বিশ্বায়ন: আমাদের ভাষা, আমাদের সংস্কৃতি

আনিসুর রহমান এরশাদ : বিশ্বায়ন এবং আকাশ সংস্কৃতির দাপটে পৃথিবীর ছোট বড়ো অনেক ভাষা ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন। আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। বিশ্বায়নের যুগে পৃথিবীর কয়টি দেশ তাদের নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারবে সে প্রশ্ন আজ বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্বায়নের আদর্শগত ক্রিয়াকলাপ বিশ্বের সংস্কৃতির বলয়ে এমন এক অসহায়ত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে চায়, যাতে প্রত্যেকেরই মনে হবে, বিশ্বায়নের বিকল্প বুঝি সত্যিই কিছু নাই।

বিশ্বায়নের আগ্রাসনের সামনে বড় বড় জাতি ও দেশগুলিও অসহায়ভাবে স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্বায়নের সার্বজনীনতা কিন্তু শুধুমাত্র সার্বিক বাজার গড়ে তোলার ভেতরেই সীমাবদ্ধ। সেই বাজার পৃথিবীর সমস্ত বস্তুকে বদলিয়ে দিতে পারে। সমস্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পণ্যে পরিণত করতে পারে এবং সেই পণ্যকে ক্ষুদ্র স্থানীয় ও বৃহৎ বিশ্ববাজারে বিক্রি করে দিতে পারে।

জাতীয় ও আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং বিশ্বায়নের সংস্কৃতির মধ্যে কিছু কিছু মৌলিক বৈপরীত্য আছে। বিশ্বায়ন সাংস্কৃতিক উপাদানগুলিকে এক ছাঁচে ঢেলে নিতে চায়। যদিও প্রাচীন সাংস্কৃতিক শৈলীগুলির মূল ধর্মই ছিল বহুধা বিভক্ত বৈচিত্রে সমৃদ্ধ সুসংহত আঞ্চলিক ঐতিহ্যের প্রতীক। আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর বিশ্বায়ন যে ধরনের চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাঁচতে সুচিন্তিত সুপরিকল্পিত সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগে গ্রহণ করা প্রয়াজন। সর্বস্তরে সচেতনতা, উপযুক্ত কর্মপ্রয়াস জোরদারের কোনো বিকল্প নেই।

বিশ্বায়ন সংক্রান্ত ধারণা

ইংরেজি Globalization’ এর বাংলা পরিভাষা বিশ্বায়ন। অর্থনীতি ও ব্যবসা সংক্রান্ত স্কুলের তাত্ত্বিকদের মতে, Globalization can be defined as the activities of multinational enterprises engaged in foreign direct investment and the development of business networks to create value across national borders.2

 Anthony Giddings এর মতে, Globalization is political, technical and cultural, as well as economic, Globalization is new and revolutionary and is mainly due to the ‘massive increase’ in financial foreign exchange transactions. This has been facilitated by dynamic improvement n communications technology especially electronic interchange facilitated by personal computers.3

 Alan Rugman বলেছেন,The word ‘Globalization is much abused and presents a problem for scholars aeross the social sciences who define it from the viewpoint of their own discipline.4

J.A. Camelleri এর মতে, Nevertheless, the process of globalization is a striking barometer of the states increasingly restricted freedom of action in management of economic activity. The growth international institutions points to a significant, it little advertises delegation of state authority.5

আবেদা সুলতানার মতে, বিশ্বায়ন হল এমন একটা প্রক্রিয়া যেখানে উৎপাদন পুঁজির গতিশীলতা, প্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবাধ বাণিজ্য ও মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সকল দেশের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হয়।

ড. মো. আজিজুর রহমানের মতে, বিশ্বায়ন হলো সমগ্র বিশ্বে অবাধ বাণিজ্য সংস্থা গড়ে তোলা। এককথায় সমগ্র বিশ্বব্যাপী একটি বাজার গড়ে তোলা। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মনুষ্যসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক সকল প্রতিবন্ধকতার অবসান ঘটানো। ব্যাপক অর্থে সমগ্র বিশ্ববাসীকে নিয়ে একটি বিশ্বসমাজ গড়ে তোলা।

ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, বিশ্বায়ন হচ্ছে পুঁজিবাদেরই নতুন, আচ্ছাদন, পুঁজিবাদ যা বিশ্বে বাজার খোঁজে এবং পুঁজি লগ্নি করে। এতকাল তারা কাজটা করতো সাম্রাজ্যবাদী কায়দায়। যেখানে জবরদস্তি থাকতো। জবরদস্তি এখনও আছে। কিন্তু এখন তাকে বিশ্বায়ন নাম দিয়ে বেশ ভদ্রগোছের চেহারা দেয়া হয়েছে। যেন সবাই এক বিশ্বের অংশ; ছোট বড় নেই। এখন আর ঔপনিবেশ স্থাপনের ঝুট ঝামেলা নেই। তথ্য প্রযুক্তি রয়েছে। আছে বিজ্ঞাপন। ব্যবস্থা রয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা।

এম. কনফুসিয়াসের মতে, বিশ্বায়ন হচ্ছে ট্যান্সন্যাশনালিজম। এ পলিসিকে তৃতীয় বিশ্বের দেশের ‘অধীনতা নীতি’ বলা যায় না।

ড. মাহাথির মোহাম্মদের মতে, বিশ্বায়ন হচ্ছে এমন একটি শব্দ যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, বিশ্বের সকল দেশকে একটি অভিন্ন সত্তার আওতায় নিয়ে আসা। দরিদ্র দেশগুলোর বাজার দখল ও তাদের অর্থনীতি ধ্বংস করাই এর লক্ষ।১০

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বিশ্বায়নের কারনে বিশ্বব্যাপী ভারসাম্যহীনতা ও অসাম্য বেড়েছে। ধনী দেশগুলোর প্রভাব বেশি বলে এমনটি হয়েছে।

প্রফেসর ড. মোজাফফর আহমদ বলেন, বিশ্বায়নের ফলে উন্নত বিশ্ব তাদের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করেছে। বাণিজ্যের বিশ্বায়নের বিষয়টি ইতোমধ্যে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মুখোমুখি হয়েছে। আধুনিক বাণিজ্য তত্ত্বের আলোকে অর্থনীতিবিদ স্যামুয়েলসন এবং লার্নার পরিপূর্ণ উপকরণ দান সমতার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু বিশ্বায়ন বাস্তবে আন্তর্জাতিকভাবে বাণিজ্যরত দেশসমূহের মধ্যে উপকরণদাম সমান করতে ব্যর্থ হয়েছে।

নোবেল বিজয়ী অমর্ত্যসেন বলেছেন, বিশ্বায়ন এখনো বিতর্কিত বিষয়। আজকের বিশ্ব আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বিপুল বিত্তের অধিকারী হলেও একই সাথে সর্বগ্রাসী বঞ্চনা এবং নিদারুণ বৈষম্যও চলেছে।১১

 

বিশ্বায়নের ফলশ্রুতিতে উন্নয়নশীর দেশে শিল্প কারখানার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানের নয়াব্যবস্থা হওয়া তো দূরের কথা তাদের যে কর্মসংস্থান আছে তাও বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।১২ 

নতুন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বায়নের নাম করে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) প্রভাব খাটিয়ে বর্তমানে সারা বিশ্বে শাসন করছে।১৩

আসলে বিশ্বায়ন কোনো শর্ত (Conditions) বা ঘটনা (Phenomenon) নয়। এ এমন এক প্রক্রিয়া (Process) যা বহুদিন ধরে ঘটে চলছে।১৪

বিশ্বায়ন (Globalization) তো প্রকৃতপক্ষে নবোদিত বিপজ্জনক কোনো বিষয় নয়। হাজার হাজার বছর আগে থেকে বিশ্বের এক দেশ থেকে আরেক দেশে অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অভিযান চলে আসছে নানাভাবে-পর্যটন, বিদেশে গমন, আমদানি-রফতানি ব্যবসা, সংস্কৃতির বিকাশ ও বিস্তার; বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসহ অন্যান্য উন্নত শিক্ষায় বিনিময় ব্যবস্থা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে।১৫

আমাদের ভাষার পরিচয়

আমাদের ভাষা বাংলা। ভাষা বলতে বোঝায়-কতকগুলো ধ্বনিমূল, ধ্বনির সমন্বয়ে গঠিত শব্দ, শব্দের সমন্বয়ে গঠিত বাক্য এবং বাক্যের মধ্যে অর্থের প্রবাহ। শুধু ব্যক্তি নিয়ে যেমন সমাজ হয় না, তেমনি শুধু ধ্বনিমূল নিয়েও ভাষা হয় না। বাংলা ভাষার-ঐতিহাসিক মাত্রা, আঞ্চলিক মাত্রা, সামাজিক মাত্রা, প্রকৌশল ও রীতিগত মাত্রা আছে।১৬

ভাষা হচ্ছে মানুষের বাক সংকেতের সংগঠন। এ সংগঠন জটিল উৎপাদনক্রম ও স্বেচ্ছাধীন এবং এর দ্বারা একই সমাজের মধ্যে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সুসম্পন্ন হয়।১৭ ভাষা হচ্ছে মানুষের জৈবিক সামর্থ্যরে ভিত্তিভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত বলে পৃথিবীর সকল ভাষার মধ্যে সার্বজনীনতা (Universal) বিদ্যমান অপরদিকে সাংস্কৃতিক সংশ্রয়ের প্রভাবে নানা ভাষার মধ্যে বৈচিত্র্য নিরীক্ষণ করা যায়। ভাষার দুটো পর্যায়-একটি চ্ছে তার রূপের পর্যায়, অপরটি বিষয়ের পর্যায়। বাঙলা ভাষার দুটো বিশুদ্ধ রূপ আছে বলে বিবেচনা করা হয়: একটির নাম সাধু ভাষা। অপরটির নাম চলিত ভাষা।

বাংলা ভাষায় সীমিত সংখ্যক ধ্বনির মাধ্যমে হাজারো রকমের ব্যস্ত ও অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করা যায়। এই বিশেষ ক্ষমতাই আমাদের ভাষাকে সীমাহীন শক্তির অধিকারী করছে। জীবনের অভিজ্ঞতাকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বা রূপ দিয়ে আমরা যে জ্ঞানের ভাণ্ডার তৈরি করি তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে দিতে পারি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। প্রতিদিনের ভাবের আলাপন, সুখ-দুখ, আশা- নৈরাশ্য, আনন্দ- বেদনার প্রকাশ তথা মনোভাব প্রকাশে এই ভাষাই সবচেয়ে উপযোগী।

বাংলা ভাষায় কোনো ভাব যত সহজে বুঝা যায়, তা আর কোনো ভাষায় সম্ভব নয়। দেশকালের সঙ্গে ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প ও সংস্কৃতির যে যোগ রয়েছে তার গভীর মিল বন্ধন রচনা করতে পারে বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা। স্বদেশের মাটি ও মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, তাদের প্রতি দায়বদ্ধতার চেতনা এই ভাষার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে। বাংলা ভাষার সম্পৃক্ততা এই ভাষাভাষী সকল মানুষকে নিয়েই; তাদের সর্বাঙ্গীনতার ধারক পরিচায়ক এই ভাষা সম্পদ। বাংলা ভাষার মাধ্যমেই আমরা স্বতন্ত্র জাতি হয়ে উঠেছি, একে কেন্দ্র করেই জাতীয় সত্তা রূপ পেয়েছে, গড়ে ওঠেছে। আমাদের এই ভাষা কোনো শ্রেণী তৈরি করেনি, এটি গঠিত হয়েছে শত শত বছর ধরে, হাজার বছর ধরে।

নোয়াম চমেস্কি ভাষার সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আমাদের বাংলা ভাষা নিজে নিজেকে বদলাতে পারে, পুনরুৎপাদিত করতে পারে। তাই ইহা সৃজনশীল, রূপান্তরশীল, উৎপাদনশীল-নিঃসন্দেহে। আমাদের যে কারো মনে যেকোনো কিছু অর্থ দেয় সমাজ বাংলা ভাষার মধ্য দিয়ে। আমরা ব্যক্তি থেকে সামাজিক হয়ে ওঠি ভাষার মধ্য দিয়ে মন ও সমাজের সাথে সমন্বয় হয়ে।বাংলাভাষা সৃজনশীল, তার ধরাবাঁধা চেহারা নেই। যোগাযোগ সক্ষম বাক্যের সৌন্দর্য, সুন্দর, সরল, সৌকর্য থাকতে হয়। এর সার্বজনীন অর্থবোধকতা নেই। একটি বাক্যের কয়েক রকমের অর্থ হতে পারে। ইহা অনিঃশেষ বিবরণ দিতে থাকে, কিন্তু ফুরায় না। সৃষ্টিশীল বলে নিত্য নতুন বাক্য তৈরি করতে পারে।

বাংলাভাষা সামাজিকভাবে বিন্যস্ত হয়। এর অর্থ কোনো ব্যক্তি তৈরি করতে পারে না। সামাজিকভাবে সকলের অংশীদারিত্বের মধ্য দিয়ে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এটা তৈরি হয়। সীমাহীন অভিজ্ঞতাকে সসীম বর্ণমালার মধ্যে সাজানো যায়। বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে আমরা ব্যক্তিক অভিজ্ঞতাকে অপরের মধ্যে সঞ্চালিত করি। ইহা কল্পনাশক্তি, ব্যক্তিক অভিজ্ঞতাকে বিস্তৃতি করে। মনন বুঝতে ভাষা উপকার করে। আমাদের সংস্কৃতির মননকে ভালভাবে বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করে বাংলা ভাষার কাঠামো। আমাদের সমাজে বিভিন্ন সামাজিক স্তর রয়েছে। বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন রকমের কথাবার্তা প্রচলিত অঞ্চলভেদে ভিন্নতা রয়েছে। উঁচুস্তরের মানুষদের বলার ভঙ্গি এবং উচ্চারণ অন্যান্য স্তরের লোকদের বলার ধরণ বলার ভঙ্গি ও উচ্চারণের ধরণ থেকে স্বতন্ত্র।

সুকুমার সেনের বাংলা ভাষার ব্যাপারে কথা হলো ফরাসি ভাষার আগমনে বাংলা ভাষা একটি চলমান সহিষ্ণু ভাষায় পরিণত হয়েছে। সেন রাজত্বের সময়ে সংস্কৃত ভাষাদের ভাষারূপে সৃজিত হয় এবং প্রশাসনিক কর্মের জন্যে সংস্কৃত ভাষার প্রয়োগ হতো। বাংলায় মুসলমানদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ফরাসি ভাষা অসাধারণ লালিত্য ও মাধুর্য নিয়ে বাংলা ভাষাকে সুকুমার সক্ষম এবং চলমান ভাষায় পরিণত করলো।১৮

বাংলা ভাষা আজ বিশ্বগামী, সর্বতোগামী। বাংলা ভাষার বিকাশধারার সংগ্রাম বহুযুগের, বহুকালের মানবদ্রোহ ও অস্তিত্বচেতনার সংগ্রাম। এ সংগ্রামের প্রবাহ অবিনাশী ও অবিনশ্বর। এর কোনো মৃত্যু নেই। এর কোনো বিস্মৃতি নেই। ব্যতয় ও বিরতী নেই। ভাষার অস্তিত্বের আবেদন ও অঙ্গীকার আবহমান-চিরায়ত, শাশ্বত। আজ বাংলাভাষা শুধু বাংলা ভাষাভাষীর ভাষা নয়। এ ভাষা আজ বিশ্ববাসীর ভাষায় পরিণত হয়েছে। বাংলাভাষার স্বকৃত-সংস্কৃতির ঐতিহ্যধারা আজ বিশ্বসংস্কৃতির ঐতিহ্যপত্রে সংযোজিত হয়েছে।১৯ বাংলা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা। সবার প্রিয় ভাষা। ভাষার মতো ইহজাগতিক সত্য কম আছে। মানুষই সৃষ্টি করে মানুষের প্রয়োজনে, ভাষা ঐক্যবদ্ধ করে মানুষকে, সেও মানুষের প্রয়োজনেই। ভাষার দুর্দশা দেশের সামগ্রিক দুর্দশারই মুখচ্ছবি, ভাষার প্রচলন দর্পণের মতো স্বচ্ছ।২০

আমাদের ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা মূল্যবোধ ও পছন্দের চৌহদ্দি তৈরিতে বাংলা ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম।

আমাদের সংস্কৃতির পরিচয়

মানুষের বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গি, মন-মানসিকতা এবং জীবন লক্ষের চেতনার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে জীবনবোধ এবং তারই প্রকাশ সংস্কৃতি। কেবলমাত্র সাহিত্য বা শিল্পকলার মধ্যেই সংস্কৃতি সীমাবদ্ধ নয়। সংস্কৃতি গোটা জীবন পরিব্যাপ্ত। কলকাতার ‘সাহিত্য সংসদ’ প্রকাশিত অশোক রায়ের ‘সমার্থ শব্দকোষে’ সংস্কৃতির সমার্থ শব্দগুলো লিখেছেন-কালচার, কৃষ্টি, তমদ্দুন, মার্জনা, পরিশীলন, পরিমার্জন, অনুশীলন, সভ্যতা, শিষ্টতা, রুচিশীলতা, রুচি, সুরুচি।

‘সংস্কৃতি’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Culture. প্রফেসর জিল্লুর রহমান সম্পাদিত Bangla Academy English Dictionary তে Culture শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে-সংস্কৃতি, কৃষ্টি, মানব সমাজের মানসিক বিকাশের প্রমাণ। একটি জাতির মানসিক বিকাশের অবস্থা। কোনো জাতির বিশেষ ধরনের মানসিক বিকাশ। কোনো জাতির বৈশিষ্ট্যসূচক শিল্প সাহিত্য, বিশ্বাস, সমাজনীতি।

Tylor তার প্রিমিটিভ কালচার গ্রন্থে লিখেছেন- Culture is that complete whole which includes knowledge, belief, art, moral law, custom and other capabilities and habits acquired by man as a member of the society.25

‘সংস্কৃতি’ শব্দটি উঁচু শ্রেণীর বৌদ্ধিক পারদর্শিতা এবং আত্মিক শুদ্ধির প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে। সে কারণেই একজন সংস্কৃতিবান মানুষ বলতে আমরা শিক্ষিত, পরিশীলিত, নান্দনিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন সুচারু ও ভদ্র কোনো ব্যক্তিকে নির্দেশ করি। কিন্তু ‘সংস্কৃতি’ বলতে আবার জীবনচর্চার একটি প্রক্রিয়াও নির্দেশিত হয়, মানুষ নিজের জীবনে যার ব্যবহারিক চর্চা করে থাকে।

সমগ্র জীবন দর্শন হিসেবে সংস্কৃতির পদ্ধতিগুলি শিক্ষা ও সূক্ষ্ম বোধের অগ্নিতে পরিশুদ্ধ হয়ে স্ফটিকের চেহারা ধারণ করে। সে জন্য যে দেশে বৃহৎ সংখ্যক পণ্ডিত ব্যক্তি লেখক, বিজ্ঞানী, স্থপতি-এসব শ্রেণীর মানুষ বেশি সংখ্যায় বসবাস করেন। সে দেশের সংস্কৃতিকে খুব উচ্চশ্রেণীর বলে ধরা হয়। সংস্কৃতি চর্চার উপাদান ভেদের কারনে, বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সংস্কৃতিও ভিন্ন হয়। ‘উচ্চশ্রেণীর সংস্কৃতি’ ও ‘নিম্নশ্রেণীর সংস্কৃতি’ ‘লেখ্য সংস্কৃতি’ ও ‘কথ্য সংস্কৃতি’ ‘বৃহৎ ঐতিহ্য’ ও ‘ক্ষুদ্র ঐতিহ্য’, ‘ধ্র“পদী সংস্কৃতি’ ও ‘ লোকসংস্কৃতি’-এসবই এই বৈষম্যের ফলে সৃষ্ট। ২২

 ক্রোবার এবং ক্লুকহোন সংস্কৃতির সংজ্ঞায় বলেছেন, Culture is product, is historical; is selective; is learned; is based upon symbols; product of behaviour.২৭

আমরা বাংলাদেশি, বাংলা ভাষাভাষী। আমাদের সংস্কৃতি জীবনের বাস্তব প্রতিফলস্বরূপ। দুই ঈদ উদযাপন, কুরবানী দেয়া এগুলো সংস্কৃতির অংশ, তেমনি একুশ উদযাপন, নববর্ষ উদযাপনও সংস্কৃতির বাইরে নয়। জীবনের রয়েছে সুখ-দুঃখ, শান্তি-সংঘাত, সাফল্য- বৈকল্য প্রভৃতি বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি, তেমনি জীবনের প্রতিবিম্ব হিসেবে সংস্কৃতিরও রয়েছে একটা বহুমাত্রিক বিস্তৃত পরিসর। এ ব্যাপক দৃষ্টিকোণ থেকেই ইদানীং সামাজিক সংস্কৃতি, নৈতিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রভৃতি বিভিন্ন নামের চল শুরু হয়েছে। সুস্থ সংস্কৃতি ও অসুস্থ সংস্কৃতি বলেও একটি ধারণা চালু আছে।

সংস্কৃতির ইংরেজি প্রতিশব্দ কালচার। ইংরেজি সাহিত্যে কালচার কথাটার প্রথম ব্যবহার করেন ফ্রান্সিস বেকন ষোল শতকের শেষভাগে। তাঁর মতে, বিজ্ঞানের কাজ যেখানে প্রকৃতির প্রতি অনুগত থেকেই প্রকৃতিকে জয় করা, সেখানে শিল্প-কাব্য-সাহিত্য তথা কালচারের লক্ষ সুকুমার বৃত্তির অনুশীলন দ্বারা মানবমনকে প্রকৃতির যান্ত্রিক বন্ধন থেকে যুক্ত করা সৃজনশীল মার্জিত জীবনের সন্ধান দেয়া। কর্ষণ (কালটিভেশন) বা চাষবাসের মাধ্যমে একটা জমিকে যেভাবে ফসল উৎপাদনের উপযোগী করে তোলা হয়, তেমনি কৃষ্টি বা সাংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে মানুষের অপরিশীলিত চিন্তা-ভাবনা ও আচার-আচরণকে পরিশীলিত এবং সত্য-সুন্দর-কল্যাণের চর্চায় উদ্বুদ্ধ করা হয়।

বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায়, “উদ্ভিদের পক্ষে কর্ষণ যাহা, মানুষের পক্ষে স্বীয় বৃত্তিগুলির অনুশীলন তাহাই। এ জন্য ইংরেজিতে উভয়ের নাম Culture.

ফ্রান্সিস বেকন থেকে শুরু করে ম্যাথু আর্নল্ড, ইমারসন প্রমুখ পাশ্চাত্যে এবং বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ বাংলা সাহিত্যে সংস্কৃতির সংজ্ঞার্থ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। তাঁদের মতামতে কিছু পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে তাঁরা সবাই ছিলেন একমত, আর সেটি হলো এই যে, সংস্কৃতি মাত্রই সর্বতোভাবে একটি অন্তরলোকের ব্যাপার-সংস্কৃতি মানে মানসিক অনুশীলন, সুরুচি ও শিষ্টাচারের চর্চা। তবে এ অর্থে সংস্কৃতির উৎপত্তি যদিও ব্যক্তিগত সুরুচি ও শিষ্টাচারে, এর বহিঃপ্রকাশ ও ব্যাপ্তি ঘটে সঙ্গীতে, কাব্যে, সাহিত্যে, ললিতকলায়, ধর্মে ও দর্শনে।

নানা ধরনের সামাজিক সংঘাত বর্ণভেদ, শ্রেণীভেদ, লিঙ্গভেদ বা গোষ্ঠী-পরিচয়ভেদ সংস্কৃতিকে জীবনচর্চার অন্যতম উপাদান হিসেবে কাজ করতে বাধা দিয়েছে। কেননা সামাজিক বৈষম্য সংস্কৃতি চর্চার উপাদানগুলিকে সমস্ত মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছে দেয় না। অনেকে সংস্কৃতির প্রসঙ্গটি ধর্ম বা ঐতিহ্যের সাথে অনেক কম সম্পর্কযুক্ত ভাবেন, শ্রেণীর সাথে সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠ সংযোগ রয়েছে বলেন। অথচ মুসলিমদের সংস্কৃতি চর্চা, ইসলামী সংস্কৃতির সাথে অর্থাৎ ধর্মের সাথে অনেক বেশি সম্পর্কযুক্ত। ‘সংস্কৃতি’ দেশের অন্তরঙ্গকে শাসন করছে, তাতে আবার নিয়ন্ত্রণ করছে সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতি। খুব নরমভাবে বললে, ‘বিশ্বায়ন’ বলা হচ্ছে এটাকেই।

বিশ্বায়ন: আমাদের ভাষা

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ বিটিভির একুশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রফেসর এমাজ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ২০৫০ সাল নাগাদ ইংরেজির দাপটে বিশ্বের ৬০ শতাংশ ভাষা বিলুপ্ত হতে পারে । মাত্র ৪০ কোটি লোকের মুখের ভাষা ইংরেজি হলেও বিশ্বের ১০০ কোটি মানুষ ইংরেজি শেখার জন্য পাগল।২৪

বিশ্বায়নের কারনে ইংরেজি প্রীতি দিন দিন বাড়ছে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধিই তার প্রমাণ। ভাষা-পরিস্থিতি কোনো দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভাষা-পরিস্থিতিরও পরিবর্তন ঘটে। ‘বিশ্বায়নের সর্বব্যাপী প্রভাব ভাষাকেও স্পর্শ করেছে।’২৫

ভাষা কাল সৃষ্টি করে, ভাষা যুগ সৃষ্টি করে, ভাষা পরিবেশ সৃষ্টি করে, ভাষা ব্যক্তি সৃষ্টি করে, আবার ভাষা মতাদর্শ সৃষ্টি করে। দেশ ও জাতির ব্যক্তিত্ব নির্মাণের জন্য তার স্বাতন্ত্র্য-স্বরূপকে চিহ্নিত করার জন্য ভাষার রূপকে পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করা যায়।২৬

বিশ্বায়নের কবলে পড়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা যাতে কমে না যায় সে জন্য প্রয়োজন নানাবিধ উদ্যোগের।বাংলাদেশে ভাষা পরিস্থিতি এখন চরম নৈরাজ্য ও বিভ্রান্তিকর অবস্থার মধ্যে যা থেকে আমাদের পরিত্রাণ নেই সহজে যদি না আমরা মাতৃভাষা নিয়ে হীনমন্যতা পরিত্যাগ করতে পারি।২৭

রক্তের আলপনা এঁকে যে ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছি বাংলাদেশের রাজকীয় ভাষারূপে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। সেই ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ এবং বিশুদ্ধ উচ্চারণে আমাদের অনীহার অবসান এখনো হয় নি।২৮

বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাব থেকে আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষাকে রক্ষা করতে হবে। এ বাংলা আমাদের শুদ্ধভাবে বলতে হবে, শিখতে হবে, লিখতে হবে। সে জন্য সকলেরই প্রয়োজন মতো, সতর্ক থাকতে হবে। ভাষা ব্যবহারের সময়, এটা আমাদের কতর্ব্য। কারণ আমরা ভালবাসি আমাদের ভাষাকে।২৯

বাংলা ভাষার জন্য গৌরববোধের পাশাপাশি এ ভাষার প্রতি আমাদের বেশ কিছু দায়িত্বও যে রয়েছে, সেটা সবসময় মনে রাখা দরকার। আমরা সবাই বাংলায় কথা বলি। কিন্তু দুঃখের কথা, এই ভাষার বর্ণগুলোর সাথে জ্ঞানের রাজ্যে ঢোকার সিঁড়ি হচ্ছে শিক্ষা, মাতৃভাষায় সবার জন্য শিক্ষা।বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েও আমাদের ভাষা সংক্রান্ত কার্যকর পদক্ষেপ নেই। আমাদের দেশের বিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষার প্রণালী ত্র“টিপূর্ণ। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে বাংলা ভাষা অনেকখানি অবহেলিত। অশুদ্ধ বানান, অশুদ্ধ শব্দপ্রয়োগ, অশুদ্ধ বাক্যগঠন সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় যত্ন করে বাংলা ভাষা শেখা।৩০

প্রবাসী বাংলাদেশি শিশুদের নিয়ে আমরা যখন বিচলিত ভাবনায় আকুল। ওদের বাংলা ভাষা চর্চার জন্য যত পরামর্শ, উপদেশ দিচ্ছি শত বিড়ম্বনা প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে শিশু মনে বাংলা ভাষা এবং কৃষ্টি-সংস্কৃতির দীপ্তি ছড়িয়ে দেবার যত রকমের কৌশল, ব্যবহারবিধি প্রয়োগ করছি। সেখানে দেশে স্বদেশে ঘরে ঘরে শিশুরা যে হিন্দি গান, সিরিয়াল, কার্টুনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতির প্রতি অনাগ্রহী হয়ে উঠছে, সেক্ষেত্রে আমাদের আতঙ্কিত হবার কোনো কারণই কী নেই? একটা সময় এমন হবে নাতো ঘরেই পরবাসী হয়ে আছে মাতৃভাষা-বাংলা ভাষা।৩১

বাংলাদেশে বর্তমানে উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে ইংরেজি ভাষায় রূপান্তরিত হচ্ছে। বাংলাদেশে বাংলা ভাষার মাধ্যমে পরিচালিত একটিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নেই। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মোটামুটি বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে কিন্তু বিচার ব্যবস্থায় বিশেষত উচ্চ আদালতে এখনও বাংলা ভাষা অপাংক্তেয়। স্বাধীনতার ৩৬ বছর এ কোন দেশ সৃষ্টি করলাম যে দেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা অথচ রাষ্ট্রের সমাজ জীবনের ভাষা বাংলা নয়? ৩২

বিদ্যমান বাস্তবতায় সম্ভবত বাংলাদেশে নতুন এক বিতর্ক সৃষ্টি হতে যাচ্ছে যে এদেশের মানুষের মাতৃভাষা কী ইংরেজি না বাংলা? এর উত্তর সম্ভবত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে। সম্ভবত এমন উত্তর পাওয়া যেতে পারে যে, উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মাতৃভাষা ইংরেজি, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তশ্রেণীর মাতৃভাষা বাংলা।৩৩

বিশ্বায়ন:আমাদের সংস্কৃতি

বিশ্বায়নের প্রধান নেতৃত্বদানকারী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর সাংস্কৃতিক রাজধানী হলিউডই মূলত: বিশ্ব সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে নিয়ন্ত্রণ করছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্ববাসী হলিউডী সংস্কৃতির প্রভাব বলয়ের আওতাভুক্ত হয়েছে। বিপুল পুঁজির বিনিয়োগে, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, উঁচুমানের বিজ্ঞাপন প্রদর্শন ইত্যাদির মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে মোহাবিষ্ট করছে পুঁজিবাদী সংস্কৃতি।

স্যাটেলাইট চ্যানেল, উন্নত প্রকাশনা ও প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা প্রভৃতির মাধ্যমে একদিকে সমগ্র বিশ্বের সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশন, অন্যদিকে অপপ্রচার ও কৌশলী নিয়ন্ত্রণ দ্বারা সাম্রাজ্যবাদের অনুকুল পরিস্থিতির বিকাশ ঘটাচ্ছে বিশ্বায়নের শ্লোগানধারী বিবিস, সিএনএন, এপি, এএফপি প্রভৃতি মিডিয়া সাম্রাজ্য।বিশ্বায়ন মানুষের সামনে নানা ধ্যান-ধারণা ও সংস্কৃতির দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

সংস্কৃতির প্রবাহ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এই নয়া সংস্কৃতির বৈশ্বিক মাধ্যমে সারা বিশ্বকে গ্রাস করছে। আর এই সংস্কৃতির বিস্তার একমুখীন অর্থাৎ তা ধনী থেকে গরীব দেশের দিকে ধাবমান। হলিউড সংস্কৃতি বিপন্ন করে চলেছে নানা দেশের জাতীয় সংস্কৃতিকে। উন্নত দেশগুলোর এই বিনোদন ব্যবসা এখন সবচেয়ে বিকাশমান খাত। বিমান বা মটর গাড়ি শিল্প নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় রপ্তানীমুখী খাত এখন এই বিনোদন বা এন্টারটেইনমেন্ট শিল্প। এভাবে মিডিয়া, নেটওয়ার্ক, স্যাটেলাইট চ্যানেল, প্রাইভেট টিভি চ্যানেল ইত্যাদির মাধ্যমে ইউরোপ, আমেরিকার সংস্কৃতি তথা পাশ্চাত্য সংস্কৃতি সারা দুনিয়ার গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রতি হাজার মানুষের মধ্যে এখন কমপক্ষে ২৫০ জনের নিজস্ব টিভি আছে। সনির মতো নামি দামি কোম্পানির টিভি কেনাটা এখন মধ্যবিত্তদের জন্য সামাজিক মর্যাদার বিষয়। ঘরে ঘরে বিভিন্ন স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান দেখাটা প্রতিদিনের জীবন যাপনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিদেশি সংস্কৃতির এই সর্বগ্রাসী বিস্তার বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে ধ্বংস করছে। নিজস্ব সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় হারানোর ভীতি মানুষের মধ্যে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতীয় সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলছে মানুষ। একরৈখিক বা একই ধরনের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হওয়ার মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিপন্নতা বোধ সৃষ্টি হচ্ছে। স্থূল ভোগবাদী বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত।৩৪

‘বিশ্বায়ন ও সংস্কৃতি’ শব্দ দুটি বিষয়ে ব্যাপক এবং বহুমাত্রিক অর্থ বহন করে। এলিট সংস্কৃতি বনাম সাধারণ মানুষের জনপ্রিয় সংস্কৃতি, সংস্কৃত ভাষা বনাম প্রাকৃত ভাষা। মহৎ মানুষের উত্তরাধিকার বনাম নিচু তলার মানুষের উত্তরাধিকার। ধ্র“পদি সংস্কৃতি বনাম লোকসংস্কৃতি-এসব লড়াই চলে। ‘কালচারাল ইণ্ডাস্ট্রি’ শুধুমাত্র ফিল্ম, টেলিভিশন, জনপ্রিয় সঙ্গীত, জনপ্রিয় কলা সংস্কৃতি বা সংবাদমাধ্যমকে বোঝায় না। আরো সূক্ষ্মতর সামাজিক চর্চার ব্যবস্থাপনা, যার মধ্য দিয়ে প্রাত্যহিক জীবনে কোনো ধরনের সচেতনতা তৈরি হয়।৩৫

বিশ্বায়নের ফলে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তৈরি হচ্ছে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। ধনী দেশ সমূহের অপসংস্কৃতির শিকারে পরিণত হচ্ছে গরিব দেশের যুবশ্রেণী। ফলে উন্নয়নশীল দেশসমূহের নিজস্ব সংস্কৃতি ক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মত আমাদের দেশেও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে অনেক ক্ষেত্রেই অপসংস্কৃতির শিকারে পরিণত হচ্ছে। নিজেদের সামাজিক মূল্যবোধ অনেক ক্ষেত্রেই ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। বৃহৎ শক্তি যে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে তার ফলে আমাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক আবহাওয়া পাল্টে যাচ্ছে।৩৬

বিশ্বায়ন: আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি

ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কযুক্ত হলেও অবিচ্ছেদ্য নয়। বাংলা সংস্কৃতি লালন করেও ইংরেজিতে কথা বলা যেতে পারে। ভাষা তুলনামূলকভাবে কম বদলায়, সংস্কৃতি দ্রুত বদলায়। সংস্কৃতির পরিবর্তন হয় পরিবেশগত ভিন্নতার কারনে, প্রয়োজনীয়তার কারনে। ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে। ভাষার ক্রিয়া হচ্ছে পরিবেশনা। ভাষা অর্থ তৈরির মধ্য দিয়ে পরিবেশন করে। ভাষার অর্থ নির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্যে গুরুত্বের সাথে সম্পৃক্ত সমাজ সংস্কৃতি। সমাজ-সংস্কৃতির সম্পর্ককে ভাষা নির্মাণ এবং পুন:নির্মাণ করে। ভাষা হচ্ছে একটি সাংস্কৃতিক সম্পদ এবং কথা বলা হচ্ছে একটি সাংস্কৃতিক চর্চা। ভাষা সংস্কৃতি ও সমাজভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। ভাষা মানুষের সংস্কৃতি ও ভাব প্রকাশ করে। আর হ্যাঁ, সংস্কৃতির অন্যান্য অংশের মতো ভাষা এক দিক দিয়ে যেমন সুপ্রতিষ্ঠিত বা সুস্থিত। অন্যদিক দিয়ে তা পরিবর্তনশীল।

বিশ্বায়নের প্রভাব আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর দারুণভাবে পারছে। নৈশক্লাবে পানাহার, নাচগান ও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার যে দীর্ঘদিনের পশ্চিমা রেওয়াজ তা এ অঞ্চলেও মিডিয়ার কল্যাণে চলে আসছে। মা-বাবা, ভাই- বোন, পরিজন নিয়ে গঠিত একান্নবর্তী পরিবারের ধারণাও ভ্রুকুটির বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এককালে যে জারি-সারি-ভাটিয়ালি-মুর্শিদি-ভাওয়াইয়া গান ছিল আমাদের আপামর জনগণের প্রাণস্বরূপ।

যে পদযাত্রা, পুঁথিপাঠ ও গাজীর পট ছিল নিত্যদিনের সাংস্কৃতিক আকর্ষণ, যেগুলোর আজ বিলুপ্ত প্রায়, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক প্রচার মাধ্যম তথা আকাশ সংস্কৃতির ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও আগ্রাসনের ফলে। এই একই প্রক্রিয়ায় আজ পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যগত অনুষ্ঠানাদির সাথে পাল্লা দিয়ে মহাসমারোহে, কখনো কখনো অত্যান্ত দৃষ্টিকটুভাবে, আয়োজিত হচ্ছে থার্টি ফার্স্ট নাইট-এর বিদেশি স্টাইলের অনুষ্ঠান। ফলে দিকে দিকে ধ্বনিত হচ্ছে বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির দুর্বিষহ বিকৃতি ও মর্মান্তিক অবক্ষয়ের, শিক্ষা চিকিৎসা সাংবাদিকতা রাজনীতি ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি প্রায় সব ক্ষেত্রে এক সর্বনাশা অপসংস্কৃতি বিস্তারের আশঙ্কা ও আর্তনাদ।

তথ্যের অর্থকরী পণ্যে পরিণত হওয়া এবং অর্থনৈতিক তৎপরতা তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়ার প্রবণতা বিশ্বসংস্কৃতির উপর বিশ্বায়নের প্রভাবকে বাড়িয়ে দিয়েছে।জ্যান নেডারভীন মনে করেন বিশ্বায়ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি সংকর সংস্কৃতি সৃষ্টি করবে। তিনি এর নাম দিয়েছেন ‘তৃতীয় সংস্কৃতি’।৩৭ অনেকেই আবার স্থানীয় সংস্কৃতির মান অবনয়ন ও অস্তিত্বের সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই উদ্বেগ অযৌক্তিক নয়।

জয়বীর এর মতে, নয়া যোগাযোগ প্রযুক্তি থেকে যে সামাজিক সম্পর্ক উদ্ভূত হয় তা গোটা বিশ্বকে ক্রমান্বয়ে একটি একক প্রধান অর্থনীতি, একক সরকার ব্যবস্থা এবং একক সংস্কৃতিকে সংহত করে।’৩৮ এই একক সংস্কৃতি স্থানীয় সংস্কৃতির পৃথক বৈশিষ্ট্য ও জনগণের নিজস্ব সাংস্কৃতিক চাহিদার প্রতি অসংবেদনশীল, কৃত্রিম ও অগভীর। কারন সংস্কৃতির মৌলিক যে বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ জনগণের আচার-আচরণ জীবনধারার প্রতিফলন ঘটানো তা এই সংস্কৃতিতে অনুপস্থিত। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় বিনোদন ও যৌনতা নির্ভর এই সংস্কৃতির এই ধারা প্রায় সর্বাংশেই উন্নত থেকে স্বল্পোন্নত দেশের দিকে ধাবিত।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএন ডি পি) ১৯৯৯ সালের মানব উন্নয়ন রিপোর্টে বলা হয়েছে ‘হলিউডের ফিল্ম ও ৩ হাজার কোটি ডলার আয় করেছে। কেবল টাইটানিক ছবিটি ব্যবসা করে ১ শ ৮০ কোটি ডলার।’৩৯ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ফর্বস জানিয়েছে পর্নোগ্রাফি এখন ৫৬ বিলিয়ন ডলারের বিশ্ব বাণিজ্য।৪০

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ম্যাগাজিন, ভিডিও, সিডি, ইন্টারনেটের মাধ্যমে সহজলভ্যতা অপসংস্কৃতির বিস্তারকে আশঙ্কাজনকভাবে শক্তিশালী করে তুলেছে। বিশেষত, এশীয় দেশগুলোর সুদীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও এ অঞ্চলকে পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক পণ্য বিস্তারের উর্বর ভূমিতে পরিণত করেছে। সিনেমার পাশাপাশি পশ্চিমা সঙ্গীত ও এশিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। পশ্চিমা পপদলগুলোর বিশ্বসফর কর্মসূচিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারত ক্রমবর্ধমানহারে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।

স্থানীয় সংস্কৃতির উপর এগুলোর প্রভাব অনায়াসে লক্ষণীয়। সিনেমাগুলোতে সহিংসতা ও যৌনতার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং সঙ্গীত রচনায় পশ্চিমা ঢং অনুকরণ এ অঞ্চলের দেশগুলোর অভিন্ন প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। উপগ্রহ সম্প্রচার ব্যবস্থার বিস্তার এই প্রক্রিয়াকে আরো বেগমান করেছে। উপগ্রহের মাধ্যমে প্রচারিত অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তুর সাথে স্থানীয় মূল্যবোধের প্রত্যক্ষ সংঘাত অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষণীয়। বাংলাদেশে টিভি সিক্স, টিভি ফোর, ফ্যাশন টিভি, এম সি এম প্রভৃতি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু নিয়ে পত্রপত্রিকায় ব্যাপক নেতিবাচক লেখালেখির পর এগুলোর প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়।৪১

দেশজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বায়ন পাশ্চাত্যের আদর্শভিত্তিক সর্বজনীন সংস্কৃতির যে ধারাটির পৃষ্ঠপোষকতা করছে আমাদের দেশজ মূল্যবোধ ও রীতিনীতির সাথে তার ব্যবধান বিশাল। সে সংস্কৃতি অবিমিশ্রভাবে জনপ্রিয়তা না পাওয়ায় বর্তমানে ‘ফিউশন’ সংস্কৃতি নামে এক উদ্ভট সাংস্কৃতিক ফর্ম তৈরি করা হয়েছে। দেশজ ও পশ্চিমা সংস্কৃতির কিছু বিচ্ছিন্ন উপাদানকে অসুষমভাবে মিশ্রিত করে তৈরি হয়েছে এই অগভীর সংস্কৃতি। অতিমাত্রায় পশ্চিমা স্টাইল ও বাদ্যযন্ত্র নির্ভর সঙ্গীত, অপরাধ ও যৌনতা নির্ভর সোপ অপেরা ও চলচ্চিত্র, চটুল বিনোদননির্ভর হালকা পত্রপত্রিকা, পোশাক প্রসাধনে পাশ্চাত্য প্রভাব-এগুলোর সাম্প্রতিক জনপ্রিয়তা বাংলাদেশে বিশ্বায়িত ভোক্তা সংস্কৃতির ক্রম-আগ্রাসী প্রকৃতিরই পরিচায়ক।৪২

ভাষা মানুষের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভাষা সংস্কৃতির প্রধান মাধ্যম ও বাহন। তাই সংস্কৃতির মতোই বিশ্বায়নে সৃষ্ট বাস্তবতার বাইরে নয় বাংলা ভাষা।

উপসংহার
কোনো জাতি সংস্কৃতিহীন হয়ে পড়েছে বললে এতটুকুই বোঝা যায়। সে স্মৃতিহীন হয়ে পড়েছে। তার গর্বিত হবার বা লজ্জিত হবার কিছু নেই। কর্মী হবার সক্রিয় হবার কোনো প্রেরণা নেই, তার পরিচয় কিছু নেই। বিশ্বায়নের যুগে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিশ্বায়নের থাবায় বিশ্ব-মানুষের সাংস্কৃতিক চেতনাকেও আক্রমণ করেছে। সংস্কৃতিকে পরিণত করেছে এক বিশাল মুনাফা অর্জনকারী শিল্পে। ভোগবাদপ্রবণ পণ্য-সংস্কৃতি গড়ে উঠায় মারাত্মক দেখা দিয়েছে। বাড়ছে আত্ম সর্বস্বতা, আত্মকেন্দ্রিকতা ও জনবিচ্ছিন্নতা। মূল্যবোধের অবক্ষয় আজ স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

বিশ্বায়ন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যগুলোর সুষ্ঠু ও সুস্থ বিকাশের পক্ষে অন্তরায়।বিশ্বায়ন সংস্কৃতির স্বাধীন অস্তিত্বকে স্বীকার করতে চায় না। মানুষের স্বাধীন আত্মপ্রকাশ ও সৃজনশীলতারও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বের ব্যবসাই চলছে এখন বিনোদন বা এন্টারটেইনমেন্ট এবং ইনফরমেশন টেকনোলজিকে কেন্দ্র করে। এর মাধ্যমে যেমন সৃষ্টি হচ্ছে ক্রেতা, তেমনি বিশ্ব বাণিজ্যও হচ্ছে নিয়ন্ত্রিত। ভাষাতাত্ত্বিকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত প্রায় ৬ হাজার ভাষার মধ্যে ইংরেজির আগ্রাসনে এই শতাব্দীতে প্রায় অর্ধেকই অব্যবহার্য হয়ে যাবে। এমনকি ধ্বংস হয়ে যাবে ভাষা বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতা।

ঐদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষ্টি, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে হটিয়ে বিশ্বপুঁজির স্বার্থে সৃষ্টি করা হচ্ছে লোভাতুর বিকৃত বাজারের। বিশ্বায়নের ফলে নারী পুরুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বাভাবিক সম্পর্ক আর টিকে থাকছে না। মানবিক মূল্যবোধ ভেঙ্গে যান্ত্রিক রূপ নিচ্ছে। প্রবৃত্তি আর যন্ত্রের কাছে হেরে যাচ্ছে মানুষ। বিশ্বায়ন যে বাজারি সংস্কৃতি তৈরি করছে, সেই সংস্কৃতিতে ব্যক্তির পরিচয় থাকে না। তাই আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির যথাযথ সমুন্নত রাখতে সম্মিলিত প্রয়াস চালাতে হবে।

তথ্য নির্দেশ

১) এজাজ আহমেদ, সংস্কৃতি ও বিশ্বায়ন, অমিয় কুমার বাগচীর বিশ্বায়ন ভাবনা-দুর্ভাবনা থেকে
২) H.F vermeulen and A.A. Roldam (ed) ‘Fieldwork and foot Notes’ Studies in the History of European Antropology, London, 1995, গ্রন্থের ভূমিকা, পৃ.১
৩) Alan Rugman, The End of Globalization (Washington, Many Rivers press, 2000, p-4
৪) এলেন রুগম্যান, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা-৪
৫) J.A.Camelleri and C.Mayzaffar Ed. Globalization:perspectives and experience of the religions traditions of Asia Pasific, p-4

৬) আবেদা সুলতানা, বিশ্বায়ন ও শ্রম শক্তিতে নারী; পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, ৭৫ সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০০৩, পৃ: ৪৭
৭) ড. মো: আজিজুর রহমান, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি কর্তৃক আয়োজিত বিশ্বায়ন ও বাংলাদেশের অর্থনীতি শীর্ষক বিশেষ সম্মেলনে বিশ্বায়নের আলোকে বাণিজ্য ও উন্নয়ন: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে, পৃ-১
৮) ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বিশ্বায়ন নাকি আন্তর্জাতিকতা (প্রবন্ধ), দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৩ সেপ্টেম্বর’০৪।
৯) M. Confirius, Angst Vordem nuen Denken? (নব্য চিন্তাধারার আতঙ্ক ) In; Rote Blaettr (দর্শন পত্রিকা) No 10/88, Frankfrut. p.13
১০) ২০০২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম এর সম্মেলনে ড: মাহাথিরের প্রদত্ত ভাষণ, দৈনিক ইনকিলাব, ১৯ ডিসেম্বর ২০০৪, পৃ.১৭

১১) দৈনিক ইনকিলাব, ১৮ জুলাই ২০০১ সংখ্যা
১২) মে দিবস, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যান ফেডারেশনের আলোচনা সভায় শিল্পমন্ত্রীর ভাষণ, দ্র: দৈনিক সংগ্রাম, ৩ মে ২০০৪, পৃ.১
১৩) বিশ্ব সামাজিক ফোরাম -এর ব্যানারে গত ১৬ ই জানুয়ারি ২০০৪ ভারতের মুম্বাই মহানগরীতে আয়োজিত বিশ্বায়ন বিরোধী চতুর্থ বার্ষিক বিশ্বসমাবেশে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ব্রাজিলের চিকো হোয়াইটেকার এর বক্তৃতা থেকে। দ্র: দৈনিক ইনকিলাব, ১৭ জানুয়ারি,২০০৪, পৃ.১
১৪) পল এম সুহাজি, বিশ্বায়ন (প্রবন্ধ), বিশ্বায়ন ভাবনা দুর্ভাবনা থেকে।
১৫) অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রান্তিক বিশ্ব এবং বিশ্বায়ন চিন্তা, প্রাগুক্ত

১৬) মনসুর মুসা, ভাষাচিন্তা: প্রসঙ্গ ও পরিধি, বাংলা একাডেমী, জুলাই ১৯৯৯
১৭) মনসুর মুসা, ভাষা পরিকল্পনা ও অন্যান্য প্রবন্ধ, ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৪
১৮) এমাজ উদ্দীন আহমদ, একুশে ফেব্রুয়ারির ভাবনা
১৯) আল মুজাহিদী, একুশে ফেব্রুয়ারি অস্তিত্ব ও মহাপ্রাণনার উৎস, অমর একুশে বিশেষ ক্রোড়পত্র, যুগান্তর, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০০৪
২০) সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, একুশে ফেব্রুয়ারি ও আমাদের সংস্কৃতি, অমর একুশে ২০০৪,যুগান্তর
২১) E.B Tylor: Primitive Culture, Vol.1,p.1

২২) এজাজ আহমেদ, প্রাগুক্ত
২৩) Kroeber: Anthropology, p-15
২৪) ভূ ইয়া মুশরাফ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
২৫) অমিয় কুমার বাগচী, বিশ্বায়ন ভাবনা ও দুর্ভাবনা
২৬) শাহাবুদ্দীন আহমদ, ভাষা-চর্চার রাজনৈতিক মতাদর্শ, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৩, দৈনিক ইনকিলাব
২৭) রফিকুল ইসলাম,একুশ শতকে বিলীয়মান একুশের চেতনা,অমর একুশে ২০০৮,দৈনিক ইত্তেফাক

২৮) এমাজ উদ্দীন আহমদ, প্রাগুক্ত
২৯) নিয়ামত হোসেন, বিশ্বজয়ী বাংলা ভাষা ও আমাদের দায়িত্ব, দৈনিক জনকণ্ঠ, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৮
৩০) প্রাগুক্ত
৩১) অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০০৮, দৈনিক জনকণ্ঠ
৩২) সৈয়দা রাজিয়া বেগম, দেশে প্রবাসে নতুন প্রজন্ম ও বাংলাভাষা
৩৩) রফিকুল ইসলাম, প্রাগুক্ত
৩৪) প্রাগুক্ত

৩৫) শাহীন রহমান, চলমান বিশ্বায়ন এবং মানব উন্নয়ন সংকট, উন্নয়ন পদক্ষেপ, স্টেপস্ টুয়ার্ডস ডেভেলটমেন্ট, একাদশ বর্ষ, ছত্রিশতম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০০৪- ফেব্রুয়ারি ২০০৫
৩৬) এজাজ আহমেদ, প্রাগুক্ত
৩৭) বিশ্বায়ন ও বাংলাদেশ, প্রফেসর’স নির্বাচিত রচনা সম্ভার, এপ্রিল ২০০৪
৩৮) Jan Nederveen Picterse, ‘Globalisation as hybridisation in M.Featherstone, S.lash and R Robertson (eds), Global Modernties, (London: Sage, 1995)

৩৯) Noville Jayaweera, ‘The political Economy of the communication Revolution and the third world’ Occasional paper-20, (Sirgapore: Asian Mass Communication Research and Information Centre, 1986), p.7
৪০)বাসুদেব ভট্টাচার্য, ‘তথাকথিত গ্লোবালাইজেশনের উল্টোপিঠ’ সংস্কৃতি, ফেব্রুয়ারি ২০০০,পৃ.৩৬
৪১)‘আনু মুহাম্মদ,‘পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের ধারাবাহিকতা ও বৈপরীত্য’ সংস্কৃতি,ডিসেম্বর ১৯৯৯,পৃ.৩৪
৪২) তানভীর আহমদ ও আকতার জাহান, বিশ্বায়ন ও নয়া তথ্য প্রযুক্তির অতিকথন ও বাস্তবতা: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ, আই বি এস জার্নাল, জুন ২০০২, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

About আনিসুর রহমান এরশাদ

শিকড় সন্ধানী লেখক। কৃতজ্ঞচিত্ত। কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী। ভেতরের তাগিদ থেকে লেখেন। রক্ত গরম করতে নয়, মাথা ঠাণ্ডা ও হৃদয় নরম করতে লেখেন। লেখালেখি ও সম্পাদনার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সময়ে পাক্ষিক-মাসিক-ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন, সাময়িকী, সংকলন, আঞ্চলিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ ও জাতীয় দৈনিকের সাথে সম্পর্ক। একযুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। পড়েছেন মিডিয়া ও জার্নালিজমেও। জন্ম টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার হাতীবান্ধা গ্রামে।

View all posts by আনিসুর রহমান এরশাদ →

Leave a Reply

Your email address will not be published.