সহ-সম্পাদকের কর্মক্ষেত্র ও যাপিত জীবন

একজন সহ-সম্পাদক তা নিয়ে কাজ করেন যা পরেরদিন সকালে খবরের কাগজে অন্যরা পড়েন। পাঠক সংবাদ পাঠের সময় রিপোর্টারের নাম দেখতে পান। সহ-সম্পাদকের সাথে পাঠকের পরিচয় হয় না।

ফলে যত ভালো কাজই করেন না কেন কাগজে ছাপা হয় না বলে সহ-সম্পাদকের নাম পাঠকের কাছে পৌঁছে না। পাঠকের কাছে সহ-সম্পাদক বলে কোনোকিছুর অস্তিত্ব নেই। অধিকাংশ পাঠকই সাংবাদিক বলতে রিপোর্টারকেই চেনে।

তবে সহ-সম্পাদককে না চিনলেও তার কাজ ঠিকই পাঠকের মন-হৃদয় স্পর্শ করে। কারণ চমকে দেওয়া হেডিং তিনিই দিয়েছেন, ছবির স্মরণীয় ক্যাপশনও তিনিই দিয়েছেন। এসব কিন্তু পাঠকের ঠিকই মনে থাকে।

পত্রিকার অফিসে দৈনন্দিন কাজের চাপে সাব এডিটরের ফুরসত না মেলায় অফিসের বাইরে সময় দিতে পারেন না, প্রেসক্লাবে আড্ডা দিতে যেতে পারেন না, সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনে সক্রিয় থাকতে পারেন না, অন্য হাউজের পরিচিতজনদের সাথেও যোগাযোগ করতে পারেন না।

ফলে সহ-সম্পাদকদের কথা মিডিয়ায় বড় একটা আসে না। এরা সংবাদজগতে দৃশ্যমান চিহ্ন কমই রাখে।

যার চেনা জানা মানুষ যত বেশি, তার কাছের মানুষও তত বেশি, তার পাশে দাঁড়ানোর লোকও তত বেশি, তাকে স্মরণ করার লোকও তত বেশি, যেকোনো ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতাও তার বেশি।

যোগাযোগ কম মানেই সম্পর্কের পরিসর বিস্তৃত নয়, মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণ করার মতো লোকও কম, কথা দেয়ার মতো লোকও কম আর কথা দিয়ে কথা রাখার মতো লোক আরো কম।

এরা অনেক সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে অংশ নিতে পারেন না কারণ অন্যদের সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও তাদের অফিস থাকে; সরকারি অনেক ছুটির দিনেও তাদের ছুটি আগে-পরে থাকে।

অনেক সময় অফিস শেষে বিভিন্ন পেশার অনেক বন্ধু-বান্ধব একত্র হয়, আড্ডা দেয়; কিন্তু সহ-সম্পাদকেরা তাতে যোগ দিতে পারেন না। কারণ অন্যদের যখন অফিস শেষ হয়, এদের তখন অফিস শুরু হয়; আর সহ-সম্পাদকদের যখন অফিস শেষ হয় তখন কর্মব্যস্ত জগত অনেকটা নিরব-নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সহ-সম্পাদক যখন বাসায় ফিরে তখন অনেকেই ঘুমন্ত থাকে।

রিপোর্টারদের ব্যস্ততা সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সবার চোখে পড়ে, কখনো মন্ত্রীর সাথে সেলফিতে, কখনো সচিবের সাথে মিটিংয়ে, কখনো কোনো সেলিব্রেটির সাথে ফটোসেশনে! কিন্তু সহ-সম্পাদকের ব্যস্ততা তেমনভাবে চোখেও পড়ে না আবার তিনি সময় পান না!

হলের পুনর্মিলনিতে নেই, বিভাগের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কিছুক্ষণ পরই চলে যান, কাজিনের বিয়েতে অতিথির মতো মূল অনুষ্ঠানে কিছু সময়ের জন্য হাজির হন, পুরোনো সহকর্মীর ছেলের জন্মদিনের দাওয়াত পেয়েও যান না, বন্ধুদের গেটটুগেদারে যোগ দিতে পারেন না! ফলে কেউ ভাবে অসামাজিক, কেউ ভাবে ব্যস্ততা দেখায়, কেউ ভাবে আমাদের গুরুত্ব দেয় না, কেউ বলে ওতো সময় নষ্ট করে না খুব হিসাবি ইত্যাদি।

যে যাই বলুক বাস্তবতা হচ্ছে- সহ-সম্পাদকের অফিসের সময়ের সাথে অন্যদের সময় না মেলার কারণেই বন্ধুদের সাথে দেখা-সাক্ষাত করতে পারে কম, যোগাযোগ রাখতে পারে কম, খোঁজখবর নিতে পারে কম। আর যদি জীবনের গতিধারার সাথে কারো স্বভাবসিদ্ধ আলস্য যোগ হয় তবে অকৃতজ্ঞ বিবেচিত হবার জন্য তা যথেষ্ট।বিশেষ করে শুরু সময়টাতে কাজ শেখার চাপ থাকে, পুরো কাজ বুঝতে সময় লাগে।

কী শিখতে হবে, কোনটা আগে শিখতে হবে কোনটা পরে- সেসব বুঝতেও সময় লাগে, মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যের দরকার হয়। পেশার সাথে মানিয়ে নেয়াও নবীন সাংবাদিকের বড় পরীক্ষা, অনেক সময় সিনিয়রদের সাহায্য নেয়ার প্রয়োজন হয়। ভুল হলে শুধরে নিতে, ভরসার মূল্য দিতে জানতে হয়।

একটি দৈনিক পত্রিকায় আন্তর্জাতিক ডেস্কে কাজ শুরুর সময় শুরুতে কিছু দ্বিধা ছিল- যেমন অন্য ডেস্কের কার সাথে কতটা কথা বলব, কার সাথে হাসিঠাট্টা করা চলে, কার ঠাট্টায় হাসা চলে আর কার ঠাট্টায় হাসলে তিনি রেগে যাবেন কিংবা ডেস্কেরও সিনিয়রদের মনোভাব বুঝা নিয়ে।

প্রথম দিকে অনুবাদ নিয়ে সিনিয়ররা প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিতেন, টুকটাক সংশোধনী দিয়ে অনুবাদ যে শুধু অনুবাদ নয় তা বুঝাতেন। তবে খুব দ্রুতই আয়ত্বে আসে এবং নিজেই প্রকাশের অনুমোদন পেয়ে যাই।

আন্তর্জাতিক সংবাদ লেখা, সম্পাদনা, প্রাসঙ্গিক ছবি বাছাই শেষে মেকাপ রুমে পত্রিকার অঙ্গসজ্জার কাজে কম্পিউটার অপারেটরকে নির্দেশনা দিতে হয়। কোন নিউজটা কত কলাম হবে, কোথায় ছবি বসবে, ছবির ক্যাপশন কী হবে- এসবই বলে দিতে হয়।পৃষ্ঠাসজ্জার কাজ শেষ হওয়ার পরে পাতাটি বার্তা সম্পাদককে দিতে হয় এবং তিনি অনুমোদন করলে ছাপার জন্য প্রেসে যায়।

আন্তর্জাতিক ক্যাটাগরিতে বিশ্বের দেশে দেশে যেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে তা তুলে ধরা হয়। এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ গুরুত্ব পায়। রাজনৈতিক বিষয়, অরাজনৈতিক বিষয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যকার সম্পর্ক, রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক, সামাজিক ও মানবিক সম্পর্ক, পররাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক নীতিবোধ ও নানাবিধ উপায় কোনোটাই বাদ যায় না।

রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক বিরোধ-বৈরীতা, সহযোগিতা-প্রতিযোগিতা, বন্ধুত্ব ও সমন্বয়সাধনের বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে আন্তর্জাতিক ডেস্কের সহ-সম্পাদকের সামনে সে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।

আন্তর্জাতিক ডেস্কে যিনি কাজ করেন তাকে বিশ্বের সমস্যা-আন্দোলন-সংগ্রামগুলো দেখতে হয়। কখন কোথায় কে আক্রান্ত হলো, নতুন কোন চুক্তি-সম্মেলন হলো, কে চুক্তি ভাঙ্গলো, নতুন কোন ঘোষণা আসলো, কে ক্ষমতাচ্যুত হলো, কে গদিতে বসলো, আন্তর্জাতিক বৈঠকাদিতে কী সিদ্ধান্ত হলো তা জানতে হয়।

আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক আদালত, আন্তর্জাতিক সংস্থা-প্রতিষ্ঠান-সংগঠন, আন্তর্জাতিক দিবস-সপ্তাহগুলো সংক্রান্ত সংবাদ নজরে রাখতে হয়। বিশ্বসংবাদের জন্য বিশ্বভাবনা দরকার হয়, বিশ্ব ইতিহাস না জানলে বা কূটনৈতিক গতি-প্রকৃতি না বুঝলে ভুল বুঝাবুঝি হয়। বিশ্ব বাণিজ্য, বিশ্ব অর্থনীতি, বিশ্ব স্বাস্থ্য, বিশ্ব ঐতিহ্য, বিশ্ব সাহিত্য, বিশ্ব সংস্কৃতি, বিশ্ব জনসংখ্যা, কী নেই আন্তর্জাতিকে!

একই নিউজ নিউইয়র্ক টাইমসে একরকম আর আনাদোলু এজেন্সিতে আরেকরকম, ডনে এক ধরনের ব্যাখ্যা আর হিন্দুস্তান টাইমসে আরেক ধরণের ব্যাখ্যা, আলজাজিরা যে ঘটনায় যাকে দায়ী করেছে আরব নিউজ করেছে ভিন্নরকম। একই ইস্যুতে বিভিন্ন ধরণের বর্ণনা ও ব্যাখ্যা থেকে আসল সংবাদ খুঁজে নিতে পারতে হয়।

রয়টার্স, বিবিসি, ওয়াশিংটন পোস্ট, টাইমস অব ইন্ডিয়া, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, টাইম, গার্ডিয়ান, মিডল ইস্ট মনিটর, মিডল ইস্ট আই আরো কত কী! কিছু সাইটে গ্রাহক হতে হয়, সাবস্ক্রিপশন ফি না দিয়ে সব কনটেন্ট পাওয়া যায় না।

সহ-সম্পাদকের জীবন একঘেয়েমির রুটিনে বাঁধা। ভাগ্যেরও বিশেষ কোনো পরিবর্তন নেই। দক্ষ সহ-সম্পাদক না থাকলে মিডিয়ার কপালে দুর্গতি বলে দক্ষরা কাজের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পায়। তারা মিডিয়ার ভালোর জন্য চেষ্টা করে, মিডিয়াও পাঠকপ্রিয়তা পায়।

দক্ষ সহ-সম্পাদকদের গুরুত্ব কখনো শেষ হয় না। তাইতো সহ-সম্পাদককেই সংবাদপত্রের নেপথ্য নায়ক, কিং অফ দ্যা নিউজ ডেস্ক, আনসাঙ্গ হিরো অফ দ্যা নিউজ পেপার আর লাস্ট চেক পোস্ট বলা হয়ে থাকে, ভবিষ্যতেও বলা হবে।

 

About আনিসুর রহমান এরশাদ

শিকড় সন্ধানী লেখক। কৃতজ্ঞচিত্ত। কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী। ভেতরের তাগিদ থেকে লেখেন। রক্ত গরম করতে নয়, মাথা ঠাণ্ডা ও হৃদয় নরম করতে লেখেন। লেখালেখি ও সম্পাদনার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সময়ে পাক্ষিক-মাসিক-ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন, সাময়িকী, সংকলন, আঞ্চলিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ ও জাতীয় দৈনিকের সাথে সম্পর্ক। একযুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। পড়েছেন মিডিয়া ও জার্নালিজমেও। জন্ম টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার হাতীবান্ধা গ্রামে।

View all posts by আনিসুর রহমান এরশাদ →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *