আত্মিক প্রশান্তি কেড়ে নেয় পরশ্রীকাতরতা

পরশ্রীকাতরতা বা কিনা একটি মানসিক রোগ,  বদ স্বভাব। সভ্যতাবোধের অভাব ও মানসিক নীচতা থেকে এই ভয়াবহ রোগের উত্পত্তি। লোভ-লালসার এ অপগুণ মানুষকে অমানুষে পরিণত করে। মানবিক চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।  ব্যাধিটি  এমন নীরব ঘাতক, যা আত্মিক প্রশান্তি কেড়ে নেয়। যা দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই ধ্বংস করে দেয়।

এক নজরে দেখে নিন লুকিয়ে রাখুন

পরশ্রীকাতর শব্দটির অর্থ

বাংলা একাডেমির অভিধানে পরশ্রীকাতর শব্দটির অর্থ দেওয়া আছে এভাবে- অপরের উন্নতি বা সৌভাগ্য দেখে কাতর বা ঈর্ষান্বিত হয় এমন। শব্দটির বিশেষণ পরশ্রীকাতরতা। অপরের উন্নতি বা সৌভাগ্য দেখে যারা ঈর্ষান্বিত হয় তার অর্থ তা বোঝাতে যদি পরশ্রীকাতর শব্দ ব্যবহার হয়।

পরশ্রীকাতর এর বাংলা অর্থ পরশ্রীকাতর বিণ. অন্যের ঐশ্বর্য বা উন্নতি দেখলে দুঃখিত বা ঈর্ষান্বিত হয় এমন।;বি. পরশ্রীকাতরতা।;[পরোস্স্রিকাতোর্] (বিশেষণ) অপরের উন্নতি বা সৌভাগ্য দেখে কাতর বা ঈর্ষান্বিত হয় এমন। পরশ্রীকাতরতা (বিশেষ্য) অপরের উন্নতিতে ঈর্ষা প্রকাশ। {(তৎসম বা সংস্কৃত) পর+শ্রী+কাতর; বহুব্রীহি সমাস}।

পরশ্রীকাতরতা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু

অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, “আমাদের বাঙ্গালিদের মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হলো আমরা মুসলমান, আর একটা হলো আমরা বাঙালি। পরশ্রীকাতরতা আর বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধহয় দুনিয়ার কোনো ভাষায়ই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, পরশ্রীকাতরতা।

পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয় তাকে পরশ্রীকাতর বলে। ঈর্ষা, দ্বেষ সকল ভাষায়ই পাবেন, সকল জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে, কিন্তু বাঙ্গালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। ভাই, ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না। এই জন্যই বাঙালি জাতির সকল রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে।”

পরশ্রীকাতরতা একটি অসুখ

পরশ্রীকাতরতা একটি অসুখ। এতে আমাদের ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে হিংসা-বিদ্বেষ-দ্বন্দ্ব-কলহ-বিবাদ বৃদ্ধি পায়। আমাদের শান্তি ও স্বস্তির জীবন হয়ে উঠে দুর্বিষহ। আজকের বাংলাদেশের চিত্র বলে দেয় মানুষের প্রতি সব মানুষের ভালোবাসা, কর্তব্য বোধ, সহানুভূতি, সহমর্মিতা কমছে। খুব আশংকাজনক হারেই কমছে। এর প্রধান একটি কারণ হচ্ছে পরশ্রীকাতরতা।

পরশ্রীকাতরতা নিয়ে বুদ্ধদেব গুহের গল্প

বাঙালির কাঁকড়া নীতিবিষয়ক একটি গল্প উল্লেখ করেছিলেন বুদ্ধদেব গুহ। এক মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী মালবাহী ট্রেনে চড়েছিলেন ড্রামভর্তি কাঁকড়া নিয়ে। তিনি প্রায়ই এ রকম ড্রাম নিয়ে যাতায়াত করেন। একদিন দেখা গেল তার ড্রামের ঢাকনা খোলা।

পরিচিত সহযাত্রী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি তো অন্যদিন ড্রাম ঢেকে রাখেন। আজ ঢাকনা খোলা কেন? কাঁকড়া তো সব বেরিয়ে যাবে।’

জবাবে ব্যবসায়ী বললেন, ‘ঢাকনা খোলা থাকলেও এই কাঁকড়া বের হতে পারবে না।’

সহযাত্রী অবাক হয়ে বললেন, ‘কেন বের হতে পারবে না?’

ব্যবসায়ী হেসে উত্তর দিলেন, ‘এই কাঁকড়াগুলো বাঙাল মুল্লুকের। কোনো কাঁকড়া যদি ড্রাম থেকে বের হতে চায়, তা হলে স্বগোত্রীয় কাঁকড়াগুলো এর হাত, পা ধরে টানাটানি করে নিচে নামাবেই। কাঁকড়া যেখানে ছিল সেখানেই নামতে বাধ্য হবে। তাই এগুলোর বেরিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’

গল্পটির মর্মার্থ পরিষ্কার। বাঙালি সে কাঁকড়াই হোক আর মানুষই হোক পরশ্রীকাতরতার হাত থেকে তার মুক্তি নেই।

পরশ্রীকাতরতা নিয়ে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৌতুক

পরের শ্রী দেখে কাতর হওয়া বাঙালির মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য। বিখ্যাত বাঙালি অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৌতুক রসের সঙ্গে আমরা কমবেশি পরিচিত। ভানুর এক প্রতিবেশীর পুত্র দীর্ঘদিন পর তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। তাদের কথোপকথন স্মরণ করা যাক-

ভানু : বড় হয়েছ, এবার কিছু একটা করো। তোমার বাবাকে দেখো, বাবা তো চিরকাল খেটে খেটে মরল।

প্রতিবেশীর পুত্র : আমি শহরে লেখাপড়া শেষ করেছি।

ভানু : লেখাপড়া শেষ করলে কী হবে? চাকরি তো পাবে না।

প্রতিবেশীর পুত্র : আমি চাকরি পেয়েছি।

ভানু : চাকরি পেতে পারো, কিন্তু বেতন পাবে না।

ভানুর উক্তির মধ্যে ঈর্ষাকাতর বাঙালির নিখুঁত পরিচয় ফুটে উঠেছে।

পরশ্রীকাতরতা নিয়ে প্রচলিত গল্প

দেবদূতের দেখা পেয়েছিলেন এক বাঙালি। দেবদূত সেই ব্যক্তিকে বলেছিলেন, তার যে কোনো আকাঙ্ক্ষা তিনি পূরণ করবেন। তবে একটি শর্ত আছে। সেই ব্যক্তি যা পাবেন তার প্রতিবেশী এর দ্বিগুণ পাবেন।

এ কথা শুনে দ্বিধায় পড়ে গেলেন লোকটি। টাকা-পয়সা, জমিজমা, গাড়ি, বাড়ি যা কিছুই চান না কেন, তার প্রতিবেশী দ্বিগুণ পাবে। প্রতিবেশীর দ্বিগুণ প্রাপ্তি তিনি কিছুতেই সহ্য করতে পারবেন না।

অনেক ভেবে তিনি দেবদূতকে বললেন, নিজের এক চোখ নষ্ট করতে চান তিনি। এতে প্রতিবেশীর দুই চোখ নষ্ট হবে। নিজের এক চোখ নষ্ট করতে তার কষ্ট হয়নি এই ভেবে যে প্রতিবেশীর দুই চোখ নষ্ট হবে।

পরশ্রীকাতরতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের জীবনে ঘটনা

শান্তিনিকেতনে কবিগুরুর ঘরে একদিন পণ্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী ও অন্য কয়েকজন বসে হাল্কা গল্পগুজব করছিলেন। কবিগুরু তাদের কথাবার্তা মন দিয়ে শুনছিলেন। এমন সময় হঠাৎ কবিগুরু বিধুশেখর শাস্ত্রীকে বলে উঠলেন, ‘শাস্ত্রীমশাই, আপনি এতদিন যে বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন করলেন, কিন্তু আপনার প্রতিহিংসা প্রবৃত্তি গেল না কেন?’

শাস্ত্রী মশাই এ কথা শুনে হতভম্ব! কী এমন অন্যায় হলো যে, গুরুদেব এমন কথা বললেন। আকাশপাতাল ভেবে কিছুই বুঝতে না পেরে শাস্ত্রীমশাই বললেন, ‘গুরুদেব, আমার কী অপরাধ?’

এবার মুচকি হেসে রবীন্দ্রনাথ শাস্ত্রীমশাইয়ের কামানো দাড়ি-গোঁফের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, ‘এই দাড়ি-গোঁফগুলোকে ছেড়ে দিন, বাড়তে দিন, আর হিংসা করবেন না।’

রবীন্দ্রনাথের মুখে এই কথা শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন বিধুশেখর শাস্ত্রী। অন্যরা প্রবল উচ্ছ্বাসে হেসে উঠলেন।

রবীন্দ্রনাথের কলম থেকেই বেরিয়েছিল প্রবাদপ্রতিম পংক্তি- ‘নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস/ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস। নদীর ওপার বসি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে/কহে, যাহা কিছু সুখ সকলি ওপারে।’

কবিগুরু নিশ্চয়ই নীলনদ, টেমস বা দানিয়ুব নদীর কথা ভেবে এই পংক্তিগুলো রচনা করেননি। বাংলাদেশে প্রবাহিত নদী সম্পর্কে তার ভাবনার প্রতিফলন এটি। অর্থাৎ মানুষ হোক, কাঁকড়া হোক কিংবা নদী, বাঙালির মধ্যে পরশ্রীকাতরতা থাকবেই।

নিজের নিন্দা নিজেই করে বাঙালি

বাঙালি নিজেই নিজের নিন্দা করতে সিদ্ধহস্ত। সবচেয়ে নিকৃষ্ট সাবানের নাম ‘বাংলা সাবান’। সবচেয়ে নিকৃষ্ট মদের নাম ‘বাংলা মদ’। এই নামকরণ তো কোনো অবাঙালি করেনি।

ব্রিটিশদের প্রধান অস্ত্র ছিল পরশ্রীকাতরতা

বাঙ্গালীর মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ, বিভাজনের বীজ খুবই সুকৌশলে বপন করে গেছে ব্রিটিশ শাসকরাই। আর তাতে তাদের প্রধান অস্ত্র ছিল “পরশ্রীকাতরতা”। উপমহাদেশ এবং বিশেষ করে বাঙ্গালী ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো জাতির মধ্যে এটা তেমন একটা দেখা যায় না। এই পরশ্রীকাতরতা গুণটি ব্যবহার করেই ইংরেজরা মীর জাফরকে নবাবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে প্ররোচিত করেছিল।

পরশ্রীকাতরতা প্রসঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তার সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তির আন্দোলনে অন্যতম বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাঙ্গালীর পরশ্রীকাতরতাকে।

তিনি বলেছেন, যাদিও এই আন্দোলন নারীদের সুফলের জন্য তবুও সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তির বিপক্ষে যেসব মহিলারা সরব ছিল তাদের বেশীরভাগই ছিল এমন যাদের মেয়ে বা আত্মীয়দের মধ্যে কোন মেয়ের এই প্রথায় জীবননাশ হয়েছিল।

অর্থাৎ সেই পরশ্রীকাতরতা, অপরের ভাল সহ্য করতে না পারা। তিনি একটা কথা বলে গেছেন বাঙ্গালী নারীর প্রধান শত্রু আরেক বাঙ্গালী নারী, আর এর পেছনে একটাই কারণ পরশ্রীকাতরতা। “

পরশ্রীকাতরতা ধর্মেও ঘৃণিত আচরণ

অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ার প্রবণতাকে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বর্ণিত করেছেন এভাবে, ‘তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও’। (সূরা আত তাকাসুর ১-২)

হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা হিংসা থেকে দূরে থাকো। কেননা হিংসা মানুষের উত্তম কাজগুলোকে এভাবে ধ্বংস করে দেয়, যেমন আগুন শুকনো কাঠকে ছাই করে ফেলে’। (আবু দাউদ)

আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন সে জন্য কি তারা তাদের হিংসা করে’ ? (সূরা নিসা : ৫৪)

রাসূল সা. বলেছেন, ‘আদম সন্তানের যদি স্বর্ণে পরিপূর্ণ একটি উপত্যকা থাকে। তবে সে তাতেই সন্তুষ্ট হবে না বরং দু’টি উপত্যকা কামনা করবে। তার মুখ মাটি ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ভর্তি করা সম্ভব নয়’। (বুখারি : ৬৪৩৯, ৬৪৪০)

হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা নিজেদের চেয়ে নিম্নমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দিকে তাকাও এবং তোমাদের চেয়ে উচ্চমর্যাদাশীলদের দিকে তাকিও না। তোমাদের পর আল্লাহর দেয়া অনুগ্রহকে নিকৃষ্ট মনে না করার জন্য এটিই উৎকৃষ্ট পন্থা’। (বুখারি ও মুসলিম)

নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ

কিছু মানুষ আছে- নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করতেও যাদের আপত্তি থাকে না । এই যে অপরের ক্ষতি করার অভিপ্রায়ে নিজের ক্ষতি সাধন- এটাই পরশ্রীকাতরতা। নিজের যত ক্ষতিই হোক না কেন  পরের খারাপ করাই  যেন মূলমন্ত্র।  নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ- প্রবাদগুলো শুধু বাংলা ভাষাতেই পাওয়া যায়।

এনিয়ে গল্পও আছে। এক গ্রামে দুই প্রতিবেশী জনের মধ্যে আগে খুব বন্ধুত্ব ছিল। কিন্তু পরে তাদের মধ্যে বিবাদ বাধে। একজনের নাম সুশান্ত, অন্য জনের নাম কৃতান্ত। সুশান্ত দেখল যে, কৃতান্তের সঙ্গে কলহ বাধিয়ে অশান্তি ভোগ করার চেয়ে কিছুদিন তীর্থভ্রমণ করে আসা ভাল। এই মনে করে সে পুরুষোত্তম ক্ষেত্র পুরী যাওয়ার জন্য একটি শুভদিন ঠিক করল।

কৃতান্ত দেখল যে সুশান্ত যদি গ্রাম ছেড়ে চলে যায় তবে তো আর উদ্বেগ দেওয়া যাবে না। তাই সে ঠিক করল যে কোন উপায়ে তাকে এই গ্রামে রাখতে হবে এবং সব সময় বিবাদের মধ্যে তাকে ফেলতে হবে। কৃতান্ত জানত যে সুশান্তের কতকগুলি কুসংস্কার আছে। কোথাও যাত্রা কালে নাক কাটা লোককে দেখলে তা অমঙ্গল সূচক বলে সে মনে করে থাকে।

তাই, যেদিন সুশান্ত পুরী যাওয়ার জন্য তৈরী হল। তার বেরোবার মুহূর্তেই কৃতান্ত নিজের নাক কেটে ফেলল। সুশান্ত ঘরের সামনে রাস্তায় পা দিতেই নাককাটা অবস্থায় কৃতান্তকে দেখল। আর তার পুরী যাওয়া হল না।

অনেক কৃতান্তের মতোই অপরের অনিষ্ট করার স্বার্থে নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা নষ্ট করে । তাতে নিজেদের কখনও হরিভজন না হয় না হোক, তাতে তারা কিছুমাত্র ক্ষতি বলে মনে করে না। কিন্তু অন্যেরা কেউ যেন ভক্তিপথে এগিয়ে না যায়। সেটিই খলচরিত্রদের অভিসন্ধি।

পরশ্রীকাতরতা নিয়ে কৌতুক

একটা লোককে কয়েকজন ধরে আচ্ছামতো মারছে। কিন্তু এত মার খেয়েও লোকটা হি হি করে হাসছে।

মার শেষে লোকগুলো চলে গেলে এক পথচারী লোকটার হাসির কারণ জানতে এগিয়ে গেল, ‘এত মার খেয়ে আপনি হাসছেন কেন?’

লোকটা হাসতে হাসতে বলল, ‘হাসব না, লোকগুলো তো সব গাধা। ওরা ফজলু শেখ ভেবে আমাকে মারল। ফজলু শেখ তো আমার শত্রু, আমার নাম তো বজলু শেখ!’

বিভাজনের বীজ পরশ্রীকাতরতা বপন করেছিল ব্রিটিশরা!

পরশ্রীকাতরতাকে ব্যবহার করেই ব্রিটিশরা ভারত পাকিস্তান নামক ২টা দেশ বিভক্ত করতে পেরেছিল। তারা চেয়েছিল একে অপরের সাথে দন্দ্বে মেতে থাকুক। কারণ অবিভক্ত থাকলে এই উপমহাদেশই হতো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র, নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্র। অবিভক্ত উপমহাদেশ গঠনের চেষ্টা ব্যর্থ করতে এই বিভাজনের বীজ আগেই বপন করেছিল ব্রিটিশরা। তারা পরশ্রীকাতরতার জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করেছিল ধর্মকে।

উপমহাদেশের প্রধান ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে বিভেদ ও প্রতিহিংসা সৃষ্টি করার জন্য ব্রিটিশ শাসকরা হিন্দুদের বেশী সুযোগ সুবিধা দিয়েছিল। এর মূলেও ছিল পরশ্রীকাতরতা। ধর্মীয় গোঁড়ামিও ব্রিটিশদের এই প্ল্যান সফল করতে সাহায্য করেছিল।

উপমহাদেশকে ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত না করে ভৌগলিক এবং ভাষাগত দিকের উপর ভিত্তিকরে বিভক্ত করা যায়নি পরশ্রীকাতরতার কারণেই। ইংরেজরা জানতো কাশ্মীর জুম্মু নিয়ে পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলবে আর দ্বন্দ্ব চলবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যেও। ফলে এরা বিভক্ত হতে বাধ্য হবেই।

পরশ্রীকাতরতা থেকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ

আশির দশকে ঢাকার ফুটবলে জনপ্রিয় দুটি ক্লাব ছিল মোহামেডান ও আবাহনী। একবার আবাহনী তাদের তুলনায় দুর্বল দল ওয়ারি ক্লাবের কাছে হেরে গেল। মোহামেডানের সমর্থকরা তখন আবাহনী সমর্থকদের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে শুরু করল ‘ওয়ারি আইলো’ ধ্বনিতে।

এমনকি আবাহনীর খেলা থাকলে মোহামেডান গ্যালারিতে ব্যানারও নিয়ে যাওয়া হতো ‘ওয়ারি আইলো’ লেখা নিয়ে। আবাহনীর সমর্থকদের মনে ততদিন শান্তি ছিল না, যতদিন না ওয়ারির মতো কোনো পচা শামুকে মোহামেডানের পা কাটল।

সে সময়ে রাজধানীর অনেক ছাত্রাবাস বা মেসের কথা শুনেছি- মাঠের খেলায় পরাজিত পক্ষের সমর্থকরা প্রতিপক্ষের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ-হুলের ভয়ে কয়েক দিন পালিয়ে থেকেছে।

পরশ্রীকাতরতা থেকে বিকৃত উল্লাস

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা লাতিন আমেরিকার দুটি দেশ। তাদের মধ্যে ফুটবল নিয়ে বৈরিতা আছে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা অনেক খ্যাতিমান খেলোয়াড়ের জন্ম দিয়েছে।

তাদের খেলা কোটি কোটি মানুষকে মুগ্ধ করছে। তাদের প্রতি সমর্থন থাকতেই পারে। তাই বলে যাকে সমর্থন করি না, তার ব্যর্থতায় বিকৃত উল্লাস প্রকাশ করতে  হবে কেন?

পরশ্রীকাতরতা তৈরিতে কে দায়ী?

পরশ্রীকাতরতা তৈরি হয় শৈশবেই। এজন্য অভিভাবকরা অনেকাংশে দায়ী। কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করলে তার অভিভাবক ভালো ফলাফল করা শিক্ষার্থীর সঙ্গে তার তুলনা করেন। ‘ভালো’র কোনো সীমা নেই।

একজন শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করলেও অভিভাবকের বকুনি খেতে পারে যদি প্রতিবেশীর সন্তান আরও ভালো ফলাফল করে। এভাবেই শিশুমনে প্রতিযোগিতা থেকে ঈর্ষার মনোভাব জন্ম লাভ করে। এক ছাত্র দুঃখ করে বলেছিল, ‘আমি পরীক্ষায় ফেল করেছি এজন্য কষ্ট নেই। কিন্তু আমার বন্ধু যে ফার্স্ট হয়ে গেল এই যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছি না।’

মাৎসর্যের ভিন্ন নাম পরশ্রীকাতরতা

কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য- এভাবেই ষড়রিপুকে চিহ্নিত করেছিলেন প্রাচীন শাস্ত্রকাররা। ষষ্ঠ রিপু অর্থাৎ মাৎসর্যের ভিন্ন নাম পরশ্রীকাতরতা। একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে পরশ্রীকাতরতা থেকে অন্যান্য ব্যাধিরও জন্ম হয়।

অন্যের শ্রী দেখে কাতর হয়ে যে কোনো মূল্যে তার মতো হতে চওয়ার প্রবৃত্তি থেকে লোভের জন্ম। লোভ মানুষকে বিপথগামী করে। লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। তাই পরশ্রীকাতরতার পরিণাম মৃত্যু- এ কথা বললে অতিশয়োক্তি হয় না। তবে মৃত্যুকে ভয় পায় না বাঙালি। অন্তত পরশ্রীকাতরতার ক্ষেত্রে বাঙালিকে মৃত্যুঞ্জয়ী বলা যায়।

পরশ্রীকাতরতা সম্পর্কে তিক্ততা  আনে

মনে করুন আপনার বন্ধু আপনার চেয়ে কম সুদর্শন দেখতে, যোগ্যতায়ও আপনার চেয়ে কম, কিন্তু তার স্ত্রী আপনার স্ত্রীর চেয়ে অনেক বেশী সুন্দরী। এই বিষয়টি নিয়ে আপনি মনে মনে ঈর্ষান্বিত।

আবার আপনার বন্ধুর স্ত্রী অনেক সুন্দরী কিন্তু সে ভাবে, আপনার স্ত্রী তার চেয়ে কম সুন্দরী, কিন্তু তিনি তার চেয়ে বেশী ধনী আর যোগ্য স্বামী পেয়েছেন।

এটাই পরশ্রীকাতরতা, যেখানে নিজেকে অন্যের সাথে অযৌক্তিক তুলনা করে আমরা নিজেদের তো ছোট করেই থাকি, সেই সাথে নিজেদের সুখের জীবনে হতাশা, গ্লানি, সম্পর্কে তিক্ততা ডেকে আনে।

 দৈনন্দিন পরশ্রীকাতরতা

সে ভালো কাজ করছে, ঐ ছেলেটা উন্নতি করছে, সে ভালো রেজাল্ট করেছে ইত্যাদিতে আনন্দ না পাওয়া।

কেন পাশের বাড়ির লোকটি নতুন ফ্ল্যাট কিনল, কীভাবে কিনলো? নিশ্চয় কোন কিন্তু আছে।

ইশ ভাবীর ছেলেটা নামি স্কুলে চান্স পেল? এ বয়সেই কীভাবে এত দ্রুত সফল হলো!

তমুকের স্বামী তাকে এত দামি উপহার দেয় কেন?

এই লোকটা এতো খ্যাতি অর্জন করছে!! নাহ, নিশ্চয় এখানে ভেজাল আছে।

আমিতো এটা পারিনি সে কেন পারবে? আমাকেও সব পেতে হবে। আমার নেই কেন? এই ধরনের চিন্তাধারার মাঝেই রয়েছে দৈনন্দিন পরশ্রীকাতরতা।

মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরশ্রীকাতরতা

মনস্তাত্ত্বিকদের মতে, প্রধানত চারটি কারণেই জেলাসির জন্ম- ১) না পাওয়ার বেদনা, ২) হেরে যাওয়া আর পরাজয়ের ভয়, ৩) নিজে নিজে করতে না পারা, নিজের অক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে গিয়ে নিজেই নিজের অজান্তে মনের মধ্যে হিংসার আগুনকে উসকে দেয়, ৪) অন্যকে অনুসরণ বা নকল করতে বা টেক্কা দিতে গিয়েই জেলাসির চৌকাঠে পা দিয়ে ফেলে মানুষ।

সংকীর্ণতার সর্বোচ্চ ধাপ পরশ্রীকাতরতা

সংকীর্ণতার সর্বোচ্চ ধাপ পরশ্রীকাতরতা শয়তানের ভূষণ। বাজে স্বভাবটি বিপথগামী করে।  অনর্থক এ কাজটি। যারা অন্যের ভালো দেখতে পারে না। অন্যের খুশিতে এরা খুশি না হয়ে ঈর্ষান্বিত হয়ে তার অমঙ্গল কামনা করে।

পরশ্রীকাতর মানুষদের মধ্যে সহমর্মিতা খুঁজে পাওয়া যাবে না। পরশ্রীকাতর ব্যক্তির মনুষ্যত্ব বহাল থাকে না। উদারতার অমৃত স্বাদ উপভোগের ক্ষমতা তারা চিরতরে হারিয়ে ফেলে।

পরশ্রীকাতরতা একটি মানসিক অসুস্থতা

আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা অন্যের ভালো দেখতে পারেন না, অন্যের খুশিতে এরা খুশি না হয়ে ঈর্ষান্বিত হয়ে তার অমঙ্গল কামনা করেন। এটা মানুষের একটা বদ স্বভাব। এটা একটি মানসিক রোগ। রোগের নাম পরশ্রীকাতরতা। পর মানে অন্য আর শ্রী মানে সৌন্দর্য্য, কাতরতা মানে অসুস্থতা, অর্থাৎ অন্যের সৌন্দর্য্য দেখে যারা অসুস্থ হয়ে পড়েন তারাই পরশ্রীকাতর। কথাটার শব্দগত অর্থই বলে দেয় পরশ্রীকাতরতা একটি মানসিক অসুস্থতা বা রোগ।

পরশ্রীকাতরদের সহমর্মীতা নেই

সভ্যতাবোধের অভাব ও মানসিক নীচতা থেকে পরশ্রীকাতরতা রোগের উৎপত্তি। সাধারণভাবে মানুষ হিসাবে অন্যের ভালো দেখে আমাদের সকলেরই আনন্দিত হওয়ার কথা। এটাই মানুষ হিসাবে আমাদের জন্য খুবই স্বাভাবিক আচরণ।

সমাজবদ্ধতার কারণে যুগে যুগে মানুষ একে অন্যের সুখে সুখী, দুখে দুখী হয়ে হয় এসেছে। এটাকে বলে সহমর্মিতা , যা না থাকলে মানুষের মানুষ পরিচয় অর্থহীন হয়ে পড়ে। আর পরশ্রীকাতর মানুষদের মধ্যে এই সহমর্মীতা একবারেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। সুতরাং একজন পরশ্রীকাতর ব্যক্তির মানুষ পরিচয় একটা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।

পরশ্রীকাতর ব্যক্তি মনুষ্যত্বহীন

পরশ্রীকাতর ব্যক্তির মনুষ্যত্ব বহাল থাকে না। শত মানুষের ভিড়ে থেকেও সে মানুষ থেকে দূরে সরে যায়। পশুরা দূর থেকে মানুষকে যে চোখে দেখে, এরাও মানুষদের মাঝে থেকেও সেই দূর চোখেই অন্য মানুষদের দেখে থাকে।

কিছুতেই এরা নিজেদেরকে সকল মানুষের দলভূক্ত ভাবতে পারেন না। পশুদের চোখ দিয়ে এরা অন্য মানুষদের দেখে থাকে। যে চোখ হিংসা লোভের লকলকে জিবের মত শুধু মানুষের অমঙ্গলই কামনা করে।

পরশ্রীকাতররা একঘরে জীবন কাটান

একজন পরশ্রীকাতর ব্যক্তি কারো ভালো কিছু দেখলে হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরেন। তার মনে তখন তীব্র অশান্তি তৈরী হয়, যা তার নিজের জন্যই ক্ষতিকর। এছাড়া সকলের অমঙ্গল চাওয়ার অপরাধে তাকে প্রায় একঘরে হয়েই জীবন পার করতে হয়।

অন্যের ক্ষতি চাইতে চাইতে এদের অন্তর তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে। পরে হাজার চেষ্টা করেও সেই আবদ্ধ তালা আর তারা খুলতে পারেন না। উদারতার অমৃত স্বাদ উপভোগের ক্ষমতা তারা চিরতরে হারিয়ে ফেলেন।

অন্যের আনন্দে আনন্দিত হতে পারার মধ্যে যে কি স্বর্গীয় আবেশ, তা এদের কাছে চির অচেনাই থেকে যায়। যতদিন তারা বেঁচে থাকেন, অন্য সকলের মত মানসিক প্রশান্তি তাদের অধরাই থেকে যায়। সকলের মাঝে থেকেও এরা থাকে বহু দূরে- দ্বীপান্তর কিংবা বনবাসে।

পরশ্রীকাতরতা নেগেটিভ স্ট্রেস বাড়ায়

মানসিক চাপ বা স্ট্রেসকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়- পজিটিভ ও নেগেটিভ। পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করা, নিজের পেশার প্রতি দায়িত্ববোধ থাকা, কিছু শেখার জন্য তৎপর হওয়া ইত্যাদিকে বলা যায় পজিটিভ বা ভালো স্ট্রেস। অন্যদিকে নেগেটিভ স্ট্রেস বলতে হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, রাগ, ক্রোধ এসবকে বোঝানো হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, জীবনের সবচেয়ে বড় স্ট্রেস হলো পরশ্রীকাতরতা।

পরশ্রীকাতরতার ব্যাখ্যা

অন্যের সুখ-সমৃদ্ধি দেখে অনেকেই হীনম্মন্যতার বোধে আক্রান্ত হন। ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা বন্ধুদের নিজেদের তুলনায় বেশি সম্পদশালী, জনপ্রিয় ও সফল বলে ভাবতে শুরু করেন। ব্যাপারটিকে কিছুটা পরশ্রীকাতরতাও বলা যেতে পারে।

এ ধরনের অনুভূতির একটি গাণিতিক ব্যাখ্যায় ফ্রান্স ও ফিনল্যান্ডের একদল বিজ্ঞানী বলছেন, বন্ধুত্বের মধ্যে এক ধরনের বৈপরীত্য বা প্যারাডক্স থেকেই পরশ্রীকাতরতার অনুভূতি জন্মায়। অধিকাংশ মানুষের বন্ধুসংখ্যা সাধারণত কম হয়ে থাকে। তবে কিছু মানুষের বন্ধুর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। আর এই দ্বিতীয় দলটির কারণেই বন্ধুত্বের প্রতি সামগ্রিক মনোভাবের পরিবর্তন ঘটে।

পরশ্রীকাতরতা মনকে বিষণ্ন করে

সহযোগিতা আর প্রতিযোগিতা শব্দ দু’টির অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। সহযোগিতা মানুষের অন্তর প্রশান্ত ও পুলকিত করে। সহযোগিতার উৎস হলো- নৈতিকতা মূল্যবোধ। আর প্রতিযোগিতা অন্তরকে বিষয়ে তুলে, বিষন্ন ও অবসাদগ্রস্ত করে। তুষের নিভু নিভু আগুন অন্তরকে অশান্ত, হিংস্র ও ভয়ংকর আগ্রাসী করে তুলে। প্রতিযোগিতা ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধবী, প্রতিবেশী, আত্মীয় সবার প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বীপূর্ণ মনোভাব পোষণে উদ্ভুদ্ধ করে। প্রতিযোগিতা প্রবণতা মূলত ঈর্ষা ও পরশ্রীকাতরতা থেকে তৈরি হয়।

অহেতুক মানসিক চাপ বাড়ায় পরশ্রীকাতরতা

পরশ্রীকাতরতা অহেতুক স্ট্রেস বাড়ায়। জীবনের সব থেকে বড় স্ট্রেস হল পরশ্রীকাতরতা। কেন পাশের বাড়ি আমার বাড়ির থেকে বড় বা ওরা বড় গাড়ি কিনল, আমরা কেন ছোট গাড়ি চড়ব! বন্ধু, ভাই বা বোনের ছেলেমেয়ে কেন নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে! আমার ছেলেমেয়েকেও সাধ্যের বাইরে গিয়ে সেই স্কুলেই ভর্তি করতে হবে। কেন মন্ত্রীদের ছবি সব সময় কাগজে বেরোবে, কেন ওই মানুষটা এত গুরুত্ব পাবে, আমি কেন নয়! এগুলো সবই নেগেটিভ স্ট্রেস।

পরশ্রীকাতরতা থেকে মুক্তির উপায়

মানুষের যে খারাপ গুনগুলো তার ধ্বংসের জন্য দায়ী তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পরশ্রীকাতরতা। বলা যেতে পারে সব ধরনের বাজে কাজ বা বিষয়গুলোর উৎপত্তি হয় এই রিপু থেকে। পরশ্রীকাতরতা এমন একটি রিপু যা অন্যের কোন ভাল বিষয় থেকে সৃষ্টি হয়, যা একজন মানুষ তার নিজের মধ্যে নেই বলে মনে করেন। পরশ্রীকাতরতা একটি ভয়াবহ ব্যাধি, এ থেকে বাঁচতে আমাদের অবশ্যই নিজেদের নিয়ন্ত্রন করা উচিত।

উপলব্ধি করা

ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করুন, আপনার পরশ্রীকাতরতা আপনাকে কতটুকু সুখী করছে? একজনকে ঈর্ষা করে আপনার প্রাপ্তি কি? এটা গভীরভাবে ভাবুন। ভেবে যদি দেখেন আসলেই ওই মানুষটি যা পেয়েছে তার যোগ্য নয়, আপনিই বেশী যোগ্য, তাহলে এটা ভাবুন যে আপনার জন্য আরও ভাল কিছু আছে। নিজের কাজ করার গতি বাড়িয়ে দিন। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এটা খুবই কার্যকর।

গুণগুলো অনুসরন করা

সাধারণত কাউকে ঈর্ষা করলে তার মধ্যে সবকিছুই খারাপ চোখে দেখা হয়। সে যে তার যোগ্যতা বা কোনো গুণের কারণে জীবনে সফলতা লাভ করছে এটা  মেনে নিতে চায় না। তার সবকিছুই লোক দেখানো, কপট আর তার গুণগুলো সবই অর্থহীন ভাবা হয়।

কিন্তু সেই ব্যক্তির কোন একটি গুণ আছে, যা আপনার নেই। সেটা হয়তো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনেও করেন না। তাই যার প্রতি পরশ্রীকাতর হচ্ছেন, তার গুণগুলো অনুসরন করুন। যোগ্যতা আর চেষ্টাই তার চেয়ে ভাল অবস্থানে নিয়ে যাবে। তখন বুঝতে পারবেন যে ঈর্ষার চেয়ে নিজেকে আপডেট করতে পারলেই সমস্যার সমাধান সহজ হবে।

মূলত নিজেকে সময় দেওয়া আর নিজের উন্নতির জন্য চেষ্টা করাতেই মূল সাফল্য লুকিয়ে আছে। আপনি ঈর্ষা করে কখনো অন্য কারো চেয়ে ভাল থাকতে পারবেন না। কিন্তু ঈর্ষনীয় মানুষের গুনগুলো অনুসরন করে নিজে ঈর্ষনীয় ব্যক্তিত্ব হতে পারবেন।

নিজেকে সম্মান করুন

নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করে নিজেকে অসম্মান করাটা বন্ধ করতে হবে। নিজেকে যিনি সম্মান করেন তিনি কখনোই অন্যের সাথে নিজের তুলনা করে নিজেকে অসম্মান করতে চাইবেন না। যাদের আত্নসম্মানবোধ অনেক তীব্র, তারা ঈর্ষাপরায়ন হতে লজ্জিত বোধ করে। অন্য কাউকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে তাদের বিবেকে বাধে।

নিজেকে ব্যস্ত রাখা

প্রবাদে আছে, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। কারণ ব্যস্ত মানুষের চেয়ে অলস মানুষের হাতে বেশী সময় থাকে অন্যের দোষগুণ, ভালমন্দ, উত্থানপতন নিয়ে মাথা ঘামানোর। নিজের কাজে ব্যস্ত থাকুন, এটাই অন্যদের চেয়ে সফল করে তুলবে। পরশ্রীকাতরতায় ভুগে মানসিক কষ্ট পেতে হবে না।

নিজেকে অনুপ্রাণিত করা

সহজেই হতাশ হয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবে কাজ করা আর সম্ভব হয় না। হীনমন্যতা, আশাহীনতা আমাদের কর্মক্ষমতাকে অকার্যকর করে তোলে। শেখা এমনি একটি শক্তি যা আমাদের এই বলে সবসময় অনুপ্রাণিত করে যে, আমরা যেকোন কিছু করতে পারি।

নিজেকে অনুপ্রাণিত করতে রোজ শিখুন, ভাল বন্ধুদের সাথে সময় কাটান। যা করতে পছন্দ করেন সে কাজগুলো করুন। অনুপ্রেরণা মানুষকে কাজের শক্তি দেয়, হতাশা মুক্ত করে। আর অনুপ্রাণিত মানুষ পরশ্রীকাতরতায় না ভুগে নিজে চেষ্টা করে নিজেকে সকলের ঈর্ষনীয় অবস্থানে নিয়ে যেতে।

মনরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া

নিজেকে পরশ্রীকাতর মনে হলে উচিৎ হবে সাথে সাথে একজন মনরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা শুরু করা। আপাতত নিজের মনকে বলতে হবে পরশ্রীকাতরতা একটা বাজে স্বভাব, অতি দ্রুত অবশ্যই এই বাজে স্বভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

পাথরের মত মনটা আস্তে আস্তে নরম করতে থাকুন। অন্য মানুষের সুখ দুঃখ মন দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করুন। আত্মকেন্দ্রীকতা থেকে বেরিয়ে এসে সহজ হয়ে সকলের সাথে মেশার চেষ্টা করতে থাকুন। কারো ভালো সংবাদ শুনে খুশি হওয়ার চেষ্টা করুন।

কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়া

পরশ্রীকাতরতার মতো একটা বাজে স্বভাব থেকে সকলকেই বেরিয়ে আসতে হবে। অন্যের ক্ষতি চাওয়ার মধ্যে কোন আনন্দ নেই, প্রশান্তি নেই। নেই কোনো লাভ। কাজেই এ কাজটাকে অনর্থক কাজ মনে করে এড়িয়ে চলতে হবে। পরশ্রীকাতরতা পরিহার করে উপভোগ করতে হবে মানব জীবনের শ্রেষ্ঠত্ব। সেজন্য প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রয়োজনে চিকিৎসা নেয়া

আজকাল বেশিরভাগ লোকের মধ্যে পরশ্রীকাতর রোগটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছে। এর থেকে পরিত্রাণের কোনো ওষুধ আজ অবধি আবিষ্কার হয়নি,যদি নিজে না কঠিন রোগটি থেকে বেরিয়ে আসা যায়।  স্বাভাবিকভাবে একজন মানুষের মন থাকবে আকাশের মত উদার। পরশ্রীকাতরতার মত সংকীর্ণতার সেখানে স্থান হওয়ার কথা নয়। অন্য সকল রোগের মত পরশ্রীকাতরতা মানসিক রোগের যথাযথ চিকিৎসা রয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর পরশ্রীকাতরতা

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর পরশ্রীকাতরতায় জাতীয় ঐক্য আজ মহাহুমকির সম্মুখীন। একদল যখন ক্ষমতার মসনদে আরোহন করে তখন আর অন্য দল সেটা সহ্য করতে পারে না। গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে তারা অনেক অগণতান্ত্রিক ও আত্মঘাতী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন।

শেষকথা

আমাদের আশেপাশে সুবেশী মানুষগুলো যাদেরকে আমরা বন্ধু ভাবি তাদের মাঝেই রয়েছে বহু পরশ্রীকাতর মানুষ! আপনি ভালো আছেন- এটাই তাদের ঠিক ভালো লাগে না। এসব বাস্তবতার মধ্যেও চেষ্টা করবেন পরশ্রীকাতরতা হতে নিজেকে দূরে রাখতে। নিজের জীবন নিয়ে ভাবুন। সৎ থাকুন। নিজেকে পরিশুদ্ধ করুন, একদিন আপনাকেও অনেকে ভালোবাসবে। তার জন্য পরশ্রীকাতর হবার কোন প্রয়োজন হবে না।

 

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.