লোক দেখানো ইবাদত নিন্দনীয়

মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে কোনো ইবাদতের স্থান ইসলামে নেই। যেটাকে প্রদর্শনেচ্ছা কিংবা রিয়া বলা হয়। ব্যক্তির উদ্দেশ্য যদি নিজের খ্যাতির, প্রচার ও প্রসারের জন্য হয়; তবে সেটা ব্যক্তির জন্য ক্ষতির কারণ হয়। রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা মুমিনের ইবাদত ধ্বংস করে ফেলে। মুমিনের ইবাদত ধ্বংস করার জন্য শয়তানের অন্যতম ফাঁদ এই ‘রিয়া’।

রিয়া এমন এক মন্দ স্বভাব বা বৈশিষ্ট্য, যা নিম্নশ্রেণির প্রাণীর মধ্যেও বিদ্যমান নেই। এহেন জঘন্য বদ গুণ সব নেক আমল ও পুণ্যকর্মকে বরবাদ করে দেয়। কষ্টে অর্জিত আমল নিষ্ফল হয়ে যায়। শরিয়তের আলোকে ‘রিয়া’ কবিরা গুনাহ ও প্রচ্ছন্ন শিরক। তরিকতের দৃষ্টিতে রিয়া হলো শিরকে আকবর (বড় শিরক)।

এক নজরে দেখে নিন লুকিয়ে রাখুন

রিয়া কী?

রিয়া (الرياء) অর্থ: লোক দেখানো, প্রদর্শন করা (To act ostentatiously, make a show before people, attitudinize, to do eyeservice) বা প্রদর্শনেচ্ছা। ইসলামের পরিভাষায়, মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে কোন আমল সম্পাদন করাকে রিয়া বলা হয়। অন্য কথায়, আল্লাহর জন্য করণীয় ইবাদত পালনের মধ্যে মানুষের দর্শন, প্রশংসা বা বাহবার ইচ্ছা পোষণ করাকে রিয়া বলে।

অর্থাৎ যখন কোন মানুষ নামায, রোযা, দান-সদকা, কুরআন তিলাওয়াত বা দ্বীনের কোনো কাজ করবে এ উদ্দেশ্যে যে, মানুষ তার প্রশংসা করবে, মানুষ জানবে যে, সে দ্বীনদার, নামাযী, সৎকর্মশীল, সবাই তাকে দানশীল বলবে, সমাজে সে ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত হবে, মানুষ তাকে বাহবা দিবে,তাহলে তখন এ আমলটি রিয়া হিসেবে পরিগণিত হবে।

মানুষের ভেতর প্রদর্শনপ্রিয়তা বিচিত্র রূপে প্রকাশ পায়। কেউ ইবাদতের সময় প্রত্যাশা করে মানুষ তার ইবাদত দেখে প্রশংসা করুক। কেউ আশা করে, মানুষ বিস্মিত হোক। কারও ইচ্ছা থাকে মানুষ তার ইবাদত দেখে তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করুক। কারও উদ্দেশ্য থাকে ইবাদতের কারণে মানুষের ভেতর তার প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ুক।

চারটি বিষয়ের সমষ্টিতে সম্পন্ন রিয়া

রিয়া শব্দটি আরবি ‘রুইয়াতুন’ ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ দেখা। শব্দটি একটি ধর্মীয় পরিভাষা। বিশেষ করে ইসলামী দর্শন তথা তাসাউফে রিয়া শব্দটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। বাংলায় রিয়া বলতে লৌকিকতাকে বোঝায়। বিশেষভাবে যেসব সৎকাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য করা হয়, অর্থাৎ ইবাদাত-বন্দেগিতে লোক দেখানো উদ্দেশ্য থাকলে সেটাকে রিয়া বলা হয়। অন্যভাবে বললে মানুষ নিজের যেসব বিষয় অন্য মানুষ জানলে আনন্দ অনুভব করে, সেটাকে বলা হয় রিয়া। মোট চারটি বিষয়ের সমষ্টিতে রিয়া সম্পন্ন হয়।

১. রিয়াকার : সে হবে ইবাদাতকারী। অর্থাৎ এমন কাজ সম্পাদনকারী যা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য করা হয়।

২. প্রদর্শনেচ্ছা : আর এটাকেই বলা হয় রিয়া।

৩. যাকে দেখানোর ইচ্ছা, সে হবে মানুষ।

৪. যা দেখানোর ইচ্ছা, সেটা হবে কোনো ইবাদাত।

রিয়ার প্রকারভেদ

ইবাদাত নয় এমন বিষয়েও প্রদর্শনেচ্ছা মানুষের থাকে। যেমন-নিজের শরীর, পোশাক-পরিচ্ছদ, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ইত্যাদি। এগুলো শিরকের পর্যায়ে না পড়লেও সর্বসম্মতভাবে নিন্দনীয়। কারণ ওই বিষয়গুলো মানুষের অন্তরে অহংকার জন্ম দেয়। বিশেষভাবে ইবাদাতের মধ্যে লৌকিকতা বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্য শিরকতুল্য রিয়ার পর্যায়ে চলে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা রিয়া দুই প্রকার বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন- ১. ‘জলি’ বা প্রকাশ্য রিয়া ২. ‘খফি’ বা গোপন রিয়া। আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধান ও সাওয়াবের নিয়ত না থাকা সত্ত্বেও যে ইবাদাত করা হয়, সেটাকে বলে প্রকাশ্য রিয়া। দ্বিতীয় প্রকার রিয়া অর্থাৎ গোপন রিয়া যা অত্যন্ত মারাত্মক। স্বয়ং রিয়াকারীও তার রিয়ার বিষয়টা বুঝতে পারে না।

এ প্রকার রিয়াকে রাসুলুল্লাহ (সা.) এক হাদিসে কালো উপত্যকায়, অন্ধকার রাতে, কালো রঙের পিঁপড়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। রাতের আঁধারে কালো রঙের পিঁপড়া যদি কালো মাটির ওপর দিয়ে চলে, তাহলে ওই পিঁপড়ার অস্তিত্ব যেমন মানুষের চোখে ধরা পড়ে না, তেমনি গোপন রিয়াও বুঝতে পারা যায় না। এ প্রকার রিয়ার উদাহরণ হলো, কোনো ইবাদাতকারী একনিষ্ঠভাবেই আল্লাহর উদ্দেশে ইবাদাত করে। সে মানুষের সন্তুষ্টি বা সুনামের প্রতি ভ্রূক্ষেপও করে না এবং রিয়ার কুফল সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞাত।

কিন্তু মানুষ তাঁকে সম্মান করে, শ্রদ্ধা করে করে, দেখা হলে তাঁকে আগে সালাম দেয়, তাঁর কথার প্রতি সমাদর করে, এ বিষয়গুলো তাঁকে তৃপ্তি দেয়। আর কখনো তাঁর কথা কেউ রক্ষা না করলে, তাঁর কোনো অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হলে কষ্ট পায়। এ প্রকারের রিয়া থেকে বেঁচে থাকা বড়ই দুঃসাধ্য ব্যাপার। বিজ্ঞ ধর্ম-সাধকদের মতে এ ধরনের রিয়া থেকে সিদ্দীকগণ ছাড়া কেউই আত্মরক্ষা করতে পারে না।

প্রদর্শনেচ্ছা ও সম্মানের আগ্রহ

মুমিন তার সকল কর্ম কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করবেন। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে দেখানোর জন্য বা কারো নিকট থেকে প্রশংসা, সম্মান বা পুরস্কার লাভের জন্য কর্ম করাকে ‘রিয়া’ বলা হয়। বাংলায় আমরা একে ‘প্রদর্শনেচ্ছা’ বলতে পারি।

আখিরাত ধ্বংস করে রিয়া

রিয়া কিংবা প্রদর্শনেচ্ছা হলো ছোট শিরক। এর মাধ্যমে মানুষের আখিরাতের প্রতিদান ধ্বংস হয়। মাহমূদ ইবন লাবীদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: ‘‘আমি সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি তোমাদের ব্যাপারে ভয় পাই তা হল, শিরক আসগার বা ক্ষুদ্রতর শিরক। সাহাবীগণ প্রশ্ন করেন: হে আল্লাহর রাসূল, শিরক আসগার কী?

তিনি বলেন: রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা বা লোক দেখানো ইবাদত। কিয়ামতের দিন যখন মানুষদেরকে তাদের কর্মের প্রতিফল দেওয়া হবে তখন মহান আল্লাহ এদেরকে বলবেন, তোমরা যাদের দেখাতে তাদের নিকট যাও, দেখ তাদের কাছে তোমাদের পুরস্কার পাও কি না!’’ (আহমদ, আল-মুসনাদ ৫/৪২৮-৪২৯; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১০২।

রিয়ার ব্যাপারে শাইখ উছাইমীন

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) বলেন, রিয়ার সাথে ইবাদতের তিনটি অবস্থা:

এক. ইবাদতটি সম্পাদন করার মূল প্রেরণা হওয়া— মানুষকে প্রদর্শন। যেমন- কেউ মানুষকে দেখানোর জন্য নামায পড়ল; যাতে করে মানুষ তার নামাযের প্রশংসা করে— এমন রিয়া ইবাদতকে বাতিল করে দেয়।

দুই. ইবাদত পালনকালীন সময়ে রিয়া। অর্থাৎ শুরুতে ইবাদতের উদ্দীপনা ছিল আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠতা; কিন্তু ইবাদতের মাঝখানে রিয়ার উদ্রেক ঘটল। এ ইবাদতের দুটো অবস্থা হতে পারে:

(১) ইবাদতের প্রথমাংশ শেষাংশের সাথে সম্পৃক্ত না থাকা (বিভাজ্য ইবাদত)। তাহলে এর প্রথমাংশ সহিহ; আর শেষাংশ বাতিল। এর উদাহরণ হল— এক ব্যক্তির কাছে ১০০ রিয়াল আছে। তিনি এই রিয়াল সদকা করতে চান। তিনি ৫০ রিয়াল সদকা করেছেন খালিস নিয়তে। আর বাকী ৫০ রিয়ালে রিয়া ঢুকেছে। তার প্রথম সদকা সহিহ ও মাকবুল। আর পরবর্তী ৫০ রিয়ালের সদকা বাতিল; যেহেতু সেটাতে ইখলাসের সাথে রিয়ার সংমিশ্রণ ঘটেছে।

(২) ইবাদতের প্রথমাংশের সাথে শেষাংশ সম্পৃক্ত থাকা (অবিভাজ্য ইবাদত)। এমন ইবাদত পালনকালে মানুষ দুটো অবস্থার কোন একটি থেকে মুক্ত হবে না: (ক) রিয়াকে প্রতিরোধ করা ও স্থিতিশীল হতে না দেওয়া। বরং রিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া ও রিয়াকে অপছন্দ করা। এমন হলে রিয়া ইবাদতের কোনো ক্ষতি করবে না। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আমার উম্মত মনে মনে যা চিন্তা করে নিশ্চয় আল্লাহ্সেটা ক্ষমা করে দিয়েছেন; যতক্ষণ না সে আমল করে কিংবা কথা বলে।” (খ) রিয়ার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং রিয়াকে প্রতিহত না করা। সেক্ষেত্রে তার গোটা ইবাদত বাতিল হয়ে যাবে। কেননা এই ইবাদতের প্রথমাংশ শেষাংশের সাথে সম্পৃক্ত (অবিভাজ্য)। এর উদাহরণ হলো: কোনো ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে নামায শুরু করল। এরপর দ্বিতীয় রাকাতে রিয়ার উদ্রেক হল। তখন গোটা নামাযই বাতিল হয়ে যাবে। যেহেতু গোটা নামায প্রথমাংশ শেষাংশের সাথে সম্পৃক্ত।

তিন. ইবাদতটি পালন সমাপ্ত হওয়ার পর রিয়ার উদ্রেক ঘটা। এটি ইবাদতের উপর কোন প্রভাব বিস্তার করবে না এবং ইবাদতকে বাতিল করবে না। কেননা ইবাদতটি সঠিকভাবে সমাপ্ত হয়েছে। সুতরাং ইবাদত সমাপ্ত হওয়ার পর রিয়া ঘটলে ইবাদত নষ্ট হবে না।

অন্য মানুষ তার ইবাদতের কথা জেনে যাওয়ার প্রেক্ষিতে মনে যে আনন্দ লাভ হয় সেটি রিয়া নয়। কেননা তা ইবাদত সম্পাদিত হওয়ার পর ঘটেছে। অনুরূপভাবে কোন ইবাদত করতে পেরে নিজে আনন্দিত হওয়াটাও রিয়া নয়। কেননা সেটা তার ঈমানের আলামত। যেহেতু নবী সা. বলেছেন: “যে ব্যক্তিকে তার নেক আমল আনন্দিত করে এবং বদ আমল ভারাক্রান্ত করে সেই-ই মুমিন।”  নবীকে সা. এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: “এটা হচ্ছে মুমিনের জন্য তাৎক্ষণিক সুসংবাদ।” [মাজমুউ ফাতাওয়াস শাইখ বিন উছাইমীন (২/২৯, ৩০)]

রিয়া গোপন শিরক

আবূ সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন: ‘‘দাজ্জালের চেয়েও যে বিষয় আমি তোমাদের জন্য বেশি ভয় পাই সে বিষয়টি কি তোমাদেরকে বলব না? আমরা বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই বলুন।

তিনি বলেন, বিষয়টি ‘শিরকে খফি’ বা গোপন শিরক। গোপন শিরক এই যে, একজন সালাতে দাঁড়াবে এরপর যখন দেখবে যে মানুষ তার দিকে তাকাচ্ছে তখন সে সালাত সুন্দর করবে।” [ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ২/১৪০৬ (কিতাবুয যুহুদ, বাবুর রিয়া ওয়াস সুমআহ); আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/৮৯।) (আহমাদ)

দুনিয়ায় কোনো পার্থিব স্বার্থে রবের ইবাদতকে নিন্দনীয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিরক সাব্যস্ত করা হয়েছে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করল সে শিরক করলো, আর যে ব্যক্তি কাউকে দেখানোর উদ্দেশ্যে রোজা পালন করলো; সে শিরক করলো এবং যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে দান-সদকা করলো সে শিরক করলো।’ -মুসনাদে আহমদ

লোক দেখানো ইবাদত আল্লাহর জন্য নয়

আপনি একটি ইবাদত করছেন বা করেছেন এবং সেটি মানুষের কাছে দেখাতে বা বুঝাতে চাইছেন যে আপনি অমুক ইবাদতটি করেছেন বা করছেন এবং মনের মধ্যে এমন কিছু রয়ে যায় যে এটি মানুষ শুনে বা দেখে আপনার প্রশংসা করুক বা মানুষের কাছ থেকে আপনি কিছু সুবিধা ইত্যাদি পান অর্থাৎ ইবাদত আল্লাহর জন্য না হয়ে হয়ে যাচ্ছে লোক দেখানো। আর এটিই মূলত রিয়া, আর রিয়া হচ্ছে শিরক।

লোক-দেখানো আমল কবুল হয় না

পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ লোক-দেখানো ইবাদত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাতের আশা রাখে, সে যেন সৎ কাজ করে এবং তার প্রভুর ইবাদতে কাউকে অংশীদার না করে।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত : ১১০)

প্রদর্শনপ্রিয়তা নিয়তের অসততা

প্রদর্শনপ্রিয়তা নিয়তের অসততা, যা ইবাদতকে মূল্যহীন করে দেয়। প্রদর্শনের উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন, তার পরিণতি ভয়াবহ। এমন ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। পরকালে এসব ইবাদত ব্যক্তির জন্য বোঝা ও আক্ষেপের কারণ হবে।

ইবাদত হবে রাসুলের সুন্নত অনুযায়ী

ইবাদত হতে হবে, আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সুন্নত অনুযায়ী। এটাও ইবাদতের পূর্বশর্ত।  অন্যদিকে আবশ্যিকভাবে ইবাদত আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে করা যাবে না। যেমন : মানুষের প্রশংসা, সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি, কারো দৃষ্টি আকর্ষণ ইত্যাদির মোহে ইবাদত করা। ইসলামী পরিভাষায় একে রিয়া এবং বাংলা ভাষায় ‘লোক-দেখানো’ বা ‘প্রদর্শনপ্রিয়তা’ বলা হয়।

ইবাদত হবে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ

ইবাদত আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হওয়া জরুরি। এটি পরকালে আমল আল্লাহর কাছে যথাযথ মূল্যায়ন লাভের প্রধান শর্ত। সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে যাতে জাগতিক কোনো উদ্দেশ্য না থাকে। এছাড়াও স্বার্থ জড়িয়ে না ফেলা, বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ত্রুটি— এসব থেকেমুক্ত হতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের কেবল একনিষ্ঠ হয়ে আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ (সুরা বাইয়িনাহ, আয়াত : ৫)

লোক-দেখানো নামাজির জন্য ধ্বংস

অন্য আয়াতে যারা লোক-দেখানো ইবাদত করে তাদের নিন্দা করে বলা হয়েছে— ‘ধ্বংস সেসব নামাজির জন্য, যারা তাদের নামাজের ব্যাপারে উদাসীন, যারা প্রদর্শন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস দেওয়া থেকে বিরত থাকে। (সুরা মাউন, আয়াত : ৪-৭)

রিয়া কবিরা গুনাহ

ইসলামী জ্ঞানতাপসরা রিয়াকে কবিরা গুনাহ (বড় পাপ) ও হারাম বলেছেন। আল্লামা ইবনে কায়্যিম (রা.) কবিরা গুনাহের তালিকার প্রথমে রিয়ার আলোচনা করেছেন।

প্রদর্শনপ্রিয়তা হারাম

ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেছেন, ‘জেনে রাখো, নিশ্চয় প্রদর্শনপ্রিয়তা হারাম। প্রদর্শনকারী আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয়। আয়াত, হাদিস ও পূর্ববর্তী আলেমদের বক্তব্য দ্বারা তা প্রমাণিত।’ (ইহয়াউ উলুমিদ্দিন : ২/৪৮০)

লোক দেখানো রোজা শুধুই উপবাস

সহিহ মুসলিমে হজরত ইবনে আতিয়্যা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, রাসূল (সা.) সামান্য ইফতার গ্রহণ করে দ্রুত নামাজ আদায় করে নিতেন। অথচ অনেক রোজাদার ইফতারিতে অধিক সময় ব্যয় করে মাগরিব ওয়াক্তের শেষ সময়ে নামাজ আদায় করছেন।

জামাতে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলেও শুধু ইফতারিতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার কারণে তারা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এমনকি অনেকে বিনা ওজরে মাগরিব ওয়াক্তের নামাজ ছেড়ে ইফতার গ্রহণে ব্যস্ত থাকছেন। ওয়াক্তের নামাজ আদায় না করে এ ধরনের রোজা রাখা শুধুই ‘উপবাস’ এবং ‘লোক দেখানো’ ইবাদত ভিন্ন কিছুই নয় বলে ইসলাম সাফ জানিয়ে দিয়েছে।

লোক দেখানো ইবাদত প্রতারণা

লোক দেখানো ইবাদত আল্লাহর সঙ্গে প্রতারণার শামিল। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহর সঙ্গে প্রতারণা করে। আর তিনি তাদের সঙ্গে কৌশল অবলম্বনকারী। যখন তারা নামাজে দাঁড়ায় তখন আলস্যভরে দাঁড়ায় মানুষকে দেখানোর জন্য। তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে।’ (সূরা : নিসা, আয়াত : ১৪২)।

রিয়াকারীর কাজকর্ম অগোছালো হয়ে যায়

হজরত আনাস (রা.)  বর্ণনা করেছেন- নবী করিম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার কাজ দিয়ে পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত করে, আল্লাহ তার অন্তরকে মানুষ থেকে অমুখাপেক্ষী করে দেন, তার এলোমেলো কার্যাবলি তিনি সম্পাদন করে দেন এবং পার্থিব সম্পদ লাঞ্ছিত হয়ে তার কাছে আসে।

পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে কাজ করে, আল্লাহ দরিদ্রতাকে তার সামনে এনে দেন। তার যাবতীয় কাজকর্ম অগোছালো হয়ে যায়। অথচ সে পার্থিব সম্পদের শুধু ততটুকুই লাভ করে যতটুকু তার জন্য তাকদিরে নির্ধারিত আছে।’ (তিরমিজি ও মুসনাদে আহমদ)।

কিয়ামাতে সিজদা করতে পারবে না রিয়াকারীরা

রাসূল (সা.) বলেছেন- ‘কিয়ামাতের দিন যখন আল্লাহ তায়ালা তার সত্তার কিয়দংশ উন্মোচিত করবেন, তখন ঈমানদার নারী-পুরুষরা সবাই তার সম্মুখে সিজদায় পড়ে যাবে। তবে সিজদা থেকে বিরত থাকবে কেবল ওইসব লোক, যারা দুনিয়াতে মানুষকে দেখানোর জন্য ও প্রশংসা পাওয়ার জন্য সিজদা (সালাত আদায়) করত। তারা সিজদা করতে চাইবে বটে; কিন্তু তাদের পিঠ ও কোমর কাঠের তক্তার মতো শক্ত হয়ে যাবে (ফলে সিজদা করতে পারবে না)।’ বুখারি, মুসলিম, মিশকাত : ৫৩০৮।

রিয়াকারীর দোষ-ত্রুটি প্রকাশিত হবে

হযরত যুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মানুষকে শোনানোর জন্য এবং মানুষের নিকট প্রসিদ্ধি লাভ করার জন্য কোনো আমল করে আল্লাহ তাআলা তার অবস্থা মানুষকে শুনিয়ে দেবেন। (অর্থাৎ কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষের সামনে তার দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করে তাকে অপমান ও অপদস্ত করবেন।) আর যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করে আল্লাহ তাআলা তাকে রিয়াকারীর শাস্তি দেবেন।

রিয়ায় আমল বাতিল হয়ে যায়

কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় কোনো আমল শুরু করার পর যদি তার মধ্যে লোক দেখানো ভাব জাগ্রত হয় এবং সে তা থেকে সরে আসতে চেষ্টা করে, তাহলে তার ওই আমলও শুদ্ধ হবে। কিন্তু যদি সে তা থেকে সরে না আসে তাহলে তার ওই আমল বাতিল হয়ে যাবে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! একবার আমি নামাজ পড়ার সময় হঠাৎ এক ব্যক্তি এসে আমাকে নামাজ অবস্থায় দেখে ফেলে। এতে আমার মন আনন্দিত হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, হে আবু হুরায়রা! আল্লাহ তোমার ওপর দয়া করুন, তোমার দ্বিগুণ সওয়াব হয়েছে। প্রথমত, তোমার ইবাদতে গোপনীয়তার কারণে; দ্বিতীয়ত, ইবাদত প্রকাশিত হয়ে পড়ার কারণে।’ (তিরমিজি)।

ফরজ আদায়ে পিছিয়ে পড়া ভুল

সেহরি ও ইফতার রোজার দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেহরির মাধ্যমে রোজার সূচনা হয় এবং ইফতারের মাধ্যমে সমাপ্তি। তাই ইফতার ও সেহরি সুন্নত পদ্ধতিতে করা আবশ্যক। অথচ মানবিক প্রবৃত্তি, ভুল ধারণা ও স্থানীয় প্রচলনের কারণে সমাজের অনেকেই সেহরি ও ইফতারি গ্রহণের ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব দিতে গিয়ে ফরজ আদায়ে পিছিয়ে পড়েন। এমনকি অনেকে ফরজ আদায়ও করেন না। যা ইসলামের দৃষ্টিতে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

লোক দেখানো ইবাদতকারীর আলামাত

রিয়াকারী বা লোক দেখানো ইবাদতকারী ব্যক্তির মাঝে ৪টি বিষয় পরিলক্ষিত হয়। আর তাহলো- লোক চক্ষুর অন্তরালে সৎ কাজে অবহেলা করে কিংবা মনোযোগের সঙ্গে আমল তথা ইবাদত করা হয় না। কিন্তু মানুষের সামনে পূর্ণ উদ্যম ও আগ্রহের সঙ্গে ইবাদত-বন্দেগি করে থাকে। আর যে কাজ করলে মানুষ প্রশংসা করে, সে কাজ বেশি বেশি করার উদ্যম ও আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। এবং যে কাজে তাকে মন্দ বলা হয় তা যত ভালোই হোক না কেন, সে কাজ অতি অল্প করে থাকে।

লোক দেখানো ইবাদতকারীর নাম 

রিয়াকারীর কোনো নেক আমলই কবুল হবে না। আর কেয়ামতের দিন লোক দেখানো ইবাদতকারী তথা এ সব রিয়াকারীদেরকে ৪টি অভিশপ্ত নামে ডাকা হবে। আর তাহলো-

– হে কাফির! অর্থাৎ হে অবিশ্বাসকারী।
– হে ফাজির! তথা হে পাপাচারে নিমজ্জিত ব্যক্তি।
– হে গাফের! তথা হে ধোকাবাজ। এবং
– হে খাছের।

অতঃপর বলা হবে, তোমাদের আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে। তোমাদের প্রতিদানও বিনষ্ট হয়ে গেছে। তোমাদের উপকারে আসতে পারে এমন কোনো নেক কাজ নেই। হে ধোকাবাজ! তোমার নেক আমলের বিনিময় সেই ব্যক্তির কাছ থেকে আদায় কর, যাকে দেখানোর জন্য ইবাদত-বন্দেগি করেছিলে।

একনিষ্ঠতার সঙ্গে করা আমলেই নাজাত

নেক কাজ কম হোক আর বেশি হোক তা আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠভাবে আদায় করা জরুরি। এ কারণেই প্রিয়নবি সা. ঘোষণা করেছেন-তোমার আমলকে খাঁটি কর তথা একনিষ্ঠতার সঙ্গে আমল কর। (একনিষ্ঠতার সঙ্গে করা) অল্প আমলই নাজাতের জন্য যথেষ্ট হবে।’

তাই উল্লেখিত আলামত নিজের মধ্যে পরিলক্ষিত হলে, সঙ্গে সঙ্গে তাওবা করে একনিষ্ঠতার সঙ্গে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদত-বন্দেগিতে নিজেকে নিয়োজিত করাই হবে মুমিন মুসলমানের একমাত্র কাজ।

লোক দেখানোর জন্যই যাকাতের কাপড়

যাকাতের কাপড় বলতে কোনো কাপড় নাই। যারা যাকাতের নিম্নমানের কাপড় গরীব মানুষকে দিচ্ছে তারা আসলে প্রতারণা করছে। সমাজের মানুষকে আত্মনির্ভরশীল ও সাবলম্বী করাই যাকাতের উদ্দেশ্য। কিন্তু বর্তমান সমাজে যাকাতের নামে যে কাপড় দান করা হচ্ছে তা দিয়ে মানুষের কোনো ধরনের উপকার হয় না। যাকাতের নামে কম দামে অধিক পরিমাণ কাপড় গরীব মানুষকে দেয়া মানে হলো নিজেকে প্রচার করা।

যারা লোক দেখানোর জন্য যাকাতের নামে এসব প্রতারণামূলক কাজ করছে তাদের জন্য পরকালে শাস্তির বিধান রয়েছে। যাকাতের নামে যেসব নিম্নমানের কাপড় দেয়া হচ্ছে তা শরিয়ত অনুমোদন করে না। যারা শুধু নাম কামানোর জন্যই কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করেন, তাদের আন্তরিকতার ছিঁটেফোঁটা নেই তা যাকাতে পণ্য ক্রয় ও বণ্টনের প্রক্রিয়া দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায়।

ইবাদত-বন্দেগির ক্ষেত্রে প্রধানতম বিষয়

নিজের আমলের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ুক এবং লোকেরা শুনে বাহবা দিক এ নিয়তে যে ইবাদত-বন্দেগি করবে সে শিরকে নিপতিত হবে।  ইবাদত-বন্দেগি প্রকাশ্যে পালনের পাশাপাশি গোপনে পালনের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে ইবাদত-বন্দেগির ক্ষেত্রে প্রধানতম বিষয় হলো- আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে ইবাদত করা। দ্বিতীয় বিষয় হলো, ইবাদতটি সুন্নত অনুযায়ী করা। তৃতীয়, ইবাদতটি মানুষকে দেখানোর মানসিকতায় না করা। সব ধরনের ইবাদতের ক্ষেত্রে এগুলো প্রযোজ্য। ইবাদত প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্য- এটা মূখ্য নয়।

অপ্রকাশ্যে করা যায় এমন ইবাদত অপ্রকাশ্যে করাই উত্তম

কিছু ইবাদত রয়েছে যেগুলো প্রকাশ্যে করতে হয়। যেমন- নামাজ। নামাজ মসজিদে এসে জামাতের সঙ্গে প্রকাশ্যে আদায় করতে হয়। হজ বায়তুল্লায় যেয়ে প্রকাশ্যে পালন করতে হয়। আর কিছু ইবাদত গোপনে পালন করা যায়। যেমন- জিকির, কোরআন তেলাওয়াত, নফল নামাজ ও দান-সদকা ইত্যাদি।

ইসলামি স্কলারদের অভিমত হলো, যে ইবাদত অপ্রকাশ্যে করা যায়, তা অপ্রকাশ্যে করাই উত্তম। আর যা লুকিয়ে করা যায় না, তা প্রকাশ্যেই করতে হবে। আল্লাহতায়ালার নিকট আমল কবুল হওয়ার জন্য লৌকিকতামুক্ত এবং কোরআন-সু্ন্নাহ নির্দেশিত নিয়মে হওয়া অপরিহার্য।

ডান হাতের দান বাম হাত যেন না জানে

দুস্থ, নিঃস্ব, গরিব, এতিম, মিসকিন, আশ্রয়হীন, পঙ্গু, বস্তিবাসী, অন্ধ, অসহায়দের দুঃখ-কষ্ট মোচনে সাহায্য-সহযোগিতায় দান-খয়রাত ও সেবা-যত্ন করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। দেখুন, আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা যে পর্যন্ত না নিজেদের প্রিয় বস্তু দান-খয়রাত করবে, সে পর্যন্ত কোনো সওয়াব পাবে না।’

আমাদের মহানবী মুহাম্মদের (সা.) কাছে কেউ কিছু চাইলে তার কাছে যা থাকত তা-ই দান করে দিতেন। নিজে অসমর্থ হলে অন্য কারও কাছ থেকে ধারকর্জ করে হলেও দানপ্রার্থীকে দিয়ে দিতেন। শুধু তাই নয়; নিজের অতি প্রয়োজনকে তুচ্ছ মনে করে পরিবার-পরিজনসহ অভুক্ত রেখেও গরিব, এতিম, মিসকিন, অসহায়-অভাবী মানুষকে আহার করাতেন।

অভাব-অভিযোগের তাড়নায় যারা এসেছে তারাও আমাদের মতো রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ। তাদেরও ক্ষুধা রয়েছে, চাহিদা রয়েছে। এ জন্য মানুষের জন্য মানুষের অন্তর কাঁদা উচিত। আল্লাহ বলেছেন_ ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা কোনো দানগ্রহীতাকে কোনোরূপ খোঁটা বা কষ্ট দিয়ে তোমাদের দান-খয়রাত ও সাহায্য-সেবাকে বরবাদ করে দিও না।’

এখানে একটু বলা প্রয়োজন, ‘ডান হাতে দান করলে বাম হাতও যেন না জানে’-এটি পবিত্র ইসলামেরই নির্দেশ। ইসলামে গোপন দানকেই বেশি করে উৎসাহিত করা হয়, কারণ গোপনে দান করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। এছাড়া গোপনে দান করলে , যারা দান গ্রহণ করছে তাদের ছোট হওয়ার সম্ভাবনাও কম; তাদেরও আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচার অধিকার রয়েছে।

দান-খয়রাতের ক্ষেত্রে সমাজের অনেকেই নিজেদের ব্যবহৃত অকেজো-অযোগ্য পুরনো জিনিসপত্র দান-খয়রাত করে নিজেদের দাতা হিসেবে নাম জাহিরের অপচেষ্টা চালায়। এতে সওয়াবপ্রাপ্ত হওয়া দূরের কথা, এতে দান-খয়রাত, সাহায্য-সেবার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করা হয়।  আর যে দান করে সে দাতা আর যে দান করার সময় ফটো তোলে সে বিজ্ঞাপনদাতা।

রিয়া প্রসঙ্গে শরিয়তের বিধান

রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা) প্রসঙ্গে শরিয়তের বিধান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘‘[ হে মুহাম্মদ], আপনি বলে দিন, আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমার নিকট এ মর্মে অহি পাঠানো হয় যে, তোমাদের ইলাহ-ই একক ইলাহ।’’ (কাহাফ: ১১০)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে ‘মারফু’ হাদিসে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘‘আমি অংশীদারদের শিরক (অর্থাৎ অংশিদারিত্ব) থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যে ব্যক্তি কোন কাজ করে ঐ কাজে আমার সাথে অন্য কাউকে শরিক করে, আমি [ঐ] ব্যক্তিকে এবং শিরককে [অংশীদারকে ও অংশিদারিত্বকে] প্রত্যাখ্যান করি।’’ (মুসলিম)

প্রদর্শনেচ্ছা সবচেয়ে মারাত্মক ত্রুটি

নেক আমল প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে মারাত্মক ত্রুটি হচ্ছে উক্ত নেক কাজ করতে গিয়ে আল্লাহ ছাড়ও অন্যকে খুশী করার নিয়ত।

শিরক মিশ্রিত নেক আমল প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনিবার্য কারণ হচ্ছে, আল্লাহর কারো মুখাপেক্ষী না হওয়া। [এ জন্য গাইরুল্লাহ মিশ্রিত কোনো আমল তাঁর প্রয়োজন নেই।]

আল্লাহ তাআলার সাথে যাদেরকে শরিক করা হয়, তাদের সকলের চেয়ে আল্লাহ বহুগুণে উত্তম। রাসূল সা. এর অন্তরে রিয়ার ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের উপর ভয় ও আশংকা।

নামাজ আদায়ে রিয়া

একজন মানুষ মূলত নামাজ আদায় করবে আল্লাহরই জন্যে। তবে নামাজকে সুন্দরভাবে আদায় করবে শুধু এজন্য যে, সে মনে করে কোন মানুষ তার নামাজ দেখছে। এটাই রিয়া। মুমিনের সকল আমল, ইবাদত-বন্দেহি আল্লাহতায়ালার জন্য নিবেদিত। সেখানে অন্যকোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারবে না।

রিয়াকারী কাজের চেয়ে প্রচারে ব্যস্ত

কোনো ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও একনিষ্ঠতা বাদে মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে করা হলো- প্রদর্শনেচ্ছা। ব্যক্তি যখন প্রদর্শনেচ্ছার মতো রোগে আক্রান্ত হয়, তখন কোনো কাজের চেয়ে কাজের প্রচার বিজ্ঞাপন নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং এটাকেই সবচাইতে বেশি অগ্রাধিকার দেয়। প্রদর্শনেচ্ছায় আক্রান্ত ব্যক্তি সকল কাজে প্রচারকে অগ্রাধিকার দেয় না বরং সে অন্যের ভালো-মন্দের অনুমানকারীতে পরিণত হয়। ইসলাম অনুমানভিত্তিক কথা বলাকে সমর্থন দেয়নি।

লোক দেখানোর জন্য কোরআন পাঠ

ব্যক্তির উদ্দেশ্য যদি নিজের খ্যাতির, প্রচার ও প্রসারের জন্য হয়; তবে সেটা ব্যক্তির জন্য ক্ষতির কারণ হবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা আল্লাহর নিকট জুব্বুল হুজন হতে আশ্রয় প্রার্থনা কর। সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! জুব্বুল হুজন কী?

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তা হলো জাহান্নামের মধ্যকার একটি উপত্যকা, যা থেকে স্বয়ং জাহান্নামও প্রতিদিন শতবার আশ্রয় প্রার্থনা করে। প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! তাতে কে প্রবেশ করবে? হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, যেসব কোরআন পাঠক লোকদেখানোর জন্য আমল করে। -ইবনে মাজাহ : ২৫৬

বিশেষ নামে পরিচিত হতে চেয়ে জাহান্নামী

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হিসাব নিকাশের জন্য যে ব্যক্তিদের সর্বপ্রথম ডাকা হবে তারা হলেন- কোরআনের হাফেজ, আল্লাহর পথে শহীদ ও ধনী ব্যক্তি। এই তিনজনই সর্বপ্রথম জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এটাই প্রমাণিত হবে যে, তারা দুনিয়াতে নিজেদেরকে বিশেষ নামে পরিচিত করতে বা বিশেষ নামে সবাই ডাকুক এজন্য কোরআনের হাফেজ, শহীদ ও সম্পদওয়ালা হয়েছিল।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম শ্রেষ্ঠ প্রদর্শনেচ্ছাস্থল

প্রদর্শনেচ্ছা যেন বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পৃথিবীব্যাপী শ্রেষ্ঠ প্রদর্শনেচ্ছাস্থলে পরিণত হয়েছে। যার কারণে ব্যক্তি পরকালীন ক্ষতির পাশাপাশি দুনিয়াতেও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

রিয়াকারীরা সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ ঘটান

ব্যক্তির আত্মমর্যাদা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অসন্তোষজনক বা ব্যক্তি ইমেজ সঙ্কটে পতিত হচ্ছে। প্রদর্শনেচ্ছার কারণে ব্যক্তি নিজের অজান্তেই মিথ্যার লালন করেন। নিজের প্রয়োজনে সত্য-মিথ্যার মিশ্রণে ধোঁয়াশায় আশ্রয় গ্রহণ করেন।

রিয়াকারীরা অস্বাভাবিক আচরণ করে

প্রচার ও প্রসার ব্যক্তিকে অস্বাভাবিক আচরণে অভ্যস্ত করে। অধিকাংশ সময় কৃত্রিম আচরণ করে। প্রদর্শনেচ্ছা অধিক ফলপ্রাপ্তিতে উৎসাহ দেয় এবং নিজের কল্যাণই মুখ্য বিষয়ে পরিণত করে। ব্যক্তি আল্লাহর নির্ধারিত সকল ইবাদতের মাধ্যমে অর্জিত বিশেষ যোগ্যতা ও বরকত হতে বঞ্চিত হয়। কবিরা গোনাহের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে।

প্রদর্শনেচ্ছার প্রভাব নেতিবাচক

প্রদর্শনেচ্ছা যখন কোনো সংগঠিত দলের মাঝে পরিলক্ষিত হয় তখন সে দল মূল লক্ষ্য হতে ধীরে ধীরে সরে আসে। প্রদর্শনেচ্ছা যদি কোনো দলের মাঝে দেখা দেয় তবে সেটা ত্বরিত সমাধান করা বাঞ্ছনীয়।  প্রদর্শনেচ্ছার প্রভাব নেতিবাচক। দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে মৌলিক ইবাদতের পদ্ধতি, ইবাদতের মাধ্যমে অর্জিত রূহানিয়াত ও কল্যাণবিমুখ প্রতিযোগিতা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

জেহাদে রিয়া

ইসলাম যেখানে প্রদর্শনেচ্ছাকে জঘন্য কাজ বলে সাব্যস্ত করছে, সেখানে ইসলামি কোনো দলের মধ্যে প্রদর্শনেচ্ছা প্রবেশ গ্রহণীয় হতে পারে না। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) তার সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমরকে জেহাদ বিষয়ে অবহিত করতে গিয়ে প্রদর্শনেচ্ছাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যদি তুমি প্রদর্শনেচ্ছা ও সম্পদ লাভের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করো তাহলে কেয়ামতের দিন আল্লাহ তোমাকে রিয়াকারী ও সম্পদ লোভী করে উপস্থিত করবেন।’ -সুনানে আবু দাউদ : ২৫১৯

প্রদর্শনেচ্ছার ভয়াল থাবায় তৈরি হাজারও বিভক্তি

প্রদর্শনেচ্ছা মুসলিম উম্মাহকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। উম্মাহর হাজারও বিভক্তি হওয়ার পেছনের কারণ ব্যক্তির প্রচার ও প্রসার হতে সৃষ্ট মতভেদ। প্রদর্শনেচ্ছার ভয়াল থাবায় তৈরি হয়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হাজার দল ও উপদল। প্রদর্শনেচ্ছামুক্ত উম্মাহ গঠনের জন্য প্রয়োজন সাদামাটা জীবন যাপন ও ইবাদতে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি।

রিয়াকারীর দোষ ত্রুটি প্রকাশ করা হবে

ইসলাম যেটাকে মস্ত-বড় অপরাধ বলছে, সেখানে কোনো মানুষ ওই অপরাধকে সহজে গ্রহণ করতে পারে না। বিশেষ করে একজন মুমিনের জন্য কখনও তা শোভনীয় নয়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে আমল করবে, আল্লাহতায়ালা তাকে তাই দেখাবে অর্থাৎ প্রদর্শনীমূলক আমল করলে তা প্রচার করে দেখানো হবে। সুনাম সুখ্যাতি অন্বেষণের উদ্দেশ্যে যে লোক আমল করবে আল্লাহ তার আমল (দোষ ত্রুটিগুলো) প্রচার করে দেবেন।’ -ইবনে মাজাহ : ৪২০৬

রিয়া থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা

রিয়া থেকে আত্মরক্ষার জন্য মুমিনের চেষ্টা করতে হবে যথাসম্ভব সকল নফল ইবাদত গোপনে করা। তবে যে ইবাদত প্রকাশ্যে করাই সুন্নাত-সম্মত তা প্রকাশ্যেই করতে হবে। রিয়ার ভয়ে কোনো নিয়মিত ইবাদত বা প্রকাশ্যে করণীয় ইবাদত বাদ দেওয়া যাবে না। রিয়ার অনুভূতি মন থেকে দূর করতে চেষ্টা করতে হবে। কখনো এসে গেলে বারংবার তাওবা করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে তাওফীক প্রার্থনা করতে হবে।

রিয়ার অন্যতম কারণ প্রশংসার আশা

রিয়ার অন্যতম কারণ সমাজের মানুষদের কাছে সম্মান, মর্যাদা বা প্রশংসার আশা। অথচ, দুনিয়ায় কোনো মানুষই কিছু দিতে পারে না। সকলেই অক্ষম। যে মানুষকে দেখানো জন্য, শোনানোর জন্য, যার প্রশংসা বা পুরস্কার লাভের জন্য আমি লালায়িত হচ্ছি সেও অসহায় মানুষ।

আমার কর্ম দেখে সে প্রশংসা নাও করতে পারে। হয়ত তার প্রশংসা শোনার আগেই আমার মৃত্যু হবে। অথবা প্রশংসা করার আগেই তার মৃত্যু হবে। আর সে প্রশংসা বা সম্মান করলেও আমার কিছুই লাভ হবে না। আমার মালিক ও পালনকর্তার পুরস্কারই আমার জন্য যথেষ্ট। তিনি অল্পতেই খুশি হন ও বেশি পুরস্কার দেন। তিনি দিলে কেউ ঠেকাতে পারে না। আর তিনি না দিলে কেউ দিতে পারে না।

কা’ব ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়েকে একটি মেষপালের মধ্যে ছেড়ে দিলে নেকড়েদুটি মেষপালের যে ক্ষতি করবে, সম্পদ ও সম্মানের লোভ মানুষের দীনের তার চেয়েও বেশি ক্ষতি করে।” [তিরমিযী, কিতাবুয যুহুদ; ৪/৫০৮, নং ২৩৭৬]

ইবাদত ধ্বংসে শয়তানের ফাঁদ রিয়া

মুমিনের ইবাদত ধ্বংস করার জন্য শয়তানের অন্যতম ফাঁদ এই ‘রিয়া’। বান্দা যদি ইবাদতের ভক্তি ও বিনয় প্রকাশ একমাত্র আল্লাহর জন্যই মনে করে, কেবল মানুষের কিছু প্রশংসা আশা করে তবে তা রিয়া বলে গণ্য হবে। আর যদি বান্দা কেবল মানুষের দেখানোর জন্যই ইবাদতটি করে তবে তা শিরক আকবার বলে গণ্য হবে।

উভয়ের পার্থক্য এই যে, প্রথম পর্যায়ে বান্দা লোক না দেখলেও ইবাদতটি পালন করবে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় পর্যায়ে বান্দা লোক না দেখলে ইবাদতটি পালনই করবে না। আল্লাহ বলেন, ‘‘যারা শুধু দুনিয়ার জীবন এবং এর চাকচিক্য কামনা করে, আমি তাদের সব কাজের প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে থাকি।’’ (হুদ : ১৫-১৬)

রিয়াকারী কাজের চাইতে বিজ্ঞাপনের চিন্তা করে বেশি

প্রদর্শনেচ্ছা প্রবণতার একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট হচ্ছে এই যে, মানুষ কাজের চাইতে কাজের বিজ্ঞাপনের চিন্তা করে বেশি। দুনিয়ায় যে কাজের ঢাকঢোল পিটানো হয় এবং যেটি মানুষের প্রশংসা অর্জন করে সেটিকেই সে কাজ মনে করে। যে নীরব কাজের খবর খোদা ছাড়া আর কেউ রাখে না সেটি তার কাছে কোনো কাজ বলে মনে হয় না। এভাবে মানুষের কাজের পরিমন্ডল কেবল প্রচারযোগ্য কাজ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে এবং প্রচারের উদ্দেশ্য সাধিত হবার পর ঐ কাজগুলোর প্রতি আর কোনো প্রকার আকর্ষণ থাকে না।

যতই আন্তরিকতার সাথে বাস্তব কার্যারম্ভ করা হোক না কেন এ রোগে আক্রান্ত হবার সাথে সাথেই যক্ষ্মারোগে জীবনীশক্তি ক্ষয় হওয়ার ন্যায় মানুষের আন্তরিকতা অন্তর্হিত হতে থাকে। অতঃপর লোকচক্ষুর বাইরেও সৎভাবে অবস্থান করা এবং নিজের কর্তব্য মনে করে কোন কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। সে প্রত্যেক বস্তুকে লোক দেখানো মর্যাদা ও মৌখিক প্রশংসার মূল হিসেবে বিচার করে। প্রতিটি কাজে সে দেখে মানুষ কোনটা পছন্দ করে। ঈমানদারীর সাথে তার বিবেক কোনো কাজে সায় দিলেও যদি সে দেখে যে, এ কাজটি দুনিয়ায় তার জনপ্রিয়তা নষ্ট করে দেবে তাহলে তার পক্ষে এমন কোনো কাজ করার কথা চিন্তা করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে।

কোরবানীতে রিয়া

কুরবানীকে প্রদর্শনেচ্ছার জায়গায় নিয়ে প্রতিনিয়ত অসুস্থ মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন অনেকে। কে কত বড় গরু কিনলো! কার গরুর দাম কত বেশি? আল্লাহ মানুষের বাহ্যিক দিক দেখেন না, আল্লাহ দেখেন মানুষের অন্তর।

ফেসবুকে গরুর ছবি দিলে কী প্রমাণ হয়! কুরবানির পশুর সাথে সেলফি কেন! মাংস বিলানোর ছবিই বা কেন! রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা আমলটিকে কলুষিত করে অপবিত্র করে ফেলছে।

রিয়ার কিছু রূপ

১. কারো ঈমানের মাঝেই প্রদর্শনেচ্ছা থাকা ভন্ডামি। কারণ এই ব্যক্তিরা মনের ভেতর ঈমানী চেতনাকে লালন না করলেও মানুষকে দেখানোর জন্য মুখে ঈমানের কথা বলে।

২. বাহ্যিক প্রকাশভঙ্গির মাধ্যমে যে প্রদর্শনগুলো করা হয়। ইবাদাতের ক্ষেত্রে এমনটা প্রায়শই দেখা যায়। একজন মানুষ তার ঠোটদুটো এমনভাবে শুকিয়ে রাখে যাতে আশপাশের লোকজন ধারণা করে নেয় যে, লোকটা নিয়মিত রোজা রাখার কারণেই তার কন্ঠ ও ঠোট শুকিয়ে গেছে।

৩. কথার মাধ্যমে প্রদর্শন করা। রাসুল সা. বলেছেন, “একজন বান্দা যদি নিজের দিকে সকলের মনোযোগ আকৃষ্ট করতে চান, তাহলে আল্লাহ তার আমলগুলোকেও সেই মুখী করে দেন।” (সহিহ আল বুখারী ও মুসলিম)

অপরকে আকর্ষণ করতে মুখরোচক কথা বলার মধ্যে অনেক কিছুই আসতে পারে যেমন, জ্ঞানীবচন, নেক আমলের কথা বলা অথবা কথায় কথায় কুরআন ও হাদিসের রেফারেন্স দেয়া ইত্যাদি।

৪. কাজের মাধ্যমে প্রদর্শনেচ্ছা। কেউ যদি অপরকে দেখানোর জন্য লম্বা সময় নামাজে কিয়াম করে কিংবা রুকু ও সিজদায় দীর্ঘ সময় ব্যয় করে। লোকজনের সামনে যদি কারো সুন্নাত বা নফল নামাজ পড়ার প্রবণতা বেড়ে যায়।

৫. লোকজনকে দেখানোর জন্য সম্পর্ক তৈরি। অনেকেই আছেন, সমাজের খ্যাতনামা লোক, বড়ো বড়ো শায়খদের সাথে নিজের সম্পর্ককে ফলাও করে প্রচার করে যাতে মানুষ তার নেটওয়ার্ক সম্বন্ধে ধারণা পায়। তার জীবন যাপন ও কর্মকান্ড সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করে।

যারা এভাবে প্রদর্শন করে তারা শুধু আল্লাহর অসন্তোষের কারণই হয় না, বরং তার মধ্যে আরো বেশ কিছু মানবিক সংকটও দেখা যায়। যেমন: মানুষের ইতিবাচক মতামত পাওয়ার একটা লোভ তার মধ্যে স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়। অপরের ভিন্ন ও নেতিবাচক মতামত গ্রহণের মানসিকতা কমে যায়। অপরকে ছোট করে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়।

রিয়া নফসের গোলামি

রিয়া বা আত্মপ্রচার তথা যশ ও জৌলুশ কামনা নফসের গোলামি করার শামিল। রিয়া বা খ্যাতির বাসনা দুনিয়ার আসক্তি বাড়িয়ে দেয়, আখিরাত থেকে বিমুখ করে। ফলে প্রতিক্ষণে ও সব সময় আখিরাত চিন্তার পরিবর্তে দুনিয়ার চিন্তা মাথায় কিলবিল করতে থাকে। সদা–সর্বদা দুনিয়া নিয়েই বিভোর থাকে, তার অন্তরে আল্লাহর জন্য প্রেম সৃষ্টি হয় না।

বান্দার রিয়ামুক্ত খাঁটি ইবাদাতেই কল্যাণ

হজরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার তিনি রাসুল (সা.)-এর মসজিদের দিকে যাচ্ছিলেন, এমন সময় তিনি মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজার কাছে ক্রন্দনরত দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কাঁদছেন কেন?

তিনি বললেন, কাঁদছি এ কারণে যে, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘সামান্যতম রিয়াও শিরক। আর যে কেউ আল্লাহর কোনো ওলির সঙ্গে শত্রুতা করল, সে যেন আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ করতে অগ্রসর হলো। আল্লাহ তায়ালা সৎকর্মশীল, ধর্মভীরু লোকচক্ষু হতে আত্মগোপনকারীদের ভালোবাসেন।

তাঁরা এমন যে, লোকচক্ষুর আড়ালে থাকলে কেউ তাঁদের অনুসন্ধান করে না, আবার মানুষের সামনে এলেও কেউ তাঁদের মজলিসে ডাকে না এবং কাছে বসায় না। তাঁদের অন্তরগুলো হেদায়েতের আলোকবর্তিকা। অথচ তাঁরা অন্ধকার জীর্ণ কুটিরে বসবাস করে।’ (ইবনে মাজা-বায়হাকী)

পার্থিব উদ্দেশ্যে ভালো কাজও রিয়া

হজরত আলী (রা.)-এর একটা উক্তি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা ক্বারীদের বলবেন, তোমাদের জন্য কি মানুষ পণ্যদ্রব্যের দাম কম করত না, তোমাদের কি আগে সালাম দিত না, তোমাদের অভাব-অনটন কি দূর করত না? অতএব তোমাদের জন্যে আজ কোনো পুরস্কার নেই। তোমরা তোমাদের পুরস্কার পৃথিবীতেই আদায় করে নিয়েছ।’ বস্তুত: পার্থিব কোনো উদ্দেশ্যে কোনো ভালো কাজ করা রিয়ার পর্যায়ভুক্ত।

রিয়ার আশংকায় হাদিয়া ফেরত

ইমাম গাজজালী (র.) হজরত সুফিয়ানের একটা ঘটনা উল্লেখ করেছেন, একবার এক ব্যক্তি তাঁর কাছে একটা থলে নিয়ে এসে বলল, আমার বাবার সম্পর্কে আপনার অন্তরে কোনো খটকা আছে কি? হজরত সুফিয়ান বললেন, না। তিনি তো খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তখন লোকটি বলল, এই থলে ভর্তি অর্থ, আমার বাবার, যা আমি মিরাস সূত্রে লাভ করেছি। এগুলো আপনি গ্রহণ করুন। তিনি সেটা গ্রহণ করলেন।

কিন্তু লোকটা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজ পুত্র মোবারককে বললেন, তাড়াতাড়ি তুমি লোকটিকে ডেকে আনো। লোকটি ফিরে আসার পর তিনি তাকে থলেটা তাকে ফিরিয়ে দিলেন। পুত্র মোবারক পরিবারের প্রয়োজনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, আমাদের প্রতি কি আপনার রহম হয় না? আপনি অর্থগুলো ফিরিয়ে দিলেন?

হজরত সুফিয়ান নিজ পুত্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমরা মজা করে খাবে, আর আমি হিসাব দেব, এটা হয় না।’ আসলে ওই লোকটার বাবার সঙ্গে হজরত সুফিয়ানের সম্পর্ক ছিল আল্লাহর উদ্দেশ্যে। তাই তাঁর ভয় হচ্ছিল, অর্থগ্রহণ করলে তার সে সম্পর্কটা রিয়াতে পরিণত হয়ে যাবে। তাই তিনি হাদিয়া ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

রিয়া থেকে আত্মরক্ষার তিনটি উপায়

আধ্যাত্মিক সাধকরা রিয়া থেকে আত্মরক্ষার জন্য বিশেষভাবে তিনটি উপায় নির্দেশ করে থাকেন।

ক. বেশি বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করা। যেহেতু যশ ও সুখ্যাতির প্রতি মোহই রিয়ার মূল কারণ। যা মৃত্যুর মাধ্যমে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাবে। তাই মৃত্যুর কথা বেশি স্মরণ করলে, অন্তরের সে মোহ কেটে গিয়ে, মানব মন একমাত্র আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট হবে। তাই রাসুল (সা.) এক হাদিসে বলেছেন, ‘তোমরা বেশি বেশি করে যাবতীয় স্বাদ-আহ্লাদ বিনষ্টকারী মৃত্যুকে স্মরণ করো।’

(খ) রিয়া থেকে বাঁচবার দ্বিতীয় যে উপায়টি সাধকরা বলে থাকেন, তা হলো, এমন কোনো বৈধ কাজ করা যা দ্বারা মানুষের ভক্তি-শ্রদ্ধা উঠে যায়। ইমাম গাজজালী (র.) একটা ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন, একবার এক দরবেশের কাছে কোনো এক বাদশা যাওয়ার ইচ্ছা করলেন। যখন দরবেশ শুনলেন, বাদশা তাঁর খানকার কাছাকাছি এসে গেছেন, তখন তিনি কিছু খাবার নিয়ে গোগ্রাসে খেতে শুরু করলেন। বাদশা দরবেশের এ অবস্থা দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ফিরে গেলেন। তখন দরবেশ বললেন, মহান আল্লাহর হাজার শোকর, যিনি বাদশাকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন এবং রিয়ামুক্ত করেছেন আমাকে।

(গ) রিয়া থেকে বাঁচবার তৃতীয় উপায় হলো নির্জনবাস। অর্থাৎ লোকালয় থেকে সরে গিয়ে ইবাদাত-বন্দেগি করা। যাতে সাধারণ মানুষের কাছে ইবাদাতের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে না পড়ে।

রিয়া চেনার কয়েকটি সহজ উপায়

১) নামায শেষ করে উঠে যাওয়ার সময় জানতে পারলাম মেহমান চলে এসেছে। এজন্য মেহমান ঘরে প্রবেশ করা পর্যন্ত জায়নামাজে বসে থাকলাম। সম্পুর্ন ইচ্ছাকৃত না হলেও অবচেতন মন চাইছে নামায যে পড়তেছি মেহমান দেখুক! এটিই রিয়া।

২) কেউ জিজ্ঞেস করলো-আপনি কি করছেন? উত্তরে বললাম-আমি নামায পড়ে উঠে নাস্তা করতেছি বা নামায পড়ে উঠে এখন রান্না করতেছি।এখানে শুধু নাস্তা বা রান্না করার কথা বললেই হতো, সাথে- নামায পড়ে উঠে” কথাটি জুড়ে দিয়ে অতি সুক্ষভাবে নামাযকে প্রচারে নিয়ে আসা হল। এটিই রিয়া।

৩) ফজরে যে নামায পড়তে উঠলাম কিন্তু কেউ জানলো না, তাই সেটা মানুষকে জানানোর জন্য দিলাম ফেসবুকে একটা পোস্ট, লিখলাম : “সবাই নামায পড়তে উঠুন/ঐ সময়ই ফজর নামাজের ফযীলত সম্পর্কিত/শাস্তি নিয়ে পোস্ট করলাম।” আমি জানি আমার এই পোস্টে কারো ঘুম ভাংগবে না, তাও দিলাম। মোদ্দাকথা নামাযের ব্যাপারটা সবাইকে জানাতেই হবে। এটিই রিয়া।

৪) নফল রোজা রেখে দুপুরে বন্ধুর সাথে চ্যাট করছি, হঠাৎ তাকে জিজ্ঞেস করেছি, ভাত খেয়েছিস কিনা? অথচ আজীবন তার ভাতের খবর নেয়নি, সে হ্যাঁ/না উত্তরের সাথে যে “তুই খেয়েছিস?”এটা জিজ্ঞেস করবে সেটার গ্যারান্টি সূর্য উঠার মতই, সে সুযোগে না দোস্ত রোজা রেখেছি বলে রোজার প্রচার করে দিলাম, এটিই রিয়া।

৫) কুরবানির গরু কিনলাম, অফলাইনের আশেপাশের সবাই দেখলেও অনলাইন বন্ধুদের সামনে তো আর শো আপ করা হলো না।তাই প্রাইভেসি পাবলিক করে দিয়ে দিলাম পোস্ট, আলহামদুলিল্লাহ্ Done এইটি রিয়া।

৬) বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার সময় মজার ছলেই টেকনিকে বলে দিলাম, তুই বেটা কিপটা, কিছুই দান করিস না। প্রতিউত্তরে, “তুই কি দান করে উল্টিয়ে ফেলছিস? এই প্রশ্নটা যে করবে তা জানুয়ারির পর ফেব্রুয়ারি আসার মতই নিশ্চিত আমি, সাথে সাথেই দিয়ে দিলাম আমার দানের লিস্ট, সম্পূর্ণ ডিটেল সহকারে। এইটি রিয়া।

প্রদর্শনেচ্ছা থেকে সাবধান থাকুন

আত্ম প্রচার আজ আমাদের ভয়াবহ মানুষিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে আজ রুহানিয়াত আর এখলাস বিদায় নিয়ে সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে প্রদর্শনেচ্ছা আর আত্নপূজা। ইবাদত আল্লাহর জন্য না করে লোক দেখানো ইবাদত করা মানেই রিয়া। এসব ইবাদত আদৌ কবুল হয় না। ইবাদত রিয়ামুক্ত হতে হবে। প্রদর্শনেচ্ছা থেকে সাবধান থাকতে হবে!

“কোনও ব্যক্তি যদি মানুষের সামনে কথা বলতে গিয়ে দেখে যে মানুষকে শোনাতে খুব ভালো লাগছে, তবে যেন সে চুপ করে। আর যদি দেখে মানুষের সামনে চুপ করে থাকতে খুব ভালো লাগছে, তাহলে যেন বলা আরম্ভ করে।” [ইমাম আয-যাহাবী, সিয়ার আ’লাম আন-নুবালা]

রিয়ামুক্ত থাকতে সচেতন সাধনা করুন

যারা বৃহত্তর সমাজক্ষেত্রে প্রবেশ করে এবং সংশোধন, জনসেবা ও সমাজ গঠনমূলক কাজ করে তারা হরহামেশা প্রদর্শনেচ্ছার মুখোমুখী দাড়িয়ে থাকে। এ অবস্থায় খ্যাতির সাথে খ্যাতির মোহ না থাকা, কাজের প্রদর্শনী সত্ত্বেও প্রদর্শনেচ্ছা না থাকা, জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও সেটি লক্ষ্যে পরিণত না হওয়া, মানুষের প্রশংসাবাণী পাওয়া সত্ত্বেও তা অর্জনের চিন্তা বা আকাঙ্খা না করার জন্যে কঠোর পরিশ্রম, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় ধরণের প্রচেষ্টা ও সাধনা প্রয়োজন। সামান্যতম গাফলতিও এ ব্যাপারে প্রদর্শনেচ্ছার রোগ-জীবাণুর অনুপ্রবেশের পথ করতে পারে।

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.