নিজের চেয়ে বুদ্ধিমান কাউকে সঙ্গী বা বন্ধু-বান্ধব হিসেবে বেছে নিলে বুদ্ধির তীক্ষèতা বজায় থাকে, বুদ্ধি উদ্দীপিত হয়, ফলে স্মৃতিশক্তি ভালো থাকে। সুতরাং এ ব্যাপারটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা জরুরি। বন্ধুকে নিজের মতো করে গড়ে নিতে চেষ্টা করা, তার ওপর নিজের রুচি ও ধ্যান-ধারণা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টায় নির্বুদ্ধিতা প্রকাশ পায়। যাকে দেখে আমরা স্মিত হাসি হাসতে পারি না তাকে আমরা পুরোপুরি ভালোবাসতে পারি না।

বন্ধুত্ব গভীর ভালোবাসার মতো। একটি মহৎ আবেগ। বন্ধুত্বের অর্থ হলো পরিপূর্ণ স্বার্থহীনতা, যে মানুষ তার কাজে লাগবে ভেবে বন্ধু খুঁজে বের করে এবং কাজটি করে দেবার পর তাকে অবহেলা করতে শুরু করে তার সঙ্গে কখনোই প্রকৃত বন্ধুত্ব গড়ে তোলা যায় না। সহজেই বিরক্ত বা অসন্তুষ্ট হয় এমন মানুষ কখনো ভালো বন্ধু হতে পারে না। প্রকৃত বন্ধুকে প্রতারিত করার চাইতে একজন কপট বন্ধু দ্বারা নিজে প্রতারিত হওয়াও ভালো।

বন্ধুত্বের প্রকারভেদ

বন্ধু হচ্ছে যাদের আমরা জানি এবং বিশ্বাস করি, এবং যারা আমাদের সামাজিকভাবে এবং আবেগের জন্য পছন্দের। সাধারণত বন্ধু হয় এমন যারা আমাদের নিজেদের মত হয়ে থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বন্ধু হিসেবে এমন ব্যক্তি খোঁজে- একসঙ্গে বড় হয়েছে, অনুরূপ পেশাতে কাজ করছে, সমবয়স্ক শিশুদের বাবা-মা, একই ব্যাপারে আগ্রহ আছে এমন ব্যক্তি, সাধারণত একই বয়স এবং একই লিঙ্গ।

পারিবারিক দায়িত্ব ও বৃত্তিমূলক কাজ কমে যাওয়ায় বৃদ্ধদের জন্যও বন্ধুত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পরে। বন্ধুত্ব গঠন সারা জীবন ধরে চলতে থাকে। নানা ধরনের বন্ধুত্ব- প্রতিনিধীমূলক বন্ধুত্ব, পারিবারিক বন্ধুত্ব, গোষ্ঠীগত বন্ধুত্ব, সহচর, কাল্পনিক বন্ধু,  প্রকৃত বন্ধু, ভার্চুয়াল বন্ধু, খাঁটি ভালোবাসা ও প্রেমের বন্ধুত্ব। ‘মিত্র’, ‘বন্ধু’, বা ‘সহকর্মী’ যাই বলি- বন্ধু আছে নির্ভরতা আর বিশ্বাসে। বন্ধু বয়স ও শ্রেণি মানে না।

বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে, মায়ের সঙ্গে, বাবার সঙ্গে, ভাইয়ের সঙ্গে, বোনের সঙ্গে। সহপাঠী হোক, হোক সমবয়সী। কোনো তফাৎ সেই বন্ধুত্বের গভীরতায় যদি কোনো খাদ না থাকে। জীবনে প্রথম বন্ধু গড়ে ওঠার স্মৃতি থাকে অমলিন। সময়ের প্রয়োজনে কোনো বন্ধু দূরে সরে যেতে পারে কিন্তু মনের দূরত্ব কখনই তৈরি হয় না। বন্ধুর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই অমূল্য। স্কুল শুরুর দিনে যে ছেলেটি বা মেয়েটি আপনারা পাশে বসেছিল তাকে কি ভোলা যায় সহজে?

বন্ধুত্বের প্রয়োজনীয়তা

যাদের বন্ধু নেই তারা বিষণ্নতায় ভোগে, একাকিত্ব তাদেরকে গ্রাস করে নেয়। এই জীবন থেকে পালিয়ে ফিরতে অনেকেই নানান পথ খোঁজে। কিন্তু যে পথটি আপনার জন্য অপেক্ষা করছে এটা শুধু জানে আপনার কাছের বন্ধুটিই। তাকেই বলেই দেখুন একবার আপনার বিষণ্নতার কথা, একাকিত্বের কথা। বন্ধুটিই আপনাকে ঘর থেকে টেনে বের করে নিয়ে যাবে খোলা মাঠে। সবুজ ঘাস সেখানে।

ছন্দহীন জীবনে ছন্দ, নিরানন্দ জীবনে আনন্দের জোয়ার যোগ করতে বন্ধুর জুড়ি নেই। একেক বন্ধু একেকটা দুনিয়ার প্রতিফলন ঘটায়। ভালো বন্ধুর কাছে মনের কথা খুলে বলা যায় অবলীলায়। ব্যস্ত নাগরিক জীবনের ফাঁকে পুরনো সহপাঠীদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে আমরা জড়ো হলে ভালোলাগে। কুশল বিনিময়, পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, একসাথে খাওয়া-দাওয়া খুবই ভালোলাগে। পুরনো বন্ধুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে অসাধারণ অনুভূতি।

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *