উগ্র পুঁজিবাদ ও লাগামহীন ভোগবাদ: স্বার্থেই সুসম্পর্ক রক্ষা

যুদ্ধ বাধানো,  অস্ত্র ব্যবসা এবং করপোরেট মুনাফা অর্জনে ব্যস্ত পুঁজিবাদের ধ্বজাধারীরা। মৌলিক মানবাধিকার, অসম সমাজ, সামাজিক অস্থিরতা, মাদক-নেশার কবল, পরিবার ধ্বংসকে থোরাই কেয়ার করে অর্থ আর  মুনাফা অর্জনের সীমাহীন নেশায় জীবন অস্থির ও নির্বান্ধব! কোম্পানিগুলো কোটি কোটি ডলারের মুনাফা তুলে নিচ্ছে।   মানুষগুলোর জীবনে বিষণ্নতা বাড়ছে, প্রাণখোলা হাসি–আনন্দ আসছে না। ভোগবাদী সমাজে পণ্যের অতি ব্যবহার বাড়ছে, ব্যবহারের চেয়ে বাড়ছে অপব্যবহার ও বিষক্রিয়া। অধিক ভোগ, অধিক উৎপাদন , অধিক মুনাফা যেন সবকিছু!

অসহায়ত্ব নিয়ে ব্যবসা

সবাই ধ্বংসের দিকে যাক, সবাই মরে যাক তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই; মাথাব্যথা ক্রেতা-ভোক্তা-গ্রহীতা বাড়ানো নিয়ে। উগ্র পুঁজিবাদ মানুষের অসহায়ত্ব নিয়ে ব্যবসা করছে, মানুষের আবেগ- অনুভূতি-মূল্যবোধ-মর্যাদা- শ্রম- সৌন্দর্য নিয়েও ব্যবসা করছে। শোষণ বাড়ুক, বৈষম্য বাড়ুক,  নির্যাতন বাড়ুক- বাড়লেও সমস্যা নেই! সমস্যা  ন্যায্য প্রাপ্য বঞ্চিত শ্রমিক সচেতন হলে বা পুঁজিপতিদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হলে। মেয়েরা  সন্ধ্যাবেলা রাস্তায় বেরুতে পারে না, বিবেকবর্জিত মানুষের দাপট সর্বত্র। হৃদয়বৃত্তি ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। স্নেহ-মায়া-মমতা-প্রেম-প্রীতি ভালবাসা মরে গেছে।

মানবিক মূল্যবোধ অনুপস্থিত

মানবিক মূল্যবোধ এখানে অনুপস্থিত, মনুষ্যত্ব বলে কিছু নাই, মানবতাবাদ অপাংক্তেয়!  ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা-স্বার্থপরতা, লোভ আর লোভ, ব্যক্তিগতভাবে লুণ্ঠন করা, অপরকে ঠকানো আর ভোগবাদী মানসিকতার জয়জয়কার। এখানে ঘুমানোর জন্য ট্যাবলেট খেতে হয়, আনন্দের জন্য নোংরা মানসিকতা চরিতার্থ করতে হয়, বিবাহিত জীবন বন্ধন এড়ায়ে লিভ টুগেদার করতে হয়, মায়ের মেয়ে হয়েও মা হওয়া বোঝা মনে হয়, মাতৃত্বের-পিতৃত্বের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়ে বেড়ে ওঠতে হয়, স্কুলে পিস্তল নিয়ে মারামারি করে খুন করা বাচ্চাদের খেলা।

দুই নাম্বারিকে করছে উৎসাহিত

ছেলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বৃদ্ধ বাবা-মাকে পাঠাচ্ছে  বৃদ্ধাশ্রমে, মাধুর্য্য-ধর্ম-ন্যায়কে বিদায় দিচ্ছে। আগের প্রজন্ম যেখানে ব্যক্তিগত কাজে অফিসের কলম পর্যন্ত ব্যবহার করতো না, সেখানে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এসব  স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা দুই নাম্বারি করাকে উৎসাহিত করছে,  বেতনের ট্যাক্স কমানোর জন্য বিজনেস একাউন্টের কার্ড দিয়ে সব করতে বলছে। ক্লাসরুমের যৌন শিক্ষা শিক্ষার্থীদের সেক্স ডলের ক্রেতা বানায়ে ফেলছে।

কালোবাজারিদের কারসাজির দাপট

লুঠ ও মুনাফার স্বার্থে দেশীয় চিকিৎসাকে ধ্বংস করেছে, দেশীয় চিকিৎসাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। পুঁজিবাদে
মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে বাধা নেই, ফুটপাতে পড়ে থাকতে মানা নেই,  ক্ষুধার্ত শিশুর কান্নায় নিষেধ নেই; নিষেধাজ্ঞা বিনোদন কেন্দ্রগুলো নিরাপদ রাখতে আর  নতজানু না হয়ে প্রতিবাদ করা রুখতে। মজুতদারের পোয়া বারো, কালোবাজারিদের কারসাজির এখানে দাপট। রোদে পোড়া কৃষকের ঘাম কিংবা শ্রমিকের অসহায়ত্ব পুঁজিপতিদের চোখে পড়ে না;  চোখে পড়ে  নর্তকীর নগ্ন নৃত্য কিংবা অর্ধ উলঙ্গ ললনারা

বুর্জোয়ার অবাধ স্বাধীনতা ভোগ

পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় বুর্জোয়ারা অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করে আর শিক্ষিতদেরও হাতে কলমের বদলে
পিস্তল নেয়ায় প্রলোভিত করে! উচ্চশিক্ষিত বেকারের লজ্জা-যন্ত্রণা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা নেই, ভাবনাতো গদি বাঁচানো নিয়ে, ক্ষমতা হারানোর পরের নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চয়তা বিধান নিয়ে, নিরাপদে অর্থপাচার আর বিদেশে বিনিয়োগের লাভের হিসাব নিয়ে। এরা পোষা কুকুরের জন্য লাখ লাথ টাকা খরচ করবে আভিজাত্য দেখাতে, অথচ  ডাস্টবিনে ময়লা থেকে খাবার কুড়িয়ে বাঁচা শিশুর জন্য দু’টি টাকা খরচ করবে না।

সবচেয়ে সস্তা মানুষের শ্রম

নতুন ব্রান্ডের বা নতুন মডেলের পণ্য পেতে এরা বেপরোয়া হয়,  অথচ একমুঠো সাদা ভাতের জায়গায় দু’মুঠো
সাদা ভাত পাবার মতো উপায়ও গরিব-দুঃখীদের মেলে না। একদিকে একটু মোটা দানার নুনের জন্য খেটে মরে, আরেকদিকে চলে বিলাসিতা-অপচয়। নির্ভেজাল পুঁজিবাদে সবচেয়ে সস্তা মানুষ আর মানুষের শ্রম। দুর্বলের
নাম-নিশানা মুছে ফেলা, তাড়িয়ে দেয়া, উচ্ছেদ-উৎখাত করা,  দখল করা, সম্পদ হস্তগত করাতে উদগ্রীব   কিছু অমানুষ।

সুকুমারবৃত্তি ও শিল্পকলা মূল্যহীন

সেবার চেয়ে পদের মোহ বেশি, আনুগত্যের চেয়ে চাটুকারিতা বেশি, বশ্যতা আর প্রলোভনের কাছে নতিস্বীকার বেশি, মানুষ রূপী পশুদের লোভাতুর চোখের দৃষ্টি বেশি। পুঁজিপতির কাছে তরুণের রক্ত প্রিয়, শ্রমিকের ঘাম প্রিয়,
গরিবের সম্ভাবনা নষ্ট করা আশার, মানুষকে ছোট করে নামিয়ে দেয়া আনন্দের। সুকুমারবৃত্তি ও শিল্পকলার কোনো মূল্য এদের কাছে নেই; মূল্য আছে মোটা মানিব্যাগের-ব্যাংক ব্যালেন্সের-গাড়ি-বাড়ির আর আন্দ-ফুর্তির উপায়-উপকরণের।

অক্ষমের পাশে কেউ নেই

পুঁজিবাদ অক্ষমের পাশে নেই, তেলে মাথায় তেল দেয় তেল বাড়ানোর লোভে, অসুস্থতার কারণে শ্রম-মেধা দিতে অপারগ হলেও মমতার হাতের মোহ থাকে না। মূলকথা লাভের জন্য পাশে বসে গল্প করার সময় আছে, ঘন্টায় ঘন্টায় খবর নেবার মানসিকতা আছে; আর লোকসানের আশঙ্কা দেখলেই মাথায় হাত বুলানোর সময় নেই; দেখতে যাওয়া সময় নেই, ভালোবাসার স্পর্শের ক্যারিশমা নেই। যার অন্যের সাহায্য  দরকার সে কাউকে পাশে পাবে না; কিন্তু যার অন্যের সহযোগিতা নেবার প্রয়োজন নেই- তার পাশে দাঁড়ানোর মতো লোকের অভাব নেই! পুঁজিবাদী  দুনিয়ায় আপনাকে হয় পুঁজিপতি হতে হবে, নতুবা পুঁজিপতির বন্ধু-সহযোগী-সহকারী হতে হবে; হয় বিনিয়োগ করবেন, নতুবা ক্রেতা-ভোক্তা হবেন। সহায়তা না করে উপায় নেই।

পুঁজিই সত্য তাহার ওপরে নাই

পুঁজিপতির কাছে পুঁজিই সত্য তাহার ওপরে নাই। যদি সে দেখে মানুষের চেয়ে যন্ত্রে খরচ কমবে, সে মানুষ ফেলে যন্ত্রের পেছনে ছুটবে।   কর্মব্যস্ততা, যান্ত্রিকতা  ও ব্যক্তি কেন্দ্রিকতা এখানে বরণীয়।  নিজের স্বাদ-আহ্লাদ এতটাই তীব্র যে, পাশের ঘরের খবর নেয়ার দরকারও মনে করে না। পুঁজিবাদী উন্নয়নের ভোগবাদী মডেল মানুষের মানবিক আবেগকে নির্বাসনে  পাঠাতে চায়,  বস্তুগত উৎকর্ষতার জন্য  ব্যস্ত হতে উৎসাহিত করে।  টাকা আছে দাম আছে, টাকা নেই মূল্য নেই। বেশি দামে বিক্রি হলে মানসিক তৃপ্তি পায় অনেকে, তবে যিনি অন্যের শ্রম-মেধা কিনে নেন তার কাছে  ব্যক্তি নয় তার কাজের বিনিময়ে লাভটাই বড়।  কয়টাকা খরচ করে কয় টাকা মুনাফা আসছে এটাই এখানে হিসাব-নিকাশের ব্যাপার।

বড় পুঁজি ছোট পুঁজিকে গ্রাস করে

পুঁজিবাদী সংস্থাগুলো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্যই  ঋণ দেয়। দারিদ্র বিমোচন বা টেকসই উন্নয়ন আসলে এদের মুখ্য লক্ষ্য নয়। অর্থনৈতিক স্বার্থ আর মুনাফার কৌশল এখানে মূল চালিকা শক্তি। পণ্যের বিপনন ও বাণিজ্যের জন্য নানাবিধ কসরৎ চলে।  শ্রমজীবীর সস্তা শ্রম , মূল্যবান পণ্যের সস্তা বাণিজ্য আর মূল্যহীন পণ্যের দামি বাণিজ্য এখানে দারুণ তৎপর। বড় পুঁজি ছোট পুঁজিকে গ্রাস  করে, নতুন বণিক আগমনের পরই পুরাতনদের বিরোধিতার মুখে পড়ে। পুঁজিতন্ত্র চায় না শ্রমিক মালিক হয়ে ওঠুক। ফলে শ্রমবাজার নিয়ে  পেরেশানি বাড়ে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা মুখ থুবড়ে পড়ে।  স্বার্থ উদ্ধারে যেই  তৎপরতা,  স্বার্থ রক্ষায় সেই তৎপরতা নেই। আমরা যা আগে ভাবা দরকার তা পরে ভাবছি, আর যা পরে ভাবা দরকার তা আগে ভাবছি। ফলে নতুন নতুন উদ্যোগ দাঁড়াতে পারছে না।

স্বার্থ ক্ষুন্ন করে সুসম্পর্ক চায়

আসলে শুধু নিজের, নিজ দলের বা নিজ প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ দেখাই যথেষ্ট নয়। সমধর্মী সবার স্বার্থ নো দেখলে বা উপেক্ষা করলে   সেই স্বার্থ স্থায়ী হয় না। স্বার্থের কারণেই শুধু সুসম্পর্ক হবে এমনটি না হলেও, স্বার্থ ক্ষুন্ন করে সুসম্পর্ক হবার প্রশ্নই আসে না।  তাই পরের স্বার্থও দেখতে হবে।
পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *