প্রকৃত মানুষ

আনিসুর রহমান এরশাদ

মাহে রমজান এসেছে। দেখছি অনেকেই রোজা রাখছেন। কিন্তু অসৎ কাজ ছাড়তে পারছেন না। রোজাদারকে মিথ্যা বলতে দেখার কথার নয়, কিন্তু দেখছি। রোজাদারের মুখে দোয়া-দরুদ ও ভালো কথা শোনার কথা কিন্তু খারাপ কথা শোনছি। যিনি ভাবেন বা বিশ্বাস করেন- রোজা রাখার মাধ্যমে লোভ-লালসা, পাপ-পঙ্কিলতা ও হিংসা-দ্বেষ দূরীভূত হয়, তিনিও অনেক রোজাদারকে গীবত-পরনিন্দা করতে দেখছেন। তার মানে যত মানুষ না খেয়ে থাকছেন, তত মানুষই রোজা রাখছেন না। ফলে রোজাদার হয়েও অনেকে যা বলার তা বলছেন না, যা করার তা করছেন না, যা ভাবার তা ভাবছেন না। এর ফলে অন্যরাও যা দেখার তা দেখছেন না।

আসলে অনেকে সুবিধামতো ধর্ম পালন করছেন, কিছু মানছেন, পুরোপুরি মানছেন না। রোজাদার শুধু নয়, অনেক ইবাদতকারীর ক্ষেত্রেই ধর্মের মূল স্পীরিট কম দেখা যাচ্ছে। পরিপূর্ণতা আসছে না। আসবে কী করে? প্রকৃত ধার্মিক হবার জন্য আগে প্রকৃত মানুষ হতে হবে। প্রকৃত মানুষের অভাবে সামাজিক জীবনে তেমন পরিবেশ নিশ্চিত হচ্ছে না, যার ফলে মানুষ তার ব্যক্তিত্বের বিকাশের সব-রকম সুযোগ লাভ করে। অন্যায়ের সম্মুখে সাহসের সাথে দাঁড়িয়ে জোরালো প্রতিরোধ করার মনোবল দেখা যাচ্ছে না বলেই বাড়ছে অধার্মিকতা। যে যেভাবে পারছেন নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন, সমাজ জীবনকে আরো ভালো করার চেষ্টাও কিছু মানুষ করছেন, কিন্তু নিয়ন্ত্রণসমূহ ব্যক্তির নৈতিক উন্নতির সাথে সংশ্লিষ্ট না হওয়ায় তার সুফল মিলছে না।

অহরহ ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। এই হস্তক্ষেপ কখনো ব্যক্তিগত পর্যায়ে, কখনো বৃহত্তর পর্যায়ে।সামাজিক স্বাধীনতার নামে সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হচ্ছে। রাজনৈতিক স্বাধীনতার নামে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকে বৈধতা দেয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার নামে অর্থনৈতিক শোষণকেও উন্নয়ন বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। স্বাধীনতা মানে এটা নয়- কেলেংকারির পরও বুক উচিয়ে চলা, চোরের মায়ের বড় গলা। চলাফেরার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা কিংবা সংগঠনের স্বাধীনতা সব নাগরিকের জন্যই। প্রকৃত গণতন্ত্র সবার ধর্মীয় স্বাধীনতা, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং পেশা ও বৃত্তির স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। আর দলীয় স্বৈরতন্ত্র নিজ দলের কারো সাত খুনও মাফ করে আর ভিন দলের সব কিছুতেই চক্রান্ত-বিরোধিতা-ষড়যন্ত্র খোঁজে।

যখন ক্ষমতাসীনরা মন থেকে চান- আইন যথাযথ প্রয়োগ, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, চিন্তার-বলা-লেখার স্বাধীনতা, আবেগ-অনুভূতি ও মতামত ব্যক্ত করার বাধাহীনতা, জনগণের স্বার্থরক্ষায় দায়িত্বশীলতা, নাগরিকদের জান-মাল-সম্মানের নিরাপত্তা; তখন দেশে শান্তি-সুখ বিরাজ করে। যেখানে সুস্থ-সুন্দর-শান্তিময়-অর্থবহ জীবন আছে, সম্মানজনক জীবিকার নিশ্চয়তা আছে, খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসা-শিক্ষাসহ জীবনযাত্রার মৌলিক অধিকার আছে; সেখানে শিরদাঁড়া উচুঁ করে আত্মমর্যাদা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পরিস্থিতিও আছে।

মানুষ চায় অস্তিত্বের সুরক্ষা, ক্ষমতার যথাযথ বিকাশ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুবিধা। সামাজিক ক্ষেত্রে প্রকৃত কল্যাণ প্রতিষ্ঠা। রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা-সাম্য, সুশাসন ভিত্তিক সমাজ ও নিজ সংস্কৃতির সুস্থ বিকাশ। ক্ষমতার সদ্ব্যবহার। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ। জনস্বার্থে সচেতনতা ও শিক্ষার ব্যাপক প্রসার। সরকার ও জনগণের মধ্যে সুসম্পর্ক। সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। সুসংগঠিত দলব্যবস্থা।

আসলেই সচেতন মানুষ চায় না- মানুষ পথের ধারে পরে মরুক, ঘরে ঘরে অশান্তি ঘাপটি মেরে থাকুক, স্কুল বয়সীরা স্কুলে না গিয়ে শ্রমিক হোক। সারাজীবন জানোয়ারের মতো জীবন কাটাক! বিনাবিচারে জেলখানায় বন্দী থাকুক। মজলুমদের চোখে পানি ঝড়ুক। নিরাপত্তাহীনতার কারণে চোখের ঘুম পালাক। দুর্নীতিবাজদের মুখে হাসি, অর্থ পাচারকারীদের সুখ, নীতিভ্রষ্ট রাজনীতিবিদদের চড়া গলা, অপসংস্কৃতির দৌরাত্ম বৃদ্ধি পাক।

সচেতন মানুষ চায়- দু’মুঠো খেয়ে পরে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা। দেশে এমন কোনো মানুষ থাকবে না যাকে দ্বারে দ্বারেও ভিক্ষা করতে হবে। জাকাতের কাপড়ের জন্য, কাজের জন্য ও দুটো ভাতের জন্য হাত পাততে হবে! সব মানুষের গায়ে থাকবে জামা, পায়ে থাকবে জুতা, থাকবে চিকিৎসার ব্যবস্থা। সম্ভাবনার বিকাশ। সৎ নাগরিক, দক্ষ প্রশাসন, দেশপ্রেমিক নেতা ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ। সর্বত্র বিধিবদ্ধ আইনের অনুসরন। সবার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা। নাগরিক অধিকার পূরণের সুযোগ লাভ। আত্ম-নির্ভর হয়ে ওঠা। সকল সম্ভাবনার বিকাশ। সত্য ও সুস্থ চিন্তার জয়জয়কার। অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা বা সহমর্মিতা। নায্যতা ও শান্তি। স্বাধীকার, নিরাপত্তা ও স্বীকৃতি। সম্মানের সঙ্গে জীবন-যাপন। খেটে খাওয়া মানুষের মুক্তি, শোষণের অবসান। সকল অত্যাচারনির্যাতন-জুলুমের অবসান। সার্বিক মুক্তি। বঞ্চিত মানুষও প্রাপ্য পাওনাটুকু বুঝে পাবে। দেশের সব মানুষের শিক্ষা, অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থান নিশ্চিত হবে। স্বাধীনতাহীনতায় কেউ থাকবে না। সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে স্বাধীনতার সুফল, সুষমভাবে।

দুর্নীতি-লুটপাট-চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি কোনো ধার্মিক করে না। ক্যাসিনো-জুয়া-ব্যাংকলুট করে অধার্মিকরাই। দলীয়করণ আর দলাদলি করে নিয়ম ভেঙে দমন-নিপীড়ন-হয়রানি করা কোনো ধর্ম শেখায়নি। চুরি চুরিই। হোক সেটা টাকা চুরি কিংবা ভোট চুরি! চুরি করাটাই লজ্জার! মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত হরণ করে মানবিক মর্যাদা রক্ষা হয় না। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক তাদের উচিত- পর্দা-বালিশ-চেয়ার কেলেংকারীর মতো ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান, ব্যাংক জালিয়াতি ও শেয়ার ধস ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে সেজন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, বাজার নিয়ন্ত্রণের সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়া, রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করা।

দেশপ্রেমী সাধারণ মানুষ চায়- সবার মৌল-মানবিক চাহিদা পূরণ হোক। বৈষম্যহীন হোক সমাজ। পুরো জাতির জন্য প্রাপ্য আলোটুকু নিশ্চিত হোক। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি মিলুক। বিশ্ব মানচিত্রে লাল-সবুজ পতাকার মান সমুন্নত থাকুক। জাতি হিসাবে ঐক্যবদ্ধ হোক। গণমানুষের জীবনমানের উন্নতি ঘটুক। সাধারণ মানুষের কল্যাণ হোক। অর্থনীতি হোক গণমুখী আধুনিক আত্মনির্ভরশীল। সামষ্টিক উন্নয়নে অগ্রগতি অব্যাহত থাকুক। গ্রামীণ সমাজের উন্নয়ন হোক। টেকসই উন্নয়ন হোক। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান হোক। অনিয়ম ও অধিকারহীনতা থেকে মানুষ মুক্ত হোক।

শান্তিপ্রিয় মানুষ চায়- কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বন্ধ হোক। বিদ্বেষ ছড়ানো বন্ধ হোক। অস্ত্রের আঘাতে চুপ করানো বন্ধ হোক। মতাদর্শের অমিলের কারণে হুমকি বন্ধ হোক। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হোক। অন্যের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন করা বন্ধ হোক। রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি বন্ধ হোক। সীমাহীন দুর্নীতি বন্ধ হোক। উদগ্র ভোগবাদী মানসিকতা দূর হোক। রাজনীতিবিদগণের জনগণের সাথে সম্পৃক্ততা বাড়ুক। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ও রক্ষকদের ভক্ষকে পরিণত হওয়া বন্ধ হোক। রাষ্ট্রটি হোক দেশের সংবিধান যে অঙ্গীকার করেছে, সেই রকম। সংবিধানে দেয়া অধিকার নাগরিকরা ভোগ করুক। সংবিধান যে রকম শাসনব্যবস্থার নির্দেশ দিয়েছে, ঠিক সেই রকম শাসনব্যবস্থায় দেশ পরিচালিত হোক। গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা হোক।

পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *