ইভটিজিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব মারাত্মক

‘ইভটিজিং’ একটি সামাজিক সমস্যা ও জাতীয় কলঙ্ক। ‘ইভটিজিং’ শব্দের ‘ইভ’ অর্থ নারী, ‘ইভ’ হচ্ছে ‘এডাম’ এর বিপরীত একটি শব্দ; টিজিং মানে উত্ত্যক্ত বা বিরক্ত করা। ইভটিজিং মানে- নারীদের মৌখিক বা শারীরিক বিভিন্ন ধরনের উত্ত্যক্ত করা, যৌন হয়রানি করা। অমার্জিত ভাষা। ইভটিজিং মূলত এক ধরনের ইউফেমিজম অর্থাৎ উত্ত্যক্ত করার আড়ালে থাকে যৌনতার নির্লজ্জ প্রবৃত্তি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ইভটিজিংকে বলা হয় সেক্সুয়াল হেরাসমেন্ট। এ সেক্সুয়াল হেরাসমেন্টের জন্ম আমেরিকায়। শব্দটি প্রথম পরিচিতি পায় ১৯৭৫ সালের দিকে।

ইভটিজিং কী?

ইভটিজিং হচ্ছে- বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি যৌন হয়রানি বা যে কোন উপায়ে বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে উত্ত্যক্ত করা। একজন মানুষ নারী বলেই তার শক্তি কম, একজন শুধু পুরুষ বলেই তার শক্তি বেশি, পুরুষ চাইলেই নারীকে হেয় করতে পারে, তাকে তুচ্ছ করতে পারে, তাকে নিয়ে উপহাস করতে পারে এবং তাকে অবহেলাও করতে পারে এমন আচরণই ‘ইভটিজিং’। সাধারণত কোনো ছেলের দ্বারা উঠতি বয়সী কোনো মেয়েকে  উত্ত্যক্ত করা ছাড়াও নারীকে এসিড নিক্ষেপ, খুন, অপহরণ, শরীরে আগুন দেয়া, ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনাতো আছেই।

ইভটিজিং বলতে সাধারণত কোনো নারী বা কিশোরীকে তার স্বাভাবিক চলাফেরা বা কাজকর্ম করা অবস্থায় অশালীন মন্তব্য করা, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ অশালীন মন্তব্য, ভয় দেখানো, তার নাম ধরে ডাকা এবং চিৎকার করা, বিকৃত নামে ডাকা, শিস দেয়া- বাজানো, কোনো কিছু ছুঁড়ে দেয়া, ব্যক্তিত্বে লাগে এমন মন্তব্য করা, যোগ্যতা নিয়ে টিটকারি করা, নারীকে তুচ্ছজ্ঞান করা বা  কোনো দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা, হেয় করে কিছু বলা, তাকে নিয়ে অহেতুক হাস্যরসের উদ্রেক করা, রাস্তায় হাঁটতে বাধা দেয়া, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করা, ইঙ্গিতপূর্ণ ইশারা দেয়া ইত্যাদি।

এছাড়া সিগারেটের ধোঁয়া গায়ে ছাড়া, উদ্দেশ্যমূলকভাবে পিছু নেয়া, অশ্লীলভাবে প্রেম নিবেদন করা, গা ঘেঁষে দাঁড়ানো ও শরীরে ধাক্কা দেওয়া, উদ্দেশ্যমূলকভাবে যৌন আবেদনময়ী গান-ছড়া-কবিতা আবৃত্তি করা, চিঠি লেখা, পর্নোগ্রাফি প্রদর্শন, ই-মেইল, টেলিফোন, এসএমএস, কার্টুন পাঠানো, চেয়ার-টেবিল ও দেয়ালে যৌন আবেদনময়ী লেখা, লম্পট চাহনী, উস্কানিমূলক হাততালি, অস্বস্তিপূর্ণ অপলক দৃষ্টি, উড়ন্ত চুমু ইঙ্গিত, পথ রোধ করে দাঁড়ানো বা চলার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, সিট খালি নেই বলে নারীকে বাসেই উঠতে না দেয়া ও ঠাট্টারছলে মেয়েলোকের বুদ্ধি কম বলা, প্রেমে সাড়া না দিলে হুমকি প্রদান ইত্যাদি ইভটিজিং এর মধ্যে পড়ে।

ইভটিজিংয়ে যা হতে পারে

ইভটিজিং এর কারণে শারীরিক লাঞ্ছনা পর্যন্ত হতে পারে, অ্যাসিড সন্ত্রাসের ঘটনাও ঘটতে পারে, হত্যা পর্যন্ত সংঘটিত হতে পারে, শারীরিকের পাশাপাশি মানসিক নির্যাতন হতে পারে, সেক্সসুয়াল ভায়োলেন্সও হতে পারে। ইভটিজিং এর শিকার হলে মানসিকভাবে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদে মেয়েটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সবসময় একটা আতঙ্কে থাকতে পারে, স্বাভাবিক কাজকর্ম-চলাফেরা বিঘ্নিত হতে পারে, নানা ধরনের রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারে ও ঘুমের অসুবিধা-খাওয়ার অরুচি হতে পারে। ইভটিজিং নারীজীবনে সবচেয়ে বাজে ও ভয়ানক অভিজ্ঞতা। নারী জীবনে বিষাক্ত ইভটিজিংয়ের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ইভটিজিং নারীকে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইভটিজিং নারীর অবাধ চলার স্বাধীনতায় বাধার সৃষ্টি করে, কেড়ে নেয় তার অফুরান প্রাণচাঞ্চল্য।

ইভটিজিংয়ের উৎপাত শুধু ভুক্তভোগী মেয়েটির উপরই নয়; বরং তা আছড়ে পড়ে তার পুরো পরিবারের উপর। ফলে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নারী হারিয়ে যায় হতাশার অথৈ সাগরে, যার চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটে নির্মম আত্মহননের মধ্য দিয়ে। কোনো মেয়ে যদি ইভটিজিং-এর শিকার হয়, তখন তার আশ্রয়স্থল হলো তার পরিবার।

এক্ষেত্রে কোনো মেয়ে এই ঘটনা পরিবারের কাছে বলতে গেলে অনেক সময় পরিবার বলে যে, অন্য কারো সঙ্গে এটা হয় না, তোমার সঙ্গে কেন এমনটা হলো? তখন মেয়েটি ভেঙে পড়ে। সে তখন আত্মহত্যার দিকে চলে যেতে পারে। এই ধরনের মেয়েদের মধ্যে মানসিক রোগ বেশি দেখা দেয়। তারা বিষণ্নতায় ভোগে। কোনো মেয়ে এই পরিস্থিতিতে পড়লে পরিবারকেই তাকে সহযোগিতা দিতে হবে। প্রয়োজনে মানসিক চিকিৎকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

ইভটিজারদের বৈশিষ্ট্য

বারবার ইভটিজেংয়ের শিকার মেয়েটির ধৈর্যচ্যুতিতে কখনো ছেলেটির প্রতি তার রাগান্বিতভাব ফুটে উঠে আর তখনই ছেলেটি বা তার বন্ধুরা এটা নিয়ে এক ধরনের মজা পেয়ে থাকে। অর্থাৎ মেয়েটির অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ছেলেটি হাসি-তামাশায় মেতে ওঠে। ইভটিজাররা সাধারণত উঠতি বয়সী মেয়েদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার পথে, শপিংমলে, নির্জন কোনো স্থানে বা সরু গলিতে একা পেয়ে বিভিন্নভাবে টিজ করে থাকে। মেয়েদের ওড়না ধরে টান দেয়া, তাদের সম্পর্কে বিভিন্ন মন্তব্য করা, মেয়েটির পাশ দিয়ে প্রচণ্ড  গতিতে হোন্ডা চালানো, অশালীন বিভিন্ন রকম অঙ্গভঙ্গি করা, শিস দেয়া, চোখ টিপ দেয়া, মেয়েটির মোবাইল নম্বর জোগাড় করে কথা বলার চেষ্টা করা, মোবাইলে বিভিন্ন রকম আজে-বাজে মেসেজ পাঠানো ইত্যাদি ইভটিজারদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

ইভটিজিং সংক্রান্ত অসচেতনতা

আমাদের দেশে ইভটিজারের শিকার হয়ে অনেক মেয়ে বিদ্যালয় ত্যাগ করেছে, অনেকে আত্মহননের মতো পথ বেছে নিয়েছে, যা প্রায়ই পত্র-পত্রিকার শিরোনাম হয়ে আসে। একটা মেয়ে টিজিংয়ের শিকার হয়ে বাড়িতে উত্থাপন করলে বাড়ি থেকে প্রথম প্রশ্ন করা হয়, তুই কী করিস? নিশ্চয়ই তুই কিছু করেছিস, অন্য কাউকে করল না, তোকেই কেন করল? একই পরিবারের একটা ছেলে যখন শিস দিতে গিয়ে ধরা পড়ে, তখনও সবাই মিলে মেয়েটার পোশাক, চাল-চলন, দিনের কোন সময় বের হয় ইত্যাদি নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত হয়।

একটি মেয়ে ইভটিজিংয়ের শিকার হয়, সে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, আতঙ্কিত বোধ করে। পরিবার নিরাপত্তার খাতিরে মেয়েটির লেখাপড়া বা বাইরে বের হওয়ায় বাধা দেয়, তাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়, কিছু দেশে অনার কিলিং পর্যন্ত হয় ইভটিজিংয়ের জন্য। নারী আক্রান্ত হলে, সবচেয়ে বেশি হেরে যায় জন সমর্থন তৈরিতে। দেখবেন, যখন একজন নারী কোনোভাবে হেয় হয়, আরেকজন নারী এসে তার পাশে দাঁড়ায় না। যে নিরাপদে আছে, সে নিজের গা বাঁচিয়ে সরে যায়। এমনকি যে আক্রান্ত হয়, সে-ও সহজে রুখে দাঁড়ায় না, কারণ বাল্যকাল থেকে সে শিখে এসেছে ‘ভালো মেয়েরা গলার আওয়াজ তোলে না’।

ইভটিজিংয়ের কারণ

ইভটিজিং এবং এডামটিজিং দুটোই আমাদের দেশে হচ্ছে। ইভটিজিংয়ের পেছনের কারণগুলো হলো- সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পারিবারিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। নারীকে পণ্য ও ভোগ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহার করা এবং মনে করা। নারীর উগ্র পোশাক ও চলাফেরা। মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা। স্যাটেলাইট টিভির অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত প্রদর্শন। সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার অভাব। পিতা-মাতার অসচেতনতা। রাজনৈতিক দাপট। অসৎ সঙ্গ, মাদকাসক্তি, বেকারত্ব ও অশিক্ষা।

লিঙ্গ বৈষম্যমূলক সামাজিক ব্যবস্থাপনা। শিক্ষাব্যবস্থায় সুস্থ চরিত্র গঠন উপযোগী শিক্ষা বাস্তবায়ন না হওয়া। সুনির্দিষ্ট আইনের প্রয়োগ না থাকা। পেনাল কোড ৫০৯-এ বলা আছে যে, কোনো নারীর শালীনতা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্য, কোনো শব্দ উচ্চারণ, আওয়াজ বা অঙ্গভঙ্গি তৈরি বা কোনো কিছু প্রদর্শন করে, এটা জেনে যে উক্ত নারী সেই শব্দ, আওয়াজ শুনবেন বা উক্ত নারী সেই অঙ্গভঙ্গি দেখবেন বা তা উক্ত নারীর গোপনীয়তায় আঘাত হানবে, সেক্ষেত্রে তিনি সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ইভটিজিং প্রতিরোধ

ইভটিজিং প্রতিরোধে যেসব করণীয়গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে- সন্তানের বেড়ে ওঠা এবং সামাজিকীকরণে পরিবারের যথাযথ ভূমিকা পালন করা। সামাজিক আন্দোলন ও প্রতিরোধ জোরদার করা। ইভটিজারদের সামাজিকভাবে বয়কট করা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া। মোবাইল, ইন্টারনেট ও মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির ওপর কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করা। সামাজিক মূল্যবোধ, সুনীতি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যকর ভূমিকা পালন নিশ্চিত করা। নারীর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা।

সুস্থ বিনোদন ও সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা বৃদ্ধি করা। নারীদের শালীনভাবে পোশাক পরিধান ও শালীনভাবে চলাফেরা করার মানসিকতা তৈরি করা ও চলাফেরা নিশ্চিত করা। অশ্লীল চলচ্চিত্র, কুরুচিপূর্ণ সাহিত্য, যৌন বিকার ও অপসংস্কৃতির আগ্রাসন রোধ করা। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে করে আলস্য, আড্ডাবাজি ও খারাপ সংশ্রব থেকে দূরে রাখা। নারীদের আত্মপ্রত্যয়ী হতে সাহায্য করা। সমাজের প্রভাবশালী ও রাজনীতিবিদদের চোখ রাঙানো দমাতে হবে এবং প্রশাসনের সকলকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।

ইভটিজিংয়ের শিকার হলে কী করবেন?

ইভটিজিংয়ের শিকার হলে সাথে সাথে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ ডায়াল করলে পুলিশি সহয়তা পাবেন। আপনার আশপাশের র‌্যাব ব্যাটালিয়নে জানাতে পারেন। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবর লিখিতভাবে এবং সশরীরে হাজির হয়ে লিখিত বা মৌখিকভাবে অভিযোগ দাখিল করতে পারেন। জেলা পর্যায়ে বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করতে পারেন। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণকেও জানাতে পারেন। জবঢ়ড়ৎঃ ২ জঅই এই অঢ়ঢ়ং এ জানাতে পারেন।

 

পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *