সঠিক সামাজিকীকরণ ও মানবিক গুণাবলির সৃজনভূমি পরিবার

আনিসুর রহমান এরশাদ

সামাজিকীকরণের মাধ্যমগুলোর মধ্যে পরিবারের ভূমিকাই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিকীকরণ একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। শিশুর জন্মের পর হতে মৃত্যু পর্যন্ত বিভিন্ন মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জন ও খাপখাওয়ানোর ক্রিয়াই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যক্তি যখন একপর্যায় হতে আরেক পর্যায়ে প্রবেশ করে তখন তাকে নতুন পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ-খাইয়ে চলতে হয়।

এই খাপ-খাওয়ানো প্রক্রিয়ার ফলে তার আচরণে পরিবর্তন আসে। নতুন নিয়মকানুন রীতিনীতি এবং নতুন পরিবেশ পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ-খাইয়ে চলার প্রক্রিয়ার নাম সামাজীকিকরণ। মানুষ সামাজিক জীব। তাই মানুষকে সমাজে বসবাস করতে হলে পারিবারিক পরিচয় বহন করতে হয়। মানুষের জীবনে পারিবারিক শিক্ষা, শিষ্টাচার ব্যাপক ভূমিকা রাখে। মানুষ অলিখিতভাবে সামাজিক সন্মান, ক্ষমতা, এবং আঞ্চলিক কর্তৃত্ব অনেকটা পরিবার থেকে পেয়ে থাকে।

সামাজিকীকরণ কী?

সামাজিকীকরণ এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে মানুষ সমাজের সাথে পরিচিত হয়, সামাজিক রীতিনীতি, মূল্যবোধ ও ভাবধারা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করে। সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষ সমাজে প্রচলিত প্রথা, রীতিনীতি, আচার-আচরণ, মূল্যবোধ ও ভাবধারা ইত্যাদি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করে। সমাজবিজ্ঞানী বোগারদোস বলেন, ‘সামাজিকীকরণ হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ব্যক্তি জনকল্যাণের নিমিত্তে একত্রে নির্ভরযোগ্য আচরণ করতে শেখে এবং এটি করতে গিয়ে সামাজিক আত্মনিয়ন্ত্রণ, দায়িত্বশীল ও সুসামঞ্জস্য ব্যক্তিত্বের অভিজ্ঞতা লাভ করে।’

সামাজিকীকরণের প্রয়োজনীয়তা

সামাজিকীকরণ ব্যক্তিকে সামাজিক আচরণ শিক্ষা দেয়, সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে, রাজনীতির সাথে পরিচিত করে, চেতনা ও মেধার বিকাশ ঘটায়, দেশাত্মবোধ জাগ্রত করে এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণা জন্ম নেয়। দেশগঠন, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সকল প্রকার সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং রাজনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে শিশুদের সামাজিকীকরণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

সঠিকভাবে সামাজিকীকরণ

সঠিকভাবে সামাজিকীকরণের প্রধান ক্ষেত্র পরিবার। পারিবারিক শিক্ষা, আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তী জীবনে খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করে। যৌথ পরিবারের শিশুরা সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়ার বিষয়ে শিক্ষা লাভ করত। নানামুখী অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্য দিয়ে বাস্তব জীবন সম্পর্কে ধারণা পেত।

বিভিন্ন সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে শিশুরা সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার শিক্ষা পেত। সমাজের সাথে তার যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে সেই উপলব্ধি জন্মাতো পরিবারেই। নৈতিক শিক্ষা অর্জন ও সামাজিক মূল্যবোধের ধারণা লাভ করে শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ সাধিত হতো। তাদের মধ্যে জন্ম নিত সামাজিক দায়বদ্ধতা।

সামাজিক কাঠামো

বেশিরভাগ মানুষ সঠিক পথ পরিহার করে বিপথে পরিচালিত হলে ভেঙে যাবে সামাজিক কাঠামো। সামাজিক অস্থিরতা, পারস্পরিক সহিংসতা ও সন্ত্রাস, দুর্নীতি, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও সামাজিক বৈষম্য দিন দিন বাড়বে। সামাজিক সুদৃঢ় বন্ধন, সামাজিক মূল্যবোধ, সমাজের ঐক্য, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, নৈতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা সমাজ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ।

যৌথ পরিবারে সমস্যা সমাধানে পরিবারের নেতৃত্বে থাকাদের ভূমিকা, সমস্যা সমাধানে গৃহীত পদক্ষেপ, সমাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণে শিশু কিশোরদের রাজনৈতিক সামাজিকীকরণের পথ সুগম করে। একক পরিবারেও সামাজিক আচার অনুষ্ঠান, ভাইবোনদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়ার শিক্ষা এবং সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষা রয়েছে।

সামাজিক প্রতিষ্ঠান

ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা বাড়ায় অণু পরিবার গঠন এবং  সন্তান সংখ্যা এক বা দুইয়ে সীমাবদ্ধ রাখায় অনেক পরিবার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। জীবিকার তাড়নায় ও সময়ের অভাবে সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে ও জীবনের মূল্যবোধ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক প্রতিষ্ঠানে সময় দেয়ার মত সময় এখন আর থাকছে না।

বিশাল জগৎ সম্পর্কে সন্তানদেরকে ধারণা দেয়ার প্রয়োজন অভিভাবকরা বোধ না করার কারণে তাদের কাছে সমাজের বাস্তব কোনো ধারণা নেই, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করতে তারা জানে না। সামাজিক সম্পর্ক গড়ে না ওঠায় তারা সমাজ ও পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতাও অনুভব করে না, পরিবারের প্রতি সহিংস হতেও দ্বিধাবোধ করে না।

সামাজিক সঙ্কট

বর্তমান সময়ে পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিরাজমান প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম কি আগামী দিনে সঠিক পথে চলতে পারবে? নারীর প্রতি যে সহিংসতা চলছে তা কমানো সমাজের সবার দায়িত্ব। এর জন্য কমিউনিটি-ভিত্তিক একটা প্রতিরোধ বা বলয় গড়ে তুলতে হবে। গণপরিবহন ব্যবস্থায় মেয়েরা এখনও হয়রানির শিকার হচ্ছেন, কর্মক্ষেত্রে হেনস্থায় পড়ছেন।

সামাজিকীকরণের যে বিষয়টি প্রচলিত আছে তা রাতারাতি পরিবর্তন করা যাচ্ছে না। গৃহে নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, মেয়ে শিশুরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, ঘরের বাইরে ইভটিজিং থেকে শুরু করে ধর্ষণ-হত্যা-প্রতারণা-ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। নবীনেরা যেভাবে যা দেখছে, সেভাবে তা শিখছে এবং মনটাও ওইভাবে তৈরি করে নিচ্ছে। তাই পরিবারেই দৃষ্টিভঙ্গি-মানসিকতা পরিবর্তন  করতে হবে, যা সামাজিক সঙ্কটগুলো নিরসনেও ভূমিকা রাখবে ।

মানবিক গুণাবলির সৃজন ভূমি পরিবার

সব বাবা-মা চান তাদের ছেলে-মেয়েরা সৎ, আস্থাভাজন, ন্যায়সঙ্গত, আত্মনিয়ন্ত্রিত ও সশ্রদ্ধ হোক। এজন্য প্রয়োজন হয় দক্ষ অভিভাবকত্বের ও কর্তৃত্বের। পরিবার চিরকালের জন্য পরিবার! বাবা-মা সন্তানের জীবনের প্রথম শিক্ষক, আত্মার শিক্ষক ও চরিত্রের রূপায়ক। পারিবারিক জীবন সমাজের প্রাণকেন্দ্র, মানবসমাজের লালনের ক্ষেত্রে দোলনাস্বরূপ, ভালোবাসা-দয়া-মায়া-ক্ষমা-করুণার মতো মানবিক গুণাবলির সৃজন ভূমি। আর পারিবারিক জীবন পবিত্র প্রেম-ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা এবং পরম শান্তি ও স্বস্তির কেন্দ্রবিন্দু।

আত্মসমালোচনা ও আত্মজিজ্ঞাসা

নিজেকে জানতে হবে ও ভালোবাসতে হবে। কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে জানতে চেষ্টা করে যে, আমি কে? কোথা থেকে এসেছি? কেন এসেছি? আমার পিছনে মা-বাবার অবদান কী? আমি কেন কষ্টের সময় কাঁদি? সুখের সময় হাসি? এ ধরনের আত্মসমালোচনা ও আত্মজিজ্ঞাসা থেকেই নিজের জীবনের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। আর যখন কোনো মানুষ প্রকৃত অর্থে নিজেকে ভালোবাসে তখন তার দ্বারা অন্যকে ভালোবাসা ব্যতীত অন্যের কোনো ক্ষতি হতে পারে না।

পরিবারকে ভালোবাসা, বড়কে শ্রদ্ধা করা, ছোটকে স্নেহ করা। পারস্পরিক সহানুভূতি, ভালোবাসা ও সম্মানবোধ থাকা। পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা করা। দায়িত্বশীল হওয়া। ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য করা তথা সত্যবাদী হওয়া।  সৎ সঙ্গ গ্রহণ অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করা। অন্যের উপকার করা এবং ক্ষতি না করা। অতিরিক্ত লোভ পরিহার করা। প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ইত্যাদি।

মঙ্গল চিন্তা ও কল্যাণ কাজ

মানবিক গুণাবলি অর্জনের অন্যতম ক্ষেত্র হচ্ছে পরিবার। পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে মানবিক গুণাবলি বিকশিত হয়। মূলত সুশিক্ষা মানুষকে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ধৈর্য, বিনয়, মনুষ্যত্ববোধ ইত্যাদির সঙ্গে পরিচিত করে।

মানবিক গুণের অধিকারী ব্যক্তির দ্বারা সমাজের কোনো ক্ষতি হয় না। তাদের দ্বারা সমাজে সংঘটিত হয় না কোনো অপরাধ। তাই ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধগুলো প্রতিরোধে মানবিক গুণাবলির বিকাশ জরুরি। মানবিক গুণাবলি বিকাশ ও প্রসারে দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা বাড়াতে হবে। জ্ঞাননির্ভর ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে নান্দনিক সংস্কৃতির প্রচার প্রসারে করতে হবে। মানুষের মানবিক গুণাবলিগুলো সুপ্তাবস্থায় থাকে। সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে উক্ত গুণাবলি জাগ্রত ও উজ্জীবিত হয়।

 

 

 

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *