দুর্বল ও অক্ষম চিন্তাধারা দূর করতে হবে : মাও সেতুং

চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবী ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের জনক মাও সেতুং বলেছেন, ‘তুলনামূলকভাবে সম্পূর্ণ জ্ঞান ছাড়া বিপ্লবী কাজ ভালোভাবে চালানো অসম্ভব। দুই ধরনের অসম্পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে; একটি হলো বইপত্রে পাওয়া তৈরি জ্ঞান; অন্যটি হলো সেই জ্ঞান যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয়লব্ধ ও আংশিক; উভয় জ্ঞানই একপেশে। কেবল এ দুটোর সংযোগসাধনের ফলেই সঠিক ও তুলনামূলকভাবে সম্পূর্ণ জ্ঞানের সৃষ্টি হয়।

অধ্যয়নের শত্রু হচ্ছে আত্মসন্তোষ, প্রকৃতই কিছু শিখতে হলে, অবশ্যই নিজেদের আত্মতুষ্টি থেকে মুক্ত রাখতে হবে। নিজেদের প্রতি ‘শিক্ষাগ্রহণে তৃপ্তিহীন থাকা’ এবং অন্যদের প্রতি ‘শিক্ষাদানে অক্লান্ত হওয়া’ এই ধরনের মনোভাব আমাদের থাকা উচিত।

দুনিয়ার সবচেয়ে উপহাসের ব্যক্তি হচ্ছে সেই ‘সবজান্তা’ যে জনশ্রুতি থেকে ভাসা ভাসা জ্ঞান সংগ্রহ করে নিজেকে ‘দুনিয়ার পয়লা নম্বরের জ্ঞানী’ বলে জাহির করে। এতে শুধু এটাই প্রমাণিত হয় যে, নিজের সম্পর্কে তার যথাযথ ধারণা নেই।

যদি আপনি জ্ঞানার্জন করতে চান তাহলে বাস্তবকে পরিবর্তন করার অনুশীলনে আপনাকে অবশ্যই অংশগ্রহণ করতে হবে। যদি আপনি নাশপাতির স্বাদ জানতে চান, তাহলে আপনাকে অবশ্যই খেয়ে নাশপাতিটার বাস্তবরূপের পরিবর্তন করতে হবে। যদি আপনি পরমাণুর গঠন ও গুণাগুণ সম্পর্কে জানতে চান তাহলে পরমাণুটির অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর জন্য পদার্থবিজ্ঞানের ও রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেই হবে। যদি আপনি বিপ্লবের তত্ত্ব ও পদ্ধতি জানতে চান তাহলে আপনাকে অবশ্যই বিপ্লবে অংশগ্রহণ করতে হবে।

বিপ্লবী সংস্কৃতি হচ্ছে ব্যাপক জনগণের পক্ষে একটি শক্তিশালী বিপ্লবী হাতিয়ার। বিপ্লব আসার আগে, তার মতাদর্শগত জমি তৈরি করে সংস্কৃতি এবং বিপ্লবের সময়ে এটি হচ্ছে সামগ্রিক বিপ্লবী ফ্রন্টের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুত অপরিহার্য একটি সংগ্রামী হাতিয়ার। সকল প্রতিক্রিয়াশীলেরাই কাগুজে বাঘ। প্রতিক্রিয়াশীলরা যত বেশি গণহত্যার আশ্রয় নেয়, বিপ্লবের শক্তি ততই বাড়ে।

জনগণ, কেবলমাত্র জনগণই হচ্ছে বিশ্ব ইতিহাস সৃষ্টির চালক শক্তি। যে কোনো স্থানের জনসাধারণই সাধারণত তিন ভাগে বিভক্ত- অপেক্ষাকৃত সক্রিয়, মধ্যবর্তী এবং অপেক্ষাকৃত পশ্চাদপদ। তাই অল্প-সংখ্যক সক্রিয় ব্যক্তিদেরকে নেতৃত্বের মেরুদণ্ড হিসেবে ঐক্যবদ্ধ করতে নেতাদের অবশ্যই নিপুন হতে হবে, এই মেরুদণ্ডের ওপর নির্ভর করেই মধ্যবর্তী ব্যক্তিদের মান উন্নত করতে হবে এবং পশ্চাদপদ ব্যক্তিদেরকে নিজেদের পক্ষে টেনে আনতে হবে।

আমরা জনগণের সেবা করি তাই আমাদের যদি কোনো ত্রুটি থাকে তা দেখিয়ে দিয়ে কেউ আমাদের সমালোচনা করলে আমরা ভয় করি না। যে কেউ, তা যিনিই হোন না কেন, আমাদের ত্রুটি দেখিয়ে দিতে পারেন। যদি তার কথা ঠিক হয় তাহলে আমরা নিজেদের ত্রুটি শুধরে নেব। তিনি যা প্রস্তাব করেন তাতে যদি জনগণের উপকার হয়, তবে আমরা তার প্রস্তাব অনুসারেই কাজ করব।

রক্তপাতহীন যুদ্ধের নাম রাজনীতি আর রক্তক্ষয়ী রাজনীতির নাম যুদ্ধ। জনগণের ধারণাকে সংগ্রহ করুন, সেসবকে সুসংবদ্ধ করুন এবং তারপর সেই সব ধারণা নিয়ে জনগণের কাছে যান। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হোন, আত্মবলিদানে নির্ভয় হোন, সমস্ত বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করুন, বিজয় অর্জন করুন। অস্ত্র হচ্ছে যুদ্ধের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কিন্তু নির্ধারক উপাদান নয়; নির্ধারক উপাদান হচ্ছে মানুষ, বস্তু নয়। শক্তির তুলনা শুধু সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির তুলনাই নয়, বরং জনশক্তি ও নৈতিক শক্তিরও তুলনা। সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি অপরিহার্যরূপেই মানুষের দ্বারা পরিচালিত হয়।

ধ্বংস ছাড়া গঠন হয় না। ধ্বংস অর্থ হচ্ছে সমালোচনা ও বর্জন, এর অর্থ বিপ্লব। এতেই রয়েছে যুক্তির মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করে আনা, যা হচ্ছে গঠন। ধ্বংসকে প্রথম স্থান দাও, এবং এই প্রক্রিয়াতেই তুমি গঠন করতে পারবে।

এমন একটা রাজনৈতিক পরিবেশ আমাদের সৃষ্টি করতে হবে যেখানে গণতন্ত্র এবং কেন্দ্রিকতা দুই-ই থাকবে। থাকবে শৃঙ্খলা এবং স্বাধীনতা। থাকবে আদর্শ ও উদ্দেশ্যের ঐক্য এবং খোলা মন ও প্রাণবন্ত পরিবেশ। দলের আভ্যন্তরীণ জীবনে এবং দলের বাইরে এমনই একটি রাজনৈতিক পরিবেশ আমাদের গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে, জনগণের মধ্যে উৎসাহের জোয়ার সৃষ্টি করা আমাদের পক্ষে কোনোমতেই সম্ভব হবে না। গণতন্ত্র ছাড়া কোনো বাধাই আমরা অতিক্রম করতে পারব না, অবশ্য কেন্দ্রিকতা না থাকলে তো আরও পারব না। কিন্তু গণতন্ত্র যদি না থাকে তবে কেন্দ্রিকতাও থাকবে না।

নিপীড়িত জনগণ ও নিপীড়িত জাতির নিজেদের মুক্তির আশা কোনোমতেই সাম্রাজ্যবাদ ও তার পদলেহী কুকুরদের ‘শুভবুদ্ধি’-র ওপর ন্যস্ত করা উচিত নয়।

যারা নিজেদের কাজের ব্যাপারে দায়িত্বজ্ঞানহীন, যারা ভারীটা বাদ দিয়ে হাল্কাটা গ্রহণ করেন এবং ভারী বোঝাগুলো অন্যের কাঁধে ঠেলে দিয়ে হাল্কাটা নিজেরা তুলে নেন, এমন লোকের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। প্রত্যেক পদে পদে তারা অন্যের আগে নিজের কথা ভাবেন, তারপর ভাবেন অন্যদের কথা। সামান্য একটা কাজ করেই তারা গর্বে ফুলে ওঠেন, এবং পাছে অন্যরা তা জানতে না পারে, সেই ভয়ে ঐ সম্পর্কে বড়াই করেন। কমরেড ও জনগণের জন্যে তাদের আন্তরিকতা নেই, বরঞ্চ তাদের প্রতি নিষ্প্রাণ, আগ্রহহীন ও উদাসীন ব্যবহার করেন। আসলে এই ধরনের লোক কমিউনিস্ট নন, অন্ততপক্ষে তাদেরকে প্রকৃত কমিউনিস্ট বলে গণ্য করা যায় না।

কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই একটি মহান বিপ্লবী সংগ্রামকে নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব নয়; যদি না দলটি একটি বিপ্লবী তত্ত্ব ধারণ করে, ইতিহাসের জ্ঞান রাখে এবং বাস্তব লড়াই সংগ্রামের ব্যাপারে দলটির বিস্তারিত ও গভীর দখল থাকে।

আমরা যদি গণজাগরণের পূর্বেই আক্রমণ শুরু করতে চেষ্টা করি, সেটা হবে হঠকারিতা। জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের পরিচালনা করতে তাদের যদি জোর-জবরদস্তি প্রয়োগ করি, তাহলে আমরা নিশ্চয় ব্যর্থ হবো। জনগণ যখন এগিয়ে যেতে উন্মুখ, তখন যদি আমরা এগিয়ে না যাই, সেটা হবে দক্ষিণপন্থি সুবিধাবাদ।

আমাদের পার্টিতেও বিভিন্ন ধ্যান-ধারণার মধ্যে অবিরাম বিরোধিতা ও সংগ্রাম চলেছে, এ হলো বিভিন্ন শ্রেণির ও নতুন-পুরনো সমাজের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-বিরোধের প্রতিফলন। পার্টির মধ্যে যদি দ্বন্দ্ব-বিরোধ না থাকতো, যদি সমাধানের জন্য না থাকতো মতাদর্শগত সংগ্রাম, পার্টি-জীবন অন্তিম দশায় উপনীত হয়ে যেত।

আমাদের অবশ্যই কোনো সফলতার ব্যাপারেই আত্মসন্তুষ্টিতে ভোগা যাবে না, আত্মসন্তুষ্টি নিয়ন্ত্রণ করা উচিৎ এবং অবিরত নিজেদের ঘাটতির ব্যাপারে সমালোচনা করা উচিৎ। ঠিক যেভাবে আমরা প্রতিদিন ময়লা পরিষ্কার করার জন্য ঘরের মেঝে মুছে রাখি।

একটা ভালো কাজ করা কারো পক্ষেই কঠিন নয়, কঠিন হচ্ছে সারা জীবন ধরে ভালো কাজ করা। কখনো কোনো খারাপ কাজ না করা, সর্বদা ব্যাপক জনসাধারণ, যুবক ও বিপ্লবের জন্য হিতকর হওয়া, কয়েক দশক বছর ধরে একটানা কঠোর সংগ্রাম করা-  এটাই হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন কাজ।

শত্রু যার বিরোধিতা করে আমাদের তা সমর্থন করা উচিত এবং শত্রু যা সমর্থন করে আমাদের তার বিরোধিতা করা উচিত।

বিপ্লব কোনো ভোজসভা নয়, বা প্রবন্ধ রচনা কিংবা চিত্র অংকন অথবা সূচিকর্মও এটা নয় । এটি এত সুমার্জিত, এত ধীর-স্থির ও সুশীল, এত নম্র, এত দয়ালু, বিনীত, সংযত ও উদার হতে পারে না। বিপ্লব হচ্ছে একটি অভ্যুত্থান- উগ্রপন্থী প্রয়োগের কাজ, যার দ্বারা এক শোষিত শ্রেণি, অন্য শোষক শ্রেণিকে উৎখাাত করে।

অবশ্যই জনগণের প্রতি এবং দলের প্রতি আস্থা-বিশ্বাস থাকতে হবে; এ হচ্ছে দুটি মৌলিক-গুরুত্বপূর্ণ নীতি। যদি এ দুটি নীতিতে সন্দেহ করি, তাহলে কোনো কিছুই অর্জন করতে পারবো না।

দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হোন, আত্মবলিদানে নির্ভয় হোন, সমস্ত বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করুন, বিজয় অর্জন করুন।

বিপ্লবকে আঁকড়ে ধরুন, উৎপাদন বাড়ান। কারা আমাদের শত্রু? কারা আমাদের বন্ধু? এটাই হলো বিপ্লবের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

মনেপ্রাণে জনগণের সেবা করা, এক মুহূর্তের জন্য জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া; সব ব্যাপারই জনগণের স্বার্থ থেকে শুরু করা, ব্যক্তিগত  স্বার্থ বা কোনো ক্ষুদ্র চক্রের স্বার্থ থেকে নয়; জনগণের প্রতি দায়িত্বকে পার্টির নেতৃস্থানীয় সংস্থার প্রতি দায়িত্বের সঙ্গে এক করে মিশিয়ে ফেলা; এ সকলই হচ্ছে কাজের প্রারম্ভিক বিন্দু।

আমাদের কর্তব্য হচ্ছে জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া।  প্রতিটি কথা, প্রতিটি কার্যকলাপ, প্রতিটি নীতি সবই জনগণের স্বার্থের অনুকূল হওয়া উচিত। যদি ভুল হয়, তাহলে অবশ্যই তা সংশোধন করতে হবে, এটাকেই বলে জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া। নিজেদের ভেতর থেকে সমস্ত দুর্বল ও অক্ষম চিন্তাধারা দূর করতে হবে। যে সমস্ত দৃষ্টিকোণ শত্রুর শক্তিকে বড় করে দেখে আর জনগণের শক্তিকে ছোট করে দেখে তা সবই ভুল।’

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *