করোনায় মুখোমুখি জীবন-জীবিকা

আনিসুর রহমান এরশাদ

জীবনের সঙ্গে জীবিকাও লাগে। জীবন ও জীবিকা পাশাপাশি চলে। জীবিকার ওপর জীবনের নির্ভরশীলতা আছে। তবে প্রথমে জীবন তারপর জীবিকা। জীবন বড়। জীবন ঊর্ধ্বে। দিন আনে দিন খায় মানুষ জীবিকা হারালে কেউ কেউ হাত পাতে। আর অপ্রাতিষ্ঠানিক বা স্বনিয়োজিত কাজে নিয়োজিতদের জীবিকা বন্ধ হলে জীবন বাঁচানো হয় কঠিন। হঠাৎ চাকরিচ্যুতির কারণেও করুণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। কেউ জমানো অর্থ খরচ করে, কেউ ঋণ করে, কেউ কিছু বিক্রি করে, কেউ ভিক্ষা করে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখায় সংগ্রাম করে। কেউ নগর-শহর ছেড়ে গ্রামে ফেরে, কেউ পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে বাসা ছেড়ে মেসে ওঠে।

দেখা যাচ্ছে- জীবনের মতো জীবিকাও গুরুত্বপূর্ণ। জীবন বাঁচাতে জীবিকাকেও টিকিয়ে রাখতে হবে। জীবন-জীবিকা দুটোই জরুরি। জীবিকার সাথে জীবনের গতিপথ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রত্যেক মানুষের জীবন তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর জীবিকাবিহীন মানুষ জীবন বাঁচাতে পারে না। তাই জীবন যেমন জীবিকাও তেমনি প্রতিটি মানুষের কাছে সর্বাধিক মূল্যবান।

করোনায় জীবন-জীবিকা এখন মুখোমুখি। মানুষের জীবন ও জীবিকার চাকা সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এখনতো জীবন বাঁচানো এবং জীবিকা বাঁচানো-এ দুইয়ের মধ্যে সতর্ক ভারসাম্য রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ । জীবিকার ওপর জীবনের নির্ভরশীলতা সবার একরকম নয়। কারো হয়তো রিক্সা নিয়ে বের না হলে, চাল কিনে না আনলে চুলায় হাড়ি বসে না। কেউ হয়তো আয়-রোজগারে নিরুপায় হয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়, চেয়ে-চিন্তে চলে। যে মানুষটি ঘরে সকালে নাস্তা করার মতো খাবারের সংস্থান না রেখে রাতে বিছানায় ঘুমোতে যায় আর যে সঞ্চয় দিয়েও একযুগ চলতে পারবে দুজনের অবস্থা এক নয়। ফলে লকডাউনের প্রভাব সবার ওপর একইরকম পড়ে না, ফলে একই ধরনের প্রতিক্রিয়াও হয় না।

অনেকক্ষেত্রেই লকডাউন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে- নির্দেশনা বাস্তবে মেনে চলার ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যকর উদ্যোগ না নেয়ায়। অস্পষ্টতায়। কিছু খোলা কিছু বন্ধ রাখায় এলোমেলো অবস্থার সৃষ্টি হওয়ায়। দরিদ্র ও নিম্নআয়ের যেসব মানুষ দিন আনে দিন খায় তারা ঘরে বসে থাকতে পারে না। জীবিকা বন্ধ হলে তাদের জীবন বাঁচাতেই দরকার হয় সহায়তার, বিশেষ ব্যবস্থার। অথচ দেখা যাচ্ছে- একদিকে নজিরবিহীন জনস্বাস্থ্য সংকট, অন্যদিকে দরিদ্র মানুষগুলোর রুটি-রুজির ব্যবস্থা না থাকা। একদিকে কঠিন আর রূঢ় বাস্তবতার সামনে দাঁড়ানো, অন্যদিকে নাগরিকদের জীবন ও জীবিকার সমন্বয়ের চেষ্টা সত্যিই খুব কঠিন।

ক্ষুধার কষ্ট, ক্ষুধার্ত পরিবার-পরিজনের অসহায়ত্ব দেখাটা খুবই কঠিন। প্রান্তিক মানুষের এই কঠিন অবস্থাকে অস্বীকার করা যাবে না। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে করোনা থেকে বাঁচার চেয়ে পেটের ক্ষুধা দূর করাই বেশি গুরুত্ব পায়। তবে এটাও ঠিক নিঃস্ব মানুষগুলো করোনায় আক্রান্ত হলে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। স্বাস্থ্যবিধি মানা, আইসোলেশন, চিকিৎসা ব্যয়সহ একটি বেদনাবিধুর পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরিস্থিতি যাই হোক এখন অগ্রাধিকার পাবে অবশ্যই মানুষের জীবন বাঁচানো। কারণ মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কিছু নেই। তবে প্রাণ বাঁচানোর পরিণাম যেন ভবিষ্যতে জীবিকা হারানোর কারণ হয়ে না দাঁড়ায় সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

তাইতো জীবন ও জীবিকার ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা জরুরি। অনেক মানুষের কাছে জীবনের চেয়ে জীবিকা বড় হয়ে ওঠে! নাহলে কি রানা প্লাজা ফাটল ধরেছে জেনেও অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাজে হাজির হয় শ্রমিকরা! কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য বলেছিলেন- ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। কবি রফিক আজাদ বলেছিলেন- ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাবো। অর্থাৎ জীবিকা ছাড়া জীবন, প্রাণহীন দেহের মতোই! জীবিকা যখন অনিশ্চয়তায় থাকে, জীবনেরও তখন কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। জীবিকার নিশ্চয়তা হারালে মানুষ হয় হতাশ, দেহগুলো হয় ক্লান্ত ।

এটা ঠিক আগে জীবন, পরে জীবিকা। কারণ মৃত্যু হলে কেউ জীবিকা চালাতে পারেন না, তবে জীবন থাকলে অবশ্যই জীবিকা চালাতে পারবেন। দুটোই গুরুত্বপূর্ণ হলেও জীবনের অগ্রাধিকার বেশী। বাংলা অভিধানে জীবন শব্দটি জীবিকার আগে।জীবন থাকলে পরেই জীবিকার প্রয়োজন হয়, জীবন না থাকলে জীবিকার প্রয়োজন হয় না। মানুষের জীবন আগে, জীবন না থাকলে জীবিকা দিয়ে কিছু হবে না। ফ্রি স্টাইলে মাস্ক না লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানোর প্রবণতা থেকে মানুষকে বেরিয়ে আসতে হবে।

তারপরও যখন বাসা ভাড়া কয়েক মাস বকেয়া পড়ায় বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াকে রাস্তায় বের করে দেন, দুবেলা না খেয়ে থাকার পর একবেলার খাবার জুটানোর ব্যাপার সামনে আসে তখন অনেক যুক্তি-বুদ্ধিই আর কাজ করে না। অনেকের ক্ষেত্রে জীবন ও জীবিকা একটার চেয়ে অন্যটা ছোট করে দেখা অতটা সহজ নয়। তাছাড়া খামখেয়ালিপনা, সীমাহীন দায়িত্বহীনতা, সামগ্রিক পরিকল্পনাহীনতা ও নির্বুদ্ধিতা পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করছে। যেভাবে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তের আয় কমছে, সামর্থ্যের অভাব দেখা দিচ্ছে, ভবিষ্যতের ভাবনায় ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে- এসবের নেতিবাচক প্রভাব মারাত্মক।

সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন-জীবিকা মুখোমুখি হলে অনেক সময় জীবিকাই জিতে যায়। বিপজ্জনক করোনাভাইরাসের চেয়েও জীবিকা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির কিছু টাকা উপার্জন না করেই পরিবারের কাছে ফেরাটা তার কাছে মৃত্যুযন্ত্রণার মতোই। সংসার কীভাবে চালাবেন সেই ভাবনাই তার মন-মগজ দখল করে রাখে। বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চললে, অস্বাভাবিক জীবন যাপন করতে বাধ্য হলে, অবাধে চলাফেরা করতে না পারলে, কাজ করতে না পারলে, এক সময় বাঁচার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বা উদ্যোক্তারা একের পর এক লোকসান গুনতে গুনতে নিরুপায় হয়ে যায়। পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। বিকল্প উপায় দরকার হয়। নয়তো বাড়িতে ছেলে-মেয়ে না খেয়ে থাকে।পরিবার-পরিজনকে নিয়ে না খেয়ে থাকলে জীবন অর্থহীন হয়ে যায়। যারা জীবিকা নিয়ে আতঙ্কিত, কীভাবে সংসার চালাবেন তা নিয়ে চিন্তিত তাদের কথা অন্যদেরও ভাবা জরুরি। পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, চরম অনিশ্চয়তা দেখা না দেয়। মানুষ নিজের বা পরিবারের খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসাসহ মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্যে যে কাজের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে , সেটাই তার জীবিকা । ফলে জীবনের স্বার্থেই জীবিকা বাঁচানো খুব বেশি জরুরি।

হাট-বাজারে উপচে পড়া ভিড়। মার্কেটে বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম। শপিংমলে স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই। লোকজনের প্রচন্ড ভিড়েও অনেকে মাস্ক ব্যবহার করছেন না। সামাজিক দূরত্ব, সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করা নিশ্চিত করা যায়নি। গণজমায়েত হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে আহ্বানকে তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। অনেকের মাস্ক থুতনির নিচে। মানুষের চলাচল বন্ধ হয়নি। মানুষও ঘরে থাকেনি। একদিকে চরম দায়িত্বহীনতা ও পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাব, আরেকদিকে নিয়ম মেনে চলার ইচ্ছার ভীষণ রকম ঘাটতি। বিধিনিষেধ না মানার ফলে করোনার ঝুঁকি বাড়ছেই।

পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *