কৃতজ্ঞতা চর্চার সচেতনতা বাড়ান

আনিসুর রহমান এরশাদ

নবীবংশে জন্মগ্রহণ করলেই কেউ সৈয়দ বা মর্যাদাশীল হতে পারে না; যদি সে আশরাফুল মাখলুকাত বা সত্যিকারের মানুষ না হয়। আবু লাহাব নবীর (সা.) চাচা হওয়ার পরও কেউ তাকে সৈয়দ বলেন না। আবু লাহাবের জন্য মানুষ বদদোয়া করে। ইতিহাস বলে ঘষেটি বেগম ও মীর জাফর আলী খান নবাব পরিবারের লোক হয়েও ইতিহাস ধিকৃত। এখনও মানুষ কাউকে গালি হিসেবে মীরজাফর বলে থাকে। তাদের কেউ নবাবের মর্যাদা দেন না। নবী-রাসূল, ওলি, আউলিয়া যারাই পৃথিবীতে এসেছেন মর্যাদার অধিকারী হয়েছেন; সবাই আমল, আখলাক, দয়া-দাক্ষিণ্য, ক্ষমাশীলতা, পরোপকারিতা দিয়ে তা অর্জন করেছেন।

বংশের পার্থক্য নয়

নহে আশরাফ আছে যার শুধু বংশের পরিচয় সেই আশরাফ জীবন যাহার পূণ্য কর্মময়। দেখা যাচ্ছে মানুষের মর্যাদা বাড়ে তার পুণ্য কর্মের গুণে। রূপে নয় সৌন্দর্যে নয়, বংশ মর্যাদায়ও নয়। নারী কিংবা পুরুষ যেই হোক- অপকর্ম করলে মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব থাকে না, পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে যায়। এতে কোনো বংশের পার্থক্য নেই। নেই কোনো রাজ পরিবারের পার্থক্য বা নারী-পুরুষের বৈষম্য।

বর্ণবৈষম্য নয়

আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, সাদার ওপর কালোর কোনো মর্যাদা নেই। আরবের ওপর অনারবের কোনো মর্যাদা নেই। সব মানুষই আদমের সন্তান। হজরত বিলালকে (রা.) বলা হতো কালো কাক। বিলাল এবং তার বাবা ভাতের জন্য মক্কা নগরীতে বিক্রি হয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ তারা ছিলেন গোলামের সন্তান গোলাম। তৎকালীন আরবরা বিলালকে হেয় নজরে দেখতেন। নবীর হাতে বায়াত হওয়ার পরও অনেকেই তাকে হেয় নজরেই দেখতেন। অথচ যে বিলাল মক্কায় আজান না দিলে ফজর হতো না। রাসূল (সা.) তাকে আজানের দায়িত্ব দিয়ে সম্মানিত করেছেন।

কৃতজ্ঞতার চর্চা বাড়ান

সারাবিশ্বের এতিম শিশুদের সবার যে বাবা-মা মারা গেছে এমনটি নয়, বাবা-মা হয়তো জীবিতই আছে অথচ সন্তান জানে না তার বাবা-মা কে এমনটাও রয়েছে। যেসব শিশু শ্রমিক, স্কুলে যায় না, ক্লাসে ক্ষুধার্ত অবস্থায় যায়, অপুষ্টিতে ভূগছে, লড়াই-সংঘর্ষ-যুদ্ধ কবলিত এলাকায় বসবাস করছে। তাদের কথা ভাবলে নিজের অবস্থায় থেকেও কৃতজ্ঞতার চর্চা করা সম্ভব হবে। কৃতজ্ঞতার চর্চা করা সম্পর্কন্নোয়নের সেরা উপায়।

সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি

মানুষের মধ্যে সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করুন। পারিবারিক কলহ ও বিশৃঙ্খলা দূর করুন। সমস্যার কারণ খুঁজে বের করে পরিবারের সদস্যগণ মিলে সমাধানের পথ বের করুন। সুখী পরিবারের ও যৌথ পরিবারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করুন। পরিবার প্রধান ও অন্যন্য সদস্যদের একসাথে থাকার মানসিকতা গড়ে তুলুন। যেকোনো পরিস্থিতিতে একত্রে থাকুন।

পরিবারের কিশোর ও যুবকদের প্রতি বাড়তি দায়িত্বশীল হোন। তারা যেন খারাপ কিছু যেমন নেশা বা সঙ্গদোষে  পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না  যায়। সুস্থ ও সুন্দর সমাজব্যবস্থা স্ন্দুর পরিবার গঠনের জন্য আবশ্যক। সামাজিক পরিবেশের ভালো ও বসবাস উপযোগী হওয়া নিশ্চিত করুন। মাতা-পিতা পরিবারের সকলের মধ্যে সর্বদা সুসম্পর্ক বজায় রাখুন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিবারের প্রয়োজনীয়তা-গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা-নির্দেশনা দিন।

মূল্যবোধের পরিবর্তন

পরিবারের সদস্যদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধে আমূল পরিবর্তন আনুন। তাদের বোঝান বস্তুবাদী ও ভোগবাদী সমাজ ও পরিবার কোন দিক দিয়েই আদর্শ ও অনুসরণীয় হতে পারে না। অনুসরণীয় হবে সেই পরিবার, যে পরিবার আদর-স্নেহ-মায়া-মমতার বন্ধনে অটুট। অসৎ সঙ্গে মিশে ছেলে-মেয়ে যাতে নষ্ট না হয়ে যায় সেদিকে পরিবারের অভিভাবক ও সদস্যরা তীক্ষè নজর রাখুন। তারা কার সাথে চলাফেরা, উঠাবসা, খেলাধুলা ও বন্ধুত্ব স্থাপন করে সে বিষয়ে খোঁজখবর নিন। ছোটবেলা থেকেই ছেলে-মেয়েদের শালীন পোশাক-পরিচ্ছদের প্রতি খেয়াল রাখুন। উপযুক্ত বয়সে ছেলে-মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করুন।

অশ্লীলতা পরিহার

ব্যক্তির মন ও মানস গঠনে পারিবারিক সংস্কৃতির শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। বাচ্চাদের বেড়ে ওঠা, কোনটি সঠিক ও কোনটি ভুল, কোনটি ভালো ও কোনটি খারাপ এই সম্পর্কে ধারণা ও বিশ্বাসে পরিবারের সংস্কৃতির প্রভাব পড়ে। বড়দের কাছ থেকে ছোটদের শেখার মনোভাব, চিন্তা-ভাবনা এবং আচরণ সারাজীবনই বহন করে। তাই পরিবারগুলোতে সুস্থ সংস্কৃতি নিশ্চিত করার জন্য সামাজিকভাবে চাপ প্রয়োগ করতে হবে।  নারী দেহের নগ্ন প্রদর্শনী, অশ্লীল গান, নৃত্য পরিহার করুন।

অবাধ যৌনতার পথ বন্ধ করুন। যৌতুক নামক পরিবারবিধ্বংসী প্রথা বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে এবং এ ব্যাপারে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। অশ্লীল বই-পত্র ও ম্যাগাজিন বাজেয়াপ্ত করতে হবে। শালীনতা শুচি-শুভ্রতার প্রতীক এবং নারী নির্যাতন, ইভটিজিং, এসিড নিক্ষেপ প্রভৃতি রোধের কার্যকর উপায়। সুতরাং মেয়েদেরকে শালীন পোশাকে অভ্যস্ত করুন। নারী-পুরুষ উভয়েই স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে অশ্লীলতামুক্ত জীবন গড়ার  কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।

পরিবার সুরক্ষা

পরিবার সুরক্ষায় সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগের পাশাপাশি সরকার, শিক্ষিত ও বিত্তশালী সবাইকে সার্বিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এগিয়ে আসুন। সমাজের প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ থেকে পরিবার সুরক্ষায় কাজ করুন। আর সবার এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা সুখী পরিবার গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। বিভিন্ন সংস্থা আছে যারা পরিবার ও সমাজ নিয়ে কাজ করে, তাদের তৎপরতা আরো বাড়াতে হবে এবং উদ্যোমী সমাজকর্মী নিয়োগ করার মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের ব্যাপারে সার্বিক তথ্য রেখে এবং যেসব পরিবারে সমস্যা রয়েছে সেসব পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আলোচনা করে সমাধান করে দিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সেতুবন্ধ সৃষ্টির জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।

সামাজিক উদ্যোগ

এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিজের এলাকায় সকল পরিবারের খোঁজখবর নেয়া। কোনো পরিবারে বিশৃঙ্খলা থাকলে তা সমাধানের উদ্যোগ নেয়া। প্রতিবেশী পরিবারের কেউ যেন নেশা বা সমাজ বিধ্বংসী কোনো কাজে যুক্ত না হয় সে জন্য প্রতিবেশীদের খোঁজখবর রাখুন। তরুণ ও যুবকদের একত্রিত করে তাদের পরিবার ও সমাজ নিয়ে ধারণা দেয়া ও মূল্যবোধ জাগ্রত করার পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলুন। বিভিন্ন আলোচনা সভা, সেমিনার, র‌্যালি, রচনা, কুইজ ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে মানুষকে সুখী-সমৃদ্ধ পরিবারের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন করে তুলুন। মসজিদ-মন্দিরসহ অন্যান্য প্রার্থনালয়গুলোতে পরিবারের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করুন, কথা বলুন।

স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ

সমাজকর্মী নিয়োগ করার মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের ব্যাপারে সার্বিক তথ্য রাখা। সমাজের সবাইকে পরিবারের গুরুত্ব ও সুফল বোঝানো। তরুণ ও যুবকদের একত্রিত করে তাদের পরিবার ও সমাজ নিয়ে ধারণা দেয়া। পরিবারের সদস্যদের পরিবারের যাবতীয় সমস্যা নিজেদের মধ্যে সমাধান করা। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিজের এলাকায় সকল পরিবারের খোঁজখবর নেয়া। কোনো পরিবারে বিশৃঙ্খলা থাকলে তা সমাধানের উদ্যোগ নেয়া। কয়েকজন মিলে নিজ উদ্যোগে সমাজের প্রতিটি পরিবারের খোঁজ নেয়া। মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি ও মূল্যবোধ জাগ্রত করা।

সুুস্থ সংস্কৃতির চর্চা

নিম্নরুচির মানুষ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে না। পরিবার, সমাজ তাদের কর্মকাণ্ড, পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করবে। এই শ্রেণির মানুষের এরূপ  প্রবণতা মানবসমাজকে এগিয়ে দিতে পারে না। ব্যতিক্রম ছাড়া পরিবারের প্রধান ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা-সহানুভূতি সাধারণত অটুট থাকে। তাই পরিবার প্রধানকে ভালো মানুষ হতে হবে।

সম্মানীয় এবং প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যরাও উচ্চতর মর্যাদায় সমাজে অধিষ্ঠিত হয়। এমন পরিবারের সদস্যরা পরিবার ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেদের দায়বদ্ধ মনে করে না। পরিবারের চেয়ে অন্য কাউকে বড় মনে করে না। পরিবারকেই সবার চেয়ে বড় মনে করা বা পরিবারে নিজ অবস্থান ঠিক থাকলে অন্য কারো কথা চিন্তা করার প্রয়োজন অনুভব না করার প্রবণতা ভয়াবহভাবে আশঙ্কাজনক।

সমাজ বা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে পারিবারিক স্বার্থ ত্যাগের মানসিকতাও থাকতে হবে। ত্যাগের মানসিকতা থাকলে সম্পর্ক রক্ষা করা সহজ হয়।  পরিসংখ্যানবিদ, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ কাজী মোতাহার হোসেন বলেছেন, সংস্কৃতিবানরা ‘অন্যায় নিষ্ঠুরতাকে তো বটেই, ন্যায় নিষ্ঠুরতাকেও’ ভয় পায়। অন্যায় নিষ্ঠুরতা হলো শাস্তি যার প্রাপ্য নয় তবুও তাকে শাস্তি দেওয়া, আর ন্যায় নিষ্ঠুরতা হলো মানুষকে ন্যায়সঙ্গতভাবে শাস্তি প্রদান করা।

 

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *