পর্যটন শিল্পে সংকট উত্তরণে করণীয়

আনিসুর রহমান এরশাদ

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন বলেছিলেন, Let us work together to maximize the immense potential of tourism to drive inclusive economic growth, protect the environment and promote sustainable development and a life of dignity for all. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে বেশকিছু করণীয় রয়েছে। যেমন-পর্যটন বান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও পর্যটন কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তৈরি করতে হবে। ব্র্যান্ডিং ও প্রচারণা চালাতে হবে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পর্যটন এলাকা জুড়ে লোকজ সংস্কৃতিক মেলা ও উৎসবের আয়োজন করতে হবে। ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতিক রুচিভেদে পর্যটন সুবিধার ভিন্নতা তৈরি করতে হবে।

পর্যটন কেন্দ্র ঘীরে পর্যটকদের জন্য সুইমিং জোন, বিশেষায়িত ক্লাব, ইনডোর-আউটডোর স্পোর্টসজোন, পার্টি এন্ড এক্সিবিশন সেন্টার, বহুজাতিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ইত্যাদি গড়ে তুলতে হবে। সমুদ্র সৈকত জুড়ে স্কুবা ড্রাইভিং, কারলিং, সার্ফিং, ফিশিং, বোটিং সুবিধা, ওয়াটার রাইডিং, বীচ স্পোর্টস ও পাহাড়ে ক্লাইম্বিং ইত্যাদির ব্যবস্থা রাখতে হবে। জীববৈচিত্র্যকে পুঁজি করে পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে হবে। সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে অংশগ্রহণ ও দায়িত্ববোধমূলক পরিবেশবান্ধব পর্যটন সেবা সৃষ্টি করতে হবে, যা আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বার্মিজ মার্কেট নামক তথাকথিত বিদেশি পণ্যের মার্কেটের বদলে দেশীয় পণ্য ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ বাজার সৃষ্টি করতে হবে।

এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন যাতে পর্যটন কেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং পর্যাপ্ত বিনোদন ব্যবস্থা চালু করার জন্য সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। পর্যটন স্থানগুলোর সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে জাতীয় পরিকল্পনায় পর্যটন শিল্পকে অগ্রাধিকার প্রদান পূর্বক জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রাখা, ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পর্যটন পুলিশ গড়ে তোলা, পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো, দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগ প্রয়োজন।

পর্যটন স্থানগুলোর জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো একান্ত আবশ্যক। স্বয়ংসম্পূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অবশ্যই বিমান বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে। পর্যটন স্থানগুলোয় উন্নত মানের হোটেল, রেস্টুরেন্টের সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি করা দরকার তেমনি উন্নত সেবাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাছাড়া এ শিল্পে কর্মরত পর্যটক গাইড সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং দক্ষ ও পেশাদার জনবল তৈরি করাও প্রয়োজন। এ জন্য দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ সং­িশ্লষ্ট কোর্স চালুর মাধ্যমে তা করা যেতে পারে।

এক নজরে দেখে নিন লুকিয়ে রাখুন
করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত

করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত

কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ

পর্যটকেরা বেড়াতে, ছুটি কাটাতে, অবসর যাপনে ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য আগমন করে থাকে। কেউ নিজস্ব ইচ্ছা অনুযায়ী কাক্সিক্ষত বিষয় ও সৌন্দর্য অবলোকন করার উদ্দেশ্যেও ভ্রমণ করে থাকে। পর্যটনের উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ ১. চিত্তবিনোদন ও মানসিক অবস্থা পরিবর্তন ২. অর্থনৈতিক ও পেশাগত কারণে ৩. সামাজিক বন্ধনের কারণে ৪. শিক্ষালাভের জন্য ৫. ধর্মীয় কারণে। দেশের পর্যটন স্পটগুলো যাতে এসব উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে সেজন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মালয়েশিয়ার আদলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বছরে একবার শিক্ষা সফরের আয়োজন বাধ্যতামূলক করা দরকার। শিক্ষা সফর বাধ্যতামূলক করা হলে এ প্রজন্মের সন্তানরা দেশকে চিনবে, জানবে, ভালোবাসবে। পাশাপাশি আয় হবে হাজার কোটি টাকা।

প্রয়োজন পূরণে ঢেলে সাজানো

আমাদের মনে রাখতে হবে বিশ্বায়নের পরিপ্রেক্ষিতে পণ্যের বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন সাধন করাই হলো পর্যটন শিল্পের মূল বিষয়। পর্যটন দুই ধরণের হয়ে থাকে। যথাঃ ১. আন্তর্জাতিক পর্যটন ২.আভ্যন্তরীণ পর্যটন। এক্ষেত্রে দু’টি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো- ১. সরবরাহ (ঝঁঢ়ঢ়ষু) ২. চাহিদা (উবসধহফ)। সরবরাহের উপাদান হলো সেইসব উপাদান যা একটি প্রতিষ্ঠান, সমাজ পর্যটককে প্রদান করে। উদাহরণ স্বরূপঃ সমুদ্র সৈকত, ভ্রমণের সুবিধা, সস্তায় বিভিন্ন দ্রব্য কেনাকাটার সুবিধা। চাহিদার উপাদান হলো- একজন পর্যটক সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যা আশা করে। উদাহরণ স্বরূপ- নিরাপত্তা, নির্জনতা। পর্যটন স্পটগুলোকে এসকল প্রয়োজন পূরণে ঢেলে সাজাতে হবে।

বিভিন্ন উপাদানের সমারোহ ঘটানো

পর্যটন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো- ১. পরিবহন ২. স্থান ৩. বসবাসের সুবিধা। এগুলো ছাড়া আরও অন্যান্য উপাদান হলো- সাংস্কৃতিক বিষয়, ঐতিহ্য, দৃশ্যাবলী, আমোদ-প্রমোদ ব্যবস্থা। সাংস্কৃতিক বিষয় হচ্ছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান, ঐতিহাসিক স্থান ইত্যাদি। ঐতিহ্যের মধ্যে রয়েছে জাতীয় উৎসব, আদিবাসীদের জীবন যাপন, সামাজিক রীতিনীতি। দৃশ্যাবলীর মধ্যে- পার্ক, বন্য জন্তুর আবাস, সমুদ্র সৈকত, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। আমোদ-প্রমোদ ব্যবস্থা যেমন- চিড়িয়াখানা, ক্রীড়ার ব্যবস্থা, সিনেমা, থিয়েটার, ভ্রমণ ইত্যাদি। সমুদ্র সৈকতের আশেপাশে এ উপাদানগুলোর সমারোহ ঘটাতে হবে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুচিন্তিত পদক্ষেপ

পর্যটনে ভৌগোলিক যে উপাদান থাকতে পারে, (জড়নরহংড়হ ১৯৭৬) সেগুলো হলোঃ ১. সহজগম্যতা এবং অবস্থান ২. স্থান ৩. দৃশ্য ৪. জলবায়ু ৫. জীবজন্তু ৬. জনপদের বৈশিষ্ট্য। দৃশ্যের মধ্যে (ক) ভূমিরূপ পাহাড়, পর্বত, প্রবাল দ্বীপ ইত্যাদি। (খ) জলভাগ- হ্রদ, নদ-নদী, জলপ্রপাত ইত্যাদি। জীবজন্তুর ক্ষেত্রে (ক) বন্য জন্তু (খ) শিকারের ব্যবস্থা (গ) মৎস শিকারের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। জনপদের বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে (ক) নগর-গ্রাম (খ) ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য (গ) প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এসকল বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সমুদ্র সৈকতকে ঘীরে পুরো কক্সবাজারকে পরিকল্পিতভাবে সাজাতে সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন

কক্সবাজার এবং সুন্দরবনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। এসব অঞ্চলের রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করতে হবে। অন্যান্য দেশে পর্যটন এলাকায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। আমাদের দেশে তা নেই। এদেশে কোনো পর্যটক এলে তাকে প্রথমেই ঢাকা নামতে হয়। ফলে বিদেশিদের বাড়তি খরচ হয়। তাই অতিদ্রুত কক্সবাজারে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হওয়া প্রয়োজন। কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হওয়ার কথা থাকলেও তা এখনও হয়নি। এখানে বিমানবন্দর হলে বিদেশি পর্যটক বাড়বে। এছাড়া ঢাকা টু চট্টগ্রাম টু কক্সবাজার হাইস্প্রিড ট্রেন বসাতে হবে। বান্দরবন, মধুপুর, ধনবাড়ী, জামালপুর, শেরপুর অঞ্চলে অনেক আকর্ষণীয় নিদর্শন, পাহাড়ী এলাকা, উপজাতি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রয়েছে। এ অঞ্চলের উন্নয়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ দরকার। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই এক্ষেত্রে সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে।

সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারণার অভাবে আমরা পর্যটকদের নিকট এদেশকে উপস্থাপিত করতে পারছি না। যাতায়াত ও বাসস্থান সমস্যা এক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। হোটেলগুলোর মান ও সেবার তুলনায় ভাড়া এবং গরমের মাত্রা অনেক বেশি। এ সমস্যাগুলোর সমাধানে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। ট্যুরিস্ট পুলিশ ব্যবস্থা কার্যকর করা দরকার।

জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি

প্রকৃতি আমাদের প্রতি অনুদার নয়। পর্যটকদের আকর্ষণ করার মত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সুবিধা যথেষ্ঠ রয়েছে। শুধু যেটা প্রয়োজন সেটা হল অবকাঠামোগত সুবিধা তৈরি করা। কক্সবাজারের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি করতে হলে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা, সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি জনসাধারণের মধ্যে পর্যটন সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষা ও প্রচারের যথেষ্ঠ ভূমিকা রয়েছে।

বিশেষ তহবিল গঠন

কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পখাতের কাক্সিক্ষত বিকাশের লক্ষ্যে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য নানা ধরণের সরকারি ইনসেনটিভ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারের রাজস্ব বাজেট থেকে পর্যটন প্রচারণা ও বিপণনের জন্য বরাদ্দ আবশ্যক। ব্যাপক ও ধারাবাহিক প্রচারণা ও বিপণন অব্যাহত রাখতে বিশেষ তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে অধিকতর সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।

নানাবিধ কৌশল গ্রহণ

দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পটগুলো সম্পর্কে রেডিও, টেলিভিশন এবং সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালানো। বেসরকারি খাতে উৎসাহী করার জন্য টেলিফোন, ফ্যান, গ্যাস, বিদ্যুৎ প্রভৃতি সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা। বিদেশি পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান/ দ্বীপগুলি সংরক্ষিত করে বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থা করা। এছাড়া দরকার অবকাঠামোগত উন্নতি, দক্ষ ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের নিকট সুলভ মূল্যে জমি প্রদান করা যাতে হোটেল তৈরি করা যায়। বিনিয়োগকারীদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা যেতে পারে। বিনিয়োগ ও বিপণন কার্যক্রম জোরদার করা সম্ভব হলে বিদেশি পর্যটক আগমন ও আয় কয়েকগুন বৃদ্ধি পাবে।

কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টি

গঁৎঢ়যু (১৯৮৫) দেখান, মানুষের পর্যটন উপকরণ ভোগ আচরণের সাথে পরিবেশের সম্পর্ক বিদ্যমান। করিম (১৯৭৭) উল্লেখ করেন, পরিবেশ পর্যটন উন্নয়নের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। উপযুক্ত পরিবেশের জন্যই গড়ে ওঠে পর্যটন শিল্প। তাই বনায়ন ও বৃক্ষরোপন বৃদ্ধি করে কাক্সিক্ষত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

প্রয়োজন সম্মিলিত প্রয়াস

প্রয়োজন সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ, এতদসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকার শিক্ষা কার্যক্রম, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রাখা উদার দৃষ্টিভঙ্গি, সমাজে অনুকূল পরিবেশ, আভ্যন্তরীণ পর্যটককে ভ্রমণে উৎসাহী করা, সরকারি/বেসরকারি কর্মচারীদের ভ্রমণের টিকিট প্রদান, বিদেশের বিভিন্ন মিশনের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার, পর্যটন স্থানটির উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণ, ট্যুরিস্ট গাইড এবং সকলকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দান, দেশের কুটির শিল্প এবং অন্যান্য সামগ্রী বিক্রয়ের সুব্যবস্থা, বিশেষ সমুদ্র দ্বীপগুলোকে আলাদা পর্যটন দ্বীপ হিসেবে উন্নয়ন, সম্প্রসারণ, পর্যটন সুবিধাদি প্রবর্তন। পর্যটন শিল্পকে পরিচিত ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয়ের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।

আকর্ষণীয় বৈশিষ্টাবলী বৃদ্ধি

কোন স্থানে পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য কতকগুলি বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। যেমন- নৈসর্গিক প্রাকৃতিক দৃশ্য, সমুদ্র সৈকত ইত্যাদি। ভ্রমণ সেবা- বাস, ট্রেন, নৌকা, বিমান ইত্যাদি। খাদ্য সেবা- রেস্তোরাঁ, ক্যাফেটেরিয়া, ফাস্টফুডের দোকান। বাসস্থান- হোটেল, বোর্ডিং হাউস, বিনোদন- থিয়েটার, কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্পোর্টস, নাইটক্লাব। শপিং- স্থানীয় বিভিন্ন আকর্ষণীয় দ্রব্যাদি ক্রয়ের উপরিউক্ত বিষয়াবলীর উপর জোর দেয়া প্রয়োজন।

পৃথক একটি সংস্থা গঠন

পর্যটনকে আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করার জন্য পৃথক একটি সংস্থা গঠন করা দরকার। এই সংস্থা পর্যটন কর্পোরেশনের অধীনে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন পর্যটন উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন করবে।

প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার

এখানে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে যথা- প্রাকৃতিক গ্যাস, গন্ধক, জেরকন, ইলমেনাইট, ব্রুটাইল, ম্যাগনাটাইল, কয়নাইট, চুনাপাথর, বেলেপাথর ইত্যাদি। যা কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি অর্জনসহ শিল্প-কারখানা তৈরি সম্ভব।

কুটির ও মাঝারি শিল্পের প্রসার

লবণ চাষ, লবণ মিল, বরফ কল, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, মৎস্য খাদ্য মিল ইত্যাদি অফুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের আশেপাশে। এগুলো পরিদর্শনের সুযোগ পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করবে।

বৈচিত্রময় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড

কক্সবাজারে সমুদ্র স্নানসহ পর্যটকদের জন্য আলাদা বিনোদনের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে কক্সবাজারকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করা সম্ভব। অন্যান্য আকর্ষণীয় স্পটগুলোতেও আলাদা বিনোদনের কার্যকরী কৌশল প্রণয়ন ও তার সফল বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাও সম্ভব হবে।

আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি

কক্সবাজারের টেকনাফ বন্দরের মাধ্যমে মায়ানমার থাইল্যান্ড এমনকি চীন পর্যন্ত ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানির দ্বারা বাণিজ্যিক খাতের উন্নয়নে বাড়তি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি। এর ফলে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্র প্রসারিত হবে এবং পর্যটনের বিকাশ ঘটবে। এছাড়াও ই-মেইল, ইন্টারনেট কিংবা ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে শক্তিশালী যোগাযোগ গড়ে তোলা সম্ভব।

 প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড ও প্যাকেজ ট্যুর

বিদেশি পর্যটকরা চায় নিরাপত্তা, সামাজিকতা, আতিথেয়তা, সর্বোপরি একজন ইয়ং, মডার্ন, স্মার্ট মুক্ত মনের অধিকারী পর্যটন শিল্পে ডিপ্লে­ামা ডিগ্রিধারী গাইড। উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশের শিক্ষিত, স্মার্ট তরুণ সমাজকে পর্যটনের উপর উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে এ পেশায় নিয়োজিত করা গেলে এক দিকে যেমন পর্যটন শিল্পের গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে অন্যদিকে শিক্ষিত বেকার তরুণ সমাজের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

 সমুদ্র সৈকতে বালি ভাস্কর্য

সমুদ্র সৈকতগুলোতে বালিভাস্কর্য নির্মাণ করার মাধ্যমে পর্যটকদের আকৃষ্ট করা সম্ভব। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের শিল্প সংস্কৃতি প্রদর্শন সহ টিকিটের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতে পারি। প্রায় ১১১ কিলোমিটার দীর্ঘ পৃথিবীর বৃহত্তর সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশের কক্সবাজারের তুলনায় মালদ্বীপের সমুদ্র সৈকত অত্যন্ত ক্ষুদ্রই বলা যেতে পারে। কিন্তু তারপরেও পৃথিবী জুড়ে পর্যটকদের কাছে মালদ্বীপের তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে।

বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করা

শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেই নয় কক্সবাজার হতে পারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উত্তম স্থান। এর মাধ্যমে আমরা বিদেশিদের সাথে ভালো যোগাযোগসহ সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারি।

পর্যটনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি

বর্ষায় এবং শুকনো মৌসুমে দুই বিপরীত রূপের হাওর দর্শন হতে পারে পর্যটনের নতুন আকর্ষণ। শহরে জন্ম ও শহরে বেড়ে ওঠা প্রজন্মকে গ্রামের সাথে পরিচিত করে তোলাটাও হতে পারে পর্যটনের নতুন ক্ষেত্র। কৃষি, কৃষক এবং গ্রামের মানুষের সরল জীবন দর্শন হতে পারে অভ্যন্তরীণ পর্যটনের উৎস। নৌ ভ্রমণ হতে পারে পর্যটনের আরেক পদক্ষেপ। নতুন প্রজন্ম দেশের নদীগুলোকে চিনবে এবং ইতিহাস জানবে।

সময়োপযোগী ও পরিকল্পনামাফিক পদক্ষেপ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশে রয়েছে একাধিক পর্যটন কেন্দ্র। এছাড়া রয়েছে সম্ভাবনাময় আরো বহু পর্যটন স্পট। সময়োপযোগী ও পরিকল্পনামাফিক পদক্ষেপ গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে এসব পর্যটন স্পট যদি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে নবদিগন্তের সূচনা হবে। তবে পর্যটন বলতে শুধু ঘোরাফেরার ধারণা পরিবর্তন করে একে বহুমুখী করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। পর্যটনের বহু শাখা-প্রশাখার মধ্যে বিনোদন পর্যটন, শ্রান্তি বিনোদন পর্যটন, স্বাস্থ্য পর্যটন, শিক্ষা পর্যটন, সাংস্কৃতিক পর্যটন, ইভেন্ট পর্যটন এবং মাইস (গওঈঊ) পর্যটনের বাইরেও ইকো পর্যটন, কৃষিভিত্তিক পর্যটন, শিল্পভিত্তিক পর্যটন, সংস্কৃতিভিত্তিক পর্যটন, ক্রীড়া পর্যটন, নৌ-পর্যটন, হাওর পর্যটন, ধর্মভিত্তিক পর্যটনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তরুণ জনগোষ্ঠীর এগিয়ে আসা

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প কালের পরিক্রমায় বহুদূর এগিয়েছে। মনমানসিকতার পরিবর্তন, অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং প্রো-অ্যাক্টিভ কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প বহুদূর এগিয়ে যাবে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব দূর হয়ে দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে এ দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে।

 বিদেশমুখী প্রবণতা কমানো

ট্যুর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে শুধু মালয়েশিয়াতেই বাংলাদেশ থেকে এক লাখ ৩৫ হাজার পর্যটক গেছেন। থাইল্যান্ডে গেছেন ৮৫ হাজার। ভারতে যাচ্ছেন প্রতিবছর পাঁচ থেকে ছয় লাখ। ৩০ থেকে ৪০ হাজার যাচ্ছেন সিঙ্গাপুরে। এ ছাড়া নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কায় ভিসা লাগে না বলে সেখানেও যাচ্ছেন বিপুল পর্যটক। তার পরও দেশের ভেতরে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। দেশেই যাতে উচ্চবিত্তরাও বেড়ানোর মতো আকর্ষণীয় পরিবেশ পায় এটি নিশ্চিত করতে হবে এবং বিদেশে যাবার চেয়ে দেশেই ভ্রমণের প্রবণতা বাড়াতে হবে।

ব্রান্ডিং করা

আমাদেরকে ব্র্যান্ডিং করতে হবে। প্রচার করতে হবে কক্সবাজার পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ সমুদ্র সৈকত কিংবা ম্যানগ্রোভ বনের সৌন্দর্য তুলে ধরতে হবে। পৃথিবীর কাছে আমাদের খাবার, ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি তুলে ধরতে হবে। টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যায় ভিন দেশের অনুকরণে রিয়্যালিটি শো কিন্তু দেখা যায় না নিজের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার কোনো প্রয়াস। কক্সবাজারে রয়েছে প্রায় ৪৫০টির মতো হোটেল যার বেশিরভাগেই নেই উন্নত আধুনিক ব্যবস্থা। নেই সুইমিং পুল, ক্যাসিনো কিংবা কোন বার। তাহলে বিদেশি পর্যটকরা আকর্ষিত হবে কেমন করে? নেই পর্যাপ্ত সিকিউরিটি ব্যবস্থা। এসব সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী ব্রান্ডিং করতে হবে।

 বিদেশি পর্যটকদের সম্মান দেখানো

বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০০৮ সালে ৪ লাখ ৬৭ হাজার এবং ২০০৯-২০১২ সাল নাগাদ গড়ে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে এসেছেন। ২০১৪ সালে এসেছেন ১ লাখ ২৫ হাজার। বাংলাদেশ তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কাজে লাগিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশের মধ্যে অন্যতম একটি দেশ হতে পারে। সেজন্য দেশের স্বার্থেই আমাদের চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আনতে হবে। পর্যটকদের এমনভাবে সম্মান দেখাতে হবে যেন তারা নিজ দেশে ফিরে গিয়েও আবারও বাংলাদেশে ভ্রমণে ইচ্ছুক হয়।

উপকূলীয় এলাকাকে ক্ষেত্রভূমি করা

রশিদ (১৯৮৮) তার গবেষণায় বলেন, ভবিষ্যতে যদি পর্যটন ব্যবস্থার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয় তবে কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন ও উপকূলীয় সম্পূর্ণ এলাকা পর্যটনের ক্ষেত্রভূমিতে পরিণত হবে। পর্যটন শিল্পকে বাদ দিয়ে উন্নত বাংলাদেশের কল্পনাই করা যায় না। অনিন্দ্য সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রচুর বিদেশি পর্যটকের আগমন ঘটানো সম্ভব।

কক্সবাজারকে আলাদা গুরুত্ব প্রদান

বাংলাদেশের পর্যটনের রাজধানী কক্সবাজারের নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যাবলীর আকর্ষণে অনেক বিদেশি পর্যটকের আগমন পরিলক্ষিত হয়। এখানকার প্রাকৃতিক নির্জনতা বিদেশি-পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। পৃথিবীর দীর্ঘতম সৈকত অযুত সম্ভাবনাময় কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত সম্পূর্ণটাই যেন একটি পর্যটন কেন্দ্র। দেশের উন্নতির জন্য এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ, বিস্তৃত সমুদ্র সৈকত জুড়ে রয়েছে সোনালী বালুকা রশ্মি। সৈকতে ফেনিল ঢেউয়ের আছড়ে পড়া এবং বিকালে সূর্যাস্ত উপভোগ করা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ঈর্ষণীয় সমৃদ্ধ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতকে কাজে লাগাতে হবে।

সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা

দেশের সমৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পটগুলোকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ পর্যটন উন্নয়ন এবং এ শিল্প উন্নয়নে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যুগের চাহিদা অনুযায়ী এই শিল্পকে গড়ে তোলা সময়ের একান্ত অনিবার্য দাবি। এর যৌক্তিকতা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।

 ব্যক্তি মালিকানাধীন পরিচালনা বৃদ্ধি

বাংলাদেশে পর্যটনকে ঘীরে অর্থনৈতিক ও জাতীয় আয়ের উল্নেখযোগ্য পরিবর্তন সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রয়োজন সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ। যদি পর্যটনকে ব্যক্তি মালিকানাধীন পরিচালনায় আনা হয় তব পর্যটনের প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হবে। (হাকিম আলী, ১৯৮৭)। সরকারি উদ্যোক্তারাই পর্যটনের ভিত মজবুত করতে পারে। এর প্রমাণ হচ্ছে- প্রতিবছর গড়ে যে পাঁচ থেকে ছয় লাখ পর্যটক আসে তাদের মধ্যে শুধু বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি দেখতে আসেন ৪০ হাজারের মতো। টোয়াবের সদস্যরা নিজ উদ্যোগে এ সব অতিথি সংগ্রহ করছে।

 দূতাবাসগুলোকে উন্নয়নে যুক্ত করা

পর্যটন শিল্পকে এগিযে নিতে পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। আর্থিক সহায়তা করতে হবে। এই খাতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করতে হবে। এছাড়া পর্যটন শিল্প সম্পর্কে ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব রয়েছে। বিমানবন্দর, রেলস্টেশন এবং বিদেশি দূতাবাসগুলোকে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে যুক্ত করতে হবে। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব দূর হলে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে সম্ভাবনাময় এই শিল্প।

সরকারের বিশেষ নজর দেয়া

আমরা পর্যটন সেক্টরকে ব্র্যান্ডিং করতে পারিনি। আন্তর্জাতিক মেলাগুলোতে আমাদের ঠিকভাবে রিপ্রেজেন্ট করা উচিত। বিদেশি মিশন কার্যকরী করতে হবে। পর্যটন এমন একটি খাত যার মাধ্যমে দেশে ডলার আসছে, তবে ডলার বাইরে যাচ্ছে না। সবই দেশে থেকে যায়। অথচ তৈরি পোশাক শিল্পে ১০০ ডলার আসলে তার বিপরীতে ৬০ থেকে ৭০ ডলার দেশের বাইরে চলে যায়। তাই পর্যটন খাতের দিকে সরকারের নজর দিতে হবে। ব্র্যান্ডিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। বিদেশে আমাদের দূতাবাসগুলোতে পর্যটন শিল্প নিয়ে মেলার আয়োজন করতে হবে। বাজেটে এই খাতের জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

ইতিবাচক প্রচারণা বৃদ্ধি

আন্তর্জাতিক টিভি চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন দিতে হবে। দেশের অনেক স্থানেই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভালোলাগার মত অনেক কিছ্ইু রয়েছে। কিন্তু প্রচারের ক্ষেত্রে দীনতা থাকায় বহু পর্যটকদের আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ সম্পর্কে বিদেশিরা ব্যাপকভাবে জানতেও পারছে না। কারণ বহির্বিশ্বে এ সংক্রান্ত কোন প্রচার নেই। অথচ পৃথিবীর শীর্ষ সব শ্রেণীর গণমাধ্যমে মালয়েশিয়া ট্যুরিজমের বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ ধরণের কোন প্রচার নেই। এমনকি আমাদের দেশের অনেকেই অবকাশকালীন সময়ে বিদেশে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে গমন করেন। কিন্তু দেশের আভ্যন্তরীণ পর্যটন শিল্প দারুণভাবে উপেক্ষিত। সেজন্য প্রচারণা বাড়াতে হবে।

শুধু বিদেশি পর্যটকদের নির্ভরতায় না থেকে ‘দেশকে চিনুন, দেশকে জানুন’, ‘ঘুরে দেখুন বাংলাদেশ-ভালোবাসুন বাংলাদেশ’- এরকম দেশাত্মবোধক স্লোগানে দেশের মানুষকে দেশ দেখানোর লক্ষ্যে ব্যাপক প্রচারণা চালানো দরকার। অবকাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতা, পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক প্রচার নেই বলে সম্ভাবনাময় এই খাতটি পিছিয়ে আছে। পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, বিশ্বের ৭০টি দেশের নাগরিকদের জন্য বাংলাদেশে আসতে ‘অন-অ্যারাইভাল ভিসা’-সুবিধা আছে। কিন্তু পর্যটন নিয়ে কোনো প্রচার নেই। ফলে এসব দেশের নাগরিকেরা এ দেশে আসছেন না। আবার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ নানা সমস্যার কারণে দেশের সচ্ছল মানুষও ঘুরতে চলে যাচ্ছেন বিদেশে।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে পর্যটন শিল্পকে। বিদেশি পর্যটকরা এই বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাই রাজনৈতিক অস্থিরতা মোটেই কাম্য নয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে বিদেশি পর্যটকদের পাশাপাশি দেশি পর্যটকরাও ভ্রমণে উৎসাহিত হন। এজন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কোনো বিকল্প নেই।

 পর্যটন নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করা

বাংলাদেশে বর্তমানে বেসরকারি উদ্যোগে বেশকিছু রিসোর্ট এবং বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। নিঃসন্দেহে পর্যটন শিল্পের বিকাশে এগুলোর উপস্থিতি আশাব্যঞ্জক। এভাবেই ধীরে ধীরে হয়তো সারাদেশেই একদিন গড়ে উঠবে এদেশের পর্যটন নেটওয়ার্ক। যতো বেশি রিসোর্ট আর পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠবে, ততোই এদেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে।

দেশের সংস্কৃতিকে বিশ্বব্যাপী তুলে ধরা

একজন পর্যটক যখন কোনো দেশে যায় তারা শুধু পাঁচ তারকা হোটেলে খাওয়া-দাওয়া বা ঘুমাতে যায় না তারা সেদেশের আচার অনুষ্ঠান, সংস্কৃতি, জীবনপ্রণালী, রন্ধনপ্রণালী দেখে আর নিয়ে আসে অভিজ্ঞতা। জাতীয় সংস্কৃতি মস্তবড়ো জাতীয় সম্পদ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহ্য হাজার বছরের বেশি পুরনো। ৭ম শতাব্দীতে লেখা বৌদ্ধ দোহার সঙ্কলন চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত। মধ্যযুগে বাংলা ভাষায় কাব্য, লোকগীতি ও পালাগানের প্রচলন ঘটে। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বাংলা কাব্য ও গদ্যসাহিত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে।

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ বাংলা ভাষায় সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। বাংলার লোক সাহিত্যও সমৃদ্ধ; মৈমনসিংহ গীতিকায় এর পরিচয় পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সংগীত বাণীপ্রধান; এখানে যন্ত্রসংগীতের ভূমিকা সামান্য। গ্রাম বাংলার লোক সঙ্গীতের মধ্যে বাউল গান, জারি, সারি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মুর্শিদী, গম্ভীরা, কবিগান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। গ্রামাঞ্চলের এই লোকসঙ্গীতের সাথে বাদ্যযন্ত্র হিসাবে মূলত একতারা, দোতারা, ঢোল, বাঁশি ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। নৃত্যশিল্পের নানা ধরন বাংলাদেশে প্রচলিত। এর মধ্যে রয়েছে উপজাতীয় নৃত্য, লোকজ নৃত্য, শাস্ত্রীয় নৃত্য ইত্যাদি। দেশের গ্রামাঞ্চলে যাত্রা পালার প্রচলন রয়েছে। ঢাকা-কেন্দ্রিক চলচ্চিত্র শিল্প হতে প্রতি বছর প্রায় ৮০ হতে ১০০টি বাংলা চলচ্চিত্র তৈরি করা হয়।

বাংলাদেশের রান্না-বান্নার ঐতিহ্যের সাথে ভারতীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের রান্নার প্রভাব রয়েছে। ভাত, ডাল ও মাছ বাংলাদেশিদের প্রধান খাবার, যেজন্য বলা হয়ে থাকে মাছে ভাতে বাঙালি। দেশে ছানা ও অন্যান্য প্রকারের মিষ্টান্ন, যেমন রসগোল্লা, চমচম, সন্দেশ, কালোজাম বেশ জনপ্রিয়। বাংলাদেশের নারীদের প্রধান পোষাক শাড়ি। অল্পবয়স্ক মেয়েদের মধ্যে, বিশেষত শহরাঞ্চলে সালোয়ার কামিজেরও প্রচলন রয়ে়ছে। পুরুষদের প্রধান পোষাক লুঙ্গি, তবে শহরাঞ্চলে পাশ্চাত্যের পোষাক শার্ট-প্যান্ট প্রচলিত। বিশেষ অনুষ্ঠানে পুরুষরা পাঞ্জাবী-পায়জামা পরিধান করে থাকেন।

এখানকার প্রধান সামাজিক অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মুসলমান সম্প্রদায়ের উৎসব ঈদুল ফিত্র ও ঈদুল আজহা, এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজা। বৌদ্ধদের প্রধান উৎসব বুদ্ধ পূর্ণিমা, আর খ্রীস্টানদের বড়দিন। এছাড়া বাংলাদেশের সর্বজনীন উৎসবের মধ্যে পহেলা বৈশাখ প্রধান। গ্রামাঞ্চলে নবান্ন, পৌষ পার্বণ ইত্যাদি লোকজ উৎসবের প্রচলন রয়েছে। এছাড়া স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এবং ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে শহীদ দিবস পালিত হয়।

খেলাধূলার মাধ্যমে দেশকে পরিচিতি করানো

বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু বা কাবাডি। এই খেলার মতোই বাংলাদেশের অধিকাংশ নিজস্ব খেলাই উপকরণহীন কিংবা উপকরণের বাহুল্যবর্জিত। উপকরণবহুল খুব কম খেলাই বাংলাদেশের নিজস্ব খেলা। উপকরণহীন খেলার মধ্যে এক্কাদোক্কা, দাড়িয়াবান্দা, গোল্লাছুট, কানামাছি, বরফ-পানি, বউচি, ছোঁয়াছুঁয়ি ইত্যাদি খেলা উল্লেখযোগ্য। উপকরণের বাহুল্যবর্জিত বা সীমিত সহজলভ্য উপকরণের খেলার মধ্যে ডাংগুলি, সাতচাড়া, রাম-সাম-যদু-মধু বা চোর-ডাকাত-পুলিশ, মার্বেল খেলা, রিং খেলা ইত্যাদির নাম করা যায়।

সাঁতার, বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায় ছাড়া, সাধারণের কাছে আলাদা ক্রীড়া হিসেবে তেমন একটা মর্যাদা পায় না। যেহেতু বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবশ্যকীয়ভাবে সাঁতার শিখতে হয়। গৃহস্থালী খেলার মধ্যে লুডু, সাপলুডু, দাবা বেশ প্রচলিত। এছাড়া ক্রিকেট ও ফুটবলের মতো বিভিন্ন বিদেশি খেলাও এদেশে বেশ জনপ্রিয়। অন্যান্য খেলার মধ্যে হকি, হ্যান্ডবল, সাঁতার, কাবাডি এবং দাবা উল্লে­খযোগ্য। এসব খেলায় ভালো করার পাশাপাশি দেশীয় ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোকেও পরিচিত করানো যেতে পারে।

পর্যটন স্পটগুলোকে সংরক্ষণ ও উন্নয়ন

পর্যটন স্পটগুলোকে সংরক্ষণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে এ খাত থেকে বিপুল আয় করা সম্ভব। একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে সরকারের বৈদেশিক আয় হয়েছে ৪ হাজার ১৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০১০ সালে এ শিল্পে বৈদেশিক আয় ছিল ৫৫৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা, যা ২০১৪ সালে বেড়ে হয় ১ হাজার ২২৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এছাড়া ২০১১ সালে ৬২০ কোটি ১৬ লাখ, ২০১২ সালে ৮২৫ কোটি ৪০ লাখ এবং ২০১৩ সালে ৯৪৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বিদেশি পর্যটকদের মাধ্যমে আয় হয়েছে সরকারের।

বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের তথ্যমতে, ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরের মে ২০১৬ পর্যন্ত এই খাত থেকে আয় হয়েছে ৭১৪৩.৬২ লাখ টাকা। যা লক্ষ্য অর্জনের শতকরা ৬৯.৮৭%। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল এ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের মতে, ২০১৩ সালে পর্যটন খাতে ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ১ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে ২ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। সেই হিসাবে ২০২৪ সালে মোট কর্মসংস্থানের মধ্যে পর্যটন খাতের অবদান দাঁড়াবে ১ দশমিক ৯ শতাংশ।

প্রকৃতি প্রদত্ত উপকরণকে রূপান্তর

শুধু প্রকৃতি প্রদত্ত উপকরণকে রূপান্তরের মাধ্যমে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করলেই বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের অগ্রগতি সম্ভব। এদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ হচ্ছে- লালবাগ কেল্লা, মুঘল ঈদগাহ, আহসান মঞ্জিল, ষাট গম্বুজ মসজিদ, সোনারগাঁও, উয়ারী বটেশ্বর, ময়নামতি, পাহাড়পুর, কান্তজীড় মন্দির, মহাস্থানগড়। সমুদ্র সৈকত হচ্ছে- কক্সবাজার, পতেঙ্গা, পারকী, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, কুয়াকাটা, কটকা। পাহাড় ও দ্বীপ হচ্ছে- রাঙামাটি হ্রদ জেলা, কাপ্তাই হ্রদ শহর, বান্দরবন, খাগড়াছড়ি, মহেশখালী দ্বীপ, সোনাদিয়া দ্বীপ।

ঐতিহাসিক স্থানসমূহঃ জাতির পিতার সমাধিসৌধ, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, জাতীয় কবির সমাধিসৌধ, কার্জন হলো, বলধা গার্ডেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, পুরাতন হাইকোর্ট ভবন, বাহাদুর শাহ পার্ক, দীঘাপতিয়া রাজবাড়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কবরস্থান, শিলাইদহ কুঠিবাড়ী, সাগরদাড়ি, মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ, ত্রিশাল, গান্ধী আশ্রম। বন ও জলাবন হচ্ছে- সুন্দরবন, রাতারগুল জলাবন।

অন্যান্য আকর্ষণীয় স্থানসমূহ হচ্ছে- জাতীয় সংসদ ভবন, বঙ্গভবন, শাঁখারি বাজার, সদরঘাট, রমনা পার্ক, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, জাতীয় চিড়িয়াখানা, জাতীয় উদ্যান, বাটালী পাহাড়, যমুনা ব্রিজ, মাধবকুন্ডু, জাফলং। প্রথমেই আমাদের পর্যটন শিল্পকে ব্র্যান্ডিং করতে হবে। প্রচার করতে হবে কক্সবাজার পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ সমুদ্র সৈকত কিংবা ম্যানগ্রোভ বনের সৌন্দর্য। পৃথিবীর কাছে আমাদের খাবার, ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি তুলে ধরতে হবে।

কর্মকর্তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ

পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সংশ্লি­ষ্ট কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আরও উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। না হলে পর্যটন প্রসারের উদ্দেশ্যে হোটেল, মোটেল, রেস্তরাঁ, রাস্তা-ঘাট নির্মাণের ফলে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব হলেও সামগ্রিক উন্নতি হবে না। দেশি-বিদেশি সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায় এই শিল্পের প্রসারের মাধ্যমে। পর্যটন একটি অদৃশ্য রফতানি শিল্প। পর্যটন শিল্পকে অর্থনৈতিকভাবে অনুকূল করতে হলে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত আনুষঙ্গিক বিষয়, যেমন- বিদ্যুত, পানি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি উন্নতমানের করতে হবে।

 পরিবেশ দূষণ রোধ করা

সংকীর্ণ স্বার্থে সাময়িক লাভের আশায় আমরা পরিবেশ দূষণ করছি। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, টেকনাফ, কুয়াকাটা, সুন্দরবনের সমুদ্র সৈকত, রাঙ্গামাটির সুভলং ঝরনা এবং বান্দরবানের শৈলপ্রপাত ও বগা লেক তথা সর্বত্র পরিবেশ দূষণ রোধ করতে হবে। এছাড়া নদীভরাট, বালি উত্তোলন, পাথর উত্তোলন, গাছ কাটা, পাহাড় কাটা রোধ করতে হবে।

 প্রযুক্তি বান্ধব পর্যটন সম্প্রসারণ

পর্যটন শিল্পের জন্য অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে- প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ইতিহাস ও ঐতিহ্যমন্ডিত স্থান, পাহাড়-নদী-অরণ্য, সমুদ্র সৈকত, মানুষের বিচিত্র জীবনধারা, বন্য প্রাণী, নানা উৎসব ইত্যাদি তার সবই বাংলাদেশ বিদ্যমান। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় আছে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি বহু ঐতিহাসিক স্থান, বহু পুরাকীর্তি। এসব থাকলেই হবে না। পর্যটনকে বিকশিত করে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে প্রয়োজন পেশাদার ও যুগোপযোগী একদল ডিপ্লে­ামা পর্যটন প্রযুক্তিবিদ।

বিশেষায়িত পেশাজীবীর মাধ্যমে সংশ্লি­ষ্ট কাজ সম্পন্ন করার সংস্কৃতি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এদেশের হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বেকারি, ট্রাভেল এজেন্সি ও পর্যটনে উন্নত দেশের সমকক্ষতা অর্জন করতে হলে এই শিল্পগুলোকে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করতে হবে। হোটেল ম্যানেজমেন্ট ও ট্যুরিজম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লে­ামা প্রযুক্তিবিদ্যা শিক্ষা পারে ঐতিহ্যবান্ধব পর্যটনব্যবস্থা গড়তে।

অগ্রাধিকার শিল্প-খাত হিসেবে বিবেচনা

টেকসই পর্যটন খাত গড়ে তোলার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের আন্তরিকতায় প্রণীত ‘জাতীয় শিল্পনীতি-২০১৬’-তে পর্যটনশিল্পকে অগ্রাধিকার শিল্প-খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটিকে কাগজে-কলমে না রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে। পর্যটনকে এগিয়ে নিতে ১৯৯২ সালে প্রথম জাতীয় পর্যটন নীতিমালা করা হয়। এতে বলা হয়েছিল, বিদেশি পর্যটকদের আধুনিক ও চিত্তবিনোদনের সব সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা হবে।

জাতীয় পর্যটন নীতিমালা তৈরির ১৮ বছর পর ২০১০ সালে তা হালনাগাদ করা হয়। আগের নীতিমালায় যা ছিল, তার সবই স্থান পেয়েছে নতুন নীতিমালায়। কক্সবাজার, টেকনাফ, সোনাদিয়াকে ঘিরে নানা পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। সিলেটের জাফলং, মাধবকুন্ড, শ্রীমঙ্গল, লাউয়াছড়া, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড, সুনামগঞ্জ-সিলেটের হাওর, নেত্রকোনার বিরিসিরি, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তীরবর্তী আকর্ষণীয় স্পট ও পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটনের জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা আছে। কিন্তু চোখে পড়ার মতো কোনো উদ্যোগ বা বিনিয়োগ নেই।

প্রত্নস্থলগুলোকে সুপরিচিত করানো

প্রাগৈতিহাসিক যুগপর্ব থেকে শুরু করে প্রাচীন, মধ্য ও ঔপনিবেশিক যুগ পর্যন্ত নানা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। বিগত দু’দশকে এদেশে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় নতুন গতি এসেছে। পুরাতাত্ত্বিকরা কুমিল্ল­­­ার লালমাই এবং হবিগঞ্জের চুনারুঘাট অঞ্চলে প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নস্থল খুঁজে পেয়েছেন। বৌদ্ধ ঐতিহ্যের ধারক প্রত্নস্থলসমূহ আবিষ্কৃত হয়েছে দেশের নানা অঞ্চলে। এগুলোর মধ্যে পাহাড়পুর, বিহার ও ময়নামতি অঞ্চলের বিহারসমূহ অনেকটা পরিচিত হলেও প্রাচীন বৌদ্ধ ও হিন্দু ঐতিহ্য বুকে নিয়ে যশোরে অবস্থিত ভরতভায়না প্রত্নস্থল এখনো সাধারণে সুপরিচিত নয়।

গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন প্রত্নস্থল মহাস্থানগড় ইতিহাসের পাদপীঠে চলে এলেও নরসিংদীর উয়ারি-বটেশ্বর প্রত্নস্থল এখন নতুন সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে। বাংলাদেশ জুড়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংস্কারকৃত এবং ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় রয়েছে মধ্যযুগের মসজিদ, মাদ্রাসা, সমাধি, দুর্গ, প্রাসাদ ইত্যাদি। মধ্যযুগের কয়েকটি নতুন প্রত্নস্থলও আবিষ্কৃত হয়েছে। দেশের নানা স্থানে রয়েছে ঔপনিবেশিক যুগের ইমারত। এগুলোর মধ্যে উল্লে­খযোগ্য হচ্ছে মন্দির, ধ্বংস-প্রায় বা সংরক্ষিত জমিদার বাড়ি ও অন্যান্য ভবন।

 টেকসই পর্যটন নিশ্চিত করা

টেকসই পর্যটন টেকসই অর্থনীতির চাবিকাঠি। টেকসই পর্যটন বলতে আমরা বলতে পারি পর্যটনের উপাদান, উপকরণ ও আকর্ষণগুলো যথাযথ ব্যবহার করে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, জীবনপ্রণালী ও পরিবেশের কোনো রকম ক্ষতি না করে অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভবান হওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ব্যবহার ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা। সহজ কথায় আমরা আমাদের সুন্দরবন, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, নিঝুমদ্বীপ, রাঙ্গামাটি, সিলেট, বান্দরবান ইত্যাদি আকর্ষণীয় জায়গাগুলোর সৌন্দর্য শুধু নিজেরাই উপভোগ করবো না, সেগুলো পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উপকারিতার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণই হল টেকসই পর্যটনের মূল কথা।

পর্যটন উৎসাহিতকরণে সহায়ক উদ্যোগ

‘ভিজিট বাংলাদেশ-এখানে জীবন’ ক্যাম্পেইনের জন্য সম্প্রতি নতুন টিভিসি ইউটিউবে প্রকাশ করেছে ট্যুরিজম বোর্ড। যেখানে আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এবং জীব-বৈচিত্র্যকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। টিভিসির শুরুতে দেখা যায়- প্রথমে গ্রাম বাংলার পুকুরে ভাসমান পদ্ম, শাপলা শালুক আর শেষ দৃশ্যে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারকে দেখানো হয়েছে। আছে ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন উৎসবের দৃশ্য, জেলের মাছ ধরা, হাতির পালের ঘোরাঘুরি, উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ, অতিথি পাখির কল-কাকলী, নদীতে দুরন্ত কিশোরের ঝাঁপ, সুন্দরবন এবং হরিণ, মহিষের সঙ্গে গ্রামীণ জীবন।

বাদ যায়নি লালন-হাছন-রাধারমন কিংবা উকিল-করিমের বাউলা গানও; সমুদ্রের ঢেউয়ে সাফিং খেলা, পাহাড়ি ঝর্নার মনোরম দৃশ্য। বাংলাদেশে অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলার ফাঁকে ফাঁকে স্টার স্পোর্টস- এ টিভিসিটির প্রচারণা হয়েছে। এরইমধ্যে ট্যুরিজম বোর্ডের ওয়েবসাইটে ও ভিজিট বাংলাদেশের ফেসবুক পেজে বিজ্ঞাপনটি বেশ সাড়া ফেলেছে। ট্যুরিজম বোর্ড ভিজিট বাংলাদেশ, স্কুল অব লাইফ, ল্যান্ড অব স্টোরিজ, ল্যান্ড অব রিভারের মতো বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচার করে বিশ্বে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছে। এসব উদ্যোগ বাড়াতে হবে, অব্যাহত রাখতে হবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে যাতে থেমে না যায়।

 হোটেলে অনৈতিক কাজ নিয়ন্ত্রণ

দেশের বিকাশমান খাত ‘হোটেল’ ব্যবসাতে হোটেল পরিচালনায় পুলিশের সহযোগিতা অপরিহার্য হয়ে ওঠেছে। হোটেলে অনৈতিক কাজ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পুলিশের সহযোগিতা নেয়া হয়। রাজধানীর সকল হোটেলে রেজিস্টার খাতা মেইনটেইন করা হয়। এই রেজিস্টার খাতায় হোটেলে কারা আসে, যাতে তাদের সম্পর্কে পূর্ণ বিবরণ থাকে। এতে করে কেউ কোন ধরনের অপরাধ করতে তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে। অপরাধ দমনে- হোটেলগুলোতে পুশিলের যে নীতিমালা রয়েছে তা মানা হয়। দু’ একদিন পরপরই পুলিশের টহল টিম হোটেল পরিদর্শনে যেয়ে থাকে। তবে এসবের ফাঁকফোকর দিয়ে কিছু কিছু অনৈতিক কাজ সংগঠিত হয়ে থাকে। এ ধরনের কাজের সঙ্গে হোটেলের কর্মকর্তা ও কর্মচারী এং অসাধু পুলিশ জড়িত রয়েছে। অর্থাৎ পুলিশকে ম্যানেজ করে অবৈধ কাজ হোটেলে হয়ে থাকে।

 মানব পাচার বন্ধ করা

রাজধানী ঢাকা, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বেশি কিছু হোটেল এখন মানব পাচারে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাজধানীর নবাবপুর রোড, ইংলিশ রোড, পল্টন, মহাখালী, মগবাজার ও বনানীর কিছু হোটেল মানব পাচারকারীরা ব্যবহার করছে। মানব পাচারের সঙ্গে জড়িতরা দেশের ১৫ জেলা থেকে এদের নিয়ে এসে সং­িশ্লষ্ট এলাকার হোটেলগুলোতে উঠিয়ে থাকে। যাদের আকাশ পথে পাচার করে তাদের এখানেই রেখে দেয়। আর যাদের সমুদ্র পাথে পাচার করে তাদের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার নিয়ে যায়। এসব হোটেলের ভাড়া মাত্র মাত্র ৫০০ টাকা। ভাড়া কম হওয়ায় এসব হোটেলে উঠিয়ে থাকে। মানব পাচারে সঙ্গে এসব হোটেলের কর্মকর্তারা জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।

হোটেলে সেক্স ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে রাখা

বড় হোটেলগুলোতে হাই সোসাইটি গার্ল ও নামি-দামি মডেলরা যাতায়াত করে থাকে। মধ্যমানের হোটেলগুলোতে কর্লগার্ল এবং নিম্নমানের হোটেলগুলোতে পতিতারা যাতায়াত করে। হোটেল রেডিসন ও পুর্বানীতে ডিজেদের দৌরাত্ম্য রয়েছে। কাস্টমার টানতে অনেক হোটেলে শিশার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে টানবাজার ও ইংলিশ রোডের পতিতালয় উঠিয়ে দিলেও সেক্স ব্যবসা চলছে বিভিন্ন হোটেল ও গেস্ট হাউসে। বিভিন্ন হোস্টেল গেস্ট হাউস ও বাসা মিনি পতিতালয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

মগবাজার, মহাখালী ও বনানীর হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলোতে পতিতাদের যাতায়াত রয়েছে। তাছাড়া ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজারের হোটেলগুলোতে পতিতাদের যাতায়াত রয়েছে। খদ্দের টানতে হোটেল কর্তৃপক্ষ এদের নিয়ে আসে। বড় বড় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের মনোচাহিদা পূরণের জন্য থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন থেকে সেদেশের সুন্দরী কলগার্ল এনে বড় হোটেলগুলোতে রাখা হচ্ছে। সেখান থেকে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের পছন্দমতো কলগার্ল সরবরাহ করা হচ্ছে। ইতিবাচক ইমেজ ধরে রাখার স্বার্থে এসব নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

‘হোটেল ব্যবসা’র নেতিবাচক এ বিষয়গুলো দূর করতে সরকার সবসময় সচেষ্ট থাকতে হবে। রাজধানীর অনেকগুলো হোটেলে পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশ করে মাদক ব্যবসা চলছে। যেসব হোটেলে পতিতাদের যাতায়াত রয়েছে সেসব জায়গায় মাদক পাওয়া যায়। ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাজা সবই পাওয়া যায় এসব হোটেল। ২০০ টাকা থেকে শুরুর করে ২০০০ টাকার মাদকদ্রব্য এসব হোটেলে বিক্রি করা হয়। মাদক দ্রব্য-হোটেলগুলোতে আনা হলেও অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ নীরব থাকে। মাঝে মধ্যে চালানো অভিযানে যাদের ধরা হয় পরে নেগোসিয়েশন করে ছেড়েও দেয়া হয়।

About আনিসুর রহমান এরশাদ

শিকড় সন্ধানী লেখক। কৃতজ্ঞচিত্ত। কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী। ভেতরের তাগিদ থেকে লেখেন। রক্ত গরম করতে নয়, মাথা ঠাণ্ডা ও হৃদয় নরম করতে লেখেন। লেখালেখি ও সম্পাদনার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সময়ে পাক্ষিক-মাসিক-ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন, সাময়িকী, সংকলন, আঞ্চলিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ ও জাতীয় দৈনিকের সাথে সম্পর্ক। একযুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। পড়েছেন মিডিয়া ও জার্নালিজমেও। জন্ম টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার হাতীবান্ধা গ্রামে।

View all posts by আনিসুর রহমান এরশাদ →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *