পরিবারেরই বিকশিত রূপ রাষ্ট্র

আনিসুর রহমান এরশাদ

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে দুনিয়ার শুরু থেকেই পরিবার প্রথা চালু ছিল। নৃবিজ্ঞানী ম্যালিনাস্কির সাথে সমাজবিজ্ঞানীরা কণ্ঠ মিলিয়ে বলেছেন, যেখানে মানুষ দেখা গেছে সেখানে পরিবারও দেখা গেছে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের গঠন ও বৈচিত্র্যপূর্ণ নানামুখী পরিবর্তন এবং বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন সংস্কৃতির পরিবারের ভূমিকা ভিন্ন ভিন্নভাবে পরিলক্ষিত হয়।

গঠন ও কর্মে বিভিন্ন পরিবার বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। প্রাচীনকালেও নিরাপত্তা লাভ  ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য পারিবারিক জীবন অপরিহার্য ছিল। পরিবারেই সন্তান বৈধভাবে জন্মগ্রহণ করে থাকে। তাকে সমাজে স্থান নির্ধারণ করে দেয়। অর্থনৈতিক ভিত্তি, সামাজিক মর্যাদা এমনকি ভবিষ্যৎ পেশা ও জীবিকাবৃত্তিও নির্ধারণ করে দেয়। প্রতিটি মানুষের দৈহিক ও মানসিক চাহিদা পূরণ করে পরিবার।

পৃথিবীর প্রাচীনতম সংগঠন পরিবার হলো সমাজের মৌলিক কোষ বা সেল, সামাজিক জীবনের প্রথম ক্ষেত্র বা স্তর, মানব সমাজের মৌলিক ভিত্তি, শান্তি-সুখের নীড়, পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। পরিবার হচ্ছে- একটি পবিত্র সংস্থা, এক স্থায়ী ও অক্ষয় মানবীয় সংস্থা, সভ্যতার একক, মানুষ গড়ার মূল কেন্দ্র, সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক অনন্য কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান, সমাজ গঠনের প্রধান ভিত্তি ও উত্তম সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং মানব বংশের জন্যে এক উপযুক্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। পরিবার  উদ্যম-প্রেরণা ও প্রশান্তির ক্ষেত্র; ভালো সমাজের জন্য পরিবারের কোনো বিকল্প নেই।

পরিবার হচ্ছে ক্ষুদ্র-সমাজ; বৃহত্তর সমাজের ভিত্তি; শিশুদের মানস গঠনের প্রথম স্তর। কঠিন পৃথিবীর বুকে আপন অস্তিত্ব বিকাশের এক টুকরো মরূদ্যান। পরিবার এক-একটি দুর্গ, মুখ্যতম প্রতিষ্ঠান, সমাজ জীবনের শাশ্বত বিদ্যালয়, একটি সার্বজনীন পদ্ধতি এবং সামাজিক জীবনের মৌলিক ভিত্তি। সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন প্রতিষ্ঠান পরিবার রাষ্ট্রেরও প্রথম স্তর, সামগ্রিক জীবনের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তরপরিবারেরই বিকশিত রূপ রাষ্ট্র। পরিবার ও সমাজের সুসংবদ্ধ দৃঢ়তার উপর রাষ্ট্রের দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব নির্ভরশীল।

ম্যালিনাস্কির মতে, পরিবার হলো একটি গোষ্ঠী বা সংগঠন আর বিবাহ হলো সন্তান জন্ম দান ও পালনের একটি চুক্তি মাত্র।

সামনার ও কেলারের মতে, পরিবার  হলো ক্ষুদ্র সামাজিক সংগঠন-যা কমপক্ষে দুই পুরুষকাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভার বলেন, ‘যৌন সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে সন্তান-সন্ততির জন্মদান ও লালন-পালনের উদ্দেশ্যে যে সংগঠন গড়ে ওঠে তাকে পরিবার বলে।’ অর্থাৎ পিতামাতা যৌন সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে এই সংগঠন গঠন করে এবং সন্তান সন্তানাদি উৎপাদন ও লালন পালনের মাধ্যমে তার অস্তিত্ব ধরে রাখে।

অধ্যাপক এফ নিমকফের মতে, ‘সন্তান-সন্ততিসহ বা সন্তান-সন্ততিহীন দম্পতি দ্বারা সৃষ্ট মোটামুটি স্থায়ী সংস্থাকে পরিবার বলে।’

অধ্যাপক কিম্বল ইয়ং-এর মতে, ‘সমাজ স্বীকৃত পন্থায় সন্তান-সন্ততির অধিকারী এক বা একাধিক পুরুষ ও এক বা একাধিক নারী দ্বারা গঠিত সামাজিক সংস্থাকে পরিবার বলে।’

অধ্যাপক রডম্যান ও গ্রামসের মতে, ‘পরিবার সমাজের এমন একক যা বিবাহের মাধ্যমে নারী-পুরুষের মিলন ঘটায় এবং সন্তান-সন্ততির জন্মদান ও লালন-পালনের মাধ্যমে তাদের ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথ সুগম হয়।’

পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের এমন একটি আয়না; সামাজিক উন্নয়নের ধারা ধরে রাখতে যার ভূমিকা অপরিসীম। নাগরিকের বৃহত্তর জীবনের আদর্শ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেও বিবেচনা করা হয় পরিবারকেই। পরিবার মানুষ পরিচালনার দিক নির্ণায়ক, লক্ষ্যে পৌঁছানোর অনুপ্রেরণা এবং হতাশার মাঝে সান্ত্বনা দানকারীপরিবারের ভালোবাসা জীবনের বড় সম্পদ; যা টাকা-পয়সার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বার্ড হেনরি বলেছেন, পরিবার হচ্ছে দিক নির্ণায়ক যা আমাদের পরিচালনা করে। পাশাপাশি পরিবার আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে অনুপ্রেরণা দান করে, হতাশার মাঝে সান্ত্বনা দেয়

জর্জ শান্তায়ন বলেছেন, পরিবার প্রকৃতির এক শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম।  সাধারণত পরিবার বলতে বুঝায়,  পিতা বা মাতা অথবা পিতা-মাতা উভয় ও তাদের সন্তান-সন্ততির সমষ্টি। বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রী লোক এবং তাদের পরিজন নিয়ে বসবাস করার একটি সংগঠন।

অক্সফোর্ড ইংরেজি অভিধানে বলা হয়েছে, পরিবার হলো পিতা-মাতা এবং তাদের সন্তানদের নিয়ে গঠিত দল বা দলসমষ্টি।

এনসাইক্লোপিডিয়া অ্যামেরিকানা গ্রন্থে বলা হয়েছে, পরিবার প্রথাটি সাধারণত কিছু ব্যক্তির সমষ্টিকে বোঝায়, যারা জন্ম এবং বিবাহসূত্রে একই আবাসগৃহে বসবাস করে।  পরিবার প্রথায় পূর্বপুরুষের ধারণা পর্যন্ত গ্রহণ করতে দেখা যায়। পরিবারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত স্বামীদের, বাবা, ভাই, বোন, ছেলে ও মেয়েদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বর্ধিত পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দাদা-দাদী, চাচা, চাচাতো ভাই, ভাতিজা, ভ্রাতুষ্পুত্র এবং ভাই-বোনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

পরিবারের সদস্য বিবেচিত হওয়া ব্যক্তির নির্দিষ্ট সম্পর্কের উপর নির্ভর করে। পরিবার সমাজকাঠামোর মৌল সংগঠন, স্নেহ-মায়া-মমতা ও সহযোগিতার দ্বারা গঠিত মানবীয় প্রতিষ্ঠান এবং গোষ্ঠী জীবনের প্রথম ধাপ। পরিবারে একজন স্বামী তার এক বা একাধিক স্ত্রী এবং অন্যান্য পরিজন নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। মানুষ সাধারণত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে, পরিবারে লালিত-পালিত হয় এবং মৃত্যুবরণ করে। পরিবার হচ্ছে মোটামুটিভাবে স্বামী-স্ত্রীর একটি স্থায়ী সংঘ বা প্রতিষ্ঠান, যেখানে সন্তান-সন্ততি থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে।

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। আর সমাজের একক বা ভিত্তি হলো পরিবার। প্রথমত মা-বাবাকে নিয়ে পরিবারের সূত্রপাত ঘটে। তবে সাধারণত মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি ও একান্ত আপনজনদের নিয়ে পরিবার গঠিত হয়। পরিবারের সদস্যরাই হচ্ছে পরিবারের অস্তিত্ব। পরিবারের সদস্যদের উপর পরিবারের ভালোমন্দ নির্ভর করে। পরিবার হচ্ছে মানুষের দলবদ্ধ জীবন-যাপনের বিশ্বজনীন স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান; দলবদ্ধ জীবনের আবেগময় ভিত্তি

সমাজের পরিবর্তন, ক্রমবিকাশ ও বিবর্তনের হাত ধরে, সমস্ত বিশ্বজুড়ে ঐতিহাসিক কারণেই পরিবার প্রথার বারবার পরিবর্তন হয়েছে। বিভিন্ন মানব গোষ্ঠীতে এখনো পুরনো ধাঁচের বিভিন্ন পরিবার প্রথাও দেখা যায়।  তবে সমাজ পরিবর্তনের সাথে সঙ্গতি রেখে তা দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে পরিবার। সমাজভেদে বা দেশ-ভেদে বিভিন্ন প্রকারের পরিবার রয়েছে। বিভিন্ন মাপকাঠির ভিত্তিতে পরিবারকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করা হয়ে থাকে। স্বামী-স্ত্রীর সংখ্যা, কর্তৃত্ব, পরিবারের আকার, বংশ মর্যাদা, বসবাস এবং পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের মাপকাঠির ভিত্তিতে পরিবার বিভিন্ন প্রকার হয়ে থাকে।

পরিবার সাধারণত দুপ্রকার- একক পরিবার ও যৌথ পরিবার। মা-বাবা সন্তান-সন্ততি নিয়ে গড়ে ওঠে একক পরিবার। মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি, দাদা-দাদী বা নানা-নানী, চাচা-চাচী, ফুপা-ফুপু এদের নিয়ে গড়ে ওঠে যৌথ পরিবার। বর্তমানে শহর এলাকায় যৌথ পরিবারের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। তবে গ্রাম এলাকায় যৌথ পরিবারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।

বর্তমান সময়ে আরেক ধরনের পরিবার লক্ষ করা যায়, যে পরিবারে স্বামী ও স্ত্রী বিভিন্ন প্রয়োজনে আলাদা আলাদা জায়গায় অবস্থান করে। যেমন স্বামী ও স্ত্রী দুজনেই চাকরি করেন এবং দুজনার কর্মস্থল দুই এলাকায়, তখন দুজন দুই জায়গায় বাসা নিয়ে আলাদা বাস করেন। এ ধরনের পরিবার ‘ন্যানো পরিবার’ বা ক্ষুদ্র থেকে অতি ক্ষুদ্র। এ সকল পরিবারের সন্তানদের মধ্যে বাবা-মায়ের আদর, স্নেহ, ভালোবাসা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা জন্মায় না। তারা যার কাছে বড় হয়, সে কাজের মেয়েও হতে পারে বা কোনো আত্মীয় হতে পারে, সেই তার আপন হয়ে যায়।

পরিবার প্রধানত ৬  প্রকার। যথা: স্বামী-স্ত্রীর সংখ্যার ভিত্তিতে পরিবার, কর্তৃত্বের ভিত্তিতে পরিবার, আকারের ভিত্তিতে পরিবার, বংশ মর্যাদা ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে পরিবার, বিবাহোত্তর স্বামী-স্ত্রীর বসবাসের ভিত্তিতে পরিবার ও পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের ভিত্তিতে পরিবার।

স্বামী-স্ত্রীর সংখ্যার ভিত্তিতে পরিবার তিন ধরনের হয়ে থাকে, যেমন- একপত্নীক, বহুপত্নীক ও বহুপতি পরিবার। এছাড়া সামাজিক ও নৃবিজ্ঞানীরা যেসব উপাদানের ভিত্তিতে পরিবারকে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন সেগুলো হলো: বিবাহভিত্তিক পরিবার, বংশানুক্রমের ভিত্তিতে পরিবার, বাসস্থানের ভিত্তিতে পরিবার, কর্তৃত্বের ভিত্তিতে পরিবার ও আয়তনের (পরিসর) দিক থেকে পরিবার।

পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *