জাতির উন্নয়নে নারীবান্ধব কর্মসূচি জরুরি

ইসরাত জাহান সুমি : বাংলাদেশে নারী ও পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান। ফলে নারীসমাজকে বাদ দিয়ে দেশ ও সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই মানব সম্পদ উন্নয়নে পুরুষের পাশাপাশি নারীর জন্যও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। নারীবান্ধব বিভিন্ন সময়োপযুগী কর্মসূচি গ্রহণ না করলে জাতি কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না।

নারী বা পুরুষ সবাই মাটির তৈরি মানুষ এবং স্রষ্টার প্রতিনিধি। ফলে শারীরিক গঠনের কারণে উত্তম-অধম বা যোগ্য-অযোগ্য ভেবে গর্ব করা ঠিক না। শারীরিক গঠন কাউকে শ্রেষ্ঠ বানায় না, ছোটখাটো পার্থক্য থাকলেই কাঠামো বা স্ট্রাকচার খারাপ বলা উচিৎ নয়।

নারীর ওপর পুরুষের অত্যাচার-নির্যাতনের ভিত্তি হলো- নারী পুরুষের চেয়ে নীচু, তাদের মান খারাপ এবং তারা পুরুষের চেয়ে ছোট এমন বিশ্বাস। এই বিশ্বাস থেকেই নারীদের প্রতি অবহেলা, বঞ্চনা ও নির্যাতন। পুরুষের সাথে নারীরাও না এগোলে সমাজ সামনে এগোয় না। এক সময়ে মেয়েরা লেখাপড়া করার কোনো সুযোগই পেতেন না, এখন পান। তবে এখনও যৌতুক আছে, নির্যাতন আছে, দুর্বল ভাবার মানসিকতা আছে।

অথচ সবারই ক্ষমতায়নের ভিত্তি রয়েছে। ক্ষমতা ছাড়া নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব, সবল-দুর্বল কেউ কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারে না। ফলে প্রত্যেকর কিছু ক্ষমতা থাকতে হবে; তবে ক্ষমতার সীমা পরিসীমা থাকবে, বল্গাহীন হবে না। যে বঞ্চিত তাকে ক্ষমতায়িত করতে হবে; সে নারীই হোক আর পুরুষই হোক।

যদি কোনো পুরুষ স্বাধীন সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঘরে থাকতে চান, তবে তার সেটা করার অধিকার যেমন আছে; যদি কোনো নারী স্বাধীন সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঘরের বাইরে কাজ করতে চান, তবে তারও সেটা করার অধিকার তেমন আছে। তবে তাকে শরীয়ত নির্ধারিত পন্থা মেনে বের হতে হবে।

একসময় নারীরা ঘরের বাইরে বের হতো না। পুরুষতো দূরের কথা নারীদের সামনে যাওয়ার ক্ষেত্রেও ছিল বিধিনিষেধ। লেখাপড়া করা ছিল অন্যায়। বাড়ির গন্ডি থেকে বের হলে কথা শুনতে হতো। কর্মক্ষেত্রের সাথে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে পারিবারিক-সামাজিক বাধা ছিল। অশিক্ষিত ও আয়রোজগার থেকে বিচ্ছিন্ন নারী শাসিত ও শোষিত হতো।

এখন সকল ক্ষেত্রে নারীর অবাধ বিচরণ। শিক্ষাক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীর ফলাফল ভালো। কর্মক্ষেত্রেও নারীরা এগিয়েছে। শিক্ষকতা ও চিকিৎসার পাশাপাশি সব ধরনের পেশায় আগ্রহী হচ্ছে। প্রতিবছরেই নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

নারী তার নারীত্বের মর্যাদা বজায় রেখেই সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন ও রাখছেন। মাতৃত্বের সেবা ও সহধর্মিণীর গঠনমূলক সহযোগী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। মানবীয় প্রতিভার বিকাশ ও সমাজের স্থায়িত্ব বজায় রাখতে মায়েরা ত্যাগ ও ভালোবাসা দিচ্ছেন। নারীরাই সমাজের প্রধান ভিত্তি তথা পরিবারের প্রশান্তির উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখছেন। এত অবদানের পরও এখনো নারীকে দুর্বল হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

নারীকে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে। যোগ্যতার সাক্ষর রাখলেও নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে যেতে পারছে না। বৈষম্য-বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। বাহ্যিকতাকেই মূল্যায়ন করে চরম অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। কর্পোরেট সংস্কৃতি নারীর মেধার চেয়ে পোষাক, কথা বলার ভঙ্গি, সাজসজ্জা, অল্প বয়স, স্মার্টনেসকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সমান কাজ করলেও কম মজুরি দেয়া হচ্ছে, সস্তা শ্রমের জোগানদার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ধর্ম কখনো নারীকে শুধু গৃহিণী হয়ে থাকতে বলেনি, প্রয়োজনে উপার্জনকে নিষিদ্ধ করেনি। রাসুল (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদার যুগে নারীদের মধ্যে অন্তত ২২ জন নারী সাহাবি মুহাদ্দিস, ফকিহ (আইনজ্ঞ) ও মুফতি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। উম্মুল মুমিনিন খাদিজা (রা.) ব্যবসা-বাণিজ্য অগ্রসর ছিলেন। আয়েশা (রা.) চিকিৎসাবিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করেন। উম্মে সুলাইম (রা.) আনসার নারীদের নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে পানি পান করাতেন এবং আহতদের জখমে ওষুধ লাগিয়ে দিতেন।

বেহেশতের সুসংবাদপ্রাপ্ত বিশিষ্ট সাহাবি হজরত যোবায়ের (রা.)-এর স্ত্রী, হজরত আবু বকর (রা.)-এর কন্যা আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) বিয়ের পর উট চরাতেন, পানি পান করাতেন, ঘোড়ার ঘাস সংগ্রহ করে আনতেন এবং পানি উত্তোলনকারী মশক ছিঁড়ে গেলে সেলাই করতেন ও আটা পিষতেন। দুই মাইল দূরের জমি থেকে মাথায় করে খেজুরের আঁটির বোঝা বহন করে বাড়ি আনতেন, খেজুর বাগানের পরিচর্যা থেকে সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করতেন।

ওহুদের যুদ্ধে উম্মে আম্মারা (রা.) শত্রুদের তরবারির ডজনখানেক আঘাত সহ্য করেও বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে রাসূল (সা.)-এর ওপর আক্রমণকারী শত্রুদের প্রতিহত করেছিলেন। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর সময় উম্মে শিফা নামক নারী বাজারের পরিদর্শক (আল হিসবাহ্) হিসেবে নিয়োজিত হন। রুফায়দা আল-আসলামিয়া প্রথম মহিলা ডাক্তার ছিলেন। রাসূল (সা.) খন্দকের যুদ্ধের সময় তাকে মদিনার মসজিদের পাশে তাঁবু টানিয়ে দিয়েছিলেন এবং সেখানে তিনি যুদ্ধাহত মুসলিম সেনাদের শুশ্রূষা করতেন।

উম্মে মিজান নামক এক মহিলা হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মসজিদে ঝাড়ু দিতেন। জয়নব (রা.) হস্তশিল্পে দক্ষ ছিলেন, চামড়া পাকা করার কাজও করতেন। হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহর খালা তালাকপ্রাপ্ত হলে খেজুর বাগান থেকে খেজুর সংগ্রহ করতেন। মহিলা সাহাবি কি্বলাহ (রা.) বাজারে ব্যবসা করতেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর স্ত্রী রায়িতা (রা.) ঘরে বসে শিল্পকর্ম করতেন, হস্তশিল্পের কাজ করতেন, বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতেন এবং অর্থ উপার্জন করে সংসার চালাতেন।

আয়েশা (রা.) মুয়াবিয়া ও আলী (রা.)-এর মধ্যকার সংকট নিরসনে এগিয়ে আসেন। সাওদা বিনতে আম্মারা বিন আশতার হামদানি তার গোত্রের প্রতিনিধি হয়ে মুয়াবিয়া (রা.)-এর কাছে যান এবং দাবি ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। খলিফা হারুনুর রশিদের স্ত্রী জোবায়দা দীর্ঘ খাল খনন করে হাজিদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেন। সেলজুক শাসক সুলতান মালিক শাহর স্ত্রী তুরকান বিনতে তুরাজ বাগদাদে তিনটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং তা পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ সম্পদ ওয়াক্ফ করেন।

একাদশ শতাব্দীতে মামলুক শাসনামলে মুসলিম নারীরা দামেস্কে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় ও ১২টি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন, যা নারীদের দ্বারাই পরিচালিত হতো। স্পেনের অধিবাসী আয়েশা বিনতে আহমদ বিন কাদিম ছিলেন ক্যালিগ্রাফিশিল্পী। লুবনি (রহ.) ছিলেন বিশিষ্ট ভাষাবিদ ও আরবি ব্যাকরণশাস্ত্রে পারদর্শী। রাবিয়া কসিসাহ সুপ্রসিদ্ধ বক্তা ছিলেন। প্রখ্যাত আইনজ্ঞ শিফা বিনতে আবদুল্লাহ মুসলিম মহিলাদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য বের হতেন। মিসরে মুসলিম শাসক কর্তৃক প্রথম আবাসিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখানে নারীরাও চিকিৎসক ও শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ পান।

ধর্ম নারীর কাজকর্মের ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করেনি, শুধু সৌন্দর্য প্রদর্শনকারী পেশায় নিয়োজিত হতে নিষেধ করেছে। একজন পুরুষ হালাল পন্থায় যেসব ব্যবসা করতে পারে, একজন নারীও সে ধরনের ব্যবসা করতে পারে। জন্মদাতা মা হাওয়া (আ.), আদমকন্যা আকলিমা, ইব্রাহিম (আ.)-এর পত্নী সারা, ইসমাইল (আ.)-এর মাতা হাজেরা, মিসরপতির স্ত্রী জুলায়খা, সুলাইমানের (আ.) পত্নী সাবার রানি বিলকিস, ফেরাউনের স্ত্রী বিবি আছিয়া, আইয়ুব (আ.)-এর স্ত্রী বিবি রহিমা, ইমরানের স্ত্রী হান্না, ঈসা (আ.)-এর মাতা বিবি মরিয়ম, মুহাম্মদ (সা.)-এর মাতা আমেনা ও দুধমাতা হালিমা সাদিয়া; হাফসা (রা.), মারিয়া (রা.)সহ নবী পত্নীগণ; নবীনন্দিনী রুকাইয়া, কুলসুম ও ফাতিমা (রা.); শহিদা সুমাইয়া ও নবীজির দুধবোন সায়েমাও পরিবার ও সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

অথচ এখন কুরুচিপূর্ণ জীবনধারায় অভ্যস্ত নারী স্বাধীনতার সুফল পাচ্ছে না। কর্তৃত্বশূণ্য জীবনেও মুক্তি মিলছে না। বিপথগামী হলে অধিকার হারাচ্ছে, সহজে ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছে। সামাজিক অনুশাসন থেকে মুক্তদের মানসিক ও শারীরিক দুরবস্থা বাড়ছে। ধর্মীয় ও সামাজিক বশ্যতার ভয় মুক্ত হয়ে শারীরিক সৌন্দর্য প্রকাশে উৎসাহিত হয়েছে। মুক্ত পৃথিবীর দাস হয়ে দাসত্বের জীবন যাপন করে ক্লান্ত, হতাশ ও অবসাদগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকে কর্মসংস্থানের সাথে যুক্ত হলেও অর্থনৈতিক মুক্তি আসছে না ও স্বাধীন ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটছে না।

যাদের কর্মসংস্থান হয়নি তারা স্বনির্ভরও হতে পারছে না। অর্থাভাব পরমুখাপেক্ষী করছে, ধর্ম চর্চাও সংকীর্ণ হচ্ছে, বুদ্ধি দুর্বল করছে এবং মানবতা বিনষ্ট হচ্ছে। মানুষের স্বাধীনতা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্ন অমর্যাদা-গ্লানির অতল গহ্বর থেকে তুলে ভালোবাসা-শ্রদ্ধার উঁচু আসনে সমাসীন করার প্রশ্ন। নারীর পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় অর্থনৈতিক ও কর্মের স্বাধীনতা গুরুত্বহীন ভাবা ঠিক নয়।

 

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.