পিএইচডি ডিগ্রির চেয়েও আইডিয়ার উন্নয়ন বেশি জরুরি

অপ্রয়োজনীয়ভাবে পিএইচডি ডিগ্রি নেয়ার অদ্ভূত প্রবণতা বাংলাদেশ ছাড়া বোধহয় অন্য কোথাও নেই। গবেষক, বিজ্ঞানী ও একাডেমিকরাতো ডিগ্রিটি প্রয়োজনেই নেয়, নেয়া জরুরিও! কিন্তু মধ্যম বা শেষ বয়সের সরকারি কর্মকর্তা বা অন্য পেশাজীবীদের এই ডিগ্রিপ্রীতি কেন! যদিও  অর্থ, পরিকল্পনা বা এ ধরনের কিছু মন্ত্রণালয়ে পিএইচডি কাজে সহায়তা করতে পারে।

এক নজরে দেখে নিন লুকিয়ে রাখুন

অযৌক্তিক সুবিধা নিতে ডিগ্রি

নিজের উন্নয়নের জন্য, কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতির জন্য, জাতে ওঠার জন্য যেন ডিগ্রিটি লাগবেই! থিসিস চুরি করে হোক, বিশ্লেষণ ধার করে হোক, চিন্তাকে শানিত না করে হোক- ডিগ্রিটি দরকার! ডিগ্রিটি থাকলে নিজের পায়ের শিকল না খুলে অন্যকে মুক্তির চেতনায় শিকল ভাঙার বায়বীয় স্বপ্ন দেখানো যায়! নিজের কাজের উপর নিজের আস্থা না থাকলেও, স্বকীয়তায় নজর না দিলেও, নিজের মন-আত্মার যত্ন নিতে না শিখলেও- অন্যের মনের কথা শুনে মন-গলানো উপদেশমালা বিতরণ করা যায়!

প্রমোশনের উদ্দেশ্যেই  গবেষণা

যদ্যপি আমার গুরু বইয়ে আহমদ ছফা লিখেছেন, ‘জ্ঞানচর্চার যে আরও একটা বৈশ্বিক মানদণ্ড রয়েছে তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান বিশেষ কিছু নেই। বিশেষত পাকিস্তান সৃষ্টির পর জ্ঞানচর্চার উত্তাপ আরও অবসিত হয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে নিবেদিতপ্রাণ মানুষও নতুন কোনো গবেষণা কর্মে আত্মনিয়োগ করেননি। তিনি বিয়ে পড়ানো এবং মিলাদ শরীফ করে সময় কাটাতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে নানা বিষয়ে গবেষণা হয়েছে তার বেশিরভাগই চাকরির প্রমোশনের উদ্দেশ্যে লেখা।’

তলানিতে ঠেকেছে গবেষণার মান

দিন দিন অবস্থার আরো অবনতিই হয়েছে! অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থাও খারাপ! শিক্ষা ও গবেষণার উন্নয়নে রিসার্চ বা টিচিং এসিট্যান্ট পজিশনগুলোই নেই।একসময় যেখানে বিশ্বমানের গবেষণা হতো, সেখানে গবেষণার মান কমতে কমতে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে! প্রকৃত গবেষকদের ডিগ্রি প্রদানে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করায় গবেষণার মান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশও নেই, গবেষণার সঙ্গে যুক্তদের গবেষণার মানসিকতাও নেই।

ভালো গবেষকেরও সুযোগ কম

পত্রিকায় কলাম লেখা কিংবা বইমেলায় বই প্রকাশই প্রকৃত গবেষককের প্রধান কাজ নয়! উদ্যোক্তারা আইডিয়ার উন্নয়ন করে তা বাস্তবে রূপ দেবেন। বিজ্ঞানীরা ল্যাবে সময় দেবেন, নবীনদের প্রশিক্ষণ দিবেন ও গবেষণা প্রবন্ধ লিখবেন। আর কাজ করতে গিয়ে অন্যদের অনীহা, বিদ্রুপ-ব্যঙ্গ, বা সমালোচনা সহ্য করবেন। আসলেই যে ভালো পড়তে পারে, ভালো রেজাল্ট করতে পারে, ভালো গবেষক হতে সক্ষম- এ সমাজ তাদের জন্য কমই সুযোগ রেখেছে!

কোনো কাজে না লাগলেও ডিগ্রি

তারপরও যাদের পিএইচডি গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কোনো সমাধান করেছে বা সম্পূর্ণ নতুন কোনো বিশ্লেষণ দিয়েছে- যা থেকে সমাজ-দেশ-জাতি উপকৃত হয়েছে; তারা প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু যাদের ডিগ্রি পিএইচডি’র সংখ্যা বৃদ্ধি ছাড়া অন্য কোনো কাজে লাগেনি, কোনো গ্যাপ পূরণ করেনি- কার্যকারিতাহীন এসব গবেষণার দরকারটা কী?

পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে জালিয়াতি

পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে- পিএইচডি ডিগ্রি জালিয়াতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ডিগ্রি বাতিলের পাশাপাশি চাকরিচ্যুত করার ঘটনা। অনুমোদনহীন নামসর্বস্ব বৈধতাহীন প্রতিষ্ঠান থেকে টাকার বিনিময়ে পিএইচডির সনদ নেয়ার ঘটনা। পিএইচডি ডিগ্রিধারী দাবি প্রমাণের জন্য  থিসিস দেখাতে না পারার ঘটনা।  অন্যের থিসিস চুরি করে নিজের নামে চালিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটছে।

টাকার বিনিময়ে পিএইচডি

খুব সহজেই ভুয়া  পিএইচডি  ডিগ্রিধারীরা বছরের  পর বছর পাঠদান করছেন  বিশ্ববিদ্যালয়ে।  টাকার বিনিময়ে পিএইচডি অভিসন্দর্ভ ও গবেষণা প্রবন্ধ লিখিয়েও নেয়া হচ্ছে। টাকা খরচ করলে পিএইচডির সনদ পাচ্ছে, গবেষণা লাগছে না। গবেষণার প্রতি উদাসীনদের অনেকের ভরসার জায়গা নীলক্ষেত! পিএইচডি ডিগ্রির সনদ যারা জাল করে তারা শিক্ষার্থীদের কী শেখায় আর প্রতিষ্ঠান-সমাজ-দেশই বা তাদের কাছ থেকে কী পাবে!

ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রিধারীরা বাড়ছে

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের বাংলাদেশি শাখা পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করছে। ঘরে বসে অনলাইনে বিদেশ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নেয়ার ব্যবস্থা ডিগ্রিটির মান নিম্নে নিয়ে গেছে। ভুল বানান! ভুল বাক্য! ভুল তথ্য! এমতাবস্থায় দেশে ঘরে ঘরে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী ব্যক্তি পাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে!

পিএইচডি ডিগ্রির বাম্পার ফলন

২০২০ সালে করোনাকালে সবকিছু থেমে থাকলেও বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রায় ৬৪১ জন শিক্ষার্থী পিএইচডি ডিগ্রি লাভই পিএইচডির বাম্পার ফলনের প্রমাণ। পিএইচডি ডিগ্রির এমন বাম্পার ফলন ডিগ্রিটিকেই খেল-তামাশার পর্যায়ে  নিয়ে যাচ্ছে। ২০১৪ সালের ভুয়া সনদধারী ছিল ৫ হাজারের মতো। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল সাড়ে ৮ হাজারের মতো।  এখন দেশে দেশে  ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রিধারী ব্যক্তির সংখ্যা আরো বেশি।

ভুয়া পিএইচডি ফৌজদারি অপরাধ

ভুয়া পিএইচডি ফৌজদারি অপরাধ। এ সনদ দেয়া ও নেয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন হয়।  অথচ শুধুমাত্র আমেরিকা ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি ইউএসএ (বাংলাদেশ স্ট্যাডি সেন্টার)  থেকে ৫ হাজারের বেশি ব্যক্তি পিএইচডি ডিগ্রি নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্তত ৫৬টি প্রতিষ্ঠান থেকে দেড় লাখ থেকে ৩ লাখ টাকায় পিএইচডি ডিগ্রি বিক্রি হয়েছে। ভবিষ্যতেও যত্রতত্র এসব ডিগ্রি মিললে পিএইচডি ডিগ্রি নেয়া ব্যক্তিদের আগের মতো সম্মান থাকবে না!

পিএইচডি ডিগ্রিতে জালিয়াতির জন্য কে দায়ী?

দেশের কৃতি গবেষকদের কিছু সাফল্য দিয়ে দুর্বলতাকে আড়াল করা যাবে না। আসলে কিছু অযোগ্য তত্ত্বাবধায়ক ক্ষমতা, লোভ-লালসার জন্য যোগ্য কিংবা অযোগ্য শিক্ষার্থীদের অযোগ্য বানিয়ে ডিগ্রি দিয়ে থাকেন। পিএইচডি ডিগ্রিতে জালিয়াতির জন্য প্রথমে দায়ী তত্ত্বাবধায়ক, তারপর ইভ্যালুয়েশন সিস্টেম ও পরীক্ষক, সবশেষে ছাত্র। শুধু বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত মুনাফার উদ্দেশ্যে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পিএইচডির তত্ত্বাবধায়ক হয়ে পরবর্তীতে এদের কাছ থেকে নানা সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন।

সামাজিক মর্যাদা লাভে পিএইচডি

পিএইচডি ডিগ্রি গবেষক হওয়ার পথে বড় ট্রেনিং, যা জ্ঞান সৃষ্টিতে কাজে লাগে, নতুন প্রজন্ম তৈরিতে ব্যয় করা যায়। তবে যারা নামের আগে একটি অর্নামেন্ট স্বরূপ ‘ডক্টরেট’ জুড়ে দেওয়ার জন্যই শুধু পিএইচডি করেন- তাদের লব্ধ জ্ঞান অর্থহীন, তারা চারিত্রিক হীনম্মন্যতাকেই প্রকাশ করেন। একাডেমিক কারণ ছাড়া সামাজিক কারণে নেয়া পিএইচডি সামাজিক মর্যাদা লাভের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ৪৪ থেকে ৫৪ বছর বয়সে করা পিএইচডি ডিগ্রি দিয়ে জাতি কমই উপকৃত হয়!

ট্যাক্সের টাকা খরচ করে পিএইচডি

জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে আমলাদের বিদেশে পিএইচডি ডিগ্রি করানো অর্থহীন! কারণ এই ডিগ্রিতে লাভ হয় যেই দেশে যায় এবং যেই প্রতিষ্ঠানে গবেষণা করে তাদের। যোগ্যতা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতো স্কলারশিপ বা ফেলোশিপ নিয়ে যাবে! আর খরচ করার মতো এত টাকাই যদি থাকে তাহলে বিশ্বমানের গবেষক ও পোস্ট-ডক নিয়োগ দিয়ে দেশেই পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করলেওতো গবেষণার পরিবেশ তৈরি হয়! গবেষণায় না এগোলে টাকা হলেও রুচি ও সংস্কৃতিবোধে পিছিয়ে থাকতে হবে।

দেশ ও জাতিকে  এগিয়ে নিতে পিএইচডি

পিএইচডি মানেই সাধারণত নতুন গবেষণা এবং নতুন কিছু উদ্ভাবন করা যা আগে কখনো করা হয়নি । অথচ এদেশে রেকর্ড সংখ্যক পিএইচডি তা করছে না। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন শাখা-প্রশাখার উন্মেষ ঘটছে না। দেশ ও জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার মতো নতুন তত্ত্বের আবিষ্কার হচ্ছে না। জ্ঞান সৃজনের চেয়ে সুনামটা প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। অথচ বিদেশে যোগ্যতা, ত্যাগ, নিষ্ঠা, মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে হাতে গোনা কিছু ব্যক্তি এই ডিগ্রি লাভ করেন, যারা নিজেদের গবেষণায় বা শিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়োজিত রাখেন।

সাধারণ কর্মজীবনে পিএইচডির গুরুত্ব

পিএইচডি ডিগ্রিতে শেখা গবেষণা করার বিভিন্ন কলাকৌশল-পদ্ধতি ও অর্জিত গবেষণা–জ্ঞানকে পরবর্তীতে কর্মজীবনে প্রয়োগ করতে না পারলে ডিগ্রি অর্জনেই সব শেষ হয়ে যায়! এই প্রশ্নটি করা অমূলক হবে না যে- বাংলাদেশে গবেষণা ও শিক্ষাখাত ছাড়া সাধারণ কর্মজীবনে পিএইচডির গুরুত্ব কতটুকু? তারপরও ডক্টরেট ডিগ্রিরও ভালো-খারাপ মান আছে। ডক্টরেট ডিগ্রিতেও এখন প্রতারণা হয়।

অনেকে অনলাইন থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি করছেন!  ভালো জার্নালে পাবলিকেশনও করছেন ভালোভাবে কাজ না শিখেই। যারা দুই নাম্বারি করে ডিগ্রি নিচ্ছেন- তারা নতুন নতুন আইডিয়া উদ্ভাবন করতে শিখেননি, যেকোনো বিষয়কে বিভিন্নভাবে চিন্তা করতেও পারেন না, অসমাধানকৃত বিষয়ের সমাধান খোঁজার চেষ্টাও করতে অপারগ এবং কোনো বিষয় নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন করতেও জানেন না।

পিএইচডি অত্যাবশ্যকীয় নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত শিক্ষক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার, বিজ্ঞানী সত্যেন বোস, জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, ভাষাবিজ্ঞানী আব্দুল হাই, নাট্যকার মুনীর চৌধুরী, দর্শন-লেখক সরদার ফজলুর করিমের কোনো পিএইচডি ছিলো না। কবি-লেখক-সম্পাদক ও বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বুদ্ধদেব বসুরও পিএইচডি ছিলো না।

জ্ঞানকাণ্ডে কিছু যোগ করতে চাইলে পিএইচডি অত্যাবশ্যকীয় কোনো শর্ত নয়। অনেকে পিএইচডি করার পরে আর কিছু উৎপাদন করতে পারেন না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আনু মুহাম্মদের পিএইচডি নেই। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক পিএইচডি করতে গিয়েও শেষ না করে ফিরে এসেছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসান আজিজুল হক, সনৎ কুমার সাহা, শহিদুল ইসলাম কিংবা জুলফিকার মতিন- কারোরই পিএইচডি নেই। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির সিনেমা স্টাডিজের সিনিয়র লেকচারার ডেভিড হানানের কোনো পিএইচডি নেই, কিন্তু তার অধীনে বেশ কয়েকজন পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন।

পিএইচডি জালিয়াতি রোধে ব্যবস্থা

দেশের আইন অনুসারে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পিএইচডি ডিগ্রি দেয়ার এখতিয়ার বা সুযোগ নেই। এখন প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে, সফটওয়ার ব্যবহার করেও ভুয়া বা জাল পিএইচডি অনায়াসে ধরা সম্ভব। এক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে। ভালো প্রতিষ্ঠানে, শ্রম ও মেধা ব্যয় করে পিএইচডি ডিগ্রিটি গ্রহণ করলেই নিজের ও দেশের সঙ্গে প্রতারণা হবে না।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও মানহীন ডিগ্রি

সরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পিএইচডি ডিগ্রি দেয়া হচ্ছে। এসব ডিগ্রির কোনো গুণগত মান নেই। কোনো গবেষণা হয় না। অনেক বিভাগের পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে প্রশ্ন আছে! অনেকেই ডিগ্রি নিয়েছেন যারা কোনোদিন গবেষণা তো দূরের কথা লাইব্রেরি পর্যন্ত যায়নি।

পিএইচডি ডিগ্রি  নিয়ে তামাশা

শখের বশে পিএইচডি ডিগ্রি নেয়া আর দেয়া নিয়ে তামাশা বন্ধ হওয়া দরকার। নতুন কোনো বিষয়ে সিরিয়াস গবেষণা ছাড়া যেনতেন উপায়ে অথবা রিসার্চ চুরি করে যাতে কেউ ডিগ্রি নিতে না পারে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও পিএইচডি ডিগ্রি দেয়ার নীরব প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে। পিএইচডি নিয়ে ব্যবসা যেন না হয়!নিজের পিইচডি ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও পিএইচডির সুপারভাইজার হচ্ছেন। ফুলটাইম চাকরি করেও পিএইচডি শেষ করছেন যথাসময়ে! এসব কে দেখবে!

 পিএইচডি নিয়ে ফ্যান্টাসি  বিপজ্জনক

কেউ অবসর সময় কাটাতে, কেউ ওএসডি কালীন ফ্যান্টাসি হিসেবে পিএইচডি করবেন এটা কেমন কথা! শুধু নামের আগে ডক্টর লেখার জন্য পিএইচডি করা বিচিত্র দেশের বিচিত্র খেয়ালের মানুষের পক্ষেই সম্ভব! জাতে ওঠার অদ্ভুত চেষ্টা করে নামসর্বস্ব ডক্টরেটরা জাতকেই কলংকিত করে! অতি নিম্নমানের আবর্জনা উৎপাদন করে কঠিন ডিগ্রি সহজে নিয়ে ডিগ্রিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে! পিএইচডি করে সারাজীবন সেটা ভাঙ্গিয়ে চলার রীতিটি খুবই বিপজ্জনক!

পিএইচডির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো

একটি উন্নত একাডেমিক পরিবেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরে বাংলা ভাষাতেও লিখতে হবে। কারণ এদেশে বেশিরভাগ লোক ইংরেজিতে প্রবন্ধ পড়ে না, তাই ইংরেজিতে লিখে দাবি করার সুযোগ নেই দেশকে বিরাট কিছু দিয়েছি!

ড. জামাল নজরুল ইসলাম, ড. হারুন উর রশিদ, ড. মুহাম্মদ ইউনূস, ড. আহমদ শরিফ, ড. হমায়ূন আজাদ, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এরকম আরও অনেকে পিএইচডির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সারা জীবন ধরে আরও অনেক অনেক কাজ করেছেন।

পিএইচডি  যাতে কাজে লাগে

পিএইচডি করার মধ্যে দোষের কিছু নেই, যদি তা দেশ ও দশের কাজে লাগে। বসে বসে অজস্র আবর্জনা উৎপাদন করার কোনো মানে হয় না! যাদের প্রমোশন দরকার, যারা কোথাও পেপার ছাপাতে পারে না; ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হওয়া জার্নালে তাদের পেপার ছাপা হয়। জার্নাল সম্পাদক/ডিন হাতে থাকলে আর্টিকেল ছাপানো কঠিন নয়। তাই ডিগ্রিই সবকিছু নয়!

যারা প্রশাসনে কাজ করবেন বা কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন তাদের পিএইচডি খুব কাজে লাগে না। যারা দেশে থেকে পিএইচডি করতে চায় বা পিএইচডি করে দেশে ফিরতে চায় তাদের জন্য জরুরি ডিগ্রি দিয়ে কনট্রিবিউট করতে পারার সক্ষমতা। বিদেশে গিয়ে থেকে যেতে না চাইলে এবং দেশেও বাস্তব ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে না পারলে পিএইচডি করে সময়ের অপচয় না করাই ভালো।

বিদেশমুখী প্রবণতা পরিবর্তন জরুরি

জ্ঞানের ব্যাপারে বিদেশিদের ওপর নির্ভর করে নিজেদের সমর্পণ করা ঠিক না। নিজেদের গবেষকদের দাম দিতে হবে। বিদেশমুখী প্রবণতা পরিবর্তন করতে হবে। নিজেদের গবেষকদের আমরা প্রমোট করতে হবে। বিদেশমুখী প্রবণতা ও নির্ভরতা পরিবর্তন করতে না পারলে প্রকৃত সুফল মিলবে না।

নিম্নমানের গবেষণা ঠেকায়ে সুনাম রক্ষা

গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক যাতে অবহেলা না করে, গবেষককে পর্যাপ্ত সময় দেয়। এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে অনেক আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে। যেসব গবেষণাকর্ম পরবর্তীতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকেও প্রকাশিত হয়েছে। ফলে নিম্নমানের পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান ঠেকায়ে এই সুনামটুকু অন্তত রক্ষা করতে হবে।

মাতৃভাষায় পিএইচডি করা

ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশেই যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি না তাদের নিজ ভাষায় গবেষণা করলেও মাতৃভাষা বাংলায় পিএইচডি করাকে অনেকেই বিদ্রুপের দৃষ্টিতে দেখেন। অথচ বাংলা ভাষায় অভিসন্দর্ভ সহজে বোধগম্য হওয়ায় আপামর জনসাধারণ গবেষণা বিষয়ে সম্যক ধারণা লাভ করতে সক্ষম হবে।  ভালো গবেষণাগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করা যেতে পারে।

আমাদের দেশে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেই অনেকে গবেষণা থেকে বিদায় নেন, গবেষণা কাজে আর নিয়োজিত থাকেন না। শুধু নামের আগে উপাধি ব্যবহারই মুখ্য উদ্দেশ্য না হয়ে নীতি নৈতিকতার উন্নয়ন ঘটিয়ে মৌলিক গবেষণার মাধ্যমে দেশ ও জাতিকে নতুন নতুন জ্ঞানের সন্ধান দেওয়া উচিত।

বিদেশি ডিগ্রিধারী দেশে অবমূল্যায়িত

নিজেদের গবেষণায় পূর্ণতা আনার জন্য পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। তবে একজন পিএইচডি ডিগ্রিধারীর মূল্যায়ন আমাদের দেশে করা হয় না বলেই কেউ ফেরে বাধ্য হয়ে, আবার কেউ কেউ স্ব-ইচ্ছায় বিদেশে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করে।

বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রী নিয়ে, নামকরা জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে নিজেরা দেশে ফিরে হাত পা গুঁটিয়ে বসে থাকার চিত্র আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বেশ কমন একটা বিষয়।

ভুয়া পিএইচডিধারী বাড়ছেই!

ভুয়া ডিগ্রি একদিকে অপরাধমূলক, অন্যদিকে গুণগত উচ্চশিক্ষারও অন্তরায়। অথচ ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি সনদ দিয়ে নিজের নামের আগে ‘ডক্টর’ উপাধি ব্যবহার করেছেন বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের উপ-পরিচালক হুমায়ন কবির আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি থেকে অবৈধ পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন প্রমাণিত হয়।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা আতিকুর রহমানের পিএইচডি ডিগ্রিও অবৈধ। এমন অসংখ্য সরকারি কর্মকর্তা অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের অবৈধ সনদ দিয়ে চাকরিতে সুবিধা নিচ্ছেন। রাজধানীর প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুমোদনহীন ও ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রিধারী ছয় শিক্ষক অধ্যাপক রেবেকা সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক শিকদার মো. আনোয়ারুল ইসলাম, মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন, আবু সাঈদ মিয়া এবং আতিকুর রহমান খান (এআর খান)।

এমন প্রচুর ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে অনেকেই সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরে পদোন্নতি, আর্থিক সুযোগ নিচ্ছেন। ভুয়া পিএইডডি ডিগ্রি নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করছে। প্রকৌশলী, আমলা, শিক্ষক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিরা রয়েছে।

জালিয়াতিতে ভরা পিএইচডি গবেষণা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ওমর ফারুককে সহকারী অধ্যাপক থেকে প্রভাষক পদে পদাবনতি দেওয়া হয়। এর আগে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় ২০১৮ সালে এ শিক্ষকের পিএইচডি ডিগ্রি বাতিল করা হয়। অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মাহফুজুল হক মারজান গবেষণায় জালিয়াতির শাস্তি হিসেবে দুই বছর পর্যন্ত কোনো ধরনের পদোন্নতি না পাবার শাস্তি পান। তাঁরা ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে গবেষণায় জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে।

গবেষণায় প্ল্যাজারিজম  বা চৌর্যবৃত্তি

গবেষণায় প্ল্যাজারিজম  বা চৌর্যবৃত্তির ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।  গবেষণা প্রবন্ধে চৌর্যবৃত্তির (প্ল্যাজারিজম) অভিযোগে পদাবনতি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষিকা সামিয়া রহমানের। ২৮ জানুয়ারি ২০২১ অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজানের পদাবনতি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পিএইচডি গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ ওমর ফারুককেও একই শাস্তি দেওয়া হয়।

পিএইচডি থিসিসে জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক নূর উদ্দিন আলোকে চাকরিচ্যুত করা হয়। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ ওঠে। ২০১৫ সালে আরবি বিভাগের তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে গবেষণায় চুরির অভিযোগ এনে পদোন্নতি আটকে দেওয়া হয়েছিল।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাপত্র জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ফলিত গণিত বিভাগের অধ্যাপক শামসুল আলম সরকার ও রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে সিন্ডিকেট। ২০১৯ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) লোকপ্রশাসন বিভাগের তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে গবেষণায় জালিয়াতির অভিযোগ করেন লোকপ্রশাসন বিভাগেরই একজন সহযোগী অধ্যাপক।

পিএইচডি গবেষণার ক্ষেত্রে করণীয়

অনর্থক চেষ্টা না চালিয়ে এমন কোনো বিষয়ে পিএইচডি করা উচিত যা কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ ঘটানো যাবে। সনদ বাণিজ্য করে এমন বিভিন্ন চক্রকেও চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

 

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.