পরিবারহীনতার পরিণতি ভয়াবহ

আনিসুর রহমান এরশাদ

পরিবারহীন জীবন হচ্ছে বিরাট শূন্যতা ও চরম অসম্পূর্ণতায় ভরা। পরিবারহীন মানুষ নোঙরহীন নৌকা বা বৃন্তচ্যুত পত্রের মতোই স্থিতিহীন। পরিবার না থাকার কুফল অনেক। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী বয়োলবি দেখিয়েছেন, যে পরিবারে সন্তান তার বাবা-মায়ের কোনো একজনকে হারায় (মৃত্যু, বিচ্ছেদ বা অন্য যেকোনো কারণে) তারা তাদের পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং বা বৈরী অবস্থার মুখোমুখি হলে সহজেই ভেঙ্গে পড়ে। এরা খুব সহজেই বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। যেসব সন্তান বাবা-মায়ের সান্নিধ্যে থেকে আদর, স্নেহ, ভালোবাসা আর শাসনে বড় হয়ে ওঠে তারা বুদ্ধিমান, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, দায়িত্ববান, সুস্থ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে বেড়ে ওঠে। আর বিপরীতে যেসব সন্তানরা বৈরী, অসুস্থ ও অশান্তিময় পারিবারিক আবহে বেড়ে ওঠে তারা সাধারণত উচ্ছৃঙ্খল, সমাজবিরোধী হয়ে আত্মপ্রকাশ করে।  পরিবারহীন মানুষ নানা ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়। যেমন-

নিরাপত্তাহীন হওয়া

নিরাপত্তা জীবনের মৌলিক দিকগুলোর একটি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আর মানব উন্নয়ন ও বিকাশের অনিবার্য ক্ষেত্র সৃষ্টিকারী। মানুষের একটি পবিত্রতম প্রত্যাশা হলো এই নিরাপত্তা। নিরাপত্তা মানুষের অস্তিত্বের সাথেই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। আর পরিবার মানুষের জন্য এক সুন্দর আশ্রয়। পার্থিব জীবনে সংঘটিত বিভিন্ন বিপদাপদে পরিবারের সদস্যরা সর্বপ্রথম এগিয়ে আসে। কিন্তু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো মানুষের জন্য এসব পাবার উপায় থাকে না। ফলে সে হয়ে পড়ে অসহায়। তার জীবনের নিরাপত্তা থাকে না।

পরিবারই জন্মের পর নিজ নিরাপত্তা বিধানে অক্ষম শিশুর নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব পালন করে। সমাজের অভ্যন্তরে বাসকারী অপরাধীরা নিজেরা যেমন নিরাপত্তাহীন থাকে তেমনি সমাজের উদাসীনতায় পার পেয়ে যাওয়ায় অন্যরাও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে। জুডো, কারাতি ও আত্মরক্ষার বিশেষ কৌশল আয়ত্তকারী কিশোরীরা রাস্তাঘাটে একাকী চলাচলকালেও তুলনামূলক কম নিরাপত্তাহীন বোধ করে।

অপরাধী হবার ঝুঁকি

পরিবারহীন মানুষ যেমন অপরাধী হবার ঝুঁকিতে থাকে, তেমনি মূল্যবোধ ও নৈতিক জাগরণ না ঘটায় অপরাধীদের অপরাধ সংঘটনের পথে সহায়কও হয়। নিরাপত্তাহীন পরিবেশে বেড়ে উঠলে আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দেয়। কারো কাছ থেকে খুব বেশি ভালোবাসা ও উৎসাহ না পেলে, দিনরাত অশান্তি লেগে থাকলে, গালিগালাজ শুনলে কিংবা শারীরিক অত্যাচার করলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে শিশুরা। নিজেদের মধ্যে অযোগ্যতার অনুভূতি নিয়ে বড় হলে কিশোর বয়সেই নেশাকর ওষুধ কিংবা অতিরিক্ত মদ্যপান করতে শুরু করে, অন্যদের ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য কুসংসর্গে জড়িয়ে পড়ে, ভালোবাসা ও স্নেহ পাওয়ার আশায় তাড়াহুড়ো করে রোমান্টিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়।

বিষণ্নতায় ভোগা

তোমার দ্বারা কিচ্ছু হবে না কথাটা বারবার শুনতে শুনতে মনে বিশ্বাস করতে থাকে সে সত্যিই অযোগ্য। কখনো প্রশংসা বা ভালোবাসা না পাওয়ার  দুঃখজনক অভিজ্ঞতা আনন্দ কেড়ে নেয়, অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ককে নষ্ট করে দেয়, অকারণে ভয় বাড়ে, সমস্যার জালে জড়িয়ে ব্যাকুল হয়, সাহায্যের প্রয়োজন হলে দুশ্চিন্তা করে, মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে অতিরিক্ত চিন্তা করে, উপহাসের শিকার হলে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে কান্নাকাটি করে, হৃদয় উজাড় করে নিজের মনের কথা বলতে না পারায় বিষণ্নতায় ভুগেন।

আর্থিক সহযোগিতা না পাওয়া

অর্থ মানব জীবনের আবশ্যিক বিষয়। রক্ত ছাড়া যেমন মানুষ বাঁচে না অর্থ ছাড়া তেমন জীবন চলে না। জীবন চলার পথে বিভিন্ন সময়ে মানুষের অর্থের প্রয়োজন হয়। পরিবারের লোকেরাই সর্বপ্রথম সেই প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসে। তাছাড়া জীবনের সূচনাকালে যেমন সে অক্ষম ও পরনির্ভরশীল থাকে, তেমনি জীবনের শেষ বেলায় সে আবার অক্ষম ও পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এসময় পরিবারভুক্ত মানুষ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাহায্য পায়। অথচ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো মানুষের দুর্দিনে সাহায্যে তেমন কেউ এগিয়ে আসে না।

বন্ধনহীন হওয়া

একেকটি পরিবার মূলত কতগুলো হৃদয়ের সমষ্টি, যেখানে আছে জীবনের প্রবাহ, মায়া মমতা, স্নেহ-ভালোবাসা, যত্ন-আত্তি, সেবা পরিচর্যা, নিরাপত্তা, মিলেমিশে থাকার প্রবল আকাক্সক্ষা, সহনশীলতা এবং একে অন্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা। কিন্তু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো মানুষ এসব সুযোগ সুবিধা পায় না।

যত্ন ও মানসিক সাপোর্টের অভাব

রোগাক্রান্ত হলে বিশেষ সেবা-শুশ্রƒষা চিকিৎসার দরকার হয়। দুর্ঘটনায় পতিত হলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। হতাশায় বা দুঃখে-কষ্টে সান্ত্বনার বাণী ও নিকটজনের সান্নিধ্য লাগে। ঝড়-বৃষ্টি ও ক্ষতিকর পশু-পাখি-কীট-পতঙ্গের আক্রমণ থেকে বাঁচতে যেমন আশ্রয়ের ঘর প্রয়োজন; জীবনকে অর্থবহ-সার্থক-আনন্দময় করতে তেমনি  পরিবারের  প্রয়োজন হয়। পরিবারহীনদের জীবন হয় অযত্নের-অবহেলার-উপেক্ষার; প্রয়োজনেও মানসিক সাপোর্ট না পাওয়ায় জীবনের যেন কোনো মানেই থাকে না।

উদ্দেশ্যহীন জীবন

পরিবার মানুষকে একটি স্থানে ও একটি লক্ষ্যে চলতে সাহায্য করে। কখনো সে লক্ষ্যচ্যুত হলে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তাকে সঠিক পথে চলতে ও নির্দিষ্ট  লক্ষ্যে ফিরিয়ে আনতে তৎপর হয়। কিন্তু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকে না। সে যা ইচ্ছে তাই করে। যেদিকে ইচ্ছে সেদিকে চলে যায়। পারিবারিক বন্ধনহীন এই জীবন যেন হালবিহীন নৌকার মতো। সুতরাং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া কোনো বিবেকবান মানুষের জন্য সমীচীন নয়।

বিচ্ছিন্নতা ও বিক্ষিপ্ততা

পাশ্চাত্যের প্রখ্যাত দার্শনিক অধ্যাপক সরোকিন বর্তমান দুনিয়ায় পরিবারের গুরুত্ব কম হওয়ার ফলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন- ‘আমরা বর্তমানে খাবার খাই হোটেল রেস্তোঁরায়, আমাদের রুটি বেকারি-কনফেকশনারি থেকে তৈরি হয়ে আসে আর আমাদের কাপড় ধোয়া হয় লন্ড্রিতে। পূর্বে মানুষ আনন্দলাভ ও চিত্ত বিনোদনের উদ্দেশ্যে ফিরে যেত পরিবারের নিভৃত আশ্রয়ে; কিন্তু বর্তমানে মানুষ তার জন্যে চলে যায় সিনেমা-থিয়েটার, নাচের আসর ও ক্লাবঘরের গীতমুখর পরিবেষ্টনীতে। পূর্বে পরিবার ছিল আমাদের আগ্রহ ঔৎসুক্য ও আনন্দ-উৎফুল্লতার কেন্দ্রস্থল, পারিবারিক জীবনেই আমরা সন্ধান করতাম শান্তি, স্বস্তি, তৃপ্তি ও আনন্দের নির্মলতা কিন্তু এখন পরিবারের লোকজন হয়ে গেছে বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত।

কিছু লোক একত্রে বাস করলেও তার মূল উদ্দেশ্য বিনষ্ট হয়ে গেছে, হারিয়ে ফেলেছে সকল প্রীতি, মাধুর্য, অকৃত্রিমতা, আন্তরিকতা ও পবিত্রতা। দিনের বেশিরভাগ সময়ই মানুষ জীবিকার চিন্তায় অতিবাহিত করে, রাত্রিবেলা অন্তত পরিবারের সব লোক একত্রিত হতো। কিন্তু এখন তারা রাত্রি যাপন করে বিচ্ছিন্নভাবে, যার যেখানে ইচ্ছে সেখানে। এখন আমাদের ঘর আমাদের আরাম বিশ্রামের স্থান নয়, ঘরে রাত্রিদিন অতিবাহিত করার তো এ যুগে কোনো কথাই উঠতে পারে না। একটি গোটা রাত্রি এখন লোকেরা নিজেদের ঘরে যাপন করবে, তা কেউই পছন্দ করে না।’

পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *