সদাচরণেই সুখময় জীবন

বর্তমানে কার সাথে কেমন আচরণ করছেন তার ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যত জীবনে আপনার সাথে কে কেমন আচরণ করবে। মানবিক আচরণই প্রত্যাশিত আচরণ। অশোভন আচরণ মানুষকে কষ্ট দেয়। ভালো ও সুন্দরভাবে কথা বললে তা মন জয় করে নিতে পারে। তাইতো মিষ্টি হাসি, মধুর আচরণ ও কোমল চিত্তের অধিকারী হওয়া পরিবার প্রধান ও সমাজ সংস্কারকদের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য।

ইংরেজি ভাষায়—‘এটিকেট’, ‘ম্যানারস’। বাংলায়—আচরণ, ভব্যতাবোধ, শিষ্টাচার, সদাচার। এটিকেট বা শিষ্টাচার শেখার বিষয়। প্রাতিষ্ঠানিক শেখার বিষয়। শেখানো যেতে পারে পরিবারে, স্কুলে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে কিংবা ক্লাবে। কাউন্সিল বা সংস্কৃতিকেন্দ্রে। এটিকেট হলো সংস্কৃতিমান হওয়া। সংস্কৃতি শেখা। এখন তো আচরণ শিক্ষার প্রয়োজন এতটাই বেড়েছে—আচরণবিদ বলে একটা পেশাই তৈরি হয়েছে। আচরণ শিক্ষার কেন্দ্রও চালু হচ্ছে দেশে দেশে। এটিকেটের সঙ্গে রসবোধ, প্রত্যুৎপন্নমতি বা উপস্থিত বুদ্ধিমত্তাও যোগ করা হয়।

চলতে ফিরতে আমরা দেখি- কিছু মানুষ আছে যারা সবার সাথেই ভালোভাবে কথা বলে, দেখা হলে সালাম দেয়, কুশলাদি জিজ্ঞেস করে, সর্বদা হাসিমুখে কথা বলে, অন্যের সুখে সুখী হয়, অন্যের দুঃখে দুঃখী হয় এবং বিপদে সহানুভূতি-সহমর্মিতা প্রকাশ করে । সুন্দর ব্যবহার ও সুন্দরভাবে কথা বলায় সুন্দর মনের পরিচয়। যার আচরণ যত সুন্দর তাকে মানুষ তত বেশি ভালোবাসে, সম্মান ও শ্রদ্ধা করে। সুন্দর ব্যবহার ও আচরণ মানুষকে সম্মানিত করে।

আর কিছু মানুষ কর্কশ ভাষায় কথা বলে, ঝগড়া-ফ্যাসাদে লিপ্ত হয়, ধমক বা রাগের সুরে কথা বলে, পরনিন্দা করে, অপমান-অপদস্ত করে, উচ্চ আওয়াজে কথা বলে, গম্ভীর মুখে কথা বলে, অহেতুক কথা বলে। যার আচরণ ভালো নয় সবাই তাকে ঘৃণা করে ও এড়িয়ে চলে। সুন্দর ব্যবহারের কারণে যে মুখটি প্রিয় হয়, অসুন্দর ব্যবহার করায় একই মুখটি অপ্রিয় হয়ে যায়।

সদাচার বা মর্যাদাপূর্ণ আচরণই বুদ্ধিমানের কাজ। অন্যকে ছোট করে শেষে নিজেরও ছোট হতে হয়। কাউকে অসদাচরণের বশে ‘তুই-তোকারি’ করে অবশেষে নিজেও ‘তুই-তোকারি’ সম্বোধনের শিকার হতে হয়।আত্মসম্মানবোধ মানুষের সহজাত। কারও সম্মানে আঘাত করলে সে পাল্টা আঘাত করবেই।

সুন্দর আচরণ নেক আমল। সুন্দর আচরণে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন, পরকালে অনন্ত সুখের জান্নাতের নিশ্চয়তা মেলে। অশ্লীল ও কটু কথা বললে বা অশোভন আচরণ করলে, তাকে আল্লাহও ঘৃণা করেন। যার আচরণ যত সুন্দর তার ইসলাম তত সুন্দর। রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং সুন্দর আচরণ বাড়িঘর ও জনপদে বরকত দেয় এবং আয়ু বৃদ্ধি করে।

‘গুড ম্যানারস’ দরকার ক্ষতিকর ও নেতিবাচক দ্বন্দ্ব-সংঘাত পরিহারের জন্য। কূটকচালী না করা। কাজের জায়গায়ই কাজই পরম ধর্ম। নিজেকে আত্মপ্রত্যয়ী, সুসংগঠিত ও হালনাগাদ রাখা। দুশ্চিন্তা, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও অবৈজ্ঞানিক চিন্তা-চেতনা থেকে দূরে থাকা।

দয়া, নম্রতা, নরম মেজাজ ও ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজের মানুষের সাথে হাসি মুখে, হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে মিশতে হবে। তাদের সঙ্গে কোমল আচরণ করতে হবে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রতিবেশীর সাথে সুন্দর আচরণ করতে হবে। তাই সর্বাবস্থায় সর্ব স্তরের মানুষের সাথে ভদ্র আচরণ করা কর্তব্য। সেই মানুষটি যে পর্যায়েরই হোক না কেন।

আচরণ শিক্ষার উপায় হচ্ছে- যখন কিছু নেবেন, ‘প্লিজ বা অনুগ্রহ করে’ বলা। উপকারকে স্বীকৃতি দেয়া। বিনিময়ে কিছু অবশ্যই দেয়া, প্রতিশ্রুতি দেয়া এবং রক্ষা করা। অন্যের জিনিসকে নিজের মতো ভেবে যত্ন করা। অন্যের গুণাবলি অনুসরণ করা।

দোষ পরিহার করা। ধন্যবাদ বলা। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। চোখের ভাষা ও নজর নম্র রাখা। হাসিমুখে কথা বলা। সম্মান দেখানো। সহমর্মিতা প্রকাশ করা। সমতা বা সবাইকে সমানভাবে দেখার অভ্যাস রপ্ত করা। যোগাযোগের ক্ষমতা বাড়ানো। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি রক্ষা করা।

ভিন্ন মত, অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান, সহনশীলতা দেখানো। নিজের ভুলকে অনুধাবন করা। ভুল স্বীকার করা দুর্বল করে না, বরং সম্মানিত ও শক্তিশালী করে। ভুলকে জায়েজ করতে কোনো খোঁড়া অজুহাত না দেয়া। ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া। সে জন্য নিজেকে নানা পরিস্থিতিতে প্রস্তুত রাখা। কানকথা না শুনা। ইগো নয়, নিজের বিবেকের নির্দেশ অনুসরণ করা।

একটি ভালো কথা, সুন্দর আচরণ একটি ভালো গাছের মতো। সুন্দর আচরণকারীর সামনে-পেছনে মানুষ তার প্রশংসা করে। তার জন্য মন খুলে দোয়া করে। ফলে আল্লাহ এবং আসমান-জমিনের ফেরেশতারাও তাকে অত্যন্ত পছন্দ করে। অপরদিকে খারাপ ব্যবহারে সম্পর্ক বিনষ্ট হয়। অপ্রীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। সমাজের মানুষ তাকে অবহেলা, অবজ্ঞা ও ঘৃণার চোখে দেখে। তার কথার কোনো দাম দেয় না।

সাধারণত কর্তা ও প্রতাপশালীর সামনে সবাই বিনয় প্রকাশ করে, তার আদেশ পালন করে। কিন্তু প্রকৃত বিনয় হলো, নিজের সমপর্যায়ের লোকদের সাথে এবং নিজের থেকে ছোটদের সাথে সদাচরণ করা। আদব-কায়দাই মানুষকে তৈরি করে। ডিফো বলেছেন- সদাচরণ মানুষকে মানুষের পর্যায়ে নিয়ে যায়। ইমারসন বলেছেন- সুন্দর আনন্দের চেয়ে সুন্দর দেহাকৃতি উত্তম, সুন্দর দেহাকৃতির চেয়ে উত্তম সুন্দর স্বভাব।

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.